ক্রিস্টিনা কোক: পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরত্বে যাওয়া কে এই নারী
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া নারী হিসেবে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন ক্রিস্টিনা কোক। এর আগে ছিল ৩২৮ দিন মহাকাশে কাটানোর রেকর্ড। চাঁদের কাছে যাওয়া প্রথম নারীও হতে যাচ্ছেন তিনি।
আলাপ ডেস্ক
প্রকাশ : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০০ পিএমআপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৩ পিএম
ক্রিস্টিনা কোক
ক্রিস্টিনা কোক, একজন দক্ষ প্রকৌশলী, নভোচারী। তবে এখন তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। কারণ নাসার এই নভোচারী এমন এক কাজ করেছেন, যা পৃথিবীর আর কোনো নারী করতে পারেননি।
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া নারী হিসেবে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন ক্রিস্টিনা কোক। আগে থেকেই তার ঝুলিতে ছিল ৩২৮ দিন মহাকাশে কাটানোর রেকর্ড। চাঁদের কাছে যাওয়া প্রথম নারীও হতে যাচ্ছেন তিনি।
২০১৩ সালে NASA-এর মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এক বিশেষ যাত্রায় নামেন। যা তাকে এমন একটি ইতিহাস তৈরি করতে সহায়তা করেছে।
এই যাত্রায় তিনি মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটান। পুরোপুরি নারীদের নিয়ে গড়া একটি দলকে নেতৃত্ব দেন; প্রমাণ করেন মহাকাশের সীমা নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান।
মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী ছিলেন ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এই নারী নভোচারী ভস্টক-সিক্স যানে করে মহাকাশে যাত্রা করেন। মোট ৭২ ঘণ্টা মহাকাশে ছিলেন ভ্যালেন্তিনা।
তার দেখানো পথেই এরপর যেতে শুরু করেন অন্য নারীরা। তার ২০ বছর পর ১৯৮৩ সালে মার্কিন নারী স্যালি রাইড ‘স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার’ মিশনে মহাকাশে পাড়ি দেন। তিনি ছিলেন প্রথম আমেরিকান নারী নভোচারী, যিনি মহাকাশে যান। ১৯৮৩ সালে ১৮ই জুন সফলভাবে যাত্রাটি শুরু হয়। প্রথম ভারতীয়-আমেরিকান নারী নভোচারী হিসেবে মহাকাশে যান কল্পনা চাওলা। ১৯৯৯ সালে স্পেস শাটল কলম্বিয়া মিশনে মহাকাশে পাড়ি দেন। এই পর্যন্ত ১১৯ জন নারী মহাকাশে গেছেন। তবে ক্রিস্টিনা এমন কাজ করেছেন যা কোনো নারী আগে করতে পারেননি। পৃথিবী থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এক লাখ মাইলেরও বেশি দূরত্ব পাড়ি দিয়েছেন। মিশন শেষে তিনি ২ লাখ ৫৩ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছাবেন।
কে এই ক্রিস্টিনা কোক
নাসায় যোগ দেন ২০১৩ সালে। এরপর ২০১৯ সালের প্রায় পুরোটা সময় ক্রিস্টিনা মহাকাশেই কাটিয়েছেন। কয়েক দফায় ৩২৮ দিন মহাকাশে ছিলেন। যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কোন নারীর মহাকাশে থাকার রেকর্ড।
সে বছরই ক্রিস্টিনা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাজ করেছিলেন এবং সেই সময় তিনি মহাকাশে প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র নারী মহাকাশচারী দল নিয়ে ‘স্পেসওয়াক’ করেছিলেন।
বর্তমানে ক্রিস্টিনা আর্টেমিস টু মিশনের মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তার এই মিশনের জন্য তিনি রাশিয়ার সয়্যুজ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে গিয়েছিলেন এবং সেখানে ব্যাপক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন।
এ ছাড়াও, তিনি নাসাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অ্যাস্ট্রোনট অফিসে ক্রু ব্রাঞ্চের প্রধান ছিলেন তিনি। এ ছাড়া নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে টেকনিক্যাল ইন্টিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
মহাকাশে যাওয়ার আগে, ক্রিস্টিনা কোক অ্যান্টার্কটিকা এবং আর্কটিক অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কাজ করেছিলেন।
ছোট থেকেই পরিশ্রমী ক্রিস্টিনা
পুরো নাম ক্রিস্টিনা হ্যামক কোক। জন্মেছিলেন ১৯৭৯ সালের ২৯ জানুয়ারি, মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডস শহরে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়, গ্রীষ্মকাল কাটত নানা-নানির খামারে।
ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন কিছু পছন্দ করতেন যা তাকে বিশালতার সামনে ক্ষুদ্র অনুভব করাত। রাতের আকাশ, সমুদ্রের বিস্তার, মহাবিশ্বের অসীমতা। এই বিশালতার সামনে নিজের জায়গাটা খোঁজার ইচ্ছাই তাকে মহাকাশের দিকে টেনেছে। তিনি বলেন, এমন কোনো সময় তিনি মনে করতে পারেন না যখন মহাকাশচারী হতে চাননি।
ক্রিস্টিনার শিক্ষাজীবনের পুরোটাই কেটেছে নর্থ ক্যারোলিনায়। নর্থ ক্যারোলিনা স্কুল অফ সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথ ও জ্যাকসনভিলের হোয়াইট ওয়াক হাইস্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু।
এর পর নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেইট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দুটো স্নাতক ডিগ্রি এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পরে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয় তাকে।
মন্টানাতে থাকার সময় তিনি নভোচারী হিসেবে যোগ দেন। ক্রিস্টিনার শখ সার্ফিং, রক ক্লাইম্বিং, যোগব্যায়াম, ট্রায়াথলন, ব্যাকপ্যাকিং, ফটোগ্রাফি, কাঠের কাজ এবং ভ্রমণ।
মহাকাশের জন্য যেভাবে প্রস্তুত করেছিলেন নিজেকে
ক্রিস্টিনা কোকের নভোচারী হওয়ার যাত্রা ছিল অনেক কঠিন। নিজেকে তৈরি করতে এমন সব জায়গায় কাজ করেছেন, যেগুলোর পরিবেশ ছিল খুবই কঠিন।
তিনি প্রথমে আলাস্কার বারো এবং আমেরিকান সামোয়ার মতো দূরবর্তী জায়গায় কাজ করেছিলেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অ্যামুন্ডসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশনে, মানে দক্ষিণ মেরুতে যেখানে তিনি শীতকালে কাটিয়েছিলেন।
২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি অ্যান্টার্কটিকা ও আর্কটিকে কাজ করেছেন। মাইনাস ৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দক্ষিণ মেরু স্টেশনে একটি পূর্ণ শীতকাল কাটিয়েছেন। দিনের পর দিন সূর্যের আলো ছাড়া, সীমিত যোগাযোগে, হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের সঙ্গে সময় কেটেছে তার।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামে রিসার্চ সহযোগী হিসেবে সাউথ পোল স্টেশনে তীব্র ঠাণ্ডায় কাজ করছিলেন ক্রিস্টিনা। সেখানে তিনি ছিলেন ফায়ারফাইটিং এবং সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিমের সদস্য। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল, প্রকৃতিতে বেঁচে থাকা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করার শক্তি।
তিনি শিখেছিলেন মহাকাশের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির গভীরে যাওয়ার কীভাবে কাজ করতে হয়। তার যাত্রা শুরু হয় মহাকাশে। পুরোপুরি নয়, কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানই ধীরে ধীরে সব হয়ে উঠতে থাকে তার।
প্রথমে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির স্পেস ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু করেন। ‘জুনো’ ও ‘ভ্যান এলেন প্রোবস’-এর মতো মিশনগুলোতেও তার অবদান রয়েছে।
এরপর ক্রিস্টিনা আবারো মাঠে ফিরে যান। এইবার তিনি অ্যান্টার্কটিকার পালমার স্টেশন এবং গ্রীনল্যান্ডের সামিট স্টেশনে কাজ করেন।
তারপর যোগ দেন ন্যাশনাল ওশেনিক এবং অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (NOAA)। সেখানে ক্রিস্টিনা আলাস্কার উটকিয়াগভিকের মতো বৈরী পরিবেশে কাজ করেন এবং আমেরিকান সামোয়া অবজারভেটরির স্টেশন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রিস্টিনা মহাকাশ যাত্রার জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। তিনি টি-৩৮ বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নেন, পরে টি-৬ বিমান কমান্ডার হওয়ার জন্যও প্রস্তুতি নেন এবং রাশিয়ান ভাষা শিখেছিলেন।
মহাকাশের যাত্রার জন্য তাকে মানসিক এবং শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (ISS) কাজ করার সময়, মহাকাশে ‘স্পেসওয়াক’ ছিল তার জন্য এক বড় শারীরিক চ্যালেঞ্জ। সেটি ছিল ম্যারাথনের সমান।
মহাকাশে প্রথমবারের মতো পুরোপুরি নারী মহাকাশচারীদের স্পেসওয়াক ছিল, যেখানে ক্রিস্টিনা এবং কেলা মেইর সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করেছিলেন। তারা ISS-এর পাওয়ার সিস্টেমের ব্যাটারি মেরামত করেছিলেন। মোট ছয়টি স্পেসওয়াকের মধ্যে, তিনি ৪২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় কাটিয়েছেন।
নাসায় যোগদান
নাসায় তার ক্যারিয়ার শুরু হয় গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। সেখানে তিনি মহাকাশ বিজ্ঞান মিশনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন।
২০০১ সালে প্রথম নাসায় যোগ দেন ক্রিস্টিনা কোক। সেসময় নাসা অ্যাকাডেমি প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। ২০১৩ সালে, তিনি নাসার ২১তম অ্যাস্ট্রোনট ক্লাসের একজন সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২০১৫ সালে অ্যাস্ট্রোনট ক্যান্ডিডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন।
২০১৮ সালে, তার প্রথম মহাকাশ মিশন শুরু হয়, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ সময় কাটান। এই মিশনে তার কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং তার মহাকাশ ভ্রমণ তাকে একজন দক্ষ মহাকাশচারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তার পরবর্তী দায়িত্ব ছিল অ্যাস্ট্রোনট অফিসে অ্যাসাইনড ক্রু ব্রাঞ্চের ব্রাঞ্চ চিফ। এরপর তিনি নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের সেন্টার ডিরেক্টরের জন্য টেকনিক্যাল ইন্টিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন।
এখন, ক্রিস্টিনা কোক নাসার আর্টেমিস টু মিশনের মিশন স্পেশালিস্ট। চন্দ্রাভিযানে যাওয়া প্রথম কোনো নারী।
মহাকাশে অভিজ্ঞতা
ক্রিস্টিনা কোক ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে সয়ুজ মহাকাশযানে করে রওনা হন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন রসকসমসের নভোচারী আলেক্সি ওভচিনিন এবং নাসার নভোচারী নিক হেগ।
প্রায় এক বছর পর, ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন, সেসময় সঙ্গে ছিলেন রসকসমসের নভোচারী আলেকজান্ডার স্কভর্সভ এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইসা) নভোচারী লুকা পারমিতানো।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের তিনটি অভিযানে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মিশনের অন্যতম বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলোর মধ্যে ছিল আলফা ম্যাগনেটিক স্পেকট্রমিটার আপগ্রেডের জন্য রোবোটিক্স কাজ, ওষুধ গবেষণার জন্য প্রোটিন ক্রিস্টাল বৃদ্ধি, এবং মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে থ্রিডি বায়োলজিক্যাল প্রিন্টার পরীক্ষা করা।
ক্রিস্টিনা কোক মোট ছয়টি স্পেসওয়াক পরিচালনা করেছেন, যার মধ্যে ছিল প্রথম তিনটি সম্পূর্ণ নারী মহাকাশচারীদের দ্বারা পরিচালিত স্পেসওয়াক। এই মিশনগুলোতে তিনি মোট ৪২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট মহাকাশে কাজ করেছেন। সব মিলিয়ে, তিনি মহাকাশে কাটিয়েছেন ৩২৮ দিন।
পুরস্কার ও অর্জন
ক্রিস্টিনা কোক তার ক্যারিয়ারে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি পান নিল আর্মস্ট্রং অ্যাওয়ার্ড অফ এক্সিলেন্স। একই বছরে ন্যাশনাল স্পেস ক্লাব ও ফাউন্ডেশন থেকে পান অ্যাস্ট্রোনটিক্স ইঞ্জিনিয়ার অ্যাওয়ার্ডও পান ও অ্যাথেনা ইন্টারন্যাশনাল থেকে পান গ্লোবাল অ্যাথেনা লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড।
এর আগে ২০১২ সালে নাসা গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। ২০০৯ সালে জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির ইনভেনশন অফ দ্য ইয়ার মনোনয়ন পেয়েছিলেন ক্রিস্টিনা কোক।
২০০৫ সালে তিনি ইউনাইটেড স্টেটস কংগ্রেস অ্যান্টার্কটিক সার্ভিস মেডেলও পান, যার মধ্যে ছিল উইন্টার-ওভার ডিস্টিংকশন। একই বছর, তিনি নাসা গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান।
ক্রিস্টিনা কোক: পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরত্বে যাওয়া কে এই নারী
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া নারী হিসেবে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন ক্রিস্টিনা কোক। এর আগে ছিল ৩২৮ দিন মহাকাশে কাটানোর রেকর্ড। চাঁদের কাছে যাওয়া প্রথম নারীও হতে যাচ্ছেন তিনি।
ক্রিস্টিনা কোক, একজন দক্ষ প্রকৌশলী, নভোচারী। তবে এখন তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। কারণ নাসার এই নভোচারী এমন এক কাজ করেছেন, যা পৃথিবীর আর কোনো নারী করতে পারেননি।
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়া নারী হিসেবে নতুন এক রেকর্ড গড়েছেন ক্রিস্টিনা কোক। আগে থেকেই তার ঝুলিতে ছিল ৩২৮ দিন মহাকাশে কাটানোর রেকর্ড। চাঁদের কাছে যাওয়া প্রথম নারীও হতে যাচ্ছেন তিনি।
২০১৩ সালে NASA-এর মহাকাশচারী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি এক বিশেষ যাত্রায় নামেন। যা তাকে এমন একটি ইতিহাস তৈরি করতে সহায়তা করেছে।
এই যাত্রায় তিনি মহাকাশে দীর্ঘ সময় কাটান। পুরোপুরি নারীদের নিয়ে গড়া একটি দলকে নেতৃত্ব দেন; প্রমাণ করেন মহাকাশের সীমা নারী-পুরুষ সবার জন্য সমান।
মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী ছিলেন ভ্যালেন্তিনা তেরেস্কোভা। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের এই নারী নভোচারী ভস্টক-সিক্স যানে করে মহাকাশে যাত্রা করেন। মোট ৭২ ঘণ্টা মহাকাশে ছিলেন ভ্যালেন্তিনা।
তার দেখানো পথেই এরপর যেতে শুরু করেন অন্য নারীরা। তার ২০ বছর পর ১৯৮৩ সালে মার্কিন নারী স্যালি রাইড ‘স্পেস শাটল চ্যালেঞ্জার’ মিশনে মহাকাশে পাড়ি দেন। তিনি ছিলেন প্রথম আমেরিকান নারী নভোচারী, যিনি মহাকাশে যান। ১৯৮৩ সালে ১৮ই জুন সফলভাবে যাত্রাটি শুরু হয়।
প্রথম ভারতীয়-আমেরিকান নারী নভোচারী হিসেবে মহাকাশে যান কল্পনা চাওলা। ১৯৯৯ সালে স্পেস শাটল কলম্বিয়া মিশনে মহাকাশে পাড়ি দেন।
এই পর্যন্ত ১১৯ জন নারী মহাকাশে গেছেন। তবে ক্রিস্টিনা এমন কাজ করেছেন যা কোনো নারী আগে করতে পারেননি। পৃথিবী থেকে ৪ঠা এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এক লাখ মাইলেরও বেশি দূরত্ব পাড়ি দিয়েছেন। মিশন শেষে তিনি ২ লাখ ৫৩ হাজার মাইল দূরত্বে পৌঁছাবেন।
কে এই ক্রিস্টিনা কোক
নাসায় যোগ দেন ২০১৩ সালে। এরপর ২০১৯ সালের প্রায় পুরোটা সময় ক্রিস্টিনা মহাকাশেই কাটিয়েছেন। কয়েক দফায় ৩২৮ দিন মহাকাশে ছিলেন। যা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দীর্ঘ সময় কোন নারীর মহাকাশে থাকার রেকর্ড।
সে বছরই ক্রিস্টিনা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে কাজ করেছিলেন এবং সেই সময় তিনি মহাকাশে প্রথমবারের মতো শুধুমাত্র নারী মহাকাশচারী দল নিয়ে ‘স্পেসওয়াক’ করেছিলেন।
বর্তমানে ক্রিস্টিনা আর্টেমিস টু মিশনের মিশন স্পেশালিস্ট হিসেবে কাজ করছেন। তার এই মিশনের জন্য তিনি রাশিয়ার সয়্যুজ রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে গিয়েছিলেন এবং সেখানে ব্যাপক প্রশিক্ষণও নিয়েছিলেন।
এ ছাড়াও, তিনি নাসাতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। অ্যাস্ট্রোনট অফিসে ক্রু ব্রাঞ্চের প্রধান ছিলেন তিনি। এ ছাড়া নাসার জনসন স্পেস সেন্টারে টেকনিক্যাল ইন্টিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন।
মহাকাশে যাওয়ার আগে, ক্রিস্টিনা কোক অ্যান্টার্কটিকা এবং আর্কটিক অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় কাজ করেছিলেন।
ছোট থেকেই পরিশ্রমী ক্রিস্টিনা
পুরো নাম ক্রিস্টিনা হ্যামক কোক। জন্মেছিলেন ১৯৭৯ সালের ২৯ জানুয়ারি, মিশিগানের গ্র্যান্ড র্যাপিডস শহরে। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে বড়, গ্রীষ্মকাল কাটত নানা-নানির খামারে।
গ্র্যান্ড র্যাপিডসে বেড়ে ওঠার পর শৈশব কাটিয়েছেন নর্থ ক্যারোলিনার জ্যাকসনভিলে। ছোটবেলায় মিশিগানের পাবিরারিক খামারে সময় কাটাতেন তিনি। সেখানেই শিখেছিলেন কঠোর পরিশ্রম।
ছোটবেলা থেকেই তিনি এমন কিছু পছন্দ করতেন যা তাকে বিশালতার সামনে ক্ষুদ্র অনুভব করাত। রাতের আকাশ, সমুদ্রের বিস্তার, মহাবিশ্বের অসীমতা। এই বিশালতার সামনে নিজের জায়গাটা খোঁজার ইচ্ছাই তাকে মহাকাশের দিকে টেনেছে। তিনি বলেন, এমন কোনো সময় তিনি মনে করতে পারেন না যখন মহাকাশচারী হতে চাননি।
ক্রিস্টিনার শিক্ষাজীবনের পুরোটাই কেটেছে নর্থ ক্যারোলিনায়। নর্থ ক্যারোলিনা স্কুল অফ সায়েন্স অ্যান্ড ম্যাথ ও জ্যাকসনভিলের হোয়াইট ওয়াক হাইস্কুলে তার শিক্ষাজীবন শুরু।
এর পর নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেইট ইউনিভার্সিটি থেকে পদার্থবিজ্ঞান ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে দুটো স্নাতক ডিগ্রি এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর করেন। পরে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয় তাকে।
মন্টানাতে থাকার সময় তিনি নভোচারী হিসেবে যোগ দেন। ক্রিস্টিনার শখ সার্ফিং, রক ক্লাইম্বিং, যোগব্যায়াম, ট্রায়াথলন, ব্যাকপ্যাকিং, ফটোগ্রাফি, কাঠের কাজ এবং ভ্রমণ।
মহাকাশের জন্য যেভাবে প্রস্তুত করেছিলেন নিজেকে
ক্রিস্টিনা কোকের নভোচারী হওয়ার যাত্রা ছিল অনেক কঠিন। নিজেকে তৈরি করতে এমন সব জায়গায় কাজ করেছেন, যেগুলোর পরিবেশ ছিল খুবই কঠিন।
তিনি প্রথমে আলাস্কার বারো এবং আমেরিকান সামোয়ার মতো দূরবর্তী জায়গায় কাজ করেছিলেন। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অ্যামুন্ডসেন-স্কট সাউথ পোল স্টেশনে, মানে দক্ষিণ মেরুতে যেখানে তিনি শীতকালে কাটিয়েছিলেন।
২০০৪ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি অ্যান্টার্কটিকা ও আর্কটিকে কাজ করেছেন। মাইনাস ৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় দক্ষিণ মেরু স্টেশনে একটি পূর্ণ শীতকাল কাটিয়েছেন। দিনের পর দিন সূর্যের আলো ছাড়া, সীমিত যোগাযোগে, হাতে গোনা কয়েকজন মানুষের সঙ্গে সময় কেটেছে তার।
যুক্তরাষ্ট্রের অ্যান্টার্কটিক প্রোগ্রামে রিসার্চ সহযোগী হিসেবে সাউথ পোল স্টেশনে তীব্র ঠাণ্ডায় কাজ করছিলেন ক্রিস্টিনা। সেখানে তিনি ছিলেন ফায়ারফাইটিং এবং সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ টিমের সদস্য। এই অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছিল, প্রকৃতিতে বেঁচে থাকা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে কাজ করার শক্তি।
তিনি শিখেছিলেন মহাকাশের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির গভীরে যাওয়ার কীভাবে কাজ করতে হয়। তার যাত্রা শুরু হয় মহাকাশে। পুরোপুরি নয়, কিন্তু মহাকাশ বিজ্ঞানই ধীরে ধীরে সব হয়ে উঠতে থাকে তার।
প্রথমে জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির স্পেস ডিপার্টমেন্টে কাজ শুরু করেন। ‘জুনো’ ও ‘ভ্যান এলেন প্রোবস’-এর মতো মিশনগুলোতেও তার অবদান রয়েছে।
এরপর ক্রিস্টিনা আবারো মাঠে ফিরে যান। এইবার তিনি অ্যান্টার্কটিকার পালমার স্টেশন এবং গ্রীনল্যান্ডের সামিট স্টেশনে কাজ করেন।
তারপর যোগ দেন ন্যাশনাল ওশেনিক এবং অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (NOAA)। সেখানে ক্রিস্টিনা আলাস্কার উটকিয়াগভিকের মতো বৈরী পরিবেশে কাজ করেন এবং আমেরিকান সামোয়া অবজারভেটরির স্টেশন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ক্রিস্টিনা মহাকাশ যাত্রার জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। তিনি টি-৩৮ বিমান চালানোর প্রশিক্ষণ নেন, পরে টি-৬ বিমান কমান্ডার হওয়ার জন্যও প্রস্তুতি নেন এবং রাশিয়ান ভাষা শিখেছিলেন।
মহাকাশের যাত্রার জন্য তাকে মানসিক এবং শারীরিক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে (ISS) কাজ করার সময়, মহাকাশে ‘স্পেসওয়াক’ ছিল তার জন্য এক বড় শারীরিক চ্যালেঞ্জ। সেটি ছিল ম্যারাথনের সমান।
মহাকাশে প্রথমবারের মতো পুরোপুরি নারী মহাকাশচারীদের স্পেসওয়াক ছিল, যেখানে ক্রিস্টিনা এবং কেলা মেইর সাত ঘণ্টার বেশি সময় ধরে কাজ করেছিলেন। তারা ISS-এর পাওয়ার সিস্টেমের ব্যাটারি মেরামত করেছিলেন। মোট ছয়টি স্পেসওয়াকের মধ্যে, তিনি ৪২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় কাটিয়েছেন।
নাসায় যোগদান
নাসায় তার ক্যারিয়ার শুরু হয় গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। সেখানে তিনি মহাকাশ বিজ্ঞান মিশনের জন্য বিভিন্ন যন্ত্র তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন।
২০০১ সালে প্রথম নাসায় যোগ দেন ক্রিস্টিনা কোক। সেসময় নাসা অ্যাকাডেমি প্রোগ্রামে অংশ নেন তিনি। ২০১৩ সালে, তিনি নাসার ২১তম অ্যাস্ট্রোনট ক্লাসের একজন সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ২০১৫ সালে অ্যাস্ট্রোনট ক্যান্ডিডেট হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন।
২০১৮ সালে, তার প্রথম মহাকাশ মিশন শুরু হয়, যেখানে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘ সময় কাটান। এই মিশনে তার কাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, এবং তার মহাকাশ ভ্রমণ তাকে একজন দক্ষ মহাকাশচারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তার পরবর্তী দায়িত্ব ছিল অ্যাস্ট্রোনট অফিসে অ্যাসাইনড ক্রু ব্রাঞ্চের ব্রাঞ্চ চিফ। এরপর তিনি নাসার জনসন স্পেস সেন্টারের সেন্টার ডিরেক্টরের জন্য টেকনিক্যাল ইন্টিগ্রেশন অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেন।
এখন, ক্রিস্টিনা কোক নাসার আর্টেমিস টু মিশনের মিশন স্পেশালিস্ট। চন্দ্রাভিযানে যাওয়া প্রথম কোনো নারী।
মহাকাশে অভিজ্ঞতা
ক্রিস্টিনা কোক ২০১৯ সালের ১৪ মার্চ বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকে সয়ুজ মহাকাশযানে করে রওনা হন। সে সময় তার সঙ্গে ছিলেন রসকসমসের নভোচারী আলেক্সি ওভচিনিন এবং নাসার নভোচারী নিক হেগ।
প্রায় এক বছর পর, ২০২০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসেন, সেসময় সঙ্গে ছিলেন রসকসমসের নভোচারী আলেকজান্ডার স্কভর্সভ এবং ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সির (ইসা) নভোচারী লুকা পারমিতানো।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের তিনটি অভিযানে ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার মিশনের অন্যতম বৈজ্ঞানিক অর্জনগুলোর মধ্যে ছিল আলফা ম্যাগনেটিক স্পেকট্রমিটার আপগ্রেডের জন্য রোবোটিক্স কাজ, ওষুধ গবেষণার জন্য প্রোটিন ক্রিস্টাল বৃদ্ধি, এবং মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে থ্রিডি বায়োলজিক্যাল প্রিন্টার পরীক্ষা করা।
ক্রিস্টিনা কোক মোট ছয়টি স্পেসওয়াক পরিচালনা করেছেন, যার মধ্যে ছিল প্রথম তিনটি সম্পূর্ণ নারী মহাকাশচারীদের দ্বারা পরিচালিত স্পেসওয়াক। এই মিশনগুলোতে তিনি মোট ৪২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট মহাকাশে কাজ করেছেন। সব মিলিয়ে, তিনি মহাকাশে কাটিয়েছেন ৩২৮ দিন।
পুরস্কার ও অর্জন
ক্রিস্টিনা কোক তার ক্যারিয়ারে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ২০২০ সালে তিনি পান নিল আর্মস্ট্রং অ্যাওয়ার্ড অফ এক্সিলেন্স। একই বছরে ন্যাশনাল স্পেস ক্লাব ও ফাউন্ডেশন থেকে পান অ্যাস্ট্রোনটিক্স ইঞ্জিনিয়ার অ্যাওয়ার্ডও পান ও অ্যাথেনা ইন্টারন্যাশনাল থেকে পান গ্লোবাল অ্যাথেনা লিডারশিপ অ্যাওয়ার্ড।
এর আগে ২০১২ সালে নাসা গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। ২০০৯ সালে জন্স হপকিন্স ইউনিভার্সিটি অ্যাপ্লাইড ফিজিক্স ল্যাবরেটরির ইনভেনশন অফ দ্য ইয়ার মনোনয়ন পেয়েছিলেন ক্রিস্টিনা কোক।
২০০৫ সালে তিনি ইউনাইটেড স্টেটস কংগ্রেস অ্যান্টার্কটিক সার্ভিস মেডেলও পান, যার মধ্যে ছিল উইন্টার-ওভার ডিস্টিংকশন। একই বছর, তিনি নাসা গ্রুপ অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান।
(নাসা, ইবেস্কো ও অ্যাস্ট্রনাট স্কলারশিপ অবলম্বনে)