শঙ্কা ও স্বপ্ন নিয়ে অর্ধশতাব্দী পর চাঁদে যাত্রা করলো মানবজাতি

ফ্লোরিডা থেকে উৎক্ষেপিত ‘আর্টেমিস টু’ চারজন নভোচারীকে নিয়ে চাঁদের চারপাশে প্রায় ১০ দিনের ভ্রমণে যাচ্ছে। এটি ৫০ বছরের মধ্যে মানুষের প্রথম গভীর মহাকাশ অভিযান। 

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৩৯ পিএম

পঞ্চাশ বছর আগে, ১৯৭২ সালের ১৯ ডিসেম্বর, অ্যাপোলো ১৭-এর নভোচারীরা চাঁদ থেকে ফিরে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করেছিলেন। তখনো হয়তো ক্রুরা ভাবতে পারেননি যে আবারও চন্দ্রাভিযানে যেতে মানবজাতির অপেক্ষা করতে হবে অর্ধ শতাব্দীরও বেশি।

তখন থেকে মানুষ কেবল পৃথিবীর কাছের কক্ষপথে ভেসেছে, চাঁদকে ছুঁতে পারেনি। সেই দীর্ঘ ৫০ বছর কাটিয়ে  আবার চাঁদের অভিযানে যাচ্ছে মানুষ।

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় ভোরে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করে আর্টেমিস টু। ৩২ তলা উচ্চতার স্পেস লঞ্চ সিস্টেম রকেটটি চারজন নভোচারীকে নিয়ে যাত্রা করছে চাঁদের দিকে।

এই অভিযানে যুক্ত রয়েছেন নাসার রিড উইসম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।

তাদের লক্ষ্য প্রায় ১০ দিন ধরে চাঁদের চারপাশে ভ্রমণ করা এবং পৃথিবীতে ফিরে আসা, যা ৫০ বছরের মধ্যে মানুষের প্রথম গভীর মহাকাশ অভিযান। আর এই প্রক্রিয়া সরাসরি সম্প্রচার করছে নাসা। 

উৎক্ষেপণের আগে উত্তেজনা

লঞ্চের কয়েক ঘণ্টা আগে উত্তেজনা তুঙ্গে। নাসার কেপ ক্যানাভেরাল সেন্টারে রকেটের চারপাশে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত, হাইড্রোজেন জ্বালানি রকেটে প্রবাহিত করার সময়। এটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ। ২০২৬ এর  শুরুতে ঠিক এই ধাপে হাইড্রোজেন লিক দেখা দিয়েছিল।

তবে এবার সব ঠিক আছে। নাসা নিশ্চিত করেছে, কোনো উল্লেখযোগ্য লিক হয়নি। রকেটে সঠিকভাবে ভরা হয়েছে সাত লাখ গ্যালন বা প্রায় ২৬ লাখ লিটার জ্বালানি।

রিড উইসম্যান (বাম থেকে), ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন।  ছবি: নাসা

ওরিয়ন ক্যাপসুলের লঞ্চ-এবোর্ট সিস্টেম এবং ফ্লাইট-টার্মিনেশন সিস্টেমে দেখা কিছু প্রযুক্তিগত সমস্যাও দ্রুত সমাধান করা হয়েছে।

এই সিস্টেমগুলো জরুরি। কারণ রকেট যদি নিয়ন্ত্রণ হারায়, তবে এগুলো রকেটকে ধ্বংস করতে পারে। ব্যাটারি তাপমাত্রার সমস্যাও ঠিক করা হয়েছে। সবকিছু প্রস্তুত, লঞ্চ শুরু হচ্ছে ।

উৎক্ষেপণের পাঁচ মিনিটের মধ্যেই কমান্ডার রিড উইসম্যান ক্যাপসুল থেকে জানালেন, “আমরা একটি সুন্দর চাঁদের উদয় দেখছি, আমরা সঠিক পথে এগোচ্ছি।”

নভোচারীদের যাত্রা  

যখন জ্বালানি দেওয়া হচ্ছিল, তখনো চারজন নভোচারী- রিড উইসম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কক এবং কানাডার জেরেমি হ্যানসেন। সবাই রকেটের ভেতরে। তাদের প্রথম এক থেকে দুই দিন কাটবে পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে।

সেখানে তারা ওরিয়নের লাইফ-সাপোর্ট, ন্যাভিগেশন, প্রপালশন এবং কমিউনিকেশন সিস্টেম পরীক্ষা করবেন। সবকিছু ঠিক থাকলে, ওরিয়ন ট্রান্সলুনার ইনজেকশন নামে একটি ইঞ্জিন বার্ন করবে এবং স্পেসক্র্যাফট পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে যাবে।

চাঁদ ঘুরে  মহাকাশযানটি অভিকর্ষ ব্যবহার করে স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীর দিকে ফিরে আসবে। জ্বালানি কম লাগবে। চাঁদ ঘুরে আসার পর নভোচারীরা কয়েক দিন আরও গভীর মহাকাশ পরীক্ষা চালাবেন।

পৃথিবীতে ফিরে আসার সময় ওরিয়ন ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিমি বা ২৫ হাজার মাইল গতিতে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করবে এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করবে। উদ্ধার দল তাদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনবে।

নতুন প্রজন্মের অ্যাপোলো

নাসা বিজ্ঞান মিশন প্রধান নিকি ফক্স বলেন, “অনেকেই অ্যাপোলোকে মনে রাখে না। যারা তখন জন্মায়নি, তারা তখন সেখানে ছিল না। এটি তাদের অ্যাপোলো।”

অভিযান শুরুর আগ মুহূর্ত ছবি: নাসা

উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন বলেন, ‘এই ঐতিহাসিক অভিযানে আপনারা সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন আর্টেমিস দলের ভালোবাসা, আমেরিকান জনগণ ও বিশ্বজুড়ে আমাদের অংশীদারদের অদম্য সাহস এবং একটি নতুন প্রজন্মের আশা ও স্বপ্ন। আপনাদের মঙ্গল হোক, সফল হোক আর্টেমিস টু। এবার এগিয়ে যান।

কেন এত অপেক্ষা করতে হলো 

১৯৬৯ সালের জুলাই। নিল আর্মস্ট্রং আর এডউইন বাজ আলড্রিন চাঁদে পা রাখলেন। তখন অনেক আমেরিকান ভেবেছিলেন কেন আমরা এখানেই থেমে গেলাম? সোভিয়েতদের হারিয়ে আমরা দেখিয়েছি প্রযুক্তিতে কত এগিয়ে। এটি ছিল  প্রজেক্টের মূল উদ্দেশ্য।

পরবর্তী ল্যান্ডিংগুলো বিজ্ঞানীদের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এবং নমুনা এনেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ সেই তথ্যের কোনো বড় গুরুত্ব দেখায়নি। ভোটাররা তখন নিজেদের দৈনন্দিন সমস্যায় ব্যস্ত। তাই চাঁদ অভিযানে খরচ হওয়া বিলিয়ন ডলার অনেকের চোখে অপ্রয়োজনীয় মনে হলো।

এই পরিস্থিতি দেখে হয়তো অনেকে মনে করতেন, নতুন চাঁদ অভিযান শুরু হতে দুই দশক সময় লাগতে পারে। কিন্তু কেউ ভাবতেও পারত না, শতাব্দীর শেষের আগে আমেরিকান নভোচারীরা চাঁদে ফিরে যাবে না।

মানুষের চাঁদে যেতে এত সময় লাগলো কেন দ্য কনভারসেশনে সেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের কনটেম্পরারি স্পেসফ্লাইট বিভাগের কিউরেটর এমিলি এ. মারগোলিস।

তিনি বলেন, মানুষকে নিরাপদভাবে মহাকাশে পাঠানো এখনও খুবই জটিল। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি পরীক্ষা, উন্নয়ন ও শংসাপত্র প্রক্রিয়া অতিক্রম করে বেসরকারি ও সরকারি অনুমোদনের মাধ্যমে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেই ব্যবহার করা হয়। কখনো কখনো সিস্টেম বা উপকরণ এমনভাবে আচরণ করে যা প্রকৌশলী ও মিশন পরিকল্পনাকারীদের জন্য চমক বা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

স্টারলাইনার সিএফটি ও আর্টেমিস-ওয়ান এর উদাহরণ টানেন এমিলি। স্টারলাইনারের থ্রাস্টারে সমস্যা দেখা দেওয়ায় নভোচারীদের আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন  থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কলম্বিয়া স্পেস শাটলের দুর্ঘটনার কথাও বলেন তিনি।

এমিলি বলেন, নাসার কাজ চালাতে হলে প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং বিভিন্ন অর্থবছরের মধ্যে রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়ন থাকা জরুরি। তিনি বলেন, “একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে আমি দেখেছি, নাসা বহুবার সাধারণ জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে যে মহাকাশ অভিযান দেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ।”

অ্যাপোলো যুগের পর, যখন মানুষ প্রথমবার চাঁদে পা রেখেছিল, তখনই প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন নাসার বাজেট কমানোর সিদ্ধান্ত নেন। তখনই দুইটি সফল চাঁদ অভিযান শেষ হয়েছিল, কিন্তু আরও তিনটি পরিকল্পিত মিশন বাতিল হয়।

তবে স্পেস স্টেশন করে তৈরি করে তারা। ১৯৭৩ সালে স্যাটার্ন-ফাইভ রকেটের তৃতীয় স্তর ব্যবহার করে প্রথম মার্কিন স্পেস স্টেশন স্কাইল্যাব তৈরি হয়। সেখানেই নভোচারীরা শিখতে শুরু করেন কীভাবে দীর্ঘ সময় ধরে মহাকাশে বসবাস করা যায়।

পরবর্তী তিন দশকে নাসা স্পেস শাটল প্রোগ্রাম চালু করে, যা ১৭ দিনেরও বেশি সময়ের মিশনে স্যাটেলাইট মোতায়েন ও মাইক্রোগ্র্যাভিটি গবেষণায় সহায়তা করেছিল। স্পেস শাটল প্রোগ্রাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তৈরি ও পরিচালনায়ও  ভূমিকা রেখেছে।

এমিলি বলেন, শাটলগুলো কেবল স্যাটেলাইট মোতায়েন এবং গবেষণার জন্য নয়, এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি মানব মিশনের প্রস্তুতি।

শাটল প্রোগ্রামের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন তৈরি ও চালানো সম্ভব হয়। মানুষ সেই স্টেশনে দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে পারে, এবং পৃথিবীর জন্য উপযোগী নানা তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।

২০০০ সালের দিকে, ক্লিনটন প্রশাসন নাসাকে চাঁদ ও পৃথিবীর কক্ষপথের বাইরে নতুন অভিযানের দিকে নজর দিতে বলে। তখন নাসা নতুন প্রযুক্তি, মিশন পরিকল্পনা এবং মহাকাশের নতুন গন্তব্য নিয়ে গবেষণা শুরু করে।

২০০৩ সালে কলম্বিয়া স্পেস শাটল দুর্ঘটনা হয়। এই ট্রাজেডি আবারও মনে করিয়ে দেয় যে মহাকাশযাত্রা কতটা জটিল।

২০০৪ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ঘোষণা দেয়, স্পেস শাটল প্রোগ্রাম শেষ হওয়ার পর ওরিয়ন ক্যাপসুল এবং নতুন হেভি রকেট ব্যবহার করে চাঁদে মানুষের যাত্রা পুনরায় শুরু হবে।

কিন্তু ২০০৯ সালে মার্কিন প্রশাসন জানায়, নাসার বাজেট অনেক বেশি। ফলে প্রোগ্রাম বাতিল হয়।

এরপর ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসন নাসাকে আবার চাঁদে ফেরার দিকে মনোনিবেশ করতে বলে। ২০১৯ সালে নাসা নতুন এই মিশনের নাম রাখে আর্টেমিস। ২০২২ সালে ওয়ানের  ২৫ দিনের অনক্রু ফ্লাইট সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

এমিলি বলেন,  অ্যাপোলো পরবর্তী সময়ে প্রতিটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই চাঁদে যাওয়া পথ প্রশস্ত হয়েছে।

(বিবিসি, আল-জাজিরা, এয়ার অ্যান্ড স্পেস, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট অবলম্বনে)