বনলতা এক্সপ্রেস: ‘বাংলাদেশ’ময় এক ট্রেন যাত্রার ছবি

‘আজান দিয়ে যে জীবনের শুরু তার শেষটা হয় আজান ছাড়া! জানাজার নামাজে কোনো আজান হয় না!’ 

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০২:৫১ পিএম

জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ আর গায়ক আইয়ুব বাচ্চুকে স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনার এক ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। ‘উৎসব’ এর পর পরিচালক তানিম নুরের দ্বিতীয় ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।

মোশাররফ করিম, শ্যামল মাওলা, চঞ্চল চৌধুরী, শরীফুল রাজসহ সব অভিনেতা অভিনেত্রীদের সুন্দর অভিনয়ের বুননে গড়া এক ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। ‘হুমায়ূনীয়’ হাসি-ঠাট্টা আর সহজাত কান্নার এক ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। দুর্দান্ত সেট আর প্রচারণা অনুযায়ী খাঁটি এক বাংলাদেশি ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। সম্ভবত ২০২৬ সালের ঈদুল ফিতরের সর্বাধিক ব্যবসা সফল এক ফ্যামিলি ড্রামা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’।

হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। যদিও হুমায়ূন আহমেদের আরেক আলোচিত উপন্যাস ‘অনীল বাগচীর একদিন’ও আছে ছবির কাহিনীতে। যারা এই দুটো উপন্যাসই পড়েছেন তারা ছবির কাহিনী সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন।

কয়েক ঘণ্টার এক ট্রেন যাত্রার ছবি ‘বনলতা এক্সপ্রেস’। ট্রেনে যাত্রী আছেন, নামকরা এবং পাগলাটে শিক্ষক আছেন, ডাক্তার আছেন, একদল ছাত্রছাত্রী আছেন আর আছেন কন্যাসহ এক সন্তান সম্ভবা নারী ও তার স্বামী। আছে বিনা টিকেটের যাত্রী আর ট্রেনের চাকুরেরা। আলাদা ভাবে সংযোজিত বিশেষ বগিতে আছেন মন্ত্রী, তার স্ত্রী, শালী ও তার স্বামী আর এক ব্যান্ডদল।

বহু বিভক্তি বা তর্কের পরে সবাই এক হয়ে যায় যখন সেই সন্তান সম্ভবা নারীর প্রসব বেদনা ওঠে। জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে কেমন করে নতুন শিশুকে আনা হবে পৃথিবীতে? মুহূর্তের ভেতর সেই ট্রেন কী হয়ে উঠবে এক সম্ভাবনার বাংলাদেশ?

ছবির সবচেয়ে ভালো দিক, এর নির্মাণশৈলী, বিশ্বাসযোগ্য সেট, ট্রেনের গতিময়তা, মজার ডায়ালগ ও শিল্পীদের অভিনয়। সন্তানসম্ভবা আফিয়া চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাকিয়া বারী মম, ১২ বছর সংসার করার পরেও চিনতে না পারা তার স্বামী আজিজুরের চরিত্রে শ্যামল মাওলা, বিয়ের দিন পার্লারে যাবার নাম করে ট্রেনে উঠে পড়া চিত্রা চরিত্রে সাবিলা নুর।

যাদু দেখিয়ে চমকে দেওয়া ডা. আসহাব চরিত্রে শরীফুল রাজ, মন্ত্রীর স্ত্রী সুরমার চরিত্রে আজমেরী হক বাঁধন, একদা গণমানুষের নেতা থেকে বুর্জোয়া মন্ত্রী বনে যাওয়া আবুল খায়ের খানের চরিত্রে চঞ্চল চৌধুরী এবং প্রফেসর রশীদ উদ্দীনের চরিত্রে মোশাররফ করিম।

ডাক্তারের মা সাজেদার চরিত্রে শামীমা নাজমীন, ট্রেনের কর্মকর্তা সুধীরের চরিত্রে এ কে আজাদ সেতু এবং চিত্রার চাচা সাজেদের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ইন্তেখাব দিনার। আরও আছেন আরেফিন জিলানী, সাবরিন আজাদ ও লাবণ্য চৌধুরী। সবাই ভালো অভিনয় দিয়ে মাতিয়ে রাখলেও শ্যামল মাওলা ও মোশাররফ করিম মনে রাখার মতো অভিনয় করেছেন। এই ছবিতে হুমায়ূন ঘনিষ্ঠ অভিনেতা ফারুক আহমেদ ও ডা. ইজাজকে দিয়ে চমক দেওয়াটাও ভালো লেগেছে।

তানিম নুরের পরিচালনায় এই ছবির চিত্রগ্রহণ এবং সংলাপও বেশ মজার। চিত্রগ্রহণে ছিলেন বরকত হোসেন পলাশ। মজার চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন আয়মান আসিব স্বাধীন ও সামিউল ভূইয়া এবং সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন জাহিদ নীরব। এই ছবির নির্বাহী প্রযোজক মশিউর রহমান, রুমেল চৌধুরী ও কৃষ্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায় এবং প্রযোজনা সংস্থা বুড়িগঙ্গা টকিজ। 

যে কোনো ছবি নিয়েই প্রশ্ন তোলা যায়। এই ছবিও তার বাইরে না। যেমন ট্রেন কোথায় যাচ্ছিল? গন্তব্যে যাবার পথে কী হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পড়ে? মন্ত্রীর জন্য কী রাজকীয় এমন বগী কখনো সংযোজিত হয়েছিল? লাশ নিয়ে যাওয়া কোনো পিতা কি কবর দেওয়ার যাত্রায় অনর্গল সিগারেট বা মদপান করে? নাকি সেসব জীবনের দুঃখ ভোলার জন্য?

হুমায়ূন আহমেদ তার ‘কবি’ উপন্যাসে কবিতা না ছাপানোর কারণে ‘পুরিস’ চিকিৎসার কথা বলেছিলেন। এই পুরিসের মানে হয়তো সব লোক জানে না। তাই কী এই ছবিতে ‘ক্রিসপি গু কচকচ করে’ খাওয়ার ডায়ালগ আছে? 

কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে এই ছবিতে সাধারণ মধ্যবিত্তের হাসি কান্না মাখা ভালো লাগার একটা আবহ আছে যেটা প্রচলিত ছবিতে দেখতে পাওয়া যায় না। সেই হিসেবে তানিম নুর পরিচালিত এই ছবির পুরো টিমকে সাধুবাদ জানানো যেতে পারে।

এই ছবি প্রমাণ করেছে হুমায়ূন আহমেদ ও আইয়ুব বাচ্চুকে কীভাবে স্মরণ করা যায়। আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় গান ‘উড়াল দেব আকাশে’ এবং ‘বাংলাদেশ’ শিরোনামের গানটা চমৎকার ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। আছে রবিঠাকুরের চিরচেনা গান, "আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে।"

জয় হোক বাংলা ছবির!

আহসান কবির, লেখক ও অভিনেতা।