চলে এসেছে ব্যালন ডি’অর ঘোষণার চূড়ান্ত সময়। দুনিয়ার বড় বড় ফুটবল তারকারা এক হচ্ছেন ঝলমলে আলো আর উৎকণ্ঠার এক মঞ্চে। সেখানে তারকাদের লড়াই সেরাদের সেরা হওয়ার, আর ভক্তদের অপেক্ষা প্রিয় তারকার হাতে বিজয়ের ট্রফি দেখবার। রদ্রি-দেম্বেলে এই লড়াইয়ে সামনের দিকের নাম।
নাবিয়া নাভেলী হোসেন
প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৩ পিএমআপডেট : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম
একবার ব্যালন ডি’অর জেতাই কঠিন। দ্বিতীয়বারের মতো জেতা আরও কঠিন। আর টানা দুবার? সেই কীর্তি সর্বশেষ করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে।
এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর সুযোগ উসমান দেম্বেলের সামনে। তবে গতবারের বিজয়ীর পথ সহজ নয়। ২০২৪ সালের বিজয়ী রদ্রি যেমন চোট কাটিয়ে ফিরে বিশ্বকাপ জিতেছেন। তিনিও এবারে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনায় সামনের সারির প্রার্থী। এই দুজনের আলাপ আরেকপাশে রাখলে, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা তো আছেনই।
দেম্বেলের পক্ষে আছে গোল-অ্যাসিস্ট ও ক্লাব ফুটবলের সাফল্য। রদ্রির পক্ষে বিশ্বকাপ জয় এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে একজন এগিয়ে, অন্যজনের মূল্যায়ন করতে হচ্ছে মাঠে তার প্রভাব দিয়ে।
তাহলে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরে কি আবারও দেম্বেলের মুকুট ধরে রাখার পালা? নাকি চোট কাটিয়ে ফিরে রদ্রিই ছিনিয়ে নেবেন পুরস্কার? আর এই দুজনের বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কতটা এগিয়ে?
দেম্বেলে সংখ্যায় পরিষ্কার এগিয়ে
গত বছর ব্যালন ডি’অর জেতার পর দেম্বেলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিলো, এটা কি এক মৌসুমের সাফল্য, নাকি সত্যিই তিনি বিশ্বের সেরাদের একজন? ২০২৬-এর পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে তাকে।
২০২৪-২৫ মৌসুমে অবশ্য নিজের উত্তরটা জোরালোভাবে দিয়েছিলেন দেম্বেলে। পিএসজির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে ৩৫ গোল ও ১৬ অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি অর্থাৎ সরাসরি ৫১টি গোলে অবদান। সেই মৌসুমে পিএসজির সঙ্গে জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ ওয়ান ও ফরাসি কাপ ট্রেবলও। এই পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত তাকে এনে দেয় ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর।
এবারও থামেননি দেম্বেলে। পিএসজির হয়ে আবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। নকআউট পর্বে লিভারপুল ও বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন, ফাইনালেও আর্সেনালের বিপক্ষে গোলের দেখা পেয়েছেন।
এরপর বিশ্বকাপে আরও বড় মঞ্চ। ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে দেম্বেলের টুর্নামেন্ট ছিলো দুর্দান্ত। ফিফার হিসাবে, আট ম্যাচে ৬ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
আর সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্সটি আসে নরওয়ের বিপক্ষে। ম্যাচটির আগে আলোচনার কেন্দ্র ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড। কিন্তু হালান্ড ছিলেন বেঞ্চে। আর ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন দেম্বেলে। ডান পায়ে একটি, বাঁ পায়ে আরও দুটি, হ্যাটট্রিক করে আবারও দেখিয়ে দেন তার সবচেয়ে বড় শক্তি দুই পায়ে সমান দক্ষতা, গতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অল্প জায়গা থেকে শট নেওয়ার ক্ষমতা।
গতবার ব্যালন ডি’অর জেতার পর দেম্বেলে বলেছিলেন, তিনি চান না কেউ মনে করুক ভাগ্যক্রমে পুরস্কারটি পেয়েছেন। তাই তাকে শীর্ষে থাকতে হবে। ৫৩ ম্যাচে ৩৫ গোল-১৬ অ্যাসিস্ট থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে ৬ গোল-২ অ্যাসিস্ট আর এই সংখ্যাগুলোও অন্তত বলছে, সেই জায়গা ধরে রাখার চেষ্টায় কোনো ঘাটতি রাখেননি তিনি।
রদ্রির গোল নেই, কিন্তু গোল্ডেন বল আছে
রদ্রির গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অর জেতার পর গুরুতর চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ তার জন্য ছিল প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ। স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতাতে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রদ্রি। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। আর টুর্নামেন্ট শেষে আসে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি, গোল্ডেন বল। কিন্তু এখানেই শুরু বিতর্ক।
গোল-অ্যাসিস্টের হিসাবে রদ্রির সঙ্গে দেম্বেলের তুলনা করা কঠিন। রদ্রি আট ম্যাচে ০ গোল, ০ অ্যাসিস্ট করেছেন। অন্যদিকে দেম্বেলের ৬ গোল, ২ অ্যাসিস্ট।
শুধু দেম্বেলে নন, লিওনেল মেসিও রদ্রির চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক সংখ্যা নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন, ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। মেসি শেষ পর্যন্ত সিলভার বল পান, আর রদ্রির গোল্ডেন বল নির্বাচন নিয়েই তৈরি হয় তাৎক্ষণিক বিতর্ক।
তবে রদ্রির পক্ষে যুক্তিটাও কম নয়। রদ্রির পারফরম্যান্সের মূল্যায়নে তাই শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখলে চলবে না। তিনি ছিলেন স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রক। পাসিং, বল দখল, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দলকে নিজের ছন্দে খেলার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল তার কাজ। ফিফাও আট ম্যাচজুড়ে তার মাঝমাঠের প্রভাবকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ রদ্রির গোল্ডেন বল আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে যে ফুটবলের সেরা খেলোয়াড় নির্ধারণে গোল-অ্যাসিস্টই কি সব? বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অন্তত এবার সেই উত্তর দেয়নি।
লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও প্রকাশ্যে রদ্রির পক্ষে কথা বলেন। তার মতে, আবারও রদ্রির হাতেই যাওয়া উচিত পুরস্কারটি।
রদ্রি নিজেও অবশ্য পুরস্কারটি ফেরত পাওয়ার ইচ্ছা লুকাননি। ‘আমি কি জিততে চাই না?’ এমনই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ রদ্রির গল্পটা শুধু আরেকটি ব্যালন ডি’অর জেতার গল্প নয়। এটা চোটের পর ফিরে এসে আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চে ওঠার গল্প
ব্যালন ডি’অরের হিসাবেও কি একই হবে?
রদ্রি ও দেম্বেলের তুলনায় মূল প্রশ্নটা এখানেই। দেম্বেলের পক্ষে আছে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, বড় ম্যাচে গোল এবং ক্লাব ফুটবলের সাফল্য। রদ্রির পক্ষে বিশ্বকাপ জয়, গোল্ডেন বল এবং মাঝমাঠে দলের খেলায় প্রভাব। তবে ব্যালন ডি’অর শুধু বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দেওয়া হয় না। পুরো মৌসুমে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়ের সামগ্রিক অবদান বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে বিশ্বকাপের স্বীকৃতি রদ্রিকে আলোচনায় রাখলেও দেম্বেলের ক্লাব সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ধরনের পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, তার ওপরই নির্ভর করবে এই দুই সাবেক বিজয়ীর সম্ভাবনা।
কিন্তু তারা একাই নন
রদ্রি-দেম্বেলের এই তুলনা আকর্ষণীয় হলেও ২০২৬-এর ব্যালন ডি’অরকে দুজনের লড়াই হিসেবে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হ্যারি কেইনের আছে অসাধারণ গোলসংখ্যা। কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন। লামিনে ইয়ামালও ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। অর্থাৎ একজনের বিশ্বকাপের গোল, আরেকজনের বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলের বাইরেও আছে আরও অনেক স্ট্যাটস।
একজনের সংখ্যা, অন্যজনের প্রভাব
শেষ পর্যন্ত রদ্রি ও দেম্বেলের লড়াইটা তাই শুধু দুই সাবেক ব্যালন ডি’অর জয়ীর লড়াই নয়। এটা ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব মাপার দুই ভিন্ন পদ্ধতির লড়াইও। দেম্বেলে দেখাচ্ছেন সংখ্যা দিয়ে ৬ গোল, ২ অ্যাসিস্ট, বড় ম্যাচে গোল, আবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। রদ্রি দেখাচ্ছেন প্রভাব দিয়ে বিশ্বকাপ জয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বল।
আর মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়েই যখন বিতর্ক হয়েছে, তখন ব্যালন ডি’অরের ভোটাররা কীভাবে এই দুই ধরনের পারফরম্যান্সকে দেখবেন, সেটাই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। একজন গতবারের মুকুট ধরে রাখতে চান। অন্যজন চোটের পর আবার সেই মুকুট ফিরে পেতে চান। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে রোনালদোর পর কেউ টানা দুইবার ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। ২০২৬-এ কি সেই অপেক্ষা শেষ হবে? নাকি সংখ্যার দেম্বেলে, প্রভাবের রদ্রি দুজনকেই পেছনে ফেলে নতুন কোনো নাম উঠে আসবে ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে? উত্তর মিলবে ২৬ অক্টোবর, লন্ডনে। ততদিন প্রশ্নটা থাকছেই, রদ্রি কি ফিরে এসে আবারও ব্যালন ডি’অর জিতবেন? নাকি দেম্বেলেই হয়ে উঠবেন রোনালদোর পর প্রথম ব্যাক-টু-ব্যাক জয়ী?
ব্যালন ডি’অর, রদ্রি না দেম্বেলের বাজিমাত?
চলে এসেছে ব্যালন ডি’অর ঘোষণার চূড়ান্ত সময়। দুনিয়ার বড় বড় ফুটবল তারকারা এক হচ্ছেন ঝলমলে আলো আর উৎকণ্ঠার এক মঞ্চে। সেখানে তারকাদের লড়াই সেরাদের সেরা হওয়ার, আর ভক্তদের অপেক্ষা প্রিয় তারকার হাতে বিজয়ের ট্রফি দেখবার। রদ্রি-দেম্বেলে এই লড়াইয়ে সামনের দিকের নাম।
একবার ব্যালন ডি’অর জেতাই কঠিন। দ্বিতীয়বারের মতো জেতা আরও কঠিন। আর টানা দুবার? সেই কীর্তি সর্বশেষ করেছিলেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে।
এবার সেই অপেক্ষার অবসান ঘটানোর সুযোগ উসমান দেম্বেলের সামনে। তবে গতবারের বিজয়ীর পথ সহজ নয়। ২০২৪ সালের বিজয়ী রদ্রি যেমন চোট কাটিয়ে ফিরে বিশ্বকাপ জিতেছেন। তিনিও এবারে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনায় সামনের সারির প্রার্থী। এই দুজনের আলাপ আরেকপাশে রাখলে, হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে, লামিনে ইয়ামাল ও লিওনেল মেসির মতো তারকারা তো আছেনই।
দেম্বেলের পক্ষে আছে গোল-অ্যাসিস্ট ও ক্লাব ফুটবলের সাফল্য। রদ্রির পক্ষে বিশ্বকাপ জয় এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি। বিশ্বকাপের পরিসংখ্যানে একজন এগিয়ে, অন্যজনের মূল্যায়ন করতে হচ্ছে মাঠে তার প্রভাব দিয়ে।
তাহলে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরে কি আবারও দেম্বেলের মুকুট ধরে রাখার পালা? নাকি চোট কাটিয়ে ফিরে রদ্রিই ছিনিয়ে নেবেন পুরস্কার? আর এই দুজনের বাইরের প্রতিদ্বন্দ্বীরা কতটা এগিয়ে?
দেম্বেলে সংখ্যায় পরিষ্কার এগিয়ে
গত বছর ব্যালন ডি’অর জেতার পর দেম্বেলের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিলো, এটা কি এক মৌসুমের সাফল্য, নাকি সত্যিই তিনি বিশ্বের সেরাদের একজন? ২০২৬-এর পারফরম্যান্স সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিয়েছে তাকে।
২০২৪-২৫ মৌসুমে অবশ্য নিজের উত্তরটা জোরালোভাবে দিয়েছিলেন দেম্বেলে। পিএসজির হয়ে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে ৩৫ গোল ও ১৬ অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি অর্থাৎ সরাসরি ৫১টি গোলে অবদান। সেই মৌসুমে পিএসজির সঙ্গে জিতেছেন চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, লিগ ওয়ান ও ফরাসি কাপ ট্রেবলও। এই পারফরম্যান্সই শেষ পর্যন্ত তাকে এনে দেয় ২০২৫ সালের ব্যালন ডি’অর।
এবারও থামেননি দেম্বেলে। পিএসজির হয়ে আবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। নকআউট পর্বে লিভারপুল ও বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ গোল করেছেন, ফাইনালেও আর্সেনালের বিপক্ষে গোলের দেখা পেয়েছেন।
এরপর বিশ্বকাপে আরও বড় মঞ্চ। ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত শিরোপা জিততে পারেনি। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে দেম্বেলের টুর্নামেন্ট ছিলো দুর্দান্ত। ফিফার হিসাবে, আট ম্যাচে ৬ গোল ও ২ অ্যাসিস্ট করেছেন তিনি।
আর সবচেয়ে স্মরণীয় পারফরম্যান্সটি আসে নরওয়ের বিপক্ষে। ম্যাচটির আগে আলোচনার কেন্দ্র ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড। কিন্তু হালান্ড ছিলেন বেঞ্চে। আর ম্যাচের নায়ক হয়ে ওঠেন দেম্বেলে। ডান পায়ে একটি, বাঁ পায়ে আরও দুটি, হ্যাটট্রিক করে আবারও দেখিয়ে দেন তার সবচেয়ে বড় শক্তি দুই পায়ে সমান দক্ষতা, গতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং অল্প জায়গা থেকে শট নেওয়ার ক্ষমতা।
গতবার ব্যালন ডি’অর জেতার পর দেম্বেলে বলেছিলেন, তিনি চান না কেউ মনে করুক ভাগ্যক্রমে পুরস্কারটি পেয়েছেন। তাই তাকে শীর্ষে থাকতে হবে। ৫৩ ম্যাচে ৩৫ গোল-১৬ অ্যাসিস্ট থেকে শুরু করে বিশ্বকাপে ৬ গোল-২ অ্যাসিস্ট আর এই সংখ্যাগুলোও অন্তত বলছে, সেই জায়গা ধরে রাখার চেষ্টায় কোনো ঘাটতি রাখেননি তিনি।
রদ্রির গোল নেই, কিন্তু গোল্ডেন বল আছে
রদ্রির গল্পটা সম্পূর্ণ আলাদা। ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অর জেতার পর গুরুতর চোটে দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপ তার জন্য ছিল প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ। স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতাতে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন রদ্রি। ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে স্পেন। আর টুর্নামেন্ট শেষে আসে সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি, গোল্ডেন বল। কিন্তু এখানেই শুরু বিতর্ক।
গোল-অ্যাসিস্টের হিসাবে রদ্রির সঙ্গে দেম্বেলের তুলনা করা কঠিন। রদ্রি আট ম্যাচে ০ গোল, ০ অ্যাসিস্ট করেছেন। অন্যদিকে দেম্বেলের ৬ গোল, ২ অ্যাসিস্ট।
শুধু দেম্বেলে নন, লিওনেল মেসিও রদ্রির চেয়ে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক সংখ্যা নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করেছেন, ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট। মেসি শেষ পর্যন্ত সিলভার বল পান, আর রদ্রির গোল্ডেন বল নির্বাচন নিয়েই তৈরি হয় তাৎক্ষণিক বিতর্ক।
তবে রদ্রির পক্ষে যুক্তিটাও কম নয়। রদ্রির পারফরম্যান্সের মূল্যায়নে তাই শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট দেখলে চলবে না। তিনি ছিলেন স্পেনের মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রক। পাসিং, বল দখল, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং দলকে নিজের ছন্দে খেলার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল তার কাজ। ফিফাও আট ম্যাচজুড়ে তার মাঝমাঠের প্রভাবকে বিশেষভাবে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ রদ্রির গোল্ডেন বল আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে যে ফুটবলের সেরা খেলোয়াড় নির্ধারণে গোল-অ্যাসিস্টই কি সব? বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার অন্তত এবার সেই উত্তর দেয়নি।
লা লিগার সভাপতি হাভিয়ের তেবাসও প্রকাশ্যে রদ্রির পক্ষে কথা বলেন। তার মতে, আবারও রদ্রির হাতেই যাওয়া উচিত পুরস্কারটি।
রদ্রি নিজেও অবশ্য পুরস্কারটি ফেরত পাওয়ার ইচ্ছা লুকাননি। ‘আমি কি জিততে চাই না?’ এমনই প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন তিনি।
অর্থাৎ রদ্রির গল্পটা শুধু আরেকটি ব্যালন ডি’অর জেতার গল্প নয়। এটা চোটের পর ফিরে এসে আবারও ফুটবলের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চে ওঠার গল্প
ব্যালন ডি’অরের হিসাবেও কি একই হবে?
রদ্রি ও দেম্বেলের তুলনায় মূল প্রশ্নটা এখানেই। দেম্বেলের পক্ষে আছে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, বড় ম্যাচে গোল এবং ক্লাব ফুটবলের সাফল্য। রদ্রির পক্ষে বিশ্বকাপ জয়, গোল্ডেন বল এবং মাঝমাঠে দলের খেলায় প্রভাব। তবে ব্যালন ডি’অর শুধু বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে দেওয়া হয় না। পুরো মৌসুমে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়ের সামগ্রিক অবদান বিবেচনায় নেওয়া হয়। ফলে বিশ্বকাপের স্বীকৃতি রদ্রিকে আলোচনায় রাখলেও দেম্বেলের ক্লাব সাফল্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
শেষ পর্যন্ত ভোটাররা কোন ধরনের পারফরম্যান্সকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, তার ওপরই নির্ভর করবে এই দুই সাবেক বিজয়ীর সম্ভাবনা।
কিন্তু তারা একাই নন
রদ্রি-দেম্বেলের এই তুলনা আকর্ষণীয় হলেও ২০২৬-এর ব্যালন ডি’অরকে দুজনের লড়াই হিসেবে দেখলে ছবিটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। হ্যারি কেইনের আছে অসাধারণ গোলসংখ্যা। কিলিয়ান এমবাপ্পে বিশ্বকাপে ১০ গোল করে গোল্ডেন বুট জিতেছেন। লামিনে ইয়ামালও ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। অর্থাৎ একজনের বিশ্বকাপের গোল, আরেকজনের বিশ্বকাপের গোল্ডেন বলের বাইরেও আছে আরও অনেক স্ট্যাটস।
একজনের সংখ্যা, অন্যজনের প্রভাব
শেষ পর্যন্ত রদ্রি ও দেম্বেলের লড়াইটা তাই শুধু দুই সাবেক ব্যালন ডি’অর জয়ীর লড়াই নয়। এটা ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্ব মাপার দুই ভিন্ন পদ্ধতির লড়াইও। দেম্বেলে দেখাচ্ছেন সংখ্যা দিয়ে ৬ গোল, ২ অ্যাসিস্ট, বড় ম্যাচে গোল, আবারও চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। রদ্রি দেখাচ্ছেন প্রভাব দিয়ে বিশ্বকাপ জয়, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ এবং শেষ পর্যন্ত গোল্ডেন বল।
আর মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার নিয়েই যখন বিতর্ক হয়েছে, তখন ব্যালন ডি’অরের ভোটাররা কীভাবে এই দুই ধরনের পারফরম্যান্সকে দেখবেন, সেটাই হয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। একজন গতবারের মুকুট ধরে রাখতে চান। অন্যজন চোটের পর আবার সেই মুকুট ফিরে পেতে চান। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে রোনালদোর পর কেউ টানা দুইবার ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি। ২০২৬-এ কি সেই অপেক্ষা শেষ হবে? নাকি সংখ্যার দেম্বেলে, প্রভাবের রদ্রি দুজনকেই পেছনে ফেলে নতুন কোনো নাম উঠে আসবে ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চে? উত্তর মিলবে ২৬ অক্টোবর, লন্ডনে। ততদিন প্রশ্নটা থাকছেই, রদ্রি কি ফিরে এসে আবারও ব্যালন ডি’অর জিতবেন? নাকি দেম্বেলেই হয়ে উঠবেন রোনালদোর পর প্রথম ব্যাক-টু-ব্যাক জয়ী?