অতিরিক্ত ডিআইজির বাসায় রাতভর ‘রেভ পার্টির’ আড়ালে যা চলতো

ভাটারার পুলিশ হাউজিংয়ের একটি বাড়িতে ডিজে পার্টির আড়ালে চলতো মাদক ব্যবসা। অবৈধ ব্যবসার আঁচ পায়নি এলাকার মানুষও। তদন্তে এসব তথ্য আসার পর অভিযানে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বাড়ির মালিক খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির।  

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:০০ পিএম

রাত গভীর হলে বাড়িটির সামনে দেখা যেত দামি গাড়ির সারি। একেকটি গাড়ির দাম কয়েক কোটি টাকা। আসতেন তরুণ-তরুণীরা, চলতো ডিজে পার্টি। বাইরে থেকে দেখে বাড়িটিকে ঘিরে কী চলছিল, তা বুঝে ওঠা সহজ ছিল না। রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ হাউজিং-১ এলাকায় বাড়িটি নিয়ে তৈরি হয় সন্দেহ। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে তথ্য আসার পর শুরু হয় তদন্ত। 

তদন্তে উঠে আসে রাতভর ডিজে পার্টি ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধের তথ্য। এরপর বাড়িটিতে অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা বিভাগের গোয়েন্দা পুলিশ।

অভিযানে মদ, ইয়াবা, কুশসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়। তবে অভিযান চালাতে গিয়ে গোয়েন্দাদের সামনে আসে আরও একটি তথ্য। বাড়িটির মালিক পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত অতিরিক্ত ডিআইজি (রিপিয়্যার অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) আব্দুল্লাহ আল জহির।

মাসে ২০ থেকে ২২টি আয়োজন

বাড়িটিতে কীভাবে আয়োজনগুলো চলতো, তার কিছু তথ্য জানিয়েছেন ডিএমপির উত্তরা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবির।

তিনি আলাপ-কে জানান, অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এসব ডিজে পার্টির আয়োজন করা হতো। 

এ জন্য এয়ারবিএনবি ও ট্রাভেলা নামের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন তারা। সেখানে অনলাইন নিবন্ধনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা যুক্ত হতেন।

বাড়িটির একজন কো-হোস্ট মাহবুবুল আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে সেখানে এ ধরনের আয়োজন চলছিল। মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২টি অনুষ্ঠান হতো বলে তাকে জানানো হয়েছে।

আয়ের হিসাবেও উঠে এসেছে কয়েকটি তথ্য। ডিসি ইলিয়াস কবির জানান, বাড়ি ভাড়া বাবদ ১০ জনের কাছ থেকে ১৮ হাজার ৫০০ টাকা করে নেওয়ার হিসাব পাওয়া গেছে। 

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে অংশ নিতে নিবন্ধনকারীদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৬০০ টাকা নেওয়া হতো।

তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, একটি আয়োজনে প্রায় ১০০ জন অংশ নিলে শুধু নিবন্ধন ফি থেকেই উল্লেখযোগ্য অর্থ আসতে পারে।

“বাড়ির মালিক বা সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দেখবেন”, আলাপ-কে বলেন ইলিয়াস কবির। 

রাতের ডিজে পার্টিতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানানোর একটি বার্তা আলাপের কাছে এসেছে। 

ইংরেজিতে লেখা বার্তাটির বাংলা অনুবাদ হলো, “হ্যালো! আগামী সোমবার, ১৯ অক্টোবর, আমরা একটি হাউস পার্টি ও রেভ পার্টির আয়োজন করছি। এটি ব্যক্তিগত ও শুধু আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য। তাই অংশ নিতে আগাম নিবন্ধন বাধ্যতামূলক। রাত ৯টা থেকে পরদিন সকাল ৯টা পর্যন্ত গানবাজনা চলবে। প্রস্তুত হয়ে আসুন পুরো রাত গান, নাচ আর আনন্দে কাটানোর জন্য! পার্টিটি হবে তিনতলা একটি বাড়িতে। বাড়িটির মালিক একজন পুলিশ ডিআইজি। তাই যেকোনো ধরনের অভিযানের আশঙ্কা নেই। আমাদের নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যরাও সেখানে থাকবেন। উন্মাতাল এক রাতের আনন্দে যোগ দিন। চাইলে বন্ধুদের সঙ্গেও এই আমন্ত্রণ শেয়ার করতে পারেন। আসন সীমিত, তাই আগেই নিবন্ধন নিশ্চিত করুন।”

টার্গেট ছিল শিক্ষার্থীরা 

ভোররাতে অভিযানের সময়ও সবাই ছিল পার্টিমুডে। 

অভিযানে অংশ নেওয়া এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “এখানে অনেক বছর ধরে চলছিল অপকর্ম। ডিজে পার্টি, মাদক ব্যবসা-সেবন, অশ্লীল কর্মকাণ্ড সবই চলতো এই বাড়িতে।” 

আরেকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, এই খবরটি পাওয়ার পর মাদকের সরবরাহের বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেই। অভিযানের পর বাড়ির মালিকের তথ্য খুঁজতে গিয়ে পুলিশ কর্মকর্তা জহিরের নাম বের হয়ে আসে। 

তিনি জানান, মূলত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই এই চক্রের মূল টার্গট। আর এখানে যে একটি শক্তিশালী মধুচক্র গড়ে উঠেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এদিকে বুধবার দুপুরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম আলাপ-কে বলেন, “আমরা মাদকসহ অবৈধ কর্মকাণ্ডের তথ্য পেয়ে অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ৮৪ জনকে গ্রেপ্তার করি।” 

কে এই জহির

আব্দুল্লাহ আল জহির বিসিএস পুলিশ ২৪ ব্যাচের কর্মকর্তা। বাড়ি সাতক্ষীরা জেলায়। চাকরি জীবনে বিভিন্ন ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। 

বিগত আওয়ামী সরকার আমলে একাধিকবার পুলিশ পদক পেয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর বাহারুল আলম যখন আইজিপি ছিলেন তখন তাকে পুলিশ সদর দপ্তরে আনা হয় বলে জানা গিয়েছে। 

জহিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি পুলিশের একাধিক অতিরিক্ত আইজিপি ও ডিআইজি’র খুবই ঘনিষ্ঠ ও আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা। তাদের সঙ্গে থেকেই পুলিশের ভিতর একটি চক্রের প্রায় অনেক কিছুই ম্যানেজ করেন এই কর্মকর্তা।

পুলিশ সদর দপ্তর থেকে শুরু করে অন্য ইউনিটে কর্মরত কমপক্ষে চারজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় আলাপের। 

তারা বলছেন ডিবির অপারেশনের পরই এই চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। কিন্তু যেহেতু মাদক উদ্ধার হয়েছে তাই শুধু মোবাইল কোর্ট না করে মামলা হওয়া উচিত ছিল। 

তারা কেউ কেউ ধারণা করছেন, অদৃশ্য ক্ষমতা বলেই জহিরকে বাঁচাতেই এই ধরনের বন্দোবস্ত। পুলিশ হাউজিংয়ের ভেতর এই ধরনের ঘটনা পুরো পুলিশ বিভাগকে বিব্রত করছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তারা। অপর এক কর্মকর্তা বলেন, এই পুলিশ হাউজিংয়ের দপ্তর সম্পাদক ছিলেন তিনি। 

ঝিলমিল হাউজিং নামের আরেকটি প্রকল্পের তিনি সাধারণ সম্পাদক। এই পুলিশ কর্মকর্তা একটি চক্রে জড়িত। বর্তমানে ওই চক্রটি যোগ্যদের বাদ দিয়ে পুলিশের পোস্টিং, প্রমোশন নিজেদের মনমর্জি মতো করছেন। এ নিয়েও পুলিশের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। যেখান থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি জহির প্রচুর অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ আছে। ওই পুলিশ কর্মকর্তার দাবি, বারবার এই কর্মকর্তার কার্যক্রম নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের অবহিত করা হয়েছে। কিন্তু অদৃশ্য শক্তির বলে তিনি এতদিন বহাল তবিয়তেই ছিলেন। তদন্ত হলে তার অপকর্মর ভাণ্ডার উন্মোচন করা সম্ভব হবে। 

সব অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহিরের কথা হয়। সেসময় তিনি হোয়াটসঅ্যাপে একটি লিখিত বক্তব্য পাঠান যা হুবুহু তুলে ধরা হচ্ছে। 

“আমার বাসা সরাসরি মনিটর করা বা সরেজমিনে সুপারভাইজ করা পুলিশ বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করে বাস্তবে সম্ভব হয় না। এজন্য বাসা ভাড়া থেকে অংশিদারিত্ব দিয়ে ম্যানেজার/কো-হোস্ট নিয়োগ করা হয়েছে। সঠিক তথ্য উপস্থাপন করে সন্দেহ থাকলে জন্মদিনের জন্য দেয়া বুকিং বাতিল সে করতে পারতো। আইন/নিয়ম ভঙ্গের বিষয়ে প্রাথমিক ও চূড়ান্ত দায় অংশগ্রহণকারীদের। এরপর যেকোন গাফিলতি থাকলে সেটার দায় ম্যানেজার/কো-হোস্টের।” 

তবে এর আগে তিনি আলাপ-কে বলেন, “অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এসব অবৈধ কাজের সঙ্গে আমি যুক্ত না।” 

তার বিরুদ্ধে সহকর্মীদের অভিযোগ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি না হলেও তিনি বলেন, আমার সার্ভিস রেকর্ড সম্পর্কে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। আর আমার নামে গোয়েন্দা প্রতিবেদনগুলোই বলে দিবে আমি কেমন। 

পুলিশ সদর দপ্তরের বক্তব্য

বাড়িটির মালিক হিসেবে জহিরের নাম প্রকাশ্যে আসার পর পুলিশ সদর দপ্তরও বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ নেয়।

একটি সূত্রের দাবি, প্রথমে তার বক্তব্য জানতে চাওয়া হয়। এরপর পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকিরের স্বাক্ষরিত অফিস আদেশে তাকে ক্লোজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বুধবার পুলিশ সদর দপ্তরের মিডিয়া শাখার এআইজি কামারুম মুনিরা আলাপকে বলেন, তাৎক্ষণিকভাবে অফিস আদেশের মাধ্যমে ওই অতিরিক্ত ডিআইজিকে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তিনি জানান, ডিবি বিষয়টি তদন্ত করছে। তদন্তে জহিরের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।