প্রাণীর চোখে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ: বিজ্ঞানীরা কি পারবেন ‘প্লানিমেল’ তৈরি করতে
ইঁদুর বা ব্যাঙাচির চোখের কোষে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রতিস্থাপন প্রমাণ করেছে প্রকৃতির দুই ভিন্ন ধারা একই সাথে স্পন্দিত হতে পারে। কল্পবিজ্ঞান বা প্রাচীন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা উদ্ভিদ-প্রাণীর মিশ্র জীবকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত?
কামরুজ্জামান পৃথু
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০৬:২৪ পিএমআপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
এলিসিয়া ক্লোরোটিকা নামের গাছের সবুজ পাতার মতো সামুদ্রিক শামুককে বলা হয় প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত প্রাকৃতিক কাইমেরা
জীববিজ্ঞানের মৌলিক বইগুলো এতদিন শিখিয়ে এসেছে, উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগতের মধ্যে আছে এক ‘অলঙ্ঘনীয়’ প্রাচীর। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে নিজের খাবার নিজে বানাতে পারে। আর প্রাণী খাবারের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভর করে উদ্ভিদের ওপর।
আধুনিক সিন্থেটিক বায়োলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যুগান্তকারী অগ্রগতি প্রকৃতির এই আদিম নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। কল্পবিজ্ঞান বা প্রাচীন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা উদ্ভিদ-প্রাণীর মিশ্র জীব এখন কেবলই ফ্যান্টাসি নয়, বরং গবেষণাগারের এক রোমাঞ্চকর বাস্তবতা।
সম্প্রতি সূর্যের আলো ব্যবহার করে উদ্ভিদের শক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রাণীর দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছে বিজ্ঞানীরা। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের একদল গবেষক পালং শাকের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে ইঁদুরের চোখে প্রতিস্থাপন করে। আর এর মাধ্যমে ইঁদুরের চোখের 'ড্রাই আই ডিজিজ' বা চোখ শুকিয়ে যাওয়া রোগকে সফলভাবেব নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছেন এই গবেষকরা।
ড্রাইআইডিজিজওপালংশাকেরথাইলাকয়েড
চোখের উপরিভাগকে সুস্থ ও আর্দ্র রাখার জন্য চোখের জলের একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বা 'টিয়ার ফিল্ম' প্রয়োজন। চোখ যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে 'টিয়ার ফিল্ম' তৈরি করতে পারে না, তখন তাকে বলা হয় ড্রাই আই ডিজিজ।
তীব্র ড্রাই আই ডিজিজের মূল কারণ হলো ক্রনিক ইনফ্লামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। যখন চোখের উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা স্ক্রিনের ব্লু-লাইটের মতো ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে আসে, তখন চোখের কোষগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিক্যাল বা রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস (আরওএস) তৈরি করে।
ক্ষতিকর এই আরওএস’য়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোষের প্রয়োজন হয় এনএডিপিএইচ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অণুর।
কিন্তু ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত চোখে এনএডিপিএইচ তৈরির এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়ে। ফলে চোখ হারিয়ে ফেলে প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি। কর্নিয়ার টিস্যু নষ্ট হয়ে শুকিয়ে যায় চোখের পানি। শুরু হয় তীব্র ব্যথা ও শুষ্কতার এক যন্ত্রণাদায়ক চক্র।
জটিল এই রোগের নিরাময় খুঁজতে পালং শাককে বেছে নেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষকরা। সালোকসংশ্লেষণের সময় উদ্ভিদ কোষে থাকা ‘থাইলাকয়েড’ নামের এক ধরণের মেমব্রেনের সাহায্যে প্রচুর পরিমাণে এনএডিপিএইচ তৈরি করে। জীবদেহের ভেতরে বিভিন্ন উপাদান তৈরি এবং ক্ষতিকর উপাদান ধ্বংস করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই শক্তি সরবরাহ করে এই এনএডিপিএইচ।
ড্রাই আই ডিজিজের চিকিৎসার জন্য পালং শাক থেকে সেই থাইলাকয়েড সংগ্রহ করেন গবেষকরা। তারপর সেই থাইলাকয়েডগুলোকে বন্দি করেন ৪০০ ন্যানোমিটার আকৃতির নিরাপদ ও শরীরের উপযোগী ন্যানোপার্টিকেলের ভেতর। এই ফর্মুলাটির নাম দেওয়া হয় ‘লাইট ডিপেন্ডেন্ট রিয়্যাকশন রিচ থাইলাকয়েড ইঞ্জিনিয়ার্ড অ্যাসেম্বিস ফর এনএডিপিএইচ ফ্যাক্টরি’ বা ‘লিফ’।
অতি ক্ষুদ্র এই কণাকে চোখের ড্রপ হিসেবে তৈরি করে দেওয়া হয় ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত ইঁদুরের চোখে। ড্রপ দেওয়ার পর কর্নিয়ার কোষগুলো নিজে থেকেই শুষে নেয় ‘লিফ’ কণাকে।
ইঁদুরের চোখের কোষে ঢোকার পর ঠিক প্রকৃতির মতোই আচরণ শুরু করে থাইলাকয়েডগুলো। ইঁদুরকে আলোর সংস্পর্শে আনা হলে ‘লাইট ডিপেন্ডেন্ট রিয়্যাকশন’ শুর হয় ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত চোখে।
ইঁদুরের চোখের কোষের নিজস্ব এনএডিপিএইচ তৈরির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলেও, সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করে দেয় পালং শাকের থাইলাকয়েড। মাত্র ৩০ মিনিট আলোর সংস্পর্শে থাকার পর চোখের টিস্যুতে ‘এনএডিপিএইচ’এর পরিমাণ ২০ গুণ বেড়ে যায়। যা চোখের ক্ষতিকর হাইড্রোজেন পারক্সাইডকে ৯৫ শতাংশর বেশি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। সুস্থ করে তোলে চোখের প্রদাহ্কে।
পালং শাকের এই ড্রপ মাত্র ৫ দিন ব্যবহারের পর ইঁদুরের কর্নিয়ার পুরুত্ব, চোখের জল নিঃসরণ এবং কোষের স্বাস্থ্য ব্যয়বহুল রাসায়নিক ওষুধ 'রেস্টাসিস' ব্যবহারের ফলাফলকেও ছাড়িয়ে যায়।
‘সিঙ্গেল সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিং’-এর মাধ্যমে দেখা গেছে, এই চিকিৎসা রোগাক্রান্ত চোখের কোষগুলোকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জিনগত অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
‘লিফ’ কণাগুলো চোখের কোষে মাত্র কয়েক ঘণ্টা থেকে একদিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এরপর তা স্বাভাবিকভাবেই বিলীন হয়ে যায় শরীর থেকে। ফলে ঝুঁকি থাকে না শরীরে কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যালার্জির।
চিকিৎসা পদ্ধতিটি শীঘ্রই মানুষের ওপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে চান বায়ো-ন্যানোটেকনোলজির এই গবেষক দলের সদস্যরা। এই ট্রায়াল সফল হলে ড্রাই আই ডিজিজের চিকিৎসা হবে কয়েক ফোঁটা ড্রপ দিয়ে শুধু একটু রোদে গিয়ে দাঁড়ানো।
উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ করা অংশকে প্রাণীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’। ইঁদুরের চোখে এই ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’য়ের ঘটনা প্রথম কোন সফল প্রতিস্থাপন নয়। এর আগেও উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতাকে প্রাণীর শরীরে জুড়ে দেওয়ার সফল গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্যাঙাচিররক্তেশ্যাওলাওইঁদুরেরলিভারেক্লোরোপ্লাস্ট
জার্মানির লুডভিগ মেক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী ২০২১ সালে একই ধরণের একটি পরিক্ষা চালান। ‘ট্যাডপোলস’ নামক এক ধরণের ব্যাঙাচির মস্তিষ্কের রক্তনালীতে ঢুকিয়ে দেন ক্ল্যামাইডোমোনাস রেইনহার্ডটি নামক সবুজ শ্যাওলা এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া। সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো পৃথিবীর আদিমতম অণুজীব যারা ব্যাকটেরিয়া হওয়া সত্ত্বেও উদ্ভিদের মতো সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে।
এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিলো প্রাণীর শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তা তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটি দেখা।
পরিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাঙাচিগুলোর পরিবেশ থেকে অক্সিজেন সরিয়ে নেন বিজ্ঞানীরা। এতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে ব্যাঙাচিগুলো।
এরপরই আলো ফেলা হয় ব্যাঙাচিগুলোর মাথায়। রক্তে থাকা শ্যাওলা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শুরু করে অক্সিজেন উৎপাদন। মাত্র কয়েক মিনিটে আবার সচল হয়ে ওঠে ব্যাঙাচিগুলোর মস্তিষ্ক। স্বাভাবিকভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তারা। আলো নেভানোর সাথে সাথে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আবার।
ইঁদুরের লিভারের কোষে ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’ করতে সফল হন জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষ উদ্ভিদের এই অঙ্গাণুটিকে গ্রহণ করে কি না, তা যাচাই করাই ছিলো এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। সাধারণত প্রাণীর শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেকোনো বাইরের উপাদানকে বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করে এবং তাকে ধ্বংস করে দেয়।
কিন্তু এই পরীক্ষায় দেখা যায়, ইঁদুরের লিভারের কোষগুলো ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে ধ্বংস না করে নিজেদের ভেতরে অন্তত দুই দিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই সময়ের মধ্যে ক্লোরোপ্লাস্টগুলো ইঁদুরের কোষের ভেতরেই সালোকসংশ্লেষণের প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছিল।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা হার্ট অ্যাটাক হওয়া ইঁদুরের হৃদপিণ্ডে সায়ানোব্যাকটেরিয়া ইনজেক্ট করেছিলো। হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডের পেশীতে যে তীব্র অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়, তা আলো এবং উদ্ভিদের শক্তির মাধ্যমে দূর করা যায় কিনা তা দেখতেই করা হয়েছিলো এই গবেষণা।
গবেষকরা যখন ইঁদুরের হৃদপিণ্ডে আলো ফেলে সালোকসংশ্লেষণ সক্রিয় করেন, তখন হৃদপিণ্ডের কোষগুলো তাৎক্ষণিক অক্সিজেন পেতে শুরু করে। সাধারণ চিকিৎসার তুলনায় এই চিকিৎসায় ইঁদুরের হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় এবং হার্টের স্থায়ী ক্ষতি অনেক কমে যায়।
কাইমেরা: গ্রীকপুরাণথেকেএকবিংশশতাব্দীতে
গ্রীক পুরাণে ‘কাইমেরা’ ছিল এমন এক দানব যার মাথাটি সিংহের, শরীরটি ছাগলের এবং লেজটি সাপের। আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভাষায়, কাইমেরা হলো এমন একটি একক জীব যার শরীরে দুই বা ততোধিক ভিন্ন জেনোটাইপ বা ভিন্ন প্রজাতির কোষ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সহাবস্থান করে। কাইমেরা জীবের শরীরে কিছু কোষ হয়তো সম্পূর্ণ উদ্ভিদের, আবার অন্য অংশটি সম্পূর্ণ প্রাণীর। এখানে কোষগুলোর ভেতরে ডিএনএ’র মিশ্রণ ঘটে না, বরং ভিন্ন ডিএনএধারী কোষগুলো একে অপরের পাশাপাশি বাস করে একটি কার্যকর শরীর গঠন করে।
‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা ‘প্ল্যানিম্যাল’ এমন এক জৈবিক কাঠামো, যেখানে একটি প্রাণীর টিস্যু বা অঙ্গের ভেতরে উদ্ভিদের কোষ বা কোষের নির্দিষ্ট অঙ্গাণু সক্রিয় এবং জীবিত অবস্থায় কাজ করে।
রোদপোহানোশামুক
প্রকৃতি আজ থেকে লক্ষ বছর আগেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর এই মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।
আমেরিকার পূর্ব উপকূলে এলিসিয়া ক্লোরোটিকা নামের এক ধরণের সামুদ্রিক শামুক পাওয়া যায়। শামুকগুলো দেখতে হুবহু গাছের সবুজ পাতার মতো। এই প্রাণীটিকে প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত প্রাকৃতিক কাইমেরা বলা হয়।
তবে জন্মের সময় এদের রঙ সবুজ থাকে না। খাদ্য হিসেবে সমুদ্রের বিশেষ সবুজ শৈবাল খায় শামুকগুলো। তবে শৈবালটিকে সম্পূর্ণ হজম করে না। শামুকটির অন্ত্রের কোষগুলো শৈবালের ভেতরের ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে অক্ষত অবস্থায় রেখে দেয় নিজের কোষের ভেতর। এই অনন্য জৈবিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্লেপ্টোপ্লাস্টি । একবার পেট পুরে শৈবাল খাওয়ার পর, এই শামুকটি জীবনের পরবর্তী ৯ থেকে ১০ মাস আর কোনো খাবার গ্রহণ করে না। এই সময় এরা রোদ পোহায় এবং কোষের ভেতরে থাকা ক্লোরোপ্লাস্ট ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণ করে বেঁচে থাকে। দ্য বায়োলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই শামুকের ডিএনএ’তে শৈবালের কিছু জিনের স্থানান্তরও ঘটেছে, যা এদের ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’র সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো স্পটেড স্যালামান্ডার। এই স্যালামান্ডারের ডিমের ভেতরে ‘উফিলা অ্যাম্ব্লিস্টোম্যাটিস’ নামের এক বিশেষ ধরণের সবুজ শৈবাল বাস করে।
শৈবালটি সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে প্রচুর অক্সিজেন তৈরি করে সরাসরি ভ্রূণকে সরবরাহ করে। আর ভ্রূণের তৈরি করা ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য শৈবালটি নিজের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভেতরে উদ্ভিদের সেলুলার এন্ডোসিমবায়োসিসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সমূদ্রেরগভীরথেকেল্যাবরেটরিরটেস্টটিউবে
প্রকৃতির এই অদ্ভুত মেলবন্ধনবকে ল্যাবরেটরিতে সম্ভব করেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু ক্লোরোপ্লাস্ট বা কোষের অংশই নয়, আস্ত ‘প্ল্যান্ট স্ক্যাফল্ড’ বা গাছের শারীরিক গঠনকে সরাসরি প্রাণী এবং মানুষের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন তারা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখাকে বলা হয় ‘টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন’।
এই পদ্ধতিতে গাছের পাতা বা বা অন্য অংশ থেকে ‘ডিসেলুলারাইজেশন’ প্রক্রিয়ায় সমস্ত উদ্ভিজ্জ কোষ বের করে ফেলা হয়। ফলে উদ্ভিদের শুধু সেলুলোজের তৈরি একটি সাদা, স্বচ্ছ কাঠামো পড়ে থাকে। এই সেলুলোজ প্রাণীর শরীরের জন্য ‘বায়োকম্পাটিবল’। ফলে শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ একে ক্ষতিকর মনে করে আক্রমণ করে না।
রিজেনারেটিভমেডিসিন: পালংশাকেরহৃদপিণ্ড
ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম অঙ্গ বা টিস্যু তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রক্তনালী তৈরি করা। মানুষের চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম কৈশিক জালিকা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। ‘ওর্সস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’-এর গবেষকরা দেখেন, পালং শাকের পাতার ভেতরের শিরার বিন্যাস হুবহু মানুষের হৃদপিণ্ডের রক্তনালীর মতো।
বিজ্ঞানীরা পালং শাকের পাতা থেকে উদ্ভিদ কোষ দূর করে সেলুলোজের কাঠামোতে মানুষের হৃদপিণ্ডের পেশী কোষ স্থাপন করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, হৃদপিণ্ডের কোষগুলো পালং শাকের পাতাকে আঁকড়ে ধরে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের হৃদপিণ্ডের মতো নিজে থেকেই স্পন্দিত হতে শুরু করে। পালং শাক দিয়ে বানানো এই হদপিণ্ডের শিরাগুলোর মধ্য দিয়ে সফলভাবে রক্ত এবং অক্সিজেন প্রবাহিত করা সম্ভব হয়েছিল।
এছাড়াও মানুষের কানের আকৃতিতে কাটা আপেলকে ডিসেলুলারাইজড করে সেই কাঠামোতে মানুষের স্টেম সেল ইনজেক্ট করে কানাডার অটোয়া ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা। সেই কানকে ইঁদুরের চামড়ার নিচে প্রতিস্থাপন করে তাকে জীবন্ত টিস্যুতে পরিণত করতে সক্ষম হন তারা।
পেঁয়াজের সেলুলোজের স্তরকে ইঁদুরের ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী মেরামতেও সফলতা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ডিসেলুলারাইজড সবুজ পেঁয়াজের ভেতরে মানুষের লিগামেন্ট কোষ প্রবেশ করিয়ে প্রাকৃতিক টেন্ডনের মতোই লম্বালম্বিভাবে বিন্যস্ত শক্তিশালী টিস্যু গঠনও সম্ভব হয়েছে ইতোমধ্যেই।
পশুর শরীর থেকে অঙ্গ নিয়ে মানুষের শরীরে স্থাপনের প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন। তবে এই প্রক্রিয়ায় ‘অর্গান রিজেকশন’য়ের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাছাড়া কৃত্রিম থ্রি-ডি প্রিন্টিংও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেই তুলনায় উদ্ভিদের এই সেলুলোজ কাঠামো অত্যন্ত সস্তা ও প্রাকৃতিক। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই টেকনোলজির মাধ্যমে মানবদেহের বড় বড় অঙ্গ ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা সম্ভব হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানওমানবসভ্যতায়সম্ভাব্যপ্রয়োগ
এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতে আরও উন্নত করা সম্ভব হলে তা চিরতরে বদলে দেবে মানবজাতি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসকে। সম্ভাবনার এই ক্ষেত্রটিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ফটোসিনথেটিক টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং’।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম চামড়া, মাংসপেশি বা লিভারের মতো টিস্যু তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ল্যাবে তৈরি বড় কোনো ত্রিমাত্রিক অঙ্গের ভেতরের কোষগুলোতে রক্তনালী না থাকায় সেখানে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। ফলে সেইসব কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়।
কৃত্রিম এই টিস্যুর কোষগুলোর ভেতরে যদি উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্ট জুড়ে দেওয়া যায়, তবে বাইরে থেকে আলো ফেলেই কোষের ভেতরে সরাসরি অক্সিজেন এবং শক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। ফলে কোষগুলো বেঁচে থাকবে রক্তনালী ছাড়াই। আর এটি হলে মানব অঙ্গ তৈরির গবেষণায় আসবে এক অভাবনীয় বিপ্লব ।
মানুষের চোখের রেটিনার কিছু রোগে যেখানে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এর ফলে রেটিনার কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়ে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। ভবিষ্যতে রেটিনার কোষে যদি ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায়, তবে আলো পড়লেই সেই কোষগুলো নিজে নিজেই অক্সিজেন তৈরি করে বেঁচে থাকতে পারবে। এর ফলে সেইসবে রোগে হওয়া অন্ধত্ব প্রতিরোধে করা সম্ভব হবে।
বৈজ্ঞানিকওজৈবিকপ্রতিবন্ধকতা
প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরার সফল গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী ঘটনা। তবে পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা তৈরির পথে বিজ্ঞানীদের সামনে এখনো বড় কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে।
উদ্ভিদের কোষের বাইরে থাকে শক্ত সেলুলোজের তৈরি কোষ প্রাচীর। অন্যদিকে প্রাণীর কোষে থাকে নরম কোষ পর্দা। এই দুই ভিন্ন কাঠামোর কোষকে কৃত্রিমভাবে ফিউশন বা যুক্ত করা অত্যন্ত জটিল।
তাছাড়াও, বিবর্তনের ধারায় কোটি কোটি বছর আগে আলাদা হয়ে গেছে উদ্ভিদ ও প্রাণী। উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্টকে বেঁচে থাকার জন্য তার নিজস্ব নিউক্লিয়াসের জিনের সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু প্রাণীর নিউক্লিয়াসের জিন উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্টকে চেনে না। ফলে ল্যাবে কাইমেরা কোষ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে ক্লোরোপ্লাস্টগুলো প্রোটিনের অভাবে মারা যায়। ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষণাতেও ক্লোরোপ্লাস্টগুলো বেঁচে ছিলো মাত্র ২ দিন।
এই প্রক্রিয়ায় আর একটি বড় বাধা হলো, একটি পূর্ণাঙ্গ বহুকোষী প্রাণীর শরীরে যখনই উদ্ভিদের কোষ স্থায়ীভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, প্রাণীর শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে। চোখের মত ‘ইমিউন প্রিভিলেজড সাইট’ ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও একে টিকিয়ে রাখা বর্তমান প্রযুক্তিতে অসম্ভব।
একটিনৈতিকওদার্শনিকপ্রশ্ন
বিজ্ঞান যখন প্রকৃতির সীমানা অতিক্রম করে, তখন তার সাথে যুক্ত হয় বড় ধরণের নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন। ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ সৃষ্টির এই বিজ্ঞানও এর ব্যতিক্রম নয়।
‘মানুষ কি প্রকৃতির নিয়মের ওপর অনধিকার চর্চা করছে?’ বায়োএথিক্স বা জৈব নৈতিকতার এই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে দেখছেন ‘প্লেয়িং গড’ বা ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ হিসেবে।
একইসাথে প্রশ্ন উঠছে, যদি কোনো জীবের শরীরে অর্ধেক উদ্ভিদের কোষ এবং বাকি অর্ধেক প্রাণীর কোষ থাকে, তবে তার আইনি ও নৈতিক পরিচয় কী হবে? তাকে কি উদ্ভিদের মতো কেটে ফেলা যাবে, নাকি প্রাণীর মতো তার ব্যথাবোধ ও অধিকার থাকবে?
একইসাথে এই ধরণের গবেষণা বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন অনেক বিজ্ঞানী।
যদি ল্যাবরেটরিতে তৈরি কোনো প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা, যা উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে এবং বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না, সেটি কোনোভাবে ল্যাবের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বর্তমান ইকোসিস্টেমের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কারণ প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে এদের কোনো শিকারী থাকবে না। এরা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদের বিলুপ্ত করে দিতে পারে। ফলে জৈব-নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই ধরণের কাইমেরা ল্যাবের বাইরে আনা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ব্যাঙাচির চোখের কোষে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রমাণ করেছে প্রকৃতির দুই ভিন্ন ধারা একই সাথে স্পন্দিত হতে পারে। সফল এই পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগৎ থেকে বাস্তব পৃথিবীতে এক ঐতিহাসিক উত্তরণ।
প্রাণীর চোখে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ: বিজ্ঞানীরা কি পারবেন ‘প্লানিমেল’ তৈরি করতে
ইঁদুর বা ব্যাঙাচির চোখের কোষে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রতিস্থাপন প্রমাণ করেছে প্রকৃতির দুই ভিন্ন ধারা একই সাথে স্পন্দিত হতে পারে। কল্পবিজ্ঞান বা প্রাচীন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা উদ্ভিদ-প্রাণীর মিশ্র জীবকে বাস্তবে রূপ দেয়ার সম্ভাবনা কতটা বাস্তবসম্মত?
জীববিজ্ঞানের মৌলিক বইগুলো এতদিন শিখিয়ে এসেছে, উদ্ভিদ এবং প্রাণী জগতের মধ্যে আছে এক ‘অলঙ্ঘনীয়’ প্রাচীর। উদ্ভিদ সূর্যের আলো থেকে নিজের খাবার নিজে বানাতে পারে। আর প্রাণী খাবারের জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভর করে উদ্ভিদের ওপর।
আধুনিক সিন্থেটিক বায়োলজি এবং জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের যুগান্তকারী অগ্রগতি প্রকৃতির এই আদিম নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেছে। কল্পবিজ্ঞান বা প্রাচীন রূপকথার পাতা থেকে উঠে আসা ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা উদ্ভিদ-প্রাণীর মিশ্র জীব এখন কেবলই ফ্যান্টাসি নয়, বরং গবেষণাগারের এক রোমাঞ্চকর বাস্তবতা।
সম্প্রতি সূর্যের আলো ব্যবহার করে উদ্ভিদের শক্তি তৈরির প্রক্রিয়াকে প্রাণীর দেহে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছে বিজ্ঞানীরা। ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের একদল গবেষক পালং শাকের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়াকে ইঁদুরের চোখে প্রতিস্থাপন করে। আর এর মাধ্যমে ইঁদুরের চোখের 'ড্রাই আই ডিজিজ' বা চোখ শুকিয়ে যাওয়া রোগকে সফলভাবেব নিরাময় করতে সক্ষম হয়েছেন এই গবেষকরা।
ড্রাই আই ডিজিজ ও পালং শাকের থাইলাকয়েড
চোখের উপরিভাগকে সুস্থ ও আর্দ্র রাখার জন্য চোখের জলের একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য বা 'টিয়ার ফিল্ম' প্রয়োজন। চোখ যখন পর্যাপ্ত পরিমাণে 'টিয়ার ফিল্ম' তৈরি করতে পারে না, তখন তাকে বলা হয় ড্রাই আই ডিজিজ।
তীব্র ড্রাই আই ডিজিজের মূল কারণ হলো ক্রনিক ইনফ্লামেশন বা দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস। যখন চোখের উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বা স্ক্রিনের ব্লু-লাইটের মতো ক্ষতিকর উপাদানের সংস্পর্শে আসে, তখন চোখের কোষগুলো অতিরিক্ত পরিমাণে ক্ষতিকর ফ্রি-রেডিক্যাল বা রিঅ্যাক্টিভ অক্সিজেন স্পিসিস (আরওএস) তৈরি করে।
ক্ষতিকর এই আরওএস’য়ের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কোষের প্রয়োজন হয় এনএডিপিএইচ নামক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট অণুর।
কিন্তু ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত চোখে এনএডিপিএইচ তৈরির এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়াটি ভেঙে পড়ে। ফলে চোখ হারিয়ে ফেলে প্রদাহের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি। কর্নিয়ার টিস্যু নষ্ট হয়ে শুকিয়ে যায় চোখের পানি। শুরু হয় তীব্র ব্যথা ও শুষ্কতার এক যন্ত্রণাদায়ক চক্র।
জটিল এই রোগের নিরাময় খুঁজতে পালং শাককে বেছে নেন ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষকরা। সালোকসংশ্লেষণের সময় উদ্ভিদ কোষে থাকা ‘থাইলাকয়েড’ নামের এক ধরণের মেমব্রেনের সাহায্যে প্রচুর পরিমাণে এনএডিপিএইচ তৈরি করে। জীবদেহের ভেতরে বিভিন্ন উপাদান তৈরি এবং ক্ষতিকর উপাদান ধ্বংস করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হয়, সেই শক্তি সরবরাহ করে এই এনএডিপিএইচ।
ড্রাই আই ডিজিজের চিকিৎসার জন্য পালং শাক থেকে সেই থাইলাকয়েড সংগ্রহ করেন গবেষকরা। তারপর সেই থাইলাকয়েডগুলোকে বন্দি করেন ৪০০ ন্যানোমিটার আকৃতির নিরাপদ ও শরীরের উপযোগী ন্যানোপার্টিকেলের ভেতর। এই ফর্মুলাটির নাম দেওয়া হয় ‘লাইট ডিপেন্ডেন্ট রিয়্যাকশন রিচ থাইলাকয়েড ইঞ্জিনিয়ার্ড অ্যাসেম্বিস ফর এনএডিপিএইচ ফ্যাক্টরি’ বা ‘লিফ’।
অতি ক্ষুদ্র এই কণাকে চোখের ড্রপ হিসেবে তৈরি করে দেওয়া হয় ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত ইঁদুরের চোখে। ড্রপ দেওয়ার পর কর্নিয়ার কোষগুলো নিজে থেকেই শুষে নেয় ‘লিফ’ কণাকে।
ইঁদুরের চোখের কোষে ঢোকার পর ঠিক প্রকৃতির মতোই আচরণ শুরু করে থাইলাকয়েডগুলো। ইঁদুরকে আলোর সংস্পর্শে আনা হলে ‘লাইট ডিপেন্ডেন্ট রিয়্যাকশন’ শুর হয় ড্রাই আই ডিজিজে আক্রান্ত চোখে।
ইঁদুরের চোখের কোষের নিজস্ব এনএডিপিএইচ তৈরির ক্ষমতা নষ্ট হয়ে গেলেও, সেই ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করে দেয় পালং শাকের থাইলাকয়েড। মাত্র ৩০ মিনিট আলোর সংস্পর্শে থাকার পর চোখের টিস্যুতে ‘এনএডিপিএইচ’এর পরিমাণ ২০ গুণ বেড়ে যায়। যা চোখের ক্ষতিকর হাইড্রোজেন পারক্সাইডকে ৯৫ শতাংশর বেশি নিষ্ক্রিয় করে দেয়। সুস্থ করে তোলে চোখের প্রদাহ্কে।
পালং শাকের এই ড্রপ মাত্র ৫ দিন ব্যবহারের পর ইঁদুরের কর্নিয়ার পুরুত্ব, চোখের জল নিঃসরণ এবং কোষের স্বাস্থ্য ব্যয়বহুল রাসায়নিক ওষুধ 'রেস্টাসিস' ব্যবহারের ফলাফলকেও ছাড়িয়ে যায়।
‘সিঙ্গেল সেল আরএনএ সিকোয়েন্সিং’-এর মাধ্যমে দেখা গেছে, এই চিকিৎসা রোগাক্রান্ত চোখের কোষগুলোকে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক জিনগত অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।
‘লিফ’ কণাগুলো চোখের কোষে মাত্র কয়েক ঘণ্টা থেকে একদিন পর্যন্ত সক্রিয় থাকে। এরপর তা স্বাভাবিকভাবেই বিলীন হয়ে যায় শরীর থেকে। ফলে ঝুঁকি থাকে না শরীরে কোনো ক্ষতিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বা দীর্ঘমেয়াদী অ্যালার্জির।
চিকিৎসা পদ্ধতিটি শীঘ্রই মানুষের ওপর ক্লিনিকাল ট্রায়াল শুরু করতে চান বায়ো-ন্যানোটেকনোলজির এই গবেষক দলের সদস্যরা। এই ট্রায়াল সফল হলে ড্রাই আই ডিজিজের চিকিৎসা হবে কয়েক ফোঁটা ড্রপ দিয়ে শুধু একটু রোদে গিয়ে দাঁড়ানো।
উদ্ভিদের সালোক সংশ্লেষণ করা অংশকে প্রাণীর শরীরে প্রতিস্থাপন করার এই প্রক্রিয়াকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’। ইঁদুরের চোখে এই ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’য়ের ঘটনা প্রথম কোন সফল প্রতিস্থাপন নয়। এর আগেও উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ ক্ষমতাকে প্রাণীর শরীরে জুড়ে দেওয়ার সফল গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্যাঙাচির রক্তে শ্যাওলা ও ইঁদুরের লিভারে ক্লোরোপ্লাস্ট
জার্মানির লুডভিগ মেক্সিমিলিয়ান ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী ২০২১ সালে একই ধরণের একটি পরিক্ষা চালান। ‘ট্যাডপোলস’ নামক এক ধরণের ব্যাঙাচির মস্তিষ্কের রক্তনালীতে ঢুকিয়ে দেন ক্ল্যামাইডোমোনাস রেইনহার্ডটি নামক সবুজ শ্যাওলা এবং সায়ানোব্যাকটেরিয়া। সায়ানোব্যাকটেরিয়া হলো পৃথিবীর আদিমতম অণুজীব যারা ব্যাকটেরিয়া হওয়া সত্ত্বেও উদ্ভিদের মতো সূর্যের আলো ব্যবহার করে খাদ্য নিজে তৈরি করতে পারে।
এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিলো প্রাণীর শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে তা তৈরি করা সম্ভব কি না, সেটি দেখা।
পরিক্ষার অংশ হিসেবে ব্যাঙাচিগুলোর পরিবেশ থেকে অক্সিজেন সরিয়ে নেন বিজ্ঞানীরা। এতে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে অচেতন হয়ে পড়ে ব্যাঙাচিগুলো।
এরপরই আলো ফেলা হয় ব্যাঙাচিগুলোর মাথায়। রক্তে থাকা শ্যাওলা সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে শুরু করে অক্সিজেন উৎপাদন। মাত্র কয়েক মিনিটে আবার সচল হয়ে ওঠে ব্যাঙাচিগুলোর মস্তিষ্ক। স্বাভাবিকভাবে সাঁতার কাটতে শুরু করে তারা। আলো নেভানোর সাথে সাথে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে আবার।
ইঁদুরের লিভারের কোষে ‘ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্লান্টেশন’ করতে সফল হন জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। স্তন্যপায়ী প্রাণীর কোষ উদ্ভিদের এই অঙ্গাণুটিকে গ্রহণ করে কি না, তা যাচাই করাই ছিলো এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। সাধারণত প্রাণীর শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা যেকোনো বাইরের উপাদানকে বিপজ্জনক হিসেবে গণ্য করে এবং তাকে ধ্বংস করে দেয়।
কিন্তু এই পরীক্ষায় দেখা যায়, ইঁদুরের লিভারের কোষগুলো ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে ধ্বংস না করে নিজেদের ভেতরে অন্তত দুই দিন বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই সময়ের মধ্যে ক্লোরোপ্লাস্টগুলো ইঁদুরের কোষের ভেতরেই সালোকসংশ্লেষণের প্রাথমিক ধাপগুলো সম্পন্ন করতে পেরেছিল।
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা হার্ট অ্যাটাক হওয়া ইঁদুরের হৃদপিণ্ডে সায়ানোব্যাকটেরিয়া ইনজেক্ট করেছিলো। হার্ট অ্যাটাকের সময় হৃদপিণ্ডের পেশীতে যে তীব্র অক্সিজেন সংকট তৈরি হয়, তা আলো এবং উদ্ভিদের শক্তির মাধ্যমে দূর করা যায় কিনা তা দেখতেই করা হয়েছিলো এই গবেষণা।
গবেষকরা যখন ইঁদুরের হৃদপিণ্ডে আলো ফেলে সালোকসংশ্লেষণ সক্রিয় করেন, তখন হৃদপিণ্ডের কোষগুলো তাৎক্ষণিক অক্সিজেন পেতে শুরু করে। সাধারণ চিকিৎসার তুলনায় এই চিকিৎসায় ইঁদুরের হৃদপিণ্ডের কার্যক্ষমতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় এবং হার্টের স্থায়ী ক্ষতি অনেক কমে যায়।
কাইমেরা: গ্রীক পুরাণ থেকে একবিংশ শতাব্দীতে
গ্রীক পুরাণে ‘কাইমেরা’ ছিল এমন এক দানব যার মাথাটি সিংহের, শরীরটি ছাগলের এবং লেজটি সাপের। আধুনিক জীববিজ্ঞানের ভাষায়, কাইমেরা হলো এমন একটি একক জীব যার শরীরে দুই বা ততোধিক ভিন্ন জেনোটাইপ বা ভিন্ন প্রজাতির কোষ সম্পূর্ণ আলাদাভাবে সহাবস্থান করে। কাইমেরা জীবের শরীরে কিছু কোষ হয়তো সম্পূর্ণ উদ্ভিদের, আবার অন্য অংশটি সম্পূর্ণ প্রাণীর। এখানে কোষগুলোর ভেতরে ডিএনএ’র মিশ্রণ ঘটে না, বরং ভিন্ন ডিএনএধারী কোষগুলো একে অপরের পাশাপাশি বাস করে একটি কার্যকর শরীর গঠন করে।
‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ বা ‘প্ল্যানিম্যাল’ এমন এক জৈবিক কাঠামো, যেখানে একটি প্রাণীর টিস্যু বা অঙ্গের ভেতরে উদ্ভিদের কোষ বা কোষের নির্দিষ্ট অঙ্গাণু সক্রিয় এবং জীবিত অবস্থায় কাজ করে।
রোদ পোহানো শামুক
প্রকৃতি আজ থেকে লক্ষ বছর আগেই উদ্ভিদ ও প্রাণীর এই মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।
আমেরিকার পূর্ব উপকূলে এলিসিয়া ক্লোরোটিকা নামের এক ধরণের সামুদ্রিক শামুক পাওয়া যায়। শামুকগুলো দেখতে হুবহু গাছের সবুজ পাতার মতো। এই প্রাণীটিকে প্রকৃতির সবচেয়ে নিখুঁত প্রাকৃতিক কাইমেরা বলা হয়।
তবে জন্মের সময় এদের রঙ সবুজ থাকে না। খাদ্য হিসেবে সমুদ্রের বিশেষ সবুজ শৈবাল খায় শামুকগুলো। তবে শৈবালটিকে সম্পূর্ণ হজম করে না। শামুকটির অন্ত্রের কোষগুলো শৈবালের ভেতরের ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে অক্ষত অবস্থায় রেখে দেয় নিজের কোষের ভেতর। এই অনন্য জৈবিক প্রক্রিয়াকে বলা হয় ক্লেপ্টোপ্লাস্টি । একবার পেট পুরে শৈবাল খাওয়ার পর, এই শামুকটি জীবনের পরবর্তী ৯ থেকে ১০ মাস আর কোনো খাবার গ্রহণ করে না। এই সময় এরা রোদ পোহায় এবং কোষের ভেতরে থাকা ক্লোরোপ্লাস্ট ব্যবহার করে সালোকসংশ্লেষণ করে বেঁচে থাকে। দ্য বায়োলজিক্যাল বুলেটিনে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, এই শামুকের ডিএনএ’তে শৈবালের কিছু জিনের স্থানান্তরও ঘটেছে, যা এদের ক্লোরোপ্লাস্টগুলোকে দীর্ঘ সময় বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যে ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’র সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো স্পটেড স্যালামান্ডার। এই স্যালামান্ডারের ডিমের ভেতরে ‘উফিলা অ্যাম্ব্লিস্টোম্যাটিস’ নামের এক বিশেষ ধরণের সবুজ শৈবাল বাস করে।
শৈবালটি সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে প্রচুর অক্সিজেন তৈরি করে সরাসরি ভ্রূণকে সরবরাহ করে। আর ভ্রূণের তৈরি করা ক্ষতিকর নাইট্রোজেনঘটিত বর্জ্য শৈবালটি নিজের খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে। এটি মেরুদণ্ডী প্রাণীর ভেতরে উদ্ভিদের সেলুলার এন্ডোসিমবায়োসিসের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
সমূদ্রের গভীর থেকে ল্যাবরেটরির টেস্টটিউবে
প্রকৃতির এই অদ্ভুত মেলবন্ধনবকে ল্যাবরেটরিতে সম্ভব করেছেন বিজ্ঞানীরা। শুধু ক্লোরোপ্লাস্ট বা কোষের অংশই নয়, আস্ত ‘প্ল্যান্ট স্ক্যাফল্ড’ বা গাছের শারীরিক গঠনকে সরাসরি প্রাণী এবং মানুষের শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন তারা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই বিশেষ শাখাকে বলা হয় ‘টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড রিজেনারেটিভ মেডিসিন’।
এই পদ্ধতিতে গাছের পাতা বা বা অন্য অংশ থেকে ‘ডিসেলুলারাইজেশন’ প্রক্রিয়ায় সমস্ত উদ্ভিজ্জ কোষ বের করে ফেলা হয়। ফলে উদ্ভিদের শুধু সেলুলোজের তৈরি একটি সাদা, স্বচ্ছ কাঠামো পড়ে থাকে। এই সেলুলোজ প্রাণীর শরীরের জন্য ‘বায়োকম্পাটিবল’। ফলে শরীরের ‘ইমিউন সিস্টেম’ একে ক্ষতিকর মনে করে আক্রমণ করে না।
রিজেনারেটিভ মেডিসিন: পালং শাকের হৃদপিণ্ড
ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম অঙ্গ বা টিস্যু তৈরির ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বড় বাধা ছিল রক্তনালী তৈরি করা। মানুষের চুলের চেয়েও সূক্ষ্ম কৈশিক জালিকা কৃত্রিমভাবে তৈরি করা প্রায় অসম্ভব। ‘ওর্সস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট’-এর গবেষকরা দেখেন, পালং শাকের পাতার ভেতরের শিরার বিন্যাস হুবহু মানুষের হৃদপিণ্ডের রক্তনালীর মতো।
বিজ্ঞানীরা পালং শাকের পাতা থেকে উদ্ভিদ কোষ দূর করে সেলুলোজের কাঠামোতে মানুষের হৃদপিণ্ডের পেশী কোষ স্থাপন করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, হৃদপিণ্ডের কোষগুলো পালং শাকের পাতাকে আঁকড়ে ধরে বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের হৃদপিণ্ডের মতো নিজে থেকেই স্পন্দিত হতে শুরু করে। পালং শাক দিয়ে বানানো এই হদপিণ্ডের শিরাগুলোর মধ্য দিয়ে সফলভাবে রক্ত এবং অক্সিজেন প্রবাহিত করা সম্ভব হয়েছিল।
এছাড়াও মানুষের কানের আকৃতিতে কাটা আপেলকে ডিসেলুলারাইজড করে সেই কাঠামোতে মানুষের স্টেম সেল ইনজেক্ট করে কানাডার অটোয়া ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা। সেই কানকে ইঁদুরের চামড়ার নিচে প্রতিস্থাপন করে তাকে জীবন্ত টিস্যুতে পরিণত করতে সক্ষম হন তারা।
পেঁয়াজের সেলুলোজের স্তরকে ইঁদুরের ক্ষতিগ্রস্ত রক্তনালী মেরামতেও সফলতা পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ডিসেলুলারাইজড সবুজ পেঁয়াজের ভেতরে মানুষের লিগামেন্ট কোষ প্রবেশ করিয়ে প্রাকৃতিক টেন্ডনের মতোই লম্বালম্বিভাবে বিন্যস্ত শক্তিশালী টিস্যু গঠনও সম্ভব হয়েছে ইতোমধ্যেই।
পশুর শরীর থেকে অঙ্গ নিয়ে মানুষের শরীরে স্থাপনের প্রক্রিয়াকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় জেনোট্রান্সপ্লান্টেশন। তবে এই প্রক্রিয়ায় ‘অর্গান রিজেকশন’য়ের ঝুঁকি অনেক বেশি। তাছাড়া কৃত্রিম থ্রি-ডি প্রিন্টিংও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। সেই তুলনায় উদ্ভিদের এই সেলুলোজ কাঠামো অত্যন্ত সস্তা ও প্রাকৃতিক। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই টেকনোলজির মাধ্যমে মানবদেহের বড় বড় অঙ্গ ল্যাবরেটরিতেই তৈরি করা সম্ভব হবে।
চিকিৎসাবিজ্ঞান ও মানব সভ্যতায় সম্ভাব্য প্রয়োগ
এই প্রযুক্তিকে ভবিষ্যতে আরও উন্নত করা সম্ভব হলে তা চিরতরে বদলে দেবে মানবজাতি এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসকে। সম্ভাবনার এই ক্ষেত্রটিকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ফটোসিনথেটিক টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং’।
বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম চামড়া, মাংসপেশি বা লিভারের মতো টিস্যু তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ল্যাবে তৈরি বড় কোনো ত্রিমাত্রিক অঙ্গের ভেতরের কোষগুলোতে রক্তনালী না থাকায় সেখানে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না। ফলে সেইসব কোষ অক্সিজেনের অভাবে মারা যায়।
কৃত্রিম এই টিস্যুর কোষগুলোর ভেতরে যদি উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্ট জুড়ে দেওয়া যায়, তবে বাইরে থেকে আলো ফেলেই কোষের ভেতরে সরাসরি অক্সিজেন এবং শক্তি তৈরি করা সম্ভব হবে। ফলে কোষগুলো বেঁচে থাকবে রক্তনালী ছাড়াই। আর এটি হলে মানব অঙ্গ তৈরির গবেষণায় আসবে এক অভাবনীয় বিপ্লব ।
মানুষের চোখের রেটিনার কিছু রোগে যেখানে রক্ত সঞ্চালন কমে যায়। এর ফলে রেটিনার কোষগুলো অক্সিজেনের অভাবে মারা গিয়ে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। ভবিষ্যতে রেটিনার কোষে যদি ক্লোরোপ্লাস্ট ট্রান্সপ্ল্যান্ট করা যায়, তবে আলো পড়লেই সেই কোষগুলো নিজে নিজেই অক্সিজেন তৈরি করে বেঁচে থাকতে পারবে। এর ফলে সেইসবে রোগে হওয়া অন্ধত্ব প্রতিরোধে করা সম্ভব হবে।
বৈজ্ঞানিক ও জৈবিক প্রতিবন্ধকতা
প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরার সফল গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে যুগান্তকারী ঘটনা। তবে পূর্ণাঙ্গ প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা তৈরির পথে বিজ্ঞানীদের সামনে এখনো বড় কিছু প্রতিবন্ধকতা আছে।
উদ্ভিদের কোষের বাইরে থাকে শক্ত সেলুলোজের তৈরি কোষ প্রাচীর। অন্যদিকে প্রাণীর কোষে থাকে নরম কোষ পর্দা। এই দুই ভিন্ন কাঠামোর কোষকে কৃত্রিমভাবে ফিউশন বা যুক্ত করা অত্যন্ত জটিল।
তাছাড়াও, বিবর্তনের ধারায় কোটি কোটি বছর আগে আলাদা হয়ে গেছে উদ্ভিদ ও প্রাণী। উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্টকে বেঁচে থাকার জন্য তার নিজস্ব নিউক্লিয়াসের জিনের সাহায্য নিতে হয়। কিন্তু প্রাণীর নিউক্লিয়াসের জিন উদ্ভিদের ক্লোরোপ্লাস্টকে চেনে না। ফলে ল্যাবে কাইমেরা কোষ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে ক্লোরোপ্লাস্টগুলো প্রোটিনের অভাবে মারা যায়। ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরের গবেষণাতেও ক্লোরোপ্লাস্টগুলো বেঁচে ছিলো মাত্র ২ দিন।
এই প্রক্রিয়ায় আর একটি বড় বাধা হলো, একটি পূর্ণাঙ্গ বহুকোষী প্রাণীর শরীরে যখনই উদ্ভিদের কোষ স্থায়ীভাবে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়, প্রাণীর শক্তিশালী ইমিউন সিস্টেম তাকে তীব্রভাবে আক্রমণ করে। চোখের মত ‘ইমিউন প্রিভিলেজড সাইট’ ছাড়া শরীরের অন্য কোথাও একে টিকিয়ে রাখা বর্তমান প্রযুক্তিতে অসম্ভব।
একটি নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন
বিজ্ঞান যখন প্রকৃতির সীমানা অতিক্রম করে, তখন তার সাথে যুক্ত হয় বড় ধরণের নৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্ন। ‘প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা’ সৃষ্টির এই বিজ্ঞানও এর ব্যতিক্রম নয়।
‘মানুষ কি প্রকৃতির নিয়মের ওপর অনধিকার চর্চা করছে?’ বায়োএথিক্স বা জৈব নৈতিকতার এই প্রশ্নটি এখন সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একে দেখছেন ‘প্লেয়িং গড’ বা ঈশ্বরের কাজে হস্তক্ষেপ হিসেবে।
একইসাথে প্রশ্ন উঠছে, যদি কোনো জীবের শরীরে অর্ধেক উদ্ভিদের কোষ এবং বাকি অর্ধেক প্রাণীর কোষ থাকে, তবে তার আইনি ও নৈতিক পরিচয় কী হবে? তাকে কি উদ্ভিদের মতো কেটে ফেলা যাবে, নাকি প্রাণীর মতো তার ব্যথাবোধ ও অধিকার থাকবে?
একইসাথে এই ধরণের গবেষণা বাস্তুতন্ত্রের ওপর মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন অনেক বিজ্ঞানী।
যদি ল্যাবরেটরিতে তৈরি কোনো প্ল্যান্ট-অ্যানিমেল কাইমেরা, যা উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ করতে পারে এবং বেঁচে থাকার জন্য খাদ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় না, সেটি কোনোভাবে ল্যাবের বাইরে প্রাকৃতিক পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা বর্তমান ইকোসিস্টেমের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
কারণ প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খলে এদের কোনো শিকারী থাকবে না। এরা খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীদের বিলুপ্ত করে দিতে পারে। ফলে জৈব-নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে এই ধরণের কাইমেরা ল্যাবের বাইরে আনা হবে অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ব্যাঙাচির চোখের কোষে উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ প্রমাণ করেছে প্রকৃতির দুই ভিন্ন ধারা একই সাথে স্পন্দিত হতে পারে। সফল এই পরীক্ষা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর জগৎ থেকে বাস্তব পৃথিবীতে এক ঐতিহাসিক উত্তরণ।
একটিপূর্ণাঙ্গ ‘কাইমেরা’ প্রাণীতৈরিএখনোসুদূরপরাহত।কিন্তুবিজ্ঞানযেগতিতেএগিয়েচলেছে, তাতেআসছেশতাব্দীতেহয়তোউদ্ভিদওপ্রাণীরমধ্যকার ‘অলঙ্ঘনীয়প্রাচীর’রেরকথালেখাথাকবেকোনএকইতিহাসেরবইয়েরপাতায়।
বিষয়: