কী এই নিউট্রিনো, হ্যালজেনের আবিষ্কার বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ কেন
অ্যান্টার্কটিকার দুই কিলোমিটার জমাট বরফের নিচে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের রহস্যময় গবেষণাগার। খালি চোখে অদৃশ্য, দেয়াল ভেদ করে চলে যাওয়া ‘ভূতুড়ে কণা’ নিউট্রিনো কীভাবে বদলে দিচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস? দীর্ঘ ৩৪ বছর পর একক বিজ্ঞানী হিসেবে পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী ফ্রান্সিস হ্যালজেন ও তার ‘আইসকিউব’ প্রজেক্টের অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প।
রিয়াজুল বাশার
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০১ পিএমআপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০২ পিএম
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের গবেষণা বিজ্ঞানীদের এমন কিছু দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা অসম্ভব ছিলো। তার কাজের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটি শাখা।
অ্যান্টার্কটিকার ঘন জমাট বরফের দুই কিলোমিটার নিচে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ যে কেন্দ্রটি থেকে মহাজাগতিক বিভিন্ন কণা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন, তারই স্বীকৃতি স্বরূপ এবার তিনি পদার্থবিদ্যায় পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার।
দীর্ঘ ৩৪ বছর পর কোনো বিজ্ঞানী এককভাবে পদার্থবিদ্যায় পেলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ এই সম্মাননা।
“আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি (মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) তৈরিতে চূড়ান্ত অবদান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎস থেকে উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য” তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
ফ্রান্সিস হ্যালজেনই প্রথম প্রস্তাব ও প্রমাণ করেছিলেন যে, বরফকে উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্তকরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ বিষয় একটি যৌথ গবেষণা দল গঠন এবং পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনিই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি।
আর আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি হলো অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং অনন্য নিউট্রিনো ডিটেক্টর।
প্রথাগত টেলিস্কোপের মতো এটি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা বা গ্রহ দেখা যায় না; বরং বরফের গভীরে থাকা কণা শনাক্ত করার এক অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি হলো আইসকিউব।
মনে করুন, মহাবিশ্বের কোনো এক প্রান্তে ভয়ংকর শক্তিশালী ঘটনা ঘটছে। বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে প্রচণ্ড শক্তির বিস্ফোরণ, কিংবা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে এমন এক প্রক্রিয়া চলছে, যা কল্পনা করাও মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য।
কিন্তু সেই ঘটনার খবর পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছে এমন এক অদৃশ্য কণা দিয়ে, যা মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে বাধাহীনভাবে চলে গেলেও টের পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞানীরা এটাকেই বলছেন নিউট্রিনো। আর এই নিউট্রিনোকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখার পথ তৈরি করেছেন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন এবং তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আইসকিউব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিউট্রিনো আসলে কী? কয়েকটি অদৃশ্য কণা শনাক্ত করার জন্য এত বড় আয়োজনই বা কেন? আর কে এই ফ্রান্সিস হ্যালজেন?
নিউট্রিনো কী?
বিভিন্ন সায়েন্স জার্নাল থেকে জানা যাচ্ছে, নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি মৌলিক কণা। এর নেই কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া এত দুর্বল যে, এটি প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই ধাক্কা খায় না।
এক কথায় নিউট্রিনো হলো, পরমাণুর ভেতরের এমন এক ধরনের কণা, যা সাব-অ্যাটমিক বা উপপারমাণবিক কণার অন্তর্ভুক্ত।
যেকোনো কঠিন পদার্থের ভেতর দিয়ে বাধা ছাড়াই অনায়াসে চলে যেতে পারায় এর উপস্থিতিও প্রচুর। প্রতি সেকেন্ডে মানুষের অজান্তেই সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের হাতের আঙুলের নখের নখদর্পণের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে।
সহজ উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা এমন যে, ধরে নিলাম পৃথিবীটা একটা বিশাল দেয়াল। একজন মানুষ সেই দেয়ালে ধাক্কা খেলে থেমে যাবে।
কিন্তু একই ক্ষেত্রে সেই দেয়ালের ভেতর দিয়েই চলে যেতে পারবে নিউট্রিনো।
প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে যাচ্ছে। সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো তো প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছেই। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও মহাজাগতিক রশ্মির সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে নিউট্রিনো তৈরি হয়।
তার মানে, যে কণা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াই করে না, তাকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণেই নিউট্রিনোকে অনেক সময় বলা হয় ভূতুড়ে কণা।
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের গবেষণা বিজ্ঞানীদের এমন কিছু দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা অসম্ভব ছিলো। তার কাজের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটি শাখা।
এর আগে মহাবিশ্বকে শুধু আলো বা বিভিন্ন রশ্মি (যেমন এক্স-রে, গামা-রে) দিয়ে দেখা হতো। কিন্তু এখন নিউট্রিনোর সাহায্যে মহাবিশ্বকে দেখা সম্ভব হচ্ছে এক নতুন চোখে।
১৯৮৮ সালে হ্যালজেন প্রথম ধারণা দেন যে, দক্ষিণ মেরুর প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরের অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরেট বরফকে নিউট্রিনো ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তার সেই আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিউট্রিনো ডিটেক্টর আইসকিউব অবজারভেটরি।
মহাবিশ্বের গভীরতম অঞ্চলে যখন কোনো নক্ষত্রের বিস্ফোরণ (সুপারনোভা) ঘটে কিংবা কোনো ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর যখন নক্ষত্রকে গ্রাস করে, তখন এই উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোগুলো তৈরি হয়। হ্যালজেনের আবিষ্কৃত পদ্ধতি ব্যবহার করে এই কণাগুলোর গতিপথ ট্র্যাক করার মাধ্যমে ঠিক কোন দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা উৎস থেকে এগুলো এসেছে তা এখন সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে।
নোবেল ঘোষণার পর আইসকিউব অবজারভেটরির এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “মানবজাতি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আলো ব্যবহার করে আসছে। এখন থেকে এই কাজে নিউট্রিনোও ব্যবহার করা যাবে। বরফের অভ্যন্তরে এমন একটি ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরির প্রস্তাবটি ছিলো একটি সাহসী ধারণা।”
“আইসকিউব নির্মাণ, এটি পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে নেওয়া ছিলো প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য ও অসাধারণ কীর্তি। আর এই কারণেই এটিকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে,” লেখা হয়েছে ওই নিবন্ধে।
নোবেল পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেনও।
“এই মহান যৌথ উদ্যোগটি যে স্বীকৃতির দাবিদার ছিলো, অবশেষে তা এনে দিতে পেরে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি,” বলেছেন তিনি।
“এটি আমার জন্য একটি বিশাল চমক ছিলো এবং এটি মূলত অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি প্রকল্পের উদযাপন। এই প্রকল্পের সাফল্য এসেছে আমার সাথে কাজ করা অসংখ্য চমৎকার সহকর্মীদের অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে।”
ফ্রান্সিস হ্যালজেন এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা বাস্তবে পরিণত করেছেন একটি অদ্ভুত ধারণাকে।
তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেন যে, যদি নিউট্রিনো সরাসরি ধরা না যায়, তাহলে এমন একটি বিশাল জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো নিউট্রিনো খুব বিরলভাবে বরফের অণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলেও সেই ঘটনাটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আর সেই জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরু। বরফের প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার গভীরে বসানো হলো হাজার হাজার আলো শনাক্তকারী সেন্সর।
পুরো ব্যবস্থাটির নাম দেওয়া হলো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। প্রায় এক ঘন কিলোমিটার অ্যান্টার্কটিক বরফকে পরিণত করা হয়েছে বিশাল একটি নিউট্রিনো ডিটেক্টরে। সেখানে ৮৬টি স্ট্রিংয়ে বসানো হয়েছে ৫ হাজার ১৬০টি ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল।
আইসকিউবের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৩ সালে। বিজ্ঞানীরা এমন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করেন, যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।
দুই বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ২৮টি অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো ইভেন্ট শনাক্ত করেন।
এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ছিলো একটি কারণে। তা হলো- বিজ্ঞানীরা প্রথমবার শক্ত প্রমাণ পেলেন যে, অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আসছে পৃথিবীর বাইরের মহাজাগতিক উৎস থেকে।
এই ঘটনার পরই মানুষের হাতে চলে এলো মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের আরেকটি নতুন মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- কেন নিউট্রিনো দিয়ে মহাবিশ্ব দেখবো আমরা?
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, মানুষ সাধারণত মহাবিশ্ব দেখে আলো দিয়ে। দৃশ্যমান আলো, ইনফ্রারেড, এক্স-রে, গামা রশ্মি—সবই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ।
কিন্তু মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর অনেকগুলো এমন পরিবেশে ঘটে, যেখানে আলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। এরা প্রায় কোনো বাধাই মানে না। তাই নিউট্রিনো যেন মহাবিশ্বের এমন একটি ‘বার্তা’, যা কোনো চরম পরিবেশের ভেতর থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসতে পারে।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির গুরুত্ব
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির অবস্থান দক্ষিণ মেরুর আদিম হিমবাহের বরফের অভ্যন্তরে। সেখানে এক ঘন কিলোমিটার বিস্তৃত একটি ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র স্থাপন করে প্রকৃতির নিজস্ব মহাজাগতিক এক্সিলারেটর থেকে নির্গত উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো প্রবাহ আবিষ্কার করা হয়েছে।
আইসকিউবের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, ১৪টি দেশের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫০ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা দলটি অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনোর বৈশিষ্ট্য ও উৎস, কসমিক রে (মহাজাগতিক রশ্মি), নিউট্রিনোর গুণাগুণ এবং পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করছে।
২০১৩ সালে যখন আইসকিউব মহাজাগতিক নিউট্রিনো আবিষ্কার করে, তখন এর উৎসগুলো জানা ছিলো না। তবে পরবর্তীতে আইসকিউব দুটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ থেকে নিউট্রিনো নির্গমনের প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার কথা জানায়।
এছাড়া ২০২৩ সালে আইসকিউব আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ—মিল্কিওয়ে (ছায়াপথ) থেকেও নিউট্রিনো আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলো।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন কর্তৃক ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনকে দেওয়া একটি অনুদান বা তহবিলের মাধ্যমে অর্থায়িত ও পরিচালিত হয়।
বিশ্বজুড়ে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত ‘আইসকিউব কোলাবোরেশন’ একটি বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি পরিচালনা করে, যা নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানসহ আইসকিউবের সামগ্রিক গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়ন করে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, জাপান, নিউজিল্যান্ড, প্রজাতন্ত্র কোরিয়া (দক্ষিণ কোরিয়া), সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য এবং এনএসএফসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা।
আইসকিউব যৌথ গবেষণা দলের মুখপাত্র এরিন ও'সুলিভান বলেছেন, আইসকিউবের মাধ্যমে আমাদের এই গবেষণা নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত এবং নোবেল পুরস্কারের যোগ্য ফ্রান্সিসকে তার প্রাপ্য দেওয়ায় অভিনন্দন জানাই।
“প্রাথমিক আবিষ্কারের স্তর পেরিয়ে কীভাবে আরো সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী শনাক্তকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়—সেই সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার পথ দেখিয়ে ফ্রান্সিস আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।”
আইসকিউবের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, ভবিষ্যত দিনগুলোতে যুক্ত হতে যাচ্ছে প্রস্তাবিত 'আইসকিউব-জেন২', যার মধ্যে রয়েছে ৮ গুণ বড় আয়তনের একটি অপটিক্যাল অ্যারে (আলোক সংবেদনশীল স্তর) এবং রেডিও ডিটেকশন বা বেতার তরঙ্গ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো পরিমাপ করার সক্ষমতা।
একসময় মানুষ মহাবিশ্বকে দেখত মূলত আলো দিয়ে। তারপর রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে, গামা রশ্মিসহ বিভিন্ন ধরনের সংকেতের ব্যবহার।
এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি শক্তিশালী বার্তাবাহক। সেটা হলো নিউট্রিনো। আর এর মানে হলো– মহাবিশ্বকে আগের তুলনায় অন্যভাবে দেখতে পারছে মানুষ।
তাই ফ্রান্সিস হ্যালজেনের গল্প অদৃশ্য কণাকে খুঁজে পাওয়ার চেয়েও বড়। মানুষের কৌতূহল কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত হয়ে গেছেন তিনি।
অ্যান্টার্কটিকার কয়েক কিলোমিটার গভীর বরফে হাজার হাজার সেন্সর বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন একটি কণার সন্ধান করেছেন, যা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া করে না। আর সেই কণার পথ অনুসরণ করে আমরা এখন মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে পারছে মানুষ।
কী এই নিউট্রিনো, হ্যালজেনের আবিষ্কার বিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ কেন
অ্যান্টার্কটিকার দুই কিলোমিটার জমাট বরফের নিচে লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের রহস্যময় গবেষণাগার। খালি চোখে অদৃশ্য, দেয়াল ভেদ করে চলে যাওয়া ‘ভূতুড়ে কণা’ নিউট্রিনো কীভাবে বদলে দিচ্ছে জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাস? দীর্ঘ ৩৪ বছর পর একক বিজ্ঞানী হিসেবে পদার্থবিদ্যায় নোবেলজয়ী ফ্রান্সিস হ্যালজেন ও তার ‘আইসকিউব’ প্রজেক্টের অবিশ্বাস্য যাত্রার গল্প।
অ্যান্টার্কটিকার ঘন জমাট বরফের দুই কিলোমিটার নিচে ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ যে কেন্দ্রটি থেকে মহাজাগতিক বিভিন্ন কণা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন ফ্রান্সিস হ্যালজেন, তারই স্বীকৃতি স্বরূপ এবার তিনি পদার্থবিদ্যায় পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার।
দীর্ঘ ৩৪ বছর পর কোনো বিজ্ঞানী এককভাবে পদার্থবিদ্যায় পেলেন বিশ্বের সর্বোচ্চ এই সম্মাননা।
“আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি (মহাকাশ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) তৈরিতে চূড়ান্ত অবদান এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের উৎস থেকে উৎপন্ন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আবিষ্কারের জন্য” তাকে এই পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
ফ্রান্সিস হ্যালজেনই প্রথম প্রস্তাব ও প্রমাণ করেছিলেন যে, বরফকে উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্তকরণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এ বিষয় একটি যৌথ গবেষণা দল গঠন এবং পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠার পেছনে তিনিই ছিলেন মূল চালিকাশক্তি।
আর আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি হলো অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বড় এবং অনন্য নিউট্রিনো ডিটেক্টর।
প্রথাগত টেলিস্কোপের মতো এটি দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা বা গ্রহ দেখা যায় না; বরং বরফের গভীরে থাকা কণা শনাক্ত করার এক অবিশ্বাস্য বৈজ্ঞানিক ল্যাবরেটরি হলো আইসকিউব।
মনে করুন, মহাবিশ্বের কোনো এক প্রান্তে ভয়ংকর শক্তিশালী ঘটনা ঘটছে। বিশাল কৃষ্ণগহ্বরের চারপাশে প্রচণ্ড শক্তির বিস্ফোরণ, কিংবা কোটি কোটি আলোকবর্ষ দূরের কোনো গ্যালাক্সিতে এমন এক প্রক্রিয়া চলছে, যা কল্পনা করাও মানুষের পক্ষে দুঃসাধ্য।
কিন্তু সেই ঘটনার খবর পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছে এমন এক অদৃশ্য কণা দিয়ে, যা মানুষের শরীরের ভেতর দিয়ে বাধাহীনভাবে চলে গেলেও টের পাওয়া যায় না।
বিজ্ঞানীরা এটাকেই বলছেন নিউট্রিনো। আর এই নিউট্রিনোকে ব্যবহার করে মহাবিশ্বকে নতুনভাবে দেখার পথ তৈরি করেছেন পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেন এবং তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আইসকিউব।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই নিউট্রিনো আসলে কী? কয়েকটি অদৃশ্য কণা শনাক্ত করার জন্য এত বড় আয়োজনই বা কেন? আর কে এই ফ্রান্সিস হ্যালজেন?
নিউট্রিনো কী?
বিভিন্ন সায়েন্স জার্নাল থেকে জানা যাচ্ছে, নিউট্রিনো হলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি মৌলিক কণা। এর নেই কোনো বৈদ্যুতিক চার্জ। সাধারণ পদার্থের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া এত দুর্বল যে, এটি প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই ধাক্কা খায় না।
এক কথায় নিউট্রিনো হলো, পরমাণুর ভেতরের এমন এক ধরনের কণা, যা সাব-অ্যাটমিক বা উপপারমাণবিক কণার অন্তর্ভুক্ত।
যেকোনো কঠিন পদার্থের ভেতর দিয়ে বাধা ছাড়াই অনায়াসে চলে যেতে পারায় এর উপস্থিতিও প্রচুর। প্রতি সেকেন্ডে মানুষের অজান্তেই সূর্য থেকে আসা প্রায় ৬৫ বিলিয়ন নিউট্রিনো আমাদের হাতের আঙুলের নখের নখদর্পণের মধ্য দিয়ে চলে যাচ্ছে।
সহজ উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা এমন যে, ধরে নিলাম পৃথিবীটা একটা বিশাল দেয়াল। একজন মানুষ সেই দেয়ালে ধাক্কা খেলে থেমে যাবে।
কিন্তু একই ক্ষেত্রে সেই দেয়ালের ভেতর দিয়েই চলে যেতে পারবে নিউট্রিনো।
প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য নিউট্রিনো আমাদের শরীর ভেদ করে যাচ্ছে। সূর্য থেকে আসা নিউট্রিনো তো প্রতিনিয়ত পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছেই। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলেও মহাজাগতিক রশ্মির সঙ্গে সংঘর্ষের ফলে নিউট্রিনো তৈরি হয়।
তার মানে, যে কণা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়াই করে না, তাকে শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। এ কারণেই নিউট্রিনোকে অনেক সময় বলা হয় ভূতুড়ে কণা।
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের আবিষ্কার কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ফ্রান্সিস হ্যালজেনের গবেষণা বিজ্ঞানীদের এমন কিছু দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আগে সাধারণ টেলিস্কোপ দিয়ে দেখা অসম্ভব ছিলো। তার কাজের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে বিজ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন একটি শাখা।
এর আগে মহাবিশ্বকে শুধু আলো বা বিভিন্ন রশ্মি (যেমন এক্স-রে, গামা-রে) দিয়ে দেখা হতো। কিন্তু এখন নিউট্রিনোর সাহায্যে মহাবিশ্বকে দেখা সম্ভব হচ্ছে এক নতুন চোখে।
১৯৮৮ সালে হ্যালজেন প্রথম ধারণা দেন যে, দক্ষিণ মেরুর প্রায় দুই কিলোমিটার গভীরের অত্যন্ত স্বচ্ছ ও নিরেট বরফকে নিউট্রিনো ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। তার সেই আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিউট্রিনো ডিটেক্টর আইসকিউব অবজারভেটরি।
মহাবিশ্বের গভীরতম অঞ্চলে যখন কোনো নক্ষত্রের বিস্ফোরণ (সুপারনোভা) ঘটে কিংবা কোনো ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর যখন নক্ষত্রকে গ্রাস করে, তখন এই উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনোগুলো তৈরি হয়। হ্যালজেনের আবিষ্কৃত পদ্ধতি ব্যবহার করে এই কণাগুলোর গতিপথ ট্র্যাক করার মাধ্যমে ঠিক কোন দূরবর্তী গ্যালাক্সি বা উৎস থেকে এগুলো এসেছে তা এখন সুনির্দিষ্টভাবে জানা সম্ভব হচ্ছে।
নোবেল ঘোষণার পর আইসকিউব অবজারভেটরির এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, “মানবজাতি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণায় দৃশ্যমান ও অদৃশ্য আলো ব্যবহার করে আসছে। এখন থেকে এই কাজে নিউট্রিনোও ব্যবহার করা যাবে। বরফের অভ্যন্তরে এমন একটি ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র তৈরির প্রস্তাবটি ছিলো একটি সাহসী ধারণা।”
“আইসকিউব নির্মাণ, এটি পরিচালনা এবং এর মাধ্যমে বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে নেওয়া ছিলো প্রযুক্তির এক অবিশ্বাস্য ও অসাধারণ কীর্তি। আর এই কারণেই এটিকে নোবেল পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়েছে,” লেখা হয়েছে ওই নিবন্ধে।
নোবেল পাওয়ার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হ্যালজেনও।
“এই মহান যৌথ উদ্যোগটি যে স্বীকৃতির দাবিদার ছিলো, অবশেষে তা এনে দিতে পেরে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছি,” বলেছেন তিনি।
“এটি আমার জন্য একটি বিশাল চমক ছিলো এবং এটি মূলত অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি প্রকল্পের উদযাপন। এই প্রকল্পের সাফল্য এসেছে আমার সাথে কাজ করা অসংখ্য চমৎকার সহকর্মীদের অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে।”
ফ্রান্সিস হ্যালজেন এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব, যার নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা বাস্তবে পরিণত করেছেন একটি অদ্ভুত ধারণাকে।
তিনিই প্রথম উপলব্ধি করেন যে, যদি নিউট্রিনো সরাসরি ধরা না যায়, তাহলে এমন একটি বিশাল জায়গা তৈরি করতে হবে, যেখানে কোনো নিউট্রিনো খুব বিরলভাবে বরফের অণুর সঙ্গে ধাক্কা খেলেও সেই ঘটনাটি শনাক্ত করা সম্ভব হবে।
আর সেই জায়গা হিসেবে বেছে নেওয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্গম অঞ্চলগুলোর একটি অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরু। বরফের প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার গভীরে বসানো হলো হাজার হাজার আলো শনাক্তকারী সেন্সর।
পুরো ব্যবস্থাটির নাম দেওয়া হলো আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি। প্রায় এক ঘন কিলোমিটার অ্যান্টার্কটিক বরফকে পরিণত করা হয়েছে বিশাল একটি নিউট্রিনো ডিটেক্টরে। সেখানে ৮৬টি স্ট্রিংয়ে বসানো হয়েছে ৫ হাজার ১৬০টি ডিজিটাল অপটিক্যাল মডিউল।
আইসকিউবের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০১৩ সালে। বিজ্ঞানীরা এমন উচ্চশক্তির নিউট্রিনো শনাক্ত করেন, যেগুলো পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলীয় উৎস দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।
দুই বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্য বিশ্লেষণ করে তারা ২৮টি অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো ইভেন্ট শনাক্ত করেন।
এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ ছিলো একটি কারণে। তা হলো- বিজ্ঞানীরা প্রথমবার শক্ত প্রমাণ পেলেন যে, অত্যন্ত উচ্চশক্তির নিউট্রিনো আসছে পৃথিবীর বাইরের মহাজাগতিক উৎস থেকে।
এই ঘটনার পরই মানুষের হাতে চলে এলো মহাবিশ্ব পর্যবেক্ষণের আরেকটি নতুন মাধ্যম।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- কেন নিউট্রিনো দিয়ে মহাবিশ্ব দেখবো আমরা?
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, মানুষ সাধারণত মহাবিশ্ব দেখে আলো দিয়ে। দৃশ্যমান আলো, ইনফ্রারেড, এক্স-রে, গামা রশ্মি—সবই ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিকিরণ।
কিন্তু মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর অনেকগুলো এমন পরিবেশে ঘটে, যেখানে আলো বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
নিউট্রিনোর ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। এরা প্রায় কোনো বাধাই মানে না। তাই নিউট্রিনো যেন মহাবিশ্বের এমন একটি ‘বার্তা’, যা কোনো চরম পরিবেশের ভেতর থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসতে পারে।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির গুরুত্ব
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরির অবস্থান দক্ষিণ মেরুর আদিম হিমবাহের বরফের অভ্যন্তরে। সেখানে এক ঘন কিলোমিটার বিস্তৃত একটি ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র স্থাপন করে প্রকৃতির নিজস্ব মহাজাগতিক এক্সিলারেটর থেকে নির্গত উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো প্রবাহ আবিষ্কার করা হয়েছে।
আইসকিউবের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, ১৪টি দেশের ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫০ জন বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত এই আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণা দলটি অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি উচ্চ-শক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনোর বৈশিষ্ট্য ও উৎস, কসমিক রে (মহাজাগতিক রশ্মি), নিউট্রিনোর গুণাগুণ এবং পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেলের বাইরের বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা করছে।
২০১৩ সালে যখন আইসকিউব মহাজাগতিক নিউট্রিনো আবিষ্কার করে, তখন এর উৎসগুলো জানা ছিলো না। তবে পরবর্তীতে আইসকিউব দুটি গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ থেকে নিউট্রিনো নির্গমনের প্রমাণ খুঁজে পাওয়ার কথা জানায়।
এছাড়া ২০২৩ সালে আইসকিউব আমাদের নিজস্ব ছায়াপথ—মিল্কিওয়ে (ছায়াপথ) থেকেও নিউট্রিনো আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছিলো।
আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন কর্তৃক ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন-ম্যাডিসনকে দেওয়া একটি অনুদান বা তহবিলের মাধ্যমে অর্থায়িত ও পরিচালিত হয়।
বিশ্বজুড়ে ৫৮টি প্রতিষ্ঠানের ৪৫০ জনেরও বেশি বিজ্ঞানীর সমন্বয়ে গঠিত ‘আইসকিউব কোলাবোরেশন’ একটি বিস্তৃত বৈজ্ঞানিক কর্মসূচি পরিচালনা করে, যা নিউট্রিনো জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করেছে।
ডিটেক্টর বা শনাক্তকারী যন্ত্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানসহ আইসকিউবের সামগ্রিক গবেষণা কার্যক্রমে অর্থায়ন করে অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, কানাডা, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইতালি, জাপান, নিউজিল্যান্ড, প্রজাতন্ত্র কোরিয়া (দক্ষিণ কোরিয়া), সুইডেন, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য এবং এনএসএফসহ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থা।
আইসকিউব যৌথ গবেষণা দলের মুখপাত্র এরিন ও'সুলিভান বলেছেন, আইসকিউবের মাধ্যমে আমাদের এই গবেষণা নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত এবং নোবেল পুরস্কারের যোগ্য ফ্রান্সিসকে তার প্রাপ্য দেওয়ায় অভিনন্দন জানাই।
“প্রাথমিক আবিষ্কারের স্তর পেরিয়ে কীভাবে আরো সুনির্দিষ্ট ও শক্তিশালী শনাক্তকরণের দিকে এগিয়ে যাওয়া যায়—সেই সুদূরপ্রসারী সম্ভাবনার পথ দেখিয়ে ফ্রান্সিস আমাদের প্রতিনিয়ত অনুপ্রাণিত করে চলেছেন।”
আইসকিউবের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, ভবিষ্যত দিনগুলোতে যুক্ত হতে যাচ্ছে প্রস্তাবিত 'আইসকিউব-জেন২', যার মধ্যে রয়েছে ৮ গুণ বড় আয়তনের একটি অপটিক্যাল অ্যারে (আলোক সংবেদনশীল স্তর) এবং রেডিও ডিটেকশন বা বেতার তরঙ্গ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে আরও উচ্চশক্তির মহাজাগতিক নিউট্রিনো পরিমাপ করার সক্ষমতা।
একসময় মানুষ মহাবিশ্বকে দেখত মূলত আলো দিয়ে। তারপর রেডিও তরঙ্গ, এক্স-রে, গামা রশ্মিসহ বিভিন্ন ধরনের সংকেতের ব্যবহার।
এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরেকটি শক্তিশালী বার্তাবাহক। সেটা হলো নিউট্রিনো। আর এর মানে হলো– মহাবিশ্বকে আগের তুলনায় অন্যভাবে দেখতে পারছে মানুষ।
তাই ফ্রান্সিস হ্যালজেনের গল্প অদৃশ্য কণাকে খুঁজে পাওয়ার চেয়েও বড়। মানুষের কৌতূহল কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, তারই দৃষ্টান্ত হয়ে গেছেন তিনি।
অ্যান্টার্কটিকার কয়েক কিলোমিটার গভীর বরফে হাজার হাজার সেন্সর বসিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন একটি কণার সন্ধান করেছেন, যা প্রায় কোনো কিছুর সঙ্গেই মিথস্ক্রিয়া করে না। আর সেই কণার পথ অনুসরণ করে আমরা এখন মহাবিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘটনাগুলোর দিকে তাকাতে পারছে মানুষ।