ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা “তোমাকে, ১৯৬৪।” হয়তো কোনো সংগ্রাহক বছরের পর বছর যে সংস্করণটির খোঁজ করছেন, তার শেষ কপিটিও তখন আর নেই।
নাবিয়া নাভেলী হোসেন
প্রকাশ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৩ এএমআপডেট : ০৩ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৬ এএম
এআইকে প্রশিক্ষণ দিতে ধ্বংস করা হচ্ছে বই।
হার্লেমের ঐতিহাসিক শহরকেন্দ্রে পিটার দে ভ্রিসের বইয়ের দোকানে সময় যেন একটু ধীরে চলে।
ষোলো ও সতেরো শতকের মানচিত্র, পুরোনো ভ্রমণকাহিনি, প্রাচীন মুদ্রণ, দুর্লভ প্রথম সংস্করণ; দোকানের তাকজুড়ে এমন সব বই, যেগুলো কেবল সাহিত্য বা ইতিহাসের দলিল নয়, নিজেরাও ইতিহাসের অংশ। কিছু বই পাঁচ শতাব্দী ধরে মানুষের হাত ঘুরে আজও টিকে আছে। সংগ্রাহক বা ভিন্টেজ বইয়ের সমঝদার ভক্তরা ছাড়া এখানে তেমন ভিড়ভাট্টা তাই হয়ও না।
তাই জুনের মাঝামাঝি একদিন প্রায় ৩,০০০ বইয়ের তালিকা-সহ একটি ই-মেইল যখন দে ভ্রিসের কাছে পৌঁছালো, তিনি সেটিকে প্রতারণা ভেবেছিলেন। দুর্লভ বইয়ের ব্যবসায় একসঙ্গে কয়েকশ বই কেনার মানুষই বিরল; সেখানে হাজার হাজার বইয়ের অর্ডার তার কাছে এতটাই অস্বাভাবিক ছিলো যে সংযুক্ত তালিকাটিও খুলতে সাহস পাননি।
পরে জানা গেল, সেটি কোনো প্রতারণা নয়। আবার কেউ বইগুলো পড়তেও চাইছিল না। তারা চাইছিল বইগুলোর ভেতরের শব্দগুলো। আর সেই শব্দগুলো বের করে নেওয়ার পর বইগুলোর আর প্রয়োজন নেই। বইয়ের স্পাইন ভেঙেচুরে পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করা হবে, দ্রুতগতির স্ক্যানারে একের পর এক পৃষ্ঠা ঢুকবে, আর শেষে শতাব্দী পেরিয়ে বেঁচে থাকা বইগুলো কাগজের টুকরোয় পরিণত হবে।
মানুষ যে বইগুলোকে যুদ্ধ, আগুন, বন্যা আর সময়ের ক্ষয় থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেগুলোই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও শক্তিশালী করার কাঁচামাল, রসদ হয়ে উঠছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় ভাষা মডেলগুলোকে শেখাতে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রয়োজন। এতদিন সেই তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ইন্টারনেটে থাকা সংবাদ, ওয়েবসাইট, প্রবন্ধ, ফোরাম, ডিজিটাল আর্কাইভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
কিন্তু এআই ইন্ডাস্ট্রির সামনে এখন একটি অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট আর আগের মতো স্রেফ কোনো মানুষের লেখা নয়। সেখানে এখন বিপুল পরিমাণ এআই-জেনারেটেড লেখা ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন মডেল যদি পুরোনো মডেলের তৈরি লেখা দিয়েই বারবার প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে তার জ্ঞান নতুন হওয়ার বদলে একই তথ্যের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠতে পারে।
ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন আবার সেই পুরোনো জিনিসটির, মানুষের লেখা। আর বই তার জন্য প্রায় আদর্শ উৎস।
একটি ভালো বইয়ে থাকে দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ লেখা, সম্পাদিত ভাষা, যুক্তির ধারাবাহিকতা, গল্প বলার কাঠামো আর সৃষ্টিশীলতার অসাধারণ ছোঁয়া, যার অনেকটাই কখনো ইন্টারনেটের বাজারে এসে সয়লাব হয়ে যায়নি।
আর পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক বই এখনো ডিজিটাল নয়। এআইয়ের নজর সেদিকেই।
তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি ঘুরেছে পুরোনো বইয়ের বাজারে, যেখানে কেউ এতদিন এআই-এর কথা ভাবেনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবহৃত ও পুরোনো বইয়ের বিক্রেতারা সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক বড় অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কখনো শত শত, কখনো হাজার হাজার বই। এমনকি দুর্লভ ও বহুদিন ধরে মুদ্রণের বাইরে থাকা বইও সেই তালিকায় উঠে আসছে।
বইয়ের দোকান থেকে বই যাচ্ছে গুদামে। গুদাম থেকে স্ক্যানিং কেন্দ্রে। আর সেখান থেকে আবর্জনায়। কিন্তু বইয়ের প্রতি এই আকর্ষণের কারণ শুধু তথ্যের পরিমাণ নয়। একটি বই শুধু তথ্য বহন করে না; সে বহন করে মানুষের চিন্তার ধরন, কীভাবে মানুষ গল্প বলে, যুক্তি সাজায়, স্মৃতি ধরে রাখে, অনুভূতি প্রকাশ করে।
মানুষের মতো লিখতে শেখার জন্য এআইকে তাই মানুষের লেখা পড়তে হয়। আর যত বেশি মানুষ লিখেছে, তত বেশি কিছু শেখার আছে মেশিনের।
এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যানথ্রোপিক—ক্লদ নামের এআই মডেলের নির্মাতা।
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি গুগল বুকসের সাবেক নির্বাহী টম টারভেকে নিয়োগ করে। তার দায়িত্ব ছিলো বিপুল পরিমাণ বই সংগ্রহ করা। অভ্যন্তরীণ নথিতে লক্ষ্যটিকে আরও উচ্চাভিলাষীভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল “অল দ্য বুকস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড”, অর্থাৎ পৃথিবীর সব বই সংগ্রহ করা।
শুরুতে প্রকাশকদের সঙ্গে বইয়ের লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পথ খুব বেশি দূর এগোয়নি। এরপর কৌশল বদলে যায়। বইয়ের অধিকার কিনে নেওয়ার বদলে কেনা শুরু হয় বই নিজেই। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে পুরোনো ও ব্যবহৃত বইয়ের বিশাল সংগ্রহ তৈরি করা হয়। তারপর সেগুলোর মলাট থেকে পৃষ্ঠা আলাদা করে ফেলা হয়, দ্রুতগতির যন্ত্রে স্ক্যান করা হয় এবং মূল কপিগুলো ফেলে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই বই ধ্বংস করে ফেলার প্রয়োজন ছিল না স্ক্যান করার জন্য। তবু ধ্বংস করা হয়েছিল। কারণ এখানে প্রযুক্তির সঙ্গে আইনেরও একটি অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের ফার্স্ট-সেল ডকট্রিন সাধারণভাবে বৈধভাবে কেনা কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের কপির ওপর ক্রেতাকে বিস্তৃত অধিকার দেয়। সেই কপি সে বিক্রি করতে পারে, সংগ্রহে রাখতে পারে, এমনকি ধ্বংসও করতে পারে।
কিন্তু বইটি স্ক্যান করে তার ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করে সেটিকে বাণিজ্যিক এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা এটি আরও জটিল প্রশ্ন।
অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে লেখকদের মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আদালত বলেছে, আইনসম্মতভাবে কেনা বই স্ক্যান করে ডিজিটাল কপি তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে মূল বই ধ্বংস করার প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কপিরাইট লঙ্ঘন নয়; বরং ডিজিটাল সংস্করণটি মূল ভৌত কপির বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ, একটি অদ্ভুত আইনি সমীকরণ তৈরি হয়:
বই কিনুন। বই স্ক্যান করুন। বইটি ধ্বংস করুন। তারপর বলুন যে আপনি বইটির আরেকটি কপি তৈরি করেননি; আপনি কেবল নিজের কপিটিকে অন্য রূপে রূপান্তর করেছেন।
আইনের চোখে বিষয়টি হয়তো বৈধ। কিন্তু ইতিহাসের চোখে কি বৈধ, সেখানেই প্রশ্নটি আরও কঠিন।
ধরা যাক, কোনো জনপ্রিয় উপন্যাসের ১০ লাখ কপি ছাপা হয়েছিল। সেখান থেকে একটি কপি কেটে ফেলা হলো। দুঃখজনক, কিন্তু পৃথিবীতে আরও ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯টি কপি রয়ে গেছে।
এবার ধরা যাক, ১৭ শতকের কোনো অখ্যাত গ্রন্থের মাত্র পাঁচটি কপি পৃথিবীতে টিকে আছে।
তার একটি কোনো এআই কোম্পানি কিনে স্ক্যান করল। তারপর কেটে ফেলে ধ্বংস করল। এখন বাকি রইল চারটি। এখানেই কপিরাইট আইনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনের কাছে দুটিই হয়তো “কপি”। ইতিহাসের কাছে তারা এক নয়।
কারণ একটি পুরোনো বইয়ের মূল্য শুধু তার ভেতরের লেখায় সীমাবদ্ধ নয়।
তার পাতায় কারও হাতে লেখা মন্তব্য থাকতে পারে। মলাট থেকে জানা যেতে পারে কোন সময়ের বাঁধাই কেমন ছিল। কাগজের ধরন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মুদ্রণপ্রযুক্তির তথ্য দিতে পারে। কোনো পুরোনো মালিকের নাম, সিলমোহর বা উৎসর্গলিপি বইটির যাত্রাপথের সন্ধান দিতে পারে।
একটি বইয়ের ভাঁজ, দাগ, ছেঁড়া পৃষ্ঠা এমনকি তার ক্ষয়ও ইতিহাসের সাক্ষ্য হতে পারে।
দুটো এক জিনিস নয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কোনো বইয়ের কোন অংশ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা আমরা আগে থেকে জানি না। একটি জিনিসের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক সময় বোঝা যায় তার হারিয়ে যাওয়ার পর।
কার্লোস রুইস সাফনের দ্য শ্যাডো অব দ্য উইন্ড-এর সেই দ্য সিমেট্রি অফ ফরগটেন বুকস-এর কথা মনে পড়ে, একটি কাল্পনিক, গোপন গ্রন্থাগার, যেখানে পৃথিবীর বিস্মৃত ও হারিয়ে যেতে বসা বইগুলোকে কবরের মতো নীরব আশ্রয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যাতে কোনো বই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে না যায়।
নামটিই যেন একটি সতর্কবার্তা। বইগুলো সেখানে মৃত নয়; তারা অপেক্ষা করছে। কোনো একদিন কোনো পাঠক আসবে, একটি বই তুলে নেবে, তার পৃষ্ঠা খুলবে, আর একটি প্রায় বিস্মৃত কণ্ঠ আবার কথা বলতে শুরু করবে।
বাস্তব পৃথিবীতে আমরা ঠিক উল্টো একটি দৃশ্যের দিকে এগোচ্ছি কি না, সেই প্রশ্নটাই অস্বস্তিকর।
এখানে বইগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে না। নিষিদ্ধও করা হচ্ছে না। বরং তাদের কবর থেকে তুলে আনা হচ্ছে, পড়ার জন্য নয়, তথ্য বের করে নেওয়ার জন্য। মলাট থেকে মেরুদণ্ড কেটে ফেলা হচ্ছে, পাতাগুলো যন্ত্রের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, শব্দগুলো ডেটায় পরিণত হচ্ছে। তারপর যে বস্তুটি শতাব্দী ধরে টিকে ছিল, সেটিই আর টিকে থাকছে না।
সাফনের কল্পিত গ্রন্থাগারে বইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু আগুন নয়, ভুলে যাওয়া। আর আমাদের বাস্তব পৃথিবীতে হয়তো নতুন এক বিপদ দেখা দিয়েছে, বইকে মনে রাখার বদলে তার স্মৃতিকে ডেটা হিসেবে রেখে দেওয়া।
কারণ একটি বই তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন কেউ সেটি পড়ে। কেউ তার সঙ্গে একমত হয়। কেউ তার সঙ্গে তর্ক করে। কেউ একটি বাক্য পড়ে বহু বছর সেটি মনে রাখে। কেউ সেই বইটি আরেকজনের হাতে তুলে দেয়।
একটি বইয়ের জীবন তাই তার প্রকাশের দিন থেকে শুরু হলেও, তার অর্থ তৈরি হয় পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পর।
এখানে এআই-বিরোধী হওয়া খুব সহজ। কিন্তু সমস্যাটি আসলে এআই বনাম বই নয়।
বইকে নতুন মাধ্যমে সংরক্ষণ করা নতুন কোনো ধারণা নয়। শত শত বছর ধরে গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ পুরোনো নথি সংরক্ষণ করে আসছে। আধুনিক প্রযুক্তি বরং সেই কাজকে আরও নিরাপদ করেছে। উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও ক্ষয়প্রাপ্ত বইকে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব, মূল বইটি ধ্বংস না করেই।
তাহলে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়, যখন প্রযুক্তি একটি বইকে একই সঙ্গে সংরক্ষণ এবং ডিজিটাইজ করতে পারে, তখন কেন এমন পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে যেখানে বইটির অস্তিত্বই শেষ হয়ে যায়?
উত্তরটি সম্ভবত অর্থনীতিতে। একটি ব্যবহৃত বই কয়েক ডলারে কেনা যায়। কিন্তু কোনো লেখক, প্রকাশক বা অধিকারধারীর কাছ থেকে সেই বইয়ের ডিজিটাল ব্যবহারের অনুমতি নিতে গেলে লাইসেন্সিং, দর-কষাকষি, অর্থপ্রদান এবং আইনি প্রক্রিয়া সবই প্রয়োজন। ফলে একটি পুরোনো বই কিনে সেটিকে ডেটায় পরিণত করা অনেক সস্তা হতে পারে।
একজন লেখক নিজের লেখা দিয়ে একটি বই তৈরি করলেন। একজন পাঠক সেটি কিনলেন। বছরের পর বছর পরে একজন মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে কোম্পানিটি সেই বইয়ের একটি ব্যবহৃত কপি কিনলো। আর সেই একটি কপি থেকে এমন একটি এআই মডেল তৈরি হলো, যা পরবর্তীতে সেই লেখকের কাজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
এ কারণেই বিতর্কটি শুধু বই ধ্বংসের নয়। এটি প্রশ্ন তোলে যেমানুষের তৈরি সংস্কৃতি যখন এআই-এর কাঁচামাল হয়ে যায়, তখন তার মূল্য কে পায়?
ইতিহাসে বই ধ্বংসের দৃশ্য নতুন নয়। যুদ্ধের সময় গ্রন্থাগার পুড়েছে। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও পাণ্ডুলিপি এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে গেছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতে বই নিষিদ্ধ হয়েছে, পুড়েছে, হারিয়ে গেছে। মানুষ বহুবার বুঝেছে, একটি বই ধ্বংস করা মানে শুধু কয়েকশ পৃষ্ঠা নষ্ট করা নয়। কখনো কখনো তা একটি সভ্যতার স্মৃতির একটি অংশ মুছে ফেলা।
আজকের ঘটনা অবশ্য বই পোড়ানোর মতো নয়। উদ্দেশ্যও সম্পূর্ণ আলাদা। বই পুড়িয়ে ফেলার উদ্দেশ্য সাধারণত জ্ঞানকে নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন করা। এখানে উদ্দেশ্য জ্ঞানকে সংগ্রহ করা।
কিন্তু ফলাফলের একটি অদ্ভুত মিল আছে। রেমন্ড ব্র্যাডবেরির ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই পোড়ানো হতো। কারণ বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, এমন চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করায় যা ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
আমাদের সময়ের দৃশ্যটি অবশ্য আলাদা। এখানে বই পোড়ানো হচ্ছে না। বই পড়া হচ্ছে মেশিনের জন্য। তাদের শব্দগুলো বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে, কিন্তু তাদের শরীরটি ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফারেনহাইট ৪৫১-এর পৃথিবীতে বই হারিয়ে যেত আগুনে; আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হয়তো আরও অদ্ভুত, বইয়ের প্রতিটি শব্দ বেঁচে থাকবে, অথচ বইটি নিজেই হারিয়ে যাবে।
দুটো ক্ষেত্রেই বইটির শরীর আর থাকে না।
পার্থক্য হলো, একটিতে বইয়ের জ্ঞানকে ঘৃণা করে ধ্বংস করা হয়; অন্যটিতে সেই জ্ঞানকে এতটাই মূল্যবান মনে করা হয় যে বইটির শরীরকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়।
আর সেই দ্বিতীয় ঘটনাটিই হয়তো আমাদের সময়ের আরও অস্বস্তিকর প্রতীক।
আজ একটি কঠিন বই পড়তে গিয়ে কোনো অংশ বুঝতে না পারলে আমরা থামতে পারি, আবার পড়তে পারি, অভিধান খুলতে পারি। চাইলে এআইকে বলতে পারি “এটা সহজ করে বোঝাও।” এতে সমস্যা নেই। এমন প্রযুক্তি একজন পাঠককে এমন বইয়ের কাছেও পৌঁছে দিতে পারে, যেটি হয়তো ভাষা বা জটিলতার কারণে সে একসময় পড়তেই পারতো না।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সহায়তা ধীরে ধীরে চিন্তার বিকল্প হয়ে ওঠে।
ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই হারিয়ে যাওয়ার পথও একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ বই ছোট হতে হতে সারাংশে, সারাংশ কয়েক লাইনে, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন মানুষের কাছে পুরো বই পড়ার প্রয়োজনটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। ব্র্যাডবেরির কল্পনায় মানুষ শুধু বই হারায়নি, হারিয়েছিল তার জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগও।
আজ সেই ধারণাটি অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত। একটি দীর্ঘ বইয়ের সারাংশ কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যায়। একটি কঠিন প্রবন্ধ কয়েক লাইনে নামিয়ে আনা যায়। একটি কবিতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, একটি দীর্ঘ বিতর্কের ‘দুই পক্ষের মূল কথা’ জানা যায়। এআই এই সংক্ষিপ্তকরণকে আরও দ্রুত এবং সহজ করে দিয়েছে।
কিন্তু একটি বইয়ের সারাংশ জানা আর বইটি পড়া এক জিনিস নয়। কোনো উপন্যাসের কাহিনি জানা আর তার ভাষার ভেতর দিয়ে হাঁটা এক জিনিস নয়। কোনো দার্শনিক কী বলেছেন তা জানা আর তার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা নিজের মাথার ভেতর তর্ক করা এক জিনিস নয়।
ব্র্যাডবেরির ‘সিশেল’ ছিল কানে লাগানো ছোট যন্ত্র, যা মানুষকে সারাক্ষণ শব্দ ও বিনোদনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখত। ১৯৫৩ সালে লেখা সেই কল্পনা আজ আর খুব দূরের মনে হয় না। কানে ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, হাতে স্মার্টফোন, এক মুহূর্ত নীরবতা এলেই আমরা সেটি গান, পডকাস্ট, ভিডিও বা নোটিফিকেশনে ভরে ফেলতে পারি। ব্র্যাডবেরির ‘পার্লর ওয়াল’-এর মতোই অ্যালগরিদমও আমাদের সামনে সারাক্ষণ এমন কনটেন্ট হাজির করছে, যা আমরা দেখতে চাই।
প্রযুক্তি আমাদের সঙ্গে সবসময় কথা বলছে। কিন্তু আমরা কি কখনো নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য যথেষ্ট নীরব থাকছি?
এখানেই গল্পটি শুধু বইয়ের গল্প থাকে না। এটি একটি সমাজের গল্প হয়ে ওঠে। ডিস্টোপিয়া সবসময় এমন কোনো পৃথিবী নয় যেখানে মানুষকে বই পড়তে নিষেধ করা হয়। কখনো কখনো এমন একটি পৃথিবীও ডিস্টোপিয়ান হতে পারে, যেখানে বই পড়ার আর কোনো প্রয়োজনই মানুষ অনুভব করে না।
আর ডিস্টোপিয়ার আরেকটি চেহারা হয়তো আরও নীরব। আমরা এমন প্রযুক্তিকে জীবনের আরও বেশি অংশের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি, আমাদের লেখা, পড়া, পছন্দ, প্রশ্ন, ছবি, কণ্ঠ, ব্যক্তিগত কথোপকথন, এমনকি আমরা কীভাবে চিন্তা করি তার ছাপ পর্যন্ত। প্রতিটি সুবিধার বিনিময়ে আমরা একটু একটু করে তথ্যও দিয়ে যাচ্ছি। একদিন কি এমন হবে, যে প্রযুক্তি আমাদের হয়ে লিখবে, ভাববে, খুঁজবে, মনে রাখবে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি জানবে?
ফারেনহাইট ৪৫১ এর মানুষকে বই থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। আমাদের ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো বই থেকে দূরে যাবে নিজের ইচ্ছাতেই কারণ তার হয়ে ভাবার, খোঁজার, লেখার এবং মনে রাখার মতো কিছু একটা সবসময় পাশে থাকবে।
এখানেই প্রশ্নটি শুধু পাঠকের ভবিষ্যৎ নিয়ে থাকে না। প্রশ্নটি গিয়ে পৌঁছায় লেখকের কাছেও।
এআইকে শেখাতে যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের লেখা বই ব্যবহার করা হয়, আর সেই প্রশিক্ষণ থেকে মেশিন ক্রমেই আরও স্বাভাবিক, আরও সংবেদনশীল, আরও মানবিক ভাষায় লিখতে শেখে, তাহলে একসময় আমরা কি আর সহজে বুঝতে পারব যে একটি লেখা মানুষ লিখেছে, নাকি একটি মেশিন?
আজও সেই সীমারেখা পুরোপুরি মুছে যায়নি। একটু অভিজ্ঞ পাঠক মাত্রই ধরে ফেলতে পারেন এআই দিয়ে বানানো আর মানুষের হাতে লেখার পার্থক্য। কিন্তু সেটাও কিন্তু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় হয়তো বুঝে উঠতে পারাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
২০২৪ সালে জাপানি লেখক রিয়ে কুদান তার টোকিও-তো দোজো-তো (টোকিও সিমপ্যাথি টাওয়ার) উপন্যাসে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। আকুতাগাওয়া পুরস্কারজয়ী সেই লেখক জানান, বইটির প্রায় পাঁচ শতাংশ লেখা সরাসরি এআই দিয়ে করা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এআই-এর সঙ্গে কথোপকথন তাকে এমন কিছু ভাবনা ও ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল, যা তিনি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করতে পারতেন না। মেশিনের দেওয়া উত্তর তার চরিত্রের সংলাপ এবং উপন্যাসের ভাষা নির্মাণেও প্রভাব ফেলেছিল। অর্থাৎ, এখানে এআই শুধু লেখকের জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছে না। লেখক নিজেই তাকে লেখার প্রক্রিয়ার অংশ করে নিচ্ছেন।
অথচ এআই নিয়ে আমাদের প্রাথমিক স্বপ্নটা ছিল কিছুটা অন্যরকম। যেসব কাজ মানুষকে সময়ের চাপে আটকে রাখে, যেসব পুনরাবৃত্ত কাজ আমাদের সৃষ্টিশীলতার সময় কেড়ে নেয়, সেগুলো মেশিন করে দিবে আর মানুষ সেই অবসর ব্যবহার করবে লেখালেখি, ছবি আঁকা, সংগীত, গবেষণা কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিশীল কাজে।
কিন্তু এখন মেশিন যখন সেই সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রগুলোর ভেতরেই ঢুকে পড়ছে, তখন প্রশ্নটা উল্টো হয়ে যায় যে কাজগুলো থেকে মানুষকে মুক্ত করে শিল্পের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল এআই-এর, শেষ পর্যন্ত সেই শিল্পের জায়গাটিই যদি এআই দখল করে নেয়, তাহলে মানুষ করবে কী?
আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি, যেখানে মেশিন আমাদের কাজের সময় বাঁচিয়ে দেবে, কিন্তু সেই অবসরটুকুতেও মেশিনই আমাদের হয়ে সৃষ্টি করবে?
এখানেই ভবিষ্যতের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
যদি একজন লেখক এআই ব্যবহার করে নিজের লেখা আরও ভালো করতে পারেন, তাহলে সেটি কি এখনও সম্পূর্ণ তার লেখা? এখানে ব্যাপারটা অনেকখানি ‘শিপ অব থিসিয়াস’ প্যারাডক্সের মতো। সারাই করা জাহাজটা কি শেষতক সেই জাহাজটা থাকে?
আর যদি কয়েক বছর পর একটি এআই এমন ভাষা তৈরি করতে পারে, যা একজন দক্ষ মানব লেখকের ভাষা থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়, তখন “মানুষের লেখা” বলে আলাদা করে কোনো সাংস্কৃতিক মূল্য থাকবে কি?
হয়তো থাকবে। কিন্তু সেই মূল্য তখন শুধু লেখার সৌন্দর্যে থাকবে না। কারণ একটি মেশিন সুন্দর একটি বাক্য লিখতে পারে। একটি চমৎকার গল্পের কাঠামোও তৈরি করতে পারে। এমনকি পাঠকের আবেগ কোথায় নাড়া খাবে, সেটিও শিখে নিতে পারে।
কিন্তু একজন লেখক শুধু বাক্য তৈরি করেন না। তিনি তার সময়, অভিজ্ঞতা, ভয়, প্রেম, ক্ষতি, স্মৃতি এবং নিজের দেখা পৃথিবীকে ভাষায় রূপ দেন।
একজন মানুষ কেন একটি নির্দিষ্ট গল্প লিখলেন, সেই প্রশ্নটির উত্তর কখনো কখনো গল্পটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই-এর জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের মতো লেখা নয়। মানুষ কেন লিখতে বসে, সেটি বোঝা।
কিন্তু অর্থনৈতিক প্রশ্নটি আরও কঠিন।
যদি একটি কোম্পানি কয়েক ডলারে একটি পুরোনো বই কিনে, সেটিকে ডেটায় পরিণত করে এবং সেই ডেটা দিয়ে এমন একটি মডেল তৈরি করে, যা হাজার হাজার মানুষের মতো লিখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের লেখকের বাজার কোথায়?
আজ একজন লেখককে হয়তো একজন সম্পাদক, একজন অনুবাদক, একজন কপিরাইটার বা একজন বিজ্ঞাপন লেখকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। আগামী দিনে তাঁকে এমন একটি মেশিনের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে, যা কয়েক সেকেন্ডে শত শত খসড়া লিখতে পারে।
আর মজার এবং কিছুটা নির্মম বিষয় হলো, সেই মেশিনটিকে লেখার ভাষা শেখানো হয়েছে এমন লেখকদের কাজ থেকেই, যাদের উত্তরসূরিরাই পরে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন। যে লেখকদের লেখা দিয়ে মেশিনকে লেখক বানানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই লেখকরাই কি মেশিনের কাছে কাজ হারাতে পারেন?
পিটার দে ভ্রিসের মতো বই বিক্রেতাদের কাছে একটি পুরোনো বই কোনো ডেটাসেট নয়। তার বয়স আছে, তার যাত্রা আছে, তার পাঠক আছে, কখনো কখনো তার ক্ষতও আছে।
একটি বই শত শত বছর ধরে মানুষের হাত বদলেছে। কেউ তার পাতায় ফুল শুকিয়ে রেখেছে, কেউ পাশে মন্তব্য লিখেছে, কেউ নিজের নাম লিখে গেছে। প্রথম পাতায় হয়তো লেখা আছে, “শুভ জন্মদিন, ভালোবাসা রইল”, তারিখটা ১৯৭৮। যে মানুষটি বইটি উপহার দিয়েছিল, সে হয়তো বহু বছর আগেই নেই। কিন্তু তার হাতের লেখা রয়ে গেছে।
ডিজিটাল সংস্করণে গল্পটি থাকবে, লেখকের নাম থাকবে, প্রকাশকের নাম থাকবে। কিন্তু সেই হাতের লেখা থাকবে না। থাকবে না বইটির যাত্রার সেই ব্যক্তিগত ইতিহাস।
একটি বই কখনো শুধু একজন লেখকের কাছ থেকে পাঠকের কাছে যায় না, কখনো কখনো সেটি একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের কাছে একটি সময়ও বহন করে নিয়ে যায়। পৃথিবীতে এমন সংগ্রাহকও আছেন, যারা বছরের পর বছর কোনো নির্দিষ্ট সংস্করণ, মলাট বা মুদ্রণের কপি খুঁজে বেড়ান। সেই সংস্করণের শেষ কয়েকটি কপির একটিও যদি হারিয়ে যায়, টাকা থাকলেও হয়তো আর সেটি কেনা যাবে না।
কারণ ডিজিটাল কপি একটি বইয়ের তথ্য বাঁচাতে পারে, কিন্তু তার প্রতিটি সংস্করণকে বাঁচাতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট মলাট, কাগজ, বাঁধাই কিংবা মুদ্রণের সংখ্যা একবার কমে গেলে তা আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না।
একটি যুদ্ধের সময় হয়তো কোনো পরিবার বইটি বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটিকে আগলে রেখেছিল। তারপর একদিন সেটি একটি অর্ডারের অংশ হয়ে যায় একটি ট্রাক, একটি গুদাম, একটি কাটার মেশিন, একটি স্ক্যানার, তারপর শ্রেডার।
বইটি নেই। তার ভাষা আছে।
কোনো এআই হয়তো সেই ভাষা থেকে আরও ভালোভাবে লিখতে শিখবে। আরও দ্রুত উত্তর দেবে। আরও নিখুঁতভাবে মানুষের মতো বাক্য গঠন করবে। কিন্তু যে বস্তুটি সেই ভাষাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করে এনেছিল, সেটি আর থাকবে না।
মানুষ বইকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কারণ তারা জানত একটি বই কেবল তার ভেতরের কথাগুলো নয়। একটি বই নিজেও ইতিহাসের একটি দলিল।
কিছু স্মৃতি ডেটা নয়। কিছু স্মৃতির একটি শরীর আছে।
হয়তো ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রায় সব বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। একটি বই খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ড লাগবে, তার সারাংশ পাওয়া যাবে এক মুহূর্তে, তার ভাষা অনুকরণ করে নতুন লেখা তৈরি করা যাবে আরও দ্রুত।
কিন্তু সেই ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা “তোমাকে, ১৯৬৪।” হয়তো কোনো সংগ্রাহক বছরের পর বছর যে সংস্করণটির খোঁজ করছেন, তার শেষ কপিটিও তখন আর নেই। তখন আমরা বুঝব, আমরা বইটির তথ্য হারাইনি। আমরা একটা অস্তিত্ব আর অনুভূতিকেই পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছি।
বই থেকে ডেটা, ডেটা থেকে এআই: হারিয়ে যাচ্ছে বই
ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা “তোমাকে, ১৯৬৪।” হয়তো কোনো সংগ্রাহক বছরের পর বছর যে সংস্করণটির খোঁজ করছেন, তার শেষ কপিটিও তখন আর নেই।
হার্লেমের ঐতিহাসিক শহরকেন্দ্রে পিটার দে ভ্রিসের বইয়ের দোকানে সময় যেন একটু ধীরে চলে।
ষোলো ও সতেরো শতকের মানচিত্র, পুরোনো ভ্রমণকাহিনি, প্রাচীন মুদ্রণ, দুর্লভ প্রথম সংস্করণ; দোকানের তাকজুড়ে এমন সব বই, যেগুলো কেবল সাহিত্য বা ইতিহাসের দলিল নয়, নিজেরাও ইতিহাসের অংশ। কিছু বই পাঁচ শতাব্দী ধরে মানুষের হাত ঘুরে আজও টিকে আছে। সংগ্রাহক বা ভিন্টেজ বইয়ের সমঝদার ভক্তরা ছাড়া এখানে তেমন ভিড়ভাট্টা তাই হয়ও না।
তাই জুনের মাঝামাঝি একদিন প্রায় ৩,০০০ বইয়ের তালিকা-সহ একটি ই-মেইল যখন দে ভ্রিসের কাছে পৌঁছালো, তিনি সেটিকে প্রতারণা ভেবেছিলেন। দুর্লভ বইয়ের ব্যবসায় একসঙ্গে কয়েকশ বই কেনার মানুষই বিরল; সেখানে হাজার হাজার বইয়ের অর্ডার তার কাছে এতটাই অস্বাভাবিক ছিলো যে সংযুক্ত তালিকাটিও খুলতে সাহস পাননি।
পরে জানা গেল, সেটি কোনো প্রতারণা নয়। আবার কেউ বইগুলো পড়তেও চাইছিল না। তারা চাইছিল বইগুলোর ভেতরের শব্দগুলো। আর সেই শব্দগুলো বের করে নেওয়ার পর বইগুলোর আর প্রয়োজন নেই। বইয়ের স্পাইন ভেঙেচুরে পৃষ্ঠাগুলো আলাদা করা হবে, দ্রুতগতির স্ক্যানারে একের পর এক পৃষ্ঠা ঢুকবে, আর শেষে শতাব্দী পেরিয়ে বেঁচে থাকা বইগুলো কাগজের টুকরোয় পরিণত হবে।
মানুষ যে বইগুলোকে যুদ্ধ, আগুন, বন্যা আর সময়ের ক্ষয় থেকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, সেগুলোই এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আরও শক্তিশালী করার কাঁচামাল, রসদ হয়ে উঠছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় ভাষা মডেলগুলোকে শেখাতে বিপুল পরিমাণ তথ্য প্রয়োজন। এতদিন সেই তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস ছিল ইন্টারনেটে থাকা সংবাদ, ওয়েবসাইট, প্রবন্ধ, ফোরাম, ডিজিটাল আর্কাইভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
কিন্তু এআই ইন্ডাস্ট্রির সামনে এখন একটি অদ্ভুত সমস্যা তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট আর আগের মতো স্রেফ কোনো মানুষের লেখা নয়। সেখানে এখন বিপুল পরিমাণ এআই-জেনারেটেড লেখা ছড়িয়ে রয়েছে। নতুন মডেল যদি পুরোনো মডেলের তৈরি লেখা দিয়েই বারবার প্রশিক্ষিত হয়, তাহলে তার জ্ঞান নতুন হওয়ার বদলে একই তথ্যের প্রতিধ্বনি হয়ে উঠতে পারে।
ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজন আবার সেই পুরোনো জিনিসটির, মানুষের লেখা। আর বই তার জন্য প্রায় আদর্শ উৎস।
একটি ভালো বইয়ে থাকে দীর্ঘ ও সুসংবদ্ধ লেখা, সম্পাদিত ভাষা, যুক্তির ধারাবাহিকতা, গল্প বলার কাঠামো আর সৃষ্টিশীলতার অসাধারণ ছোঁয়া, যার অনেকটাই কখনো ইন্টারনেটের বাজারে এসে সয়লাব হয়ে যায়নি।
আর পৃথিবীর বিপুলসংখ্যক বই এখনো ডিজিটাল নয়। এআইয়ের নজর সেদিকেই।
তাই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টি ঘুরেছে পুরোনো বইয়ের বাজারে, যেখানে কেউ এতদিন এআই-এর কথা ভাবেনি। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবহৃত ও পুরোনো বইয়ের বিক্রেতারা সাম্প্রতিক সময়ে অস্বাভাবিক বড় অর্ডার পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। কখনো শত শত, কখনো হাজার হাজার বই। এমনকি দুর্লভ ও বহুদিন ধরে মুদ্রণের বাইরে থাকা বইও সেই তালিকায় উঠে আসছে।
বইয়ের দোকান থেকে বই যাচ্ছে গুদামে। গুদাম থেকে স্ক্যানিং কেন্দ্রে। আর সেখান থেকে আবর্জনায়। কিন্তু বইয়ের প্রতি এই আকর্ষণের কারণ শুধু তথ্যের পরিমাণ নয়। একটি বই শুধু তথ্য বহন করে না; সে বহন করে মানুষের চিন্তার ধরন, কীভাবে মানুষ গল্প বলে, যুক্তি সাজায়, স্মৃতি ধরে রাখে, অনুভূতি প্রকাশ করে।
মানুষের মতো লিখতে শেখার জন্য এআইকে তাই মানুষের লেখা পড়তে হয়। আর যত বেশি মানুষ লিখেছে, তত বেশি কিছু শেখার আছে মেশিনের।
এই গল্পের কেন্দ্রে রয়েছে অ্যানথ্রোপিক—ক্লদ নামের এআই মডেলের নির্মাতা।
২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি গুগল বুকসের সাবেক নির্বাহী টম টারভেকে নিয়োগ করে। তার দায়িত্ব ছিলো বিপুল পরিমাণ বই সংগ্রহ করা। অভ্যন্তরীণ নথিতে লক্ষ্যটিকে আরও উচ্চাভিলাষীভাবে বর্ণনা করা হয়েছিল “অল দ্য বুকস ইন দ্য ওয়ার্ল্ড”, অর্থাৎ পৃথিবীর সব বই সংগ্রহ করা।
শুরুতে প্রকাশকদের সঙ্গে বইয়ের লাইসেন্স নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই পথ খুব বেশি দূর এগোয়নি। এরপর কৌশল বদলে যায়। বইয়ের অধিকার কিনে নেওয়ার বদলে কেনা শুরু হয় বই নিজেই। লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে পুরোনো ও ব্যবহৃত বইয়ের বিশাল সংগ্রহ তৈরি করা হয়। তারপর সেগুলোর মলাট থেকে পৃষ্ঠা আলাদা করে ফেলা হয়, দ্রুতগতির যন্ত্রে স্ক্যান করা হয় এবং মূল কপিগুলো ফেলে দেওয়া হয়।
সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো এই বই ধ্বংস করে ফেলার প্রয়োজন ছিল না স্ক্যান করার জন্য। তবু ধ্বংস করা হয়েছিল। কারণ এখানে প্রযুক্তির সঙ্গে আইনেরও একটি অদ্ভুত সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কপিরাইট আইনের ফার্স্ট-সেল ডকট্রিন সাধারণভাবে বৈধভাবে কেনা কোনো নির্দিষ্ট বইয়ের কপির ওপর ক্রেতাকে বিস্তৃত অধিকার দেয়। সেই কপি সে বিক্রি করতে পারে, সংগ্রহে রাখতে পারে, এমনকি ধ্বংসও করতে পারে।
কিন্তু বইটি স্ক্যান করে তার ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করে সেটিকে বাণিজ্যিক এআই প্রশিক্ষণে ব্যবহার করা এটি আরও জটিল প্রশ্ন।
অ্যানথ্রোপিকের বিরুদ্ধে লেখকদের মামলায় আদালতের সিদ্ধান্ত সেই বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আদালত বলেছে, আইনসম্মতভাবে কেনা বই স্ক্যান করে ডিজিটাল কপি তৈরি এবং পরবর্তী সময়ে মূল বই ধ্বংস করার প্রক্রিয়াটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কপিরাইট লঙ্ঘন নয়; বরং ডিজিটাল সংস্করণটি মূল ভৌত কপির বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অর্থাৎ, একটি অদ্ভুত আইনি সমীকরণ তৈরি হয়:
বই কিনুন। বই স্ক্যান করুন। বইটি ধ্বংস করুন। তারপর বলুন যে আপনি বইটির আরেকটি কপি তৈরি করেননি; আপনি কেবল নিজের কপিটিকে অন্য রূপে রূপান্তর করেছেন।
আইনের চোখে বিষয়টি হয়তো বৈধ। কিন্তু ইতিহাসের চোখে কি বৈধ, সেখানেই প্রশ্নটি আরও কঠিন।
ধরা যাক, কোনো জনপ্রিয় উপন্যাসের ১০ লাখ কপি ছাপা হয়েছিল। সেখান থেকে একটি কপি কেটে ফেলা হলো। দুঃখজনক, কিন্তু পৃথিবীতে আরও ৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯টি কপি রয়ে গেছে।
এবার ধরা যাক, ১৭ শতকের কোনো অখ্যাত গ্রন্থের মাত্র পাঁচটি কপি পৃথিবীতে টিকে আছে।
তার একটি কোনো এআই কোম্পানি কিনে স্ক্যান করল। তারপর কেটে ফেলে ধ্বংস করল। এখন বাকি রইল চারটি। এখানেই কপিরাইট আইনের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের পার্থক্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আইনের কাছে দুটিই হয়তো “কপি”। ইতিহাসের কাছে তারা এক নয়।
কারণ একটি পুরোনো বইয়ের মূল্য শুধু তার ভেতরের লেখায় সীমাবদ্ধ নয়।
তার পাতায় কারও হাতে লেখা মন্তব্য থাকতে পারে। মলাট থেকে জানা যেতে পারে কোন সময়ের বাঁধাই কেমন ছিল। কাগজের ধরন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের মুদ্রণপ্রযুক্তির তথ্য দিতে পারে। কোনো পুরোনো মালিকের নাম, সিলমোহর বা উৎসর্গলিপি বইটির যাত্রাপথের সন্ধান দিতে পারে।
একটি বইয়ের ভাঁজ, দাগ, ছেঁড়া পৃষ্ঠা এমনকি তার ক্ষয়ও ইতিহাসের সাক্ষ্য হতে পারে।
দুটো এক জিনিস নয়। আর সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো, কোনো বইয়ের কোন অংশ ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, তা আমরা আগে থেকে জানি না। একটি জিনিসের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক সময় বোঝা যায় তার হারিয়ে যাওয়ার পর।
কার্লোস রুইস সাফনের দ্য শ্যাডো অব দ্য উইন্ড-এর সেই দ্য সিমেট্রি অফ ফরগটেন বুকস-এর কথা মনে পড়ে, একটি কাল্পনিক, গোপন গ্রন্থাগার, যেখানে পৃথিবীর বিস্মৃত ও হারিয়ে যেতে বসা বইগুলোকে কবরের মতো নীরব আশ্রয়ে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যাতে কোনো বই পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে না যায়।
নামটিই যেন একটি সতর্কবার্তা। বইগুলো সেখানে মৃত নয়; তারা অপেক্ষা করছে। কোনো একদিন কোনো পাঠক আসবে, একটি বই তুলে নেবে, তার পৃষ্ঠা খুলবে, আর একটি প্রায় বিস্মৃত কণ্ঠ আবার কথা বলতে শুরু করবে।
বাস্তব পৃথিবীতে আমরা ঠিক উল্টো একটি দৃশ্যের দিকে এগোচ্ছি কি না, সেই প্রশ্নটাই অস্বস্তিকর।
এখানে বইগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে না। নিষিদ্ধও করা হচ্ছে না। বরং তাদের কবর থেকে তুলে আনা হচ্ছে, পড়ার জন্য নয়, তথ্য বের করে নেওয়ার জন্য। মলাট থেকে মেরুদণ্ড কেটে ফেলা হচ্ছে, পাতাগুলো যন্ত্রের ভেতর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে, শব্দগুলো ডেটায় পরিণত হচ্ছে। তারপর যে বস্তুটি শতাব্দী ধরে টিকে ছিল, সেটিই আর টিকে থাকছে না।
সাফনের কল্পিত গ্রন্থাগারে বইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু আগুন নয়, ভুলে যাওয়া। আর আমাদের বাস্তব পৃথিবীতে হয়তো নতুন এক বিপদ দেখা দিয়েছে, বইকে মনে রাখার বদলে তার স্মৃতিকে ডেটা হিসেবে রেখে দেওয়া।
কারণ একটি বই তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন কেউ সেটি পড়ে। কেউ তার সঙ্গে একমত হয়। কেউ তার সঙ্গে তর্ক করে। কেউ একটি বাক্য পড়ে বহু বছর সেটি মনে রাখে। কেউ সেই বইটি আরেকজনের হাতে তুলে দেয়।
একটি বইয়ের জীবন তাই তার প্রকাশের দিন থেকে শুরু হলেও, তার অর্থ তৈরি হয় পাঠকের কাছে পৌঁছানোর পর।
ডিজিটাইজেশন বইয়ের তথ্যকে বাঁচায়। সংরক্ষণ বইটিকেই বাঁচায়। দুটো এক জিনিস নয়।
এখানে এআই-বিরোধী হওয়া খুব সহজ। কিন্তু সমস্যাটি আসলে এআই বনাম বই নয়।
বইকে নতুন মাধ্যমে সংরক্ষণ করা নতুন কোনো ধারণা নয়। শত শত বছর ধরে গ্রন্থাগার ও আর্কাইভ পুরোনো নথি সংরক্ষণ করে আসছে। আধুনিক প্রযুক্তি বরং সেই কাজকে আরও নিরাপদ করেছে। উন্নত স্ক্যানিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও ক্ষয়প্রাপ্ত বইকে ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব, মূল বইটি ধ্বংস না করেই।
তাহলে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়, যখন প্রযুক্তি একটি বইকে একই সঙ্গে সংরক্ষণ এবং ডিজিটাইজ করতে পারে, তখন কেন এমন পদ্ধতি বেছে নেওয়া হবে যেখানে বইটির অস্তিত্বই শেষ হয়ে যায়?
উত্তরটি সম্ভবত অর্থনীতিতে। একটি ব্যবহৃত বই কয়েক ডলারে কেনা যায়। কিন্তু কোনো লেখক, প্রকাশক বা অধিকারধারীর কাছ থেকে সেই বইয়ের ডিজিটাল ব্যবহারের অনুমতি নিতে গেলে লাইসেন্সিং, দর-কষাকষি, অর্থপ্রদান এবং আইনি প্রক্রিয়া সবই প্রয়োজন। ফলে একটি পুরোনো বই কিনে সেটিকে ডেটায় পরিণত করা অনেক সস্তা হতে পারে।
একজন লেখক নিজের লেখা দিয়ে একটি বই তৈরি করলেন। একজন পাঠক সেটি কিনলেন। বছরের পর বছর পরে একজন মধ্যস্বত্বভোগীর কাছ থেকে কোম্পানিটি সেই বইয়ের একটি ব্যবহৃত কপি কিনলো। আর সেই একটি কপি থেকে এমন একটি এআই মডেল তৈরি হলো, যা পরবর্তীতে সেই লেখকের কাজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে।
এ কারণেই বিতর্কটি শুধু বই ধ্বংসের নয়। এটি প্রশ্ন তোলে যে মানুষের তৈরি সংস্কৃতি যখন এআই-এর কাঁচামাল হয়ে যায়, তখন তার মূল্য কে পায়?
ইতিহাসে বই ধ্বংসের দৃশ্য নতুন নয়। যুদ্ধের সময় গ্রন্থাগার পুড়েছে। সাম্রাজ্য বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জ্ঞান ও পাণ্ডুলিপি এক দেশ থেকে আরেক দেশে চলে গেছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংঘাতে বই নিষিদ্ধ হয়েছে, পুড়েছে, হারিয়ে গেছে। মানুষ বহুবার বুঝেছে, একটি বই ধ্বংস করা মানে শুধু কয়েকশ পৃষ্ঠা নষ্ট করা নয়। কখনো কখনো তা একটি সভ্যতার স্মৃতির একটি অংশ মুছে ফেলা।
আজকের ঘটনা অবশ্য বই পোড়ানোর মতো নয়। উদ্দেশ্যও সম্পূর্ণ আলাদা। বই পুড়িয়ে ফেলার উদ্দেশ্য সাধারণত জ্ঞানকে নিষিদ্ধ বা নিশ্চিহ্ন করা। এখানে উদ্দেশ্য জ্ঞানকে সংগ্রহ করা।
কিন্তু ফলাফলের একটি অদ্ভুত মিল আছে। রেমন্ড ব্র্যাডবেরির ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই পোড়ানো হতো। কারণ বই মানুষকে ভাবতে শেখায়, প্রশ্ন করতে শেখায়, এমন চিন্তার মুখোমুখি দাঁড় করায় যা ক্ষমতার জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে।
আমাদের সময়ের দৃশ্যটি অবশ্য আলাদা। এখানে বই পোড়ানো হচ্ছে না। বই পড়া হচ্ছে মেশিনের জন্য। তাদের শব্দগুলো বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে, কিন্তু তাদের শরীরটি ফেলে দেওয়া হচ্ছে। ফারেনহাইট ৪৫১-এর পৃথিবীতে বই হারিয়ে যেত আগুনে; আমাদের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ হয়তো আরও অদ্ভুত, বইয়ের প্রতিটি শব্দ বেঁচে থাকবে, অথচ বইটি নিজেই হারিয়ে যাবে।
দুটো ক্ষেত্রেই বইটির শরীর আর থাকে না।
পার্থক্য হলো, একটিতে বইয়ের জ্ঞানকে ঘৃণা করে ধ্বংস করা হয়; অন্যটিতে সেই জ্ঞানকে এতটাই মূল্যবান মনে করা হয় যে বইটির শরীরকে অপ্রয়োজনীয় মনে করা হয়।
আর সেই দ্বিতীয় ঘটনাটিই হয়তো আমাদের সময়ের আরও অস্বস্তিকর প্রতীক।
আজ একটি কঠিন বই পড়তে গিয়ে কোনো অংশ বুঝতে না পারলে আমরা থামতে পারি, আবার পড়তে পারি, অভিধান খুলতে পারি। চাইলে এআইকে বলতে পারি “এটা সহজ করে বোঝাও।” এতে সমস্যা নেই। এমন প্রযুক্তি একজন পাঠককে এমন বইয়ের কাছেও পৌঁছে দিতে পারে, যেটি হয়তো ভাষা বা জটিলতার কারণে সে একসময় পড়তেই পারতো না।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন সহায়তা ধীরে ধীরে চিন্তার বিকল্প হয়ে ওঠে।
ফারেনহাইট ৪৫১-এ বই হারিয়ে যাওয়ার পথও একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘ বই ছোট হতে হতে সারাংশে, সারাংশ কয়েক লাইনে, আর শেষ পর্যন্ত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যখন মানুষের কাছে পুরো বই পড়ার প্রয়োজনটাই অপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল। ব্র্যাডবেরির কল্পনায় মানুষ শুধু বই হারায়নি, হারিয়েছিল তার জন্য প্রয়োজনীয় মনোযোগও।
আজ সেই ধারণাটি অস্বস্তিকরভাবে পরিচিত। একটি দীর্ঘ বইয়ের সারাংশ কয়েক সেকেন্ডে পাওয়া যায়। একটি কঠিন প্রবন্ধ কয়েক লাইনে নামিয়ে আনা যায়। একটি কবিতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, একটি দীর্ঘ বিতর্কের ‘দুই পক্ষের মূল কথা’ জানা যায়। এআই এই সংক্ষিপ্তকরণকে আরও দ্রুত এবং সহজ করে দিয়েছে।
কিন্তু একটি বইয়ের সারাংশ জানা আর বইটি পড়া এক জিনিস নয়। কোনো উপন্যাসের কাহিনি জানা আর তার ভাষার ভেতর দিয়ে হাঁটা এক জিনিস নয়। কোনো দার্শনিক কী বলেছেন তা জানা আর তার সঙ্গে কয়েক ঘণ্টা নিজের মাথার ভেতর তর্ক করা এক জিনিস নয়।
ব্র্যাডবেরির ‘সিশেল’ ছিল কানে লাগানো ছোট যন্ত্র, যা মানুষকে সারাক্ষণ শব্দ ও বিনোদনের মধ্যে ডুবিয়ে রাখত। ১৯৫৩ সালে লেখা সেই কল্পনা আজ আর খুব দূরের মনে হয় না। কানে ওয়্যারলেস ইয়ারবাড, হাতে স্মার্টফোন, এক মুহূর্ত নীরবতা এলেই আমরা সেটি গান, পডকাস্ট, ভিডিও বা নোটিফিকেশনে ভরে ফেলতে পারি। ব্র্যাডবেরির ‘পার্লর ওয়াল’-এর মতোই অ্যালগরিদমও আমাদের সামনে সারাক্ষণ এমন কনটেন্ট হাজির করছে, যা আমরা দেখতে চাই।
প্রযুক্তি আমাদের সঙ্গে সবসময় কথা বলছে। কিন্তু আমরা কি কখনো নিজের সঙ্গে কথা বলার জন্য যথেষ্ট নীরব থাকছি?
এখানেই গল্পটি শুধু বইয়ের গল্প থাকে না। এটি একটি সমাজের গল্প হয়ে ওঠে। ডিস্টোপিয়া সবসময় এমন কোনো পৃথিবী নয় যেখানে মানুষকে বই পড়তে নিষেধ করা হয়। কখনো কখনো এমন একটি পৃথিবীও ডিস্টোপিয়ান হতে পারে, যেখানে বই পড়ার আর কোনো প্রয়োজনই মানুষ অনুভব করে না।
আর ডিস্টোপিয়ার আরেকটি চেহারা হয়তো আরও নীরব। আমরা এমন প্রযুক্তিকে জীবনের আরও বেশি অংশের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছি, আমাদের লেখা, পড়া, পছন্দ, প্রশ্ন, ছবি, কণ্ঠ, ব্যক্তিগত কথোপকথন, এমনকি আমরা কীভাবে চিন্তা করি তার ছাপ পর্যন্ত। প্রতিটি সুবিধার বিনিময়ে আমরা একটু একটু করে তথ্যও দিয়ে যাচ্ছি। একদিন কি এমন হবে, যে প্রযুক্তি আমাদের হয়ে লিখবে, ভাববে, খুঁজবে, মনে রাখবে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কে আমাদের নিজেদের চেয়েও বেশি জানবে?
ফারেনহাইট ৪৫১ এর মানুষকে বই থেকে দূরে রাখা হয়েছিল। আমাদের ভবিষ্যতের মানুষ হয়তো বই থেকে দূরে যাবে নিজের ইচ্ছাতেই কারণ তার হয়ে ভাবার, খোঁজার, লেখার এবং মনে রাখার মতো কিছু একটা সবসময় পাশে থাকবে।
এখানেই প্রশ্নটি শুধু পাঠকের ভবিষ্যৎ নিয়ে থাকে না। প্রশ্নটি গিয়ে পৌঁছায় লেখকের কাছেও।
এআইকে শেখাতে যদি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের লেখা বই ব্যবহার করা হয়, আর সেই প্রশিক্ষণ থেকে মেশিন ক্রমেই আরও স্বাভাবিক, আরও সংবেদনশীল, আরও মানবিক ভাষায় লিখতে শেখে, তাহলে একসময় আমরা কি আর সহজে বুঝতে পারব যে একটি লেখা মানুষ লিখেছে, নাকি একটি মেশিন?
আজও সেই সীমারেখা পুরোপুরি মুছে যায়নি। একটু অভিজ্ঞ পাঠক মাত্রই ধরে ফেলতে পারেন এআই দিয়ে বানানো আর মানুষের হাতে লেখার পার্থক্য। কিন্তু সেটাও কিন্তু কঠিন হয়ে যাচ্ছে। একটা সময় হয়তো বুঝে উঠতে পারাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে যাবে।
২০২৪ সালে জাপানি লেখক রিয়ে কুদান তার টোকিও-তো দোজো-তো (টোকিও সিমপ্যাথি টাওয়ার) উপন্যাসে চ্যাটজিপিটি ব্যবহারের কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করেন। আকুতাগাওয়া পুরস্কারজয়ী সেই লেখক জানান, বইটির প্রায় পাঁচ শতাংশ লেখা সরাসরি এআই দিয়ে করা। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এআই-এর সঙ্গে কথোপকথন তাকে এমন কিছু ভাবনা ও ভাষা খুঁজে পেতে সাহায্য করেছিল, যা তিনি অন্য কারও সঙ্গে ভাগ করতে পারতেন না। মেশিনের দেওয়া উত্তর তার চরিত্রের সংলাপ এবং উপন্যাসের ভাষা নির্মাণেও প্রভাব ফেলেছিল। অর্থাৎ, এখানে এআই শুধু লেখকের জায়গা নেওয়ার চেষ্টা করছে না। লেখক নিজেই তাকে লেখার প্রক্রিয়ার অংশ করে নিচ্ছেন।
অথচ এআই নিয়ে আমাদের প্রাথমিক স্বপ্নটা ছিল কিছুটা অন্যরকম। যেসব কাজ মানুষকে সময়ের চাপে আটকে রাখে, যেসব পুনরাবৃত্ত কাজ আমাদের সৃষ্টিশীলতার সময় কেড়ে নেয়, সেগুলো মেশিন করে দিবে আর মানুষ সেই অবসর ব্যবহার করবে লেখালেখি, ছবি আঁকা, সংগীত, গবেষণা কিংবা অন্য কোনো সৃষ্টিশীল কাজে।
কিন্তু এখন মেশিন যখন সেই সৃষ্টিশীল ক্ষেত্রগুলোর ভেতরেই ঢুকে পড়ছে, তখন প্রশ্নটা উল্টো হয়ে যায় যে কাজগুলো থেকে মানুষকে মুক্ত করে শিল্পের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ছিল এআই-এর, শেষ পর্যন্ত সেই শিল্পের জায়গাটিই যদি এআই দখল করে নেয়, তাহলে মানুষ করবে কী?
আমরা কি এমন এক ভবিষ্যতের দিকে যাচ্ছি, যেখানে মেশিন আমাদের কাজের সময় বাঁচিয়ে দেবে, কিন্তু সেই অবসরটুকুতেও মেশিনই আমাদের হয়ে সৃষ্টি করবে?
এখানেই ভবিষ্যতের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
যদি একজন লেখক এআই ব্যবহার করে নিজের লেখা আরও ভালো করতে পারেন, তাহলে সেটি কি এখনও সম্পূর্ণ তার লেখা? এখানে ব্যাপারটা অনেকখানি ‘শিপ অব থিসিয়াস’ প্যারাডক্সের মতো। সারাই করা জাহাজটা কি শেষতক সেই জাহাজটা থাকে?
আর যদি কয়েক বছর পর একটি এআই এমন ভাষা তৈরি করতে পারে, যা একজন দক্ষ মানব লেখকের ভাষা থেকে আলাদা করে চেনা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়, তখন “মানুষের লেখা” বলে আলাদা করে কোনো সাংস্কৃতিক মূল্য থাকবে কি?
হয়তো থাকবে। কিন্তু সেই মূল্য তখন শুধু লেখার সৌন্দর্যে থাকবে না। কারণ একটি মেশিন সুন্দর একটি বাক্য লিখতে পারে। একটি চমৎকার গল্পের কাঠামোও তৈরি করতে পারে। এমনকি পাঠকের আবেগ কোথায় নাড়া খাবে, সেটিও শিখে নিতে পারে।
কিন্তু একজন লেখক শুধু বাক্য তৈরি করেন না। তিনি তার সময়, অভিজ্ঞতা, ভয়, প্রেম, ক্ষতি, স্মৃতি এবং নিজের দেখা পৃথিবীকে ভাষায় রূপ দেন।
একজন মানুষ কেন একটি নির্দিষ্ট গল্প লিখলেন, সেই প্রশ্নটির উত্তর কখনো কখনো গল্পটির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ।
এআই-এর জন্য হয়তো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মানুষের মতো লেখা নয়। মানুষ কেন লিখতে বসে, সেটি বোঝা।
কিন্তু অর্থনৈতিক প্রশ্নটি আরও কঠিন।
যদি একটি কোম্পানি কয়েক ডলারে একটি পুরোনো বই কিনে, সেটিকে ডেটায় পরিণত করে এবং সেই ডেটা দিয়ে এমন একটি মডেল তৈরি করে, যা হাজার হাজার মানুষের মতো লিখতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতের লেখকের বাজার কোথায়?
আজ একজন লেখককে হয়তো একজন সম্পাদক, একজন অনুবাদক, একজন কপিরাইটার বা একজন বিজ্ঞাপন লেখকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়। আগামী দিনে তাঁকে এমন একটি মেশিনের সঙ্গেও প্রতিযোগিতা করতে হতে পারে, যা কয়েক সেকেন্ডে শত শত খসড়া লিখতে পারে।
আর মজার এবং কিছুটা নির্মম বিষয় হলো, সেই মেশিনটিকে লেখার ভাষা শেখানো হয়েছে এমন লেখকদের কাজ থেকেই, যাদের উত্তরসূরিরাই পরে তার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবেন। যে লেখকদের লেখা দিয়ে মেশিনকে লেখক বানানো হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেই লেখকরাই কি মেশিনের কাছে কাজ হারাতে পারেন?
পিটার দে ভ্রিসের মতো বই বিক্রেতাদের কাছে একটি পুরোনো বই কোনো ডেটাসেট নয়। তার বয়স আছে, তার যাত্রা আছে, তার পাঠক আছে, কখনো কখনো তার ক্ষতও আছে।
একটি বই শত শত বছর ধরে মানুষের হাত বদলেছে। কেউ তার পাতায় ফুল শুকিয়ে রেখেছে, কেউ পাশে মন্তব্য লিখেছে, কেউ নিজের নাম লিখে গেছে। প্রথম পাতায় হয়তো লেখা আছে, “শুভ জন্মদিন, ভালোবাসা রইল”, তারিখটা ১৯৭৮। যে মানুষটি বইটি উপহার দিয়েছিল, সে হয়তো বহু বছর আগেই নেই। কিন্তু তার হাতের লেখা রয়ে গেছে।
ডিজিটাল সংস্করণে গল্পটি থাকবে, লেখকের নাম থাকবে, প্রকাশকের নাম থাকবে। কিন্তু সেই হাতের লেখা থাকবে না। থাকবে না বইটির যাত্রার সেই ব্যক্তিগত ইতিহাস।
একটি বই কখনো শুধু একজন লেখকের কাছ থেকে পাঠকের কাছে যায় না, কখনো কখনো সেটি একজন মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের কাছে একটি সময়ও বহন করে নিয়ে যায়। পৃথিবীতে এমন সংগ্রাহকও আছেন, যারা বছরের পর বছর কোনো নির্দিষ্ট সংস্করণ, মলাট বা মুদ্রণের কপি খুঁজে বেড়ান। সেই সংস্করণের শেষ কয়েকটি কপির একটিও যদি হারিয়ে যায়, টাকা থাকলেও হয়তো আর সেটি কেনা যাবে না।
কারণ ডিজিটাল কপি একটি বইয়ের তথ্য বাঁচাতে পারে, কিন্তু তার প্রতিটি সংস্করণকে বাঁচাতে পারে না। একটি নির্দিষ্ট মলাট, কাগজ, বাঁধাই কিংবা মুদ্রণের সংখ্যা একবার কমে গেলে তা আর আগের জায়গায় ফিরে আসে না।
একটি যুদ্ধের সময় হয়তো কোনো পরিবার বইটি বাক্সে লুকিয়ে রেখেছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সেটিকে আগলে রেখেছিল। তারপর একদিন সেটি একটি অর্ডারের অংশ হয়ে যায় একটি ট্রাক, একটি গুদাম, একটি কাটার মেশিন, একটি স্ক্যানার, তারপর শ্রেডার।
বইটি নেই। তার ভাষা আছে।
কোনো এআই হয়তো সেই ভাষা থেকে আরও ভালোভাবে লিখতে শিখবে। আরও দ্রুত উত্তর দেবে। আরও নিখুঁতভাবে মানুষের মতো বাক্য গঠন করবে। কিন্তু যে বস্তুটি সেই ভাষাকে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বহন করে এনেছিল, সেটি আর থাকবে না।
মানুষ বইকে বাঁচিয়ে রেখেছিল কারণ তারা জানত একটি বই কেবল তার ভেতরের কথাগুলো নয়। একটি বই নিজেও ইতিহাসের একটি দলিল।
কিছু স্মৃতি ডেটা নয়। কিছু স্মৃতির একটি শরীর আছে।
হয়তো ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রায় সব বইয়ের ডিজিটাল সংস্করণ আমাদের হাতের মুঠোয় থাকবে। একটি বই খুঁজে পেতে কয়েক সেকেন্ড লাগবে, তার সারাংশ পাওয়া যাবে এক মুহূর্তে, তার ভাষা অনুকরণ করে নতুন লেখা তৈরি করা যাবে আরও দ্রুত।
কিন্তু সেই ভবিষ্যতে হয়তো এমন কোনো বই আর খুঁজে পাওয়া যাবে না, যার প্রথম পাতায় কাঁপা হাতে লেখা “তোমাকে, ১৯৬৪।” হয়তো কোনো সংগ্রাহক বছরের পর বছর যে সংস্করণটির খোঁজ করছেন, তার শেষ কপিটিও তখন আর নেই। তখন আমরা বুঝব, আমরা বইটির তথ্য হারাইনি। আমরা একটা অস্তিত্ব আর অনুভূতিকেই পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছি।
বিষয়: