২০১৫ থেকে ২০১৯। বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের অন্যতম স্মরণীয় সময়। বড় কোনো বৈশ্বিক শিরোপা জিততে না পারলেও এই সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছিল বাংলাদেশ। দেশের মাটিতে একের পর এক সিরিজ জয়, বড় দলগুলোর বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী পারফরম্যান্স এবং নিয়মিত জয়ের অভ্যাস তৈরি হয়েছিল তখন। কিন্তু সেই সময়ের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের পার্থক্য এখন স্পষ্ট।
২০১৫ সালে ভারত, পাকিস্তান ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজ জিতেছিল বাংলাদেশ। সেই সাফল্য দেশের ক্রিকেটে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ৭৯টি ওয়ানডে খেলে ৪০টিতে জয় পেয়েছিল দল। জয়ের অনুপাত ছিলো ১ দশমিক ১৯।
অন্যদিকে, পরের পাঁচ বছরে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সে অবনতি দেখা গেছে। ৮০টি ম্যাচে জয় মাত্র ৩৪টি, জয়ের অনুপাত নেমে এসেছে ০ দশমিক ৮০-তে। আফগানিস্তানের বিপক্ষে ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তিনটি ওয়ানডে সিরিজেই হেরেছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও এই সময়ে খেলা দুটি সিরিজে জয় পায়নি দল।
আবুধাবিতে ত্রিদেশীয় সিরিজের শুরুটাও হলো হতাশা দিয়ে। জিম্বাবুয়ের কাছে ৯৯ রানে হেরেছে বাংলাদেশ। ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ৩৩ দশমিক ৪ ওভারে ১৭২ রানে অলআউট হয়ে যায় দল। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা আবারও সামনে এসেছে এই ম্যাচে।
তাসকিনের দুর্দান্ত শুরু, ঘুরে দাঁড়ালো জিম্বাবুয়ে
টস জিতে প্রথমে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। কিন্তু শুরুতেই বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদের তোপে পড়ে তারা। ইনিংসের প্রথম বল থেকেই চাপে ছিলেন জিম্বাবুয়ের ব্যাটাররা। প্রথম ওভারের শেষ বলে ব্রায়ান বেনেটকে ফিরিয়ে শুরু করেন তাসকিন। এরপর বেন কারান ও অভিষিক্ত তাফাজওয়া সিগারাকেও আউট করেন তিনি।
সপ্তম ওভারে জিম্বাবুয়ের সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৪ রানে ৩ উইকেট। এমন অবস্থায় বড় সংগ্রহ গড়া কঠিনই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ক্রেইগ আরভিন ও ব্রেন্ডন টেলর বুঝিয়ে দেন, অভিজ্ঞতা কেন ক্রিকেটে এত গুরুত্বপূর্ণ।
দুজনের বয়সই চল্লিশের কোঠায়। অথচ চাপের মুখে তারা বিচলিত হননি। বরং পরিস্থিতি বুঝে কখন আক্রমণ করতে হবে, কখন ইনিংস সামলাতে হবে, সেই হিসাবেই ব্যাটিং করেছেন। চতুর্থ উইকেটে ১৫০ রানের জুটি গড়ে দলকে বিপর্যয় থেকে উদ্ধার করেন তারা।
টেলর ১০১ বলে ৮১ রান করেন। তার ইনিংসে ছিলো ১০টি চার। অন্যদিকে আরভিন ১০৬ বলে ৯৩ রান করেন, মারেন নয়টি চার। দুজনের ব্যাটিংয়েই ছিলো অভিজ্ঞতার ছাপ। পেসারদের বিপক্ষে শুরুতে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের পর স্পিনারদের সামলেছেন সুইপ ও রিভার্স সুইপের মতো শটে।
টেলরের জন্য ইনিংসটি ছিলো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বশেষ অর্ধশতক করার পর এই প্রথম ওয়ানডেতে পঞ্চাশ পেরোলেন তিনি। একই সঙ্গে জিম্বাবুয়ের হয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক হিসেবে অ্যান্ডি ফ্লাওয়ারের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যান।
দলীয় ১৭৪ রানে সাইফ হাসানের বলে আউট হন টেলর। এরপর সিকান্দার রাজাকেও ফিরিয়ে দেন সাইফ। তবে আরভিন তখনো লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ওয়েসলি মাধেভেরের সঙ্গে তার জুটি ভাঙার পর জিম্বাবুয়ের ইনিংসে আবারও কিছুটা ধস নামে। শতকের মাত্র সাত রান আগে শফিউল ইসলামের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন আরভিন।
তবে শেষ দিকে নিউম্যান নিয়ামহুরি ও ওয়েলিংটন মাসাকাদজা আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে দলের সংগ্রহ বাড়িয়ে নেন। অষ্টম উইকেটে অপরাজিত ৩৭ রান যোগ করেন তারা। ফলে ৫০ ওভারে ৮ উইকেটে ২৭১ রান তোলে জিম্বাবুয়ে।
ব্যাটিংয়ে আবারও পুরোনো সমস্যা
২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশের শুরুটা খারাপ ছিলো না। তানজিদ হাসান তামিম আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে রান তুলছিলেন। ৩৮ বলে ৪৬ রানের ইনিংসে তিনি মারেন নয়টি চার ও একটি ছক্কা। কাট, স্কয়ার ড্রাইভ, ফ্লিক ও পুলে সাবলীল ছিলেন এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান।

তবে সপ্তম ওভারে সৌম্য সরকার ব্লেসিং মুজারাবানির বলে দ্বিতীয় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন। এরপর তানজিদও বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। ৪৬ রানে একটি ক্যাচের সুযোগ থেকে বেঁচে যাওয়ার পরের বলেই বিকল্প ফিল্ডার রায়ান বার্লের হাতে ক্যাচ দেন তিনি।
এরপর ব্র্যাড ইভান্সের বলে বোল্ড হন নাজমুল হোসেন শান্ত। ফলে দশম ওভারে ৬৮ রানে তিন উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশ।
অধিনায়ক তাওহিদ হৃদয় ১৩ রান করে সিকান্দার রাজার বলে এলবিডব্লিউ হন। এরপর ওয়েলিংটন মাসাকাদজার বলে একইভাবে আউট হন মোসাদ্দেক হোসেন। ২৬ রান করে সাইফ হাসানও উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন।
মাঝের ওভারগুলোতে জিম্বাবুয়ের স্পিনাররা বাংলাদেশের ব্যাটারদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। সিকান্দার রাজা ও মাসাকাদজা নিয়মিত উইকেট তুলে নিয়ে রান তোলার গতি কমিয়ে দেন। অন্যদিকে পেসার ইভান্সও ফিরে এসে আঘাত হানেন। তার শর্ট বলে নুরুল হাসান ও শরীফুল ইসলাম ক্যাচ দিয়ে ফেরেন।
রিশাদ হোসেন ৩৩ বলে ২৩ রান করে কিছুটা প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাকেও ফেরান রাজা। ওয়ানডেতে নিজের শততম উইকেটটি পান এই জিম্বাবুয়ে অধিনায়ক। শেষ পর্যন্ত ৩৩ দশমিক ৪ ওভারে ১৭২ রানে গুটিয়ে যায় বাংলাদেশের ইনিংস।
জিম্বাবুয়ের হয়ে ইভান্স চারটি, রাজা ও মাসাকাদজা দুটি করে এবং মুজারাবানি ও নিয়ামহুরি একটি করে উইকেট নেন। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে তানজিদের ৪৬ ও সাইফের ২৬ রান ছাড়া উল্লেখযোগ্য অবদান ছিলো না।
অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে জিম্বাবুয়ের জয়
এই ম্যাচে জিম্বাবুয়ের সাফল্যের পেছনে ছিলো অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের কার্যকর সমন্বয়। ব্যাট হাতে চল্লিশোর্ধ্ব আরভিন ও টেলর কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন। বল হাতে তরুণ পেসাররা বাংলাদেশের ব্যাটিংকে ভেঙে দিয়েছেন। অধিনায়ক হিসেবে সিকান্দার রাজারও এটি ছিলো প্রথম ওয়ানডে জয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ শুরুতে ভালো বোলিং করেও প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে পারেনি। ব্যাটিংয়ে তানজিদের দ্রুত বিদায়ের পর আর কেউ ইনিংস বড় করতে পারেননি। দলীয়ভাবে প্রতিপক্ষের চাপ সামলানোর ব্যর্থতা আবারও চোখে পড়েছে।
ব্যাটিংয়ে বড় কোনো জুটি গড়তে না পারাকেই ম্যাচ থেকে ছিটকে যাওয়ার অন্যতম কারণ মনে করছেন তাসকিন আহমেদ। তার মতে, ব্যাটসম্যানরা একটি জুটি গড়তে পারলেও ম্যাচের চিত্র বদলে যেতে পারতো। ব্যাটিংয়ে বারবার ভুলের পুনরাবৃত্তি হলেও বোলিংয়ে আগের চেয়ে ধারাবাহিকতা বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। তাসকিনের আক্ষেপ, বোলারদের পারফরম্যান্সের পর ব্যাটসম্যানদেরই ম্যাচ জেতানোর দায়িত্ব নেওয়া উচিত ছিলো, কিন্তু তারা তা পারেননি।
বাংলাদেশের ওয়ানডে ক্রিকেটের অবনমন তাই শুধু আবুধাবির একটি ম্যাচের পরাজয়ে সীমাবদ্ধ নয়। গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যান, আফগানিস্তানের বিপক্ষে ধারাবাহিক সিরিজ হার এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও সাফল্য না পাওয়ার চিত্র একই উদ্বেগের কথা বলে।
একসময় বড় দলকে হারিয়ে যে বাংলাদেশ আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিল, সেই দল এখন অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষেও ধারাবাহিকতা খুঁজছে। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে ব্যাটিংয়ে দায়িত্বশীলতা, বোলিংয়ে পরিকল্পনার বাস্তবায়ন এবং চাপের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
অতীতের সাফল্য বাংলাদেশের সামর্থ্যের প্রমাণ। কিন্তু সেই সামর্থ্যকে আবার নিয়মিত পারফরম্যান্সে রূপ দিতে না পারলে সোনালি সময়ের সঙ্গে বর্তমানের দূরত্ব আরও বাড়বে।



