ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে রেকর্ড পরিমাণ জরিমানা করা হয়েছে। ব্যবসায়িক কার্যক্রম নিয়ে অনিয়মের অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটিকে এই জরিমানা করা হয়।
বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের একজন বিচারক মেটাকে ২৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করার নির্দেশ দেন।
বিচারপ্রক্রিয়ায় উঠে আসে, ফেইসবুক ইউজারদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার করছে সে সম্পর্কে অনেক বছর থেকে অসত্য বলে আসছিল মেটা।
মেটার বিরুদ্ধে এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জরিমানার রায়। চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি আরও কয়েকটি মামলায় জরিমানা দিয়েছে অথবা সমঝোতা করেছে। এর মধ্যে শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সঙ্গে ১৮ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতাও রয়েছে।
ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে মামলার সূত্রপাত
নিউ মেক্সিকোর মামলাটি শুরু হয় ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিকে কেন্দ্র করে। তখন মেটা ব্যবসা পরিচালনা করতো ফেইসবুক নামে।
২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, তাদের সর্বোচ্চ ৮৭ মিলিয়ন ফেইসবুক ইউজারদের ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ম না মেনে সংগ্রহ করেছিল ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের প্রোফাইল তৈরি করেছিল। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা একটি রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান।
২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কাজেও এসব তথ্য ব্যবহার করা হয়। ওই নির্বাচনে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডনাল্ড ট্রাম্প।
২০২১ সালে ফেসবুকের বিরুদ্ধে মামলা করে নিউ মেক্সিকো।
অভিযোগে বলা হয়, ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে ব্যবহার করা হবে- সে সম্পর্কে অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করা ইউজারদের নীতিমালা নিয়ে সঠিক তথ্য দেওয়া হয়নি।
সেপ্টেম্বরে জুরি বোর্ড দেখতে পায়, মেটা অঙ্গরাজ্যটির ‘আনফেয়ার প্র্যাকটিসেস অ্যাক্ট’ ৪ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি বার লঙ্ঘন করেছে।
বুধবার জরিমানার বিষয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে অঙ্গরাজ্যের জেলা আদালতের বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ বলেন, “জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার জন্য মেটা ‘সুসংগঠিত কৌশল’ নিয়েছিল।”
বিচারক রায়ে বলেন, “ইউজারদের তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের বিভ্রান্ত করা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। বরং এটি ছিলো ফেইসবুকের প্রতারণার একটি ধারাবাহিক পদ্ধতি। যা তাদের ব্যবসায়িক মডেলের অংশ।”
রায়ের পর মেটা জানায়, তারা এর বিরুদ্ধে আপিল করবে।
মেটার প্রধান আইন কর্মকর্তা সি জে মাহোনি এক বিবৃতিতে বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেলের আইন প্রয়োগের পদ্ধতি এবং এ রায় নিউ মেক্সিকোতে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব করে তুলবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো অনলাইনে মানুষ কী বলতে পারবে, তা নিয়ন্ত্রণে নতুন নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া। আমরা বিশ্বাস করি, আপিলে আমরা জিতবো।”
ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ে মিথ্যা বলার অভিযোগ
মেটার শীর্ষ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময়ে দাবি করেছিলেন, ইউজারদের অনুমতি ছাড়া তথ্য তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে শেয়ার করা হয় না। তৃতীয় পক্ষ এসব তথ্য ব্যবহারও করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবে এর ব্যতিক্রম ঘটেছিল বলে অভিযোগ করেন নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা।
তাদের দাবি, ব্যবহারকারীদের তথ্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মেটার অসততার কারণে অঙ্গরাজ্যটির প্রায় ২০ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজ বুধবার বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে টেক জায়ান্টরা এমনভাবে কাজ করছে, দেখে মনে হয় তারা আইনের ঊর্ধ্বে।”
তিনি আরও বলেন, “আজকের এই রায় স্পষ্ট করেছে, কোনো প্রতিষ্ঠান এত ক্ষমতাবান নয় যে তাকে জবাবদিহিতার বাইরে রাখা যাবে।”
নিউ মেক্সিকোর আইনজীবীরা মেটার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৪০ বিলিয়ন ডলার জরিমানা দাবি করেছিলেন। অন্যদিকে মেটার দাবি ছিল, ৩ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি জরিমানা করা হলে তা হবে অসাংবিধানিক।
১১ বছরের বেশি সময় ধরে আইন লঙ্ঘন
বুধবার বিচারক ফ্রান্সিস ম্যাথিউ তার রায়ে কঠোর অবস্থান নেন। তিনি মেটাকে এমন অংকের জরিমানা করেন, যা প্রতিষ্ঠানটির এক প্রান্তিকের মুনাফার প্রায় সমান।
বিচারক বলেন, ফেইসবুক ইউজারদের তথ্য কীভাবে ব্যবহার ও শেয়ার করবে, তা নিয়ে মেটা ইচ্ছাকৃতভাবে আইন লঙ্ঘন করেছে। একইসঙ্গে ইউজারদের বিভ্রান্ত করেছে। এসব ঘটনা ২০১০ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘটেছে।
অঙ্গরাজ্যের আইন বারবার লঙ্ঘনের কারণে মেটার জরিমানার মোট অংক দাঁড়িয়েছিল ২১৯ বিলিয়ন ডলার। তবে বিচারক তা কমিয়ে ২৫ বিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেন।
এর আগে ২০১৯ সালে ব্যবহারকারীদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষা করতে ব্যর্থ হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন (এফটিসি) মেটাকে ৫ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করেছিল।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও জরিমানা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদালতে মেটার অন্যতম বড় প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্য।
চলতি বছর শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যমের নিরাপত্তা নিয়ে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগেও অঙ্গরাজ্যটি মেটাকে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার জরিমানা করে।
ওই মামলার বিচারক মেটার কার্যক্রমকে বায়ুদূষণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মেটার ক্ষেত্রে দূষণের ধরন হলো ‘শিশুদের মানসিক ক্ষতি ও যৌন নিপীড়ন’।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিপুল বিনিয়োগ
মেটার বিরুদ্ধে এত বড় অংকের জরিমানা হলেও প্রতিষ্ঠানটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে আরও বেশি অর্থ ব্যয় করছে। এই খাতে অন্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে চায় মেটা।
আর্থিক বিশ্লেষকদের সঙ্গে এক আলোচনায় মেটার প্রধান নির্বাহী জাকারবার্গ জানান, মেটার নতুন এআই টুল ‘মিউজ’ ১ কোটি মানুষ ব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, “মিউজকে কোটি কোটি মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাই আমাদের লক্ষ্য ও কৌশল।”
এ লক্ষ্য পূরণে চলতি বছর মেটা অন্তত ১৩৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা করেছে। এর বেশির ভাগই ব্যয় হবে এআই প্রকল্পে। তবে মোট ব্যয় ১৪৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে মেটার নগদ অর্থপ্রবাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। বিবিসির আগের আর্থিক নথি পর্যালোচনা বলছে, শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এই প্রথম প্রতিষ্ঠানটির নগদ অর্থপ্রবাহ ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণাত্মক হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নগদ অর্থপ্রবাহ বলতে পরিচালন ব্যয় ও বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানের হাতে থাকা অর্থকে বোঝায়। মেটা এখন যত অর্থ আয় করছে, তার চেয়েও বেশি ব্যয় করছে। যদিও প্রতিষ্ঠানটির আয় আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মেটার আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৬ শতাংশ বেড়ে ৬৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বেড়ে হয়েছে প্রায় তিন গুণ। মোট মুনাফা হয়েছে ৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
তবু এআই খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না মেটা।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা সুসান লি বলেন, “নতুন এই শেয়ার এখনই কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগের জন্য তৈরি করা হয়নি।”
তবে এআই খাতে চলমান ব্যয়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগামী বছর অর্থায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি শিথিল হওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।
বিবিসি ও সিএনএন অবলম্বনে



