লাতিন ছন্দ আর ইউরোপের গতি- বাংলাদেশের ফুটবল দর্শকরা সাধারণত ভাগ হয়ে যান এই দুই ভাগেই। তবু নিজ মহাদেশের কোনো দেশের ওপরও নিশ্চয়ই চোখ রাখতে ইচ্ছে করে। তেমন কাউকে সমর্থন দিতেও খুঁজতে শুরু করতে পারেন কেউ কেউ।
এবারের বিশ্বকাপে কি এশিয়ার কারও ভালো করার সম্ভাবনা নেই? অনেকের মনে এই প্রশ্নও হয়তো ঘুরপাক খাচ্ছে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমনিতে এশিয়ার দেশগুলো খুব বেশি সাফল্য পায়নি কখনো, ঘরের মাঠে ২০০২ বিশ্বকাপে দক্ষিণ কোরিয়ার সেমিফাইনাল খেলাটাই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ।
এবারও কোনো দলের খুব দূরে যাওয়া কঠিন। কিন্তু এশিয়ার একটা দল এবার বিশ্বকাপে যাচ্ছে চ্যাম্পিয়ন হতে! হুট করে কথাটা শুনে আপনার একটু ধাক্কাই লাগতে পারে। কিন্তু জাপানের কোচ, ফুটবলাররা খোলামেলাই বলছেন এমন ইচ্ছের কথা।
এবারের বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই যেমন দলটির উইঙ্গার ইউকিনারি সুগাওয়ারা বলে দিয়েছেন, ‘আমরা এখানে মজা করতে আসিনি, বিশ্বকাপ জিততেই এসেছি।’
জাপানের স্বপ্নটা হয়তো একটু বেশি বড় স্বপ্নই দেখছে, তবে একেবারে হাসাহাসি করার মতোও কিন্তু নয় তা। বিশ্বকাপে আসার পথে তাদের যে পারফরম্যান্স, সেটিই আরও বেশি আশাবাদী করছে তাদের। এবারের জাপান দলকে শুধু তাদের ইতিহাসেরই নয়, এশিয়ারও সেরা দল বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে।
২০১৮ সাল থেকে জাপানের কোচ মোরিয়াসু। সবচেয়ে বেশি সময় ধরে এই দায়িত্বে থাকা কোচের হাত ধরেই ‘বিশ্বকাপ জেতার’ স্বপ্ন বুনছে তারা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের প্রথম পর্বে জাপান ৬ ম্যাচের সবগুলোই জিতেছিল। দ্বিতীয় পর্বে ১০ ম্যাচে হেরেছে কেবল একটি ম্যাচ। দীর্ঘ ভ্রমণ, প্রতিপক্ষের ভিন্নতা আর ভিন্ন ভিন্ন পরিবেশের কথা বিবেচনায় নিলে কাজটা কঠিন যেকোনো দলের জন্যই।
জাপান যে শুধু বাছাইপর্বেই ভালো করেছে, এমনও কিন্তু নয়। টানা ৬টি প্রীতি ম্যাচ জিতেছে তারা- ইংল্যান্ড ও ব্রাজিলের মতো শক্তিশালী দলও আছে এর মধ্যে। বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পরে জাপানের কোচ পরীক্ষা–নিরীক্ষাও চালিয়েছেন, গত এক বছরে তিনি সবমিলিয়ে জাপানের হয়ে খেলিয়েছেন ৬৫ জন ফুটবলারকে। সেখান থেকেই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন সম্ভাব্য সেরা দল।
টেকটিক্যাল ডিসিপ্লিন আর গতি জাপানের এই দলের জন্য সবচেয়ে বড় শক্তি। কাউন্টার-অ্যাটাকের সময় তাদের ক্ষিপ্রতা প্রতিপক্ষের জন্য মুহূর্তেই বিপদ তৈরি করতে পারে। মাঝমাঠ থেকে উইং ধরে চোখের পলকে প্রতিপক্ষের বক্সে ঢুকে যাওয়ার ক্ষমতা আছে জাপানের।
এর সঙ্গে জাপানের ফুটবলারদের আছে ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে খেলার অভিজ্ঞতাও। নিয়মিত বড় তারকাদের মুখোমুখি হওয়ায় বড় মঞ্চে খেলার ভয়টাও থাকার কথা নয় সেভাবে।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলোতে তারা ৩–৪–২–১ ছকেই শুরু করবে। তবে প্রীতি ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তারা ৩–১–৪–২ ফরমেশনও খেলেছে। এ থেকে স্পষ্ট, প্রতিপক্ষ অনুযায়ী নিজেদের কৌশল বদলানোর সক্ষমতা আছে।
দলটির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি হচ্ছ ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক প্রেসিং করা। বল হারালে তা আবার প্রতিপক্ষের পা থেকে ছিনিয়ে এনে আক্রমণে উঠার চেষ্টা করার মন্ত্রে এগিয়ে চলবে জাপান।
তবে উচ্চতা আর ফিজিক্যালিটিতে একটু পিছিয়ে যেতে পারে তারা। ইউরোপ বা আফ্রিকার দীর্ঘদেহী দলগুলোর বিরুদ্ধে সেট–পিস ডিফেন্ড করার সময় জাপান বিপদে পড়ে যেতে পারে। স্ট্রাইকারের অভাবও তাদের ভুগিয়েছে বেশ লম্বা সময়।
তবে বিশ্বকাপের আগে এই জায়গায় আশার আলো হয়ে এসেছেন ২৭ বছর বয়সি স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদা, তাঁর প্রতি নজরও রাখতে হবে আপনাকে। নেদারল্যান্ডসের ক্লাব ফেইনুর্ডে রবিন ফন পার্সির অধীনে ধারাবাহিকভাবে উন্নতি করে চলেছেন তিনি।
এই মৌসুমে ডাচ লিগে ক্লাবটির সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন উয়েদা। গত অক্টোবরে ব্রাজিলের বিপক্ষে জাপানের জয়ে জয়সূচক গোলটিও এসেছিল তাঁর কাছ থেকে। সর্বশেষ ৭ ম্যাচে ৯ গোল করেছেন তিনি।
এছাড়া এক সময় জাপানের মেসি হিসেবে খ্যাতি পাওয়া তাকেফুসা কুবোর দিকেও নজর রাখতে হবে এই বিশ্বকাপে। ১০ বছর বয়সে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়া এই মিডফিল্ডারকে দীর্ঘদিন ধরেই জাপানি ফুটবলারকে সবচেয়ে বড় প্রতিভা হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন অবশ্য তিনি খেলছেন রিয়াল সোসিয়েদাদে।
তবে যতই প্রতিভা, সাম্প্রতিক সময়ে ভালো পারফরম্যান্স কিংবা সম্ভাবনাই থাকুক ‘এফ’ গ্রুপে বেশ ভালো চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়তে হবে জাপানকে। নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন—দুই ইউরোপীয় দলেরই স্কোয়াড বেশ শক্তিশালী। গ্রুপের আরেক প্রতিপক্ষ তিউনিশিয়াও রক্ষণাত্মক ফুটবলে চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে জাপানকে।
শেষ পর্যন্ত তারা কতদূর যেতে পারবে, এই উত্তর সময়ের হাতে। তবে এশিয়ার কারও প্রতি যদি আপনি নজর রাখতে চান- বিশ্বকাপ শুরুর আগ পর্যন্ত ওই দলটার নাম নিশ্চিতভাবেই জাপান।


ম্যাচ ড্র তবু 'আফ্রিকার ব্রাজিলের’ সামনে আসল ব্রাজিলের অন্যরকম 'পরাজয়’
