স্কোরলাইন বলছে ১-১। ইতিহাস বলছে ব্রাজিল এখনও বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে হারেনি। কিন্তু মাঠে যারা দেখেছে, তারা জানে নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়ামের এই রাতটা ব্রাজিলের জন্য কেবল একটি ড্র নয়। এটা ছিল সতর্কবার্তা। এটা ছিল এমন এক ম্যাচ যেখানে আফ্রিকার প্রতিনিধি মরক্কো ব্রাজিলকে হারাতে না পারলেও অনেকটা সময় ধরে মনে করিয়ে দিয়েছে, শুধু জার্সির পাঁচটা তারা দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না।
বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট হয়ে মাঠে নেমেছিল ব্রাজিল। নতুন কোচ কার্লো আনচেলত্তির দল, আক্রমণে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মাঝমাঠে গতি আর অভিজ্ঞতার মিশেল। কিন্তু শুরু থেকেই ম্যাচের গল্প লিখছিল অন্য কেউ।
সেই গল্পের নাম মরক্কো।
আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন দলটি শুরু থেকেই এমনভাবে খেলেছে যেন প্রতিপক্ষের নাম ব্রাজিল নয়, আরেকটি সাধারণ দল।
বল দখলে সাহস, আক্রমণে গতি, প্রেসিংয়ে আত্মবিশ্বাস। আর সবচেয়ে বড় কথা, ভয়হীন ফুটবল। একুশ মিনিটে সেই সাহসের পুরস্কারও পেয়ে যায় তারা।
ব্রাজিলের রক্ষণ আর গোলরক্ষক অ্যালিসন বেকারের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির সুযোগ নিয়ে দূর থেকে বল তুলে দেন ইসমাইল সাইবারি। বল জালে জড়াতেই স্টেডিয়ামে ছড়িয়ে পড়ে বিস্ময়। বিশ্বকাপে দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দলের বিপক্ষে এটাই মরক্কোর প্রথম গোল। ইতিহাস লেখা হয়ে যায় এক মুহূর্তে।
আর সেই মুহূর্তের পরও মরক্কো থামেনি।
প্রথম আধাঘণ্টায় তারা নিয়েছিল ১২টি শট। বিশ্বকাপে ২০১৮ সালে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের পর এত চাপের মুখে ব্রাজিলকে আর দেখা যায়নি। ব্রাজিলের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল তারা ম্যাচে আছে শরীরে, কিন্তু মনটা এখনও ড্রেসিংরুমে।
ম্যাচ শেষে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও সেটাই স্বীকার করলেন। তার ভাষায়, শুরুটা খুব খারাপ হয়েছে। প্রথমার্ধে দল নিজেদের খেলাই খেলতে পারেনি। বল নিজেদের কাছে রাখা, এক দিক থেকে আরেক দিকে ছড়িয়ে খেলার জায়গায় তারা বারবার প্রতিপক্ষের ফাঁদে পড়েছে। বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচ সহজ নয়, সেটাও মনে করিয়ে দিলেন ব্রাজিলের তারকা।
কিন্তু এই ম্যাচে ভিনিসিয়ুস ছিলেন ব্যতিক্রম।
দলের বাকিরা যখন ছন্দ খুঁজছিল, তখন নিজের ৫০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে এক মুহূর্তের জাদু দেখালেন তিনি। ব্রুনো গিমারায়েসের পাস ধরে বক্সের ভেতর থেকে ভেতরের দিকে কেটে এসে দুর্দান্ত শটে গোল করেন। গোলটা ছিল ব্রাজিলিয়ান শিল্পের মতো। সুন্দর, তীক্ষ্ণ, কার্যকর।
আর সেই গোলই শেষ পর্যন্ত বাঁচিয়ে দেয় ব্রাজিলকে। নইলে, ১৯৩৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে হারের লজ্জা দেখতে হতো সেলেসাওদের।
তবু ড্রয়ের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ব্রাজিল নয়, মরক্কো। বিশেষ করে এক তরুণের নাম এখন আলোচনার কেন্দ্র—আয়্যুব বুয়াদ্দি।
ফ্রান্সে জন্ম, মরক্কান পরিবারে বড় হওয়া, ফ্রান্সের বয়সভিত্তিক দলে খেলা ১৮ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার বিশ্বকাপের ঠিক আগে মরক্কোকে বেছে নিয়েছেন। আর প্রথম বড় মঞ্চেই এমন স্বাভাবিক ফুটবল খেললেন যেন বহু বছর ধরে বিশ্বকাপ খেলছেন। বল নিয়ন্ত্রণ, সিদ্ধান্ত নেওয়া, ম্যাচের গতি বোঝা সবকিছুতেই ছিল অসাধারণ পরিপক্বতা।
মরক্কো অধিনায়ক আশরাফ হাকিমিও ম্যাচ শেষে বললেন, এটা সহজ ছিল না। তারা বিশ্বকাপের অন্যতম ফেভারিট দলের মুখোমুখি হয়েছে। কিন্তু এই ড্রয়ের ভেতরেও ভালো অনেক কিছু আছে। ভুল থেকে শিখে তারা আরও উন্নতি করতে চায়।
এই কথাটাই হয়তো মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তি।
কারণ তারা মাঠে নেমেছিল সম্মান নিয়ে। কিন্তু খেলেছে সমতার বিশ্বাস নিয়ে।
আর ব্রাজিল?
তারা হারেনি। তাদের ৯২ বছরের প্রথম ম্যাচে অপরাজিত থাকার রেকর্ডও টিকে গেছে।
কিন্তু এই ম্যাচ তাদের বুঝিয়ে দিল বিশ্বকাপে নামের ওজন দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। আজকের ফুটবলে প্রতিপক্ষ যদি মরক্কোও হয়, তাকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই।
স্কোরবোর্ডে লেখা থাকবে ১ ১।
কিন্তু এই ম্যাচের গল্প হয়তো অন্য কিছু বলবে।
একটা ড্র। আর ব্রাজিলের সামনে দাঁড়িয়ে আফ্রিকার ফুটবলের নীরব ঘোষণা—''আমরাও এসেছি!''



