একটি শৈবাল, একটি প্রশ্ন, তারপর নোবেল জয়ের গল্প

যে জিনিসটা একসময় ছিলো একটি শৈবালের আলো বোঝার রহস্য, সেটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেলো মানুষের মস্তিষ্ককে বোঝার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার।

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৯ পিএম

ভাবুন তো, একজন বিজ্ঞানী আপনার মস্তিষ্কের একটি নির্দিষ্ট কোষকে বললেন, এবার জ্বলে ওঠো! এক ঝলক আলো পড়লো। কোষটি সত্যিই সক্রিয় হয়ে গেলো। বিজ্ঞানী এবার আলোটা বন্ধ করে দিলেন। কোষটিও থেমে গেলো। কোনো ওষুধ নাই। কোনো বৈদ্যুতিক তার নেই। কোনো ইলেকট্রোড নেই। শুধু আলো দিয়ে মস্তিষ্কের কোষকে চালু আর বন্ধ করা হচ্ছে।

শুনতে সায়েন্স ফিকশনের মতো। অথবা কোনো সিনেমার দৃশ্য। বাস্তবে কোনোটাই না। এটি আধুনিক নিউরোসায়েন্সের বাস্তব চিত্র। আর এই অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির নাম অপ্টোজেনেটিক্স (Optogenetics)। যার মাধ্যমে তিনজন যৌথভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নোবেল বিজয়ী হয়ে গেলেন। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই গল্পের শুরু মানুষের মস্তিষ্কে হয়নি। শুরুটা ছিলো একটি অতি ক্ষুদ্র সবুজ শৈবালকে নিয়ে।

একটু পেছনে যাওয়া যাক। পানির মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে ক্ল্যামিডোমোনাস (Chlamydomonas) নামের এক ধরনের এককোষী সবুজ শৈবাল। এত ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। তার কোনো মস্তিষ্ক নেই। চোখ নেই। স্নায়ুতন্ত্র নেই। কিন্তু একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে। সে আলো চিনতে পারে। শুধু চিনতেই পারে না, আলো কোন দিক থেকে আসছে সেটাও বুঝতে পারে। তারপর সেই অনুযায়ী নিজের চলার দিক পরিবর্তন করে। এখন প্রশ্ন হলো- একটা মাত্র কোষ এটা করে কীভাবে?

আমরা মানুষ হিসাবে আলো চোখ দিয়ে দেখি। চোখ সেই তথ্য মস্তিষ্কে পাঠায়। তারপর মস্তিষ্ক সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর শরীরকে নির্দেশ দেয়। কিন্তু এই ছোট্ট শৈবালের তো এসব কিছুই নেই। তাহলে সে জানে কীভাবে- আলো ওইদিকে?

আইস্পট দিয়ে আলো চিহ্নিত করে তার দিকে ছুটতে পারে ক্ল্যামিডোমোনাস

এই প্রশ্নটার সমাধান করতেই এই বিজ্ঞানীরা বসেছিলেন। গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা শৈবালের শরীরে একটি বিশেষ অংশের সন্ধান পেলেন। নাম আইস্পট (eyespot)। নাম শুনে মনে হতে পারে ছোট্ট একটা চোখ। আসলে এটা মানুষের চোখের মতো কিছু না। এটি মূলত আলো শনাক্ত করার একটি বিশেষ ব্যবস্থা। কিন্তু এখানেও কয়েকটা প্রশ্ন থেকে গেলো- আলো শনাক্ত করার পর কোষের ভেতরে আসলে কী ঘটে?

কীভাবে আলো একটা সংকেতে পরিণত হয়? কীভাবে সেই সংকেত কোষের আচরণ বদলে দেয়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গবেষণা ধীরে ধীরে চলে গেলো কোষের ভেতরের জিন আর প্রোটিনের দিকে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেন জার্মান বিজ্ঞানী পিটার হেগেমান। হেগেমান দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অণুজীবের আলো অনুভব করার প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছিলেন। পরে তার গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হলেন আরেক জার্মান বিজ্ঞানী গেয়র্গ নাগেল। 

দু’জনের গবেষণা ধীরে ধীরে নিয়ে গেলো এক আশ্চর্য প্রোটিনের দিকে, নাম চ্যানেলরোডপসিন (Channelrhodopsin)। নামটা কঠিন। তবে কাজটা চমকপ্রদ। অনেকটা দরজার মতো। আলো পড়লে এই দরজাটা খুলে যায়। দরজা খুললে নির্দিষ্ট আয়ন কোষের ভেতরে ঢুকতে পারে। আর আয়নের এই চলাচল কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। অর্থাৎ খুব সহজ করে বললে, আলো পড়লো, চ্যানেল খুললো, আয়ন ঢুকলো আর কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থা বদলে গেলো।

বিজ্ঞানীরা তখন বুঝলেন, প্রকৃতি আসলে একটি আলো-নিয়ন্ত্রিত সুইচ তৈরি করে রেখেছে।  কিন্তু তখনও তারা জানতেন না, এই ছোট্ট আবিষ্কার একদিন নিউরোসায়েন্সের চেহারাই বদলে দেবে। এবার এই আবিষ্কারের গল্পে আসেন আমেরিকান বিজ্ঞানী কার্ল ডাইসেরথ। ডাইসেরথের মূল কাজ ছিলো মস্তিষ্ক ও মানসিক রোগ নিয়ে গবেষণা। তিনি ভাবলেন, শৈবালের এই প্রোটিন যদি আলো দিয়ে একটি কোষের বৈদ্যুতিক অবস্থা বদলাতে পারে, তাহলে এটি কি নিউরনের মধ্যেও কাজ করবে?

প্রশ্নটা খুব সাধারণ মনে হতে পারে। কিন্তু এর উত্তরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিউরোসায়েন্সের তখন একটা বড় সমস্যা ছিলো। আমাদের মস্তিষ্কে অসংখ্য নিউরন একসঙ্গে কাজ করে। আপনি ভয় পাচ্ছেন? তখনই হাজার হাজার নিউরন সক্রিয় হচ্ছে। আপনি আনন্দিত? তখনো আবার অন্য অনেক নিউরন সক্রিয় হচ্ছে। আপনি কোনো পুরোনো স্মৃতি মনে করছেন? আরও অন্য একটি নিউরাল সার্কিট কাজ করছে। বিজ্ঞানীরা দেখতে পাচ্ছিলেন কোন কোন নিউরন সক্রিয় হচ্ছে। কিন্তু তারা নিশ্চিতভাবে বলতে পারছিলেন না এই সক্রিয় নিউরনটা আসলে করছেটা কী?

ডাইসেরথ ভাবলেন যদি আমরা নিউরনকে আলো-সংবেদনশীল করে দিতে পারি? তাহলে তো সমস্যার সমাধান হতে পারে। শুরু হলো পরীক্ষা। চ্যানেলরোডপসিনের জিন নিউরনের মধ্যে প্রকাশ করানো হলো। অর্থাৎ নিউরনকে এমন একটা ক্ষমতা দেওয়া হলো, যা তার স্বাভাবিকভাবে ছিলো না। মানে আলো দেখলে সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা। তারপর সেই নিউরনের ওপর আলো ফেলা হলো।

এক মুহূর্ত, দুই মুহূর্ত, আর তারপর... নিউরন সক্রিয়! 

বিজ্ঞানীরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। আলো বন্ধ করা হলো। নিউরনের কার্যকলাপও বন্ধ হয়ে গেলো। আবার আলো জ্বালানো হলো। নিউরন আবার সক্রিয়। এ যেন নিউরনের হাতে একটা রিমোট কন্ট্রোল পাওয়া গেছে। রিমোটের বোতাম চাপলে- নিউরন চালু। আরেকবার চাপলে- নিউরন বন্ধ। এখান থেকেই জন্ম নিলো আধুনিক অপ্টোজেনেটিক্স। কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখানেই থেমে থাকেননি। ল্যাবের একটি নিউরনকে আলো দিয়ে চালু করা গেলো। ভালো কথা। কিন্তু জীবন্ত প্রাণীর মস্তিষ্কে এটা করা যাবে? সেখানেই শুরু হলো পরবর্তী পরীক্ষা। খুব সূক্ষ্ম একটি অপটিক্যাল ফাইবারের মাধ্যমে প্রাণীর মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট জায়গায় আলো পাঠানো হলো। আলো গিয়ে পড়লো নির্দিষ্ট নিউরনের ওপর। নিউরন সক্রিয় হলো। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রাণীর আচরণেও পরিবর্তন দেখা গেলো। এটা ছিলো একটা বিশাল ব্যাপার। আগে প্রশ্ন ছিলো- এই নিউরন কখন সক্রিয় হয়? এখন প্রশ্ন করা সম্ভব হলো- এই নিউরনটাকে আমি সক্রিয় করলে কী হবে? এই পার্থক্যটাই নিউরোসায়েন্সে একটা নতুন যুগের দরজা খুলে দিলো। এরপর শুরু হলো আরও বিস্ময়কর গবেষণা।

কোন নিউরন ভয় তৈরি করে? কোন নিউরন আনন্দের অনুভূতির সঙ্গে যুক্ত? কোন নিউরাল সার্কিট স্মৃতি তৈরিতে কাজ করে? কোন সার্কিট চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করে? কোন নিউরনগুলো পারকিনসনস বা অন্য স্নায়বিক রোগের সঙ্গে জড়িত?

বিজ্ঞানীরা নির্দিষ্ট নিউরনকে আলো দিয়ে চালু ও বন্ধ করে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করলেন। মস্তিষ্কের যে জটিল সার্কিটকে আগে শুধু বাইরে থেকে পর্যবেক্ষণ করা হতো, এখন সেটিকে অনেকটা ভেতর থেকে পরীক্ষা করা সম্ভব হলো। আর তখনই বিজ্ঞানীদের মাথায় এলো আরও বড় প্রশ্ন। যদি আলো দিয়ে নিউরন নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে পারকিনসনস, মৃগী, বিষণ্ণতা, দৃষ্টিশক্তি হারানো, এমনকি পক্ষাঘাত রোগের চিকিৎসায় কি একদিন এটি ব্যবহার করা সম্ভব?

গবেষণা অনেক দূর এগিয়েছে। যে জিনিসটা একসময় ছিলো, একটি শৈবালের আলো বোঝার রহস্য, সেটা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে মানুষের মস্তিষ্ক বোঝার একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। আর এখানেই এই গল্পটার সবচেয়ে সুন্দর জায়গা।

চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার ঘোষণার মুহূর্ত। 

পিটার হেগেমান যখন ছোট্ট শৈবাল নিয়ে গবেষণা করছিলেন, তখন তিনি কি ভাবতে পেরেছিলেন যে এই কাজ একদিন মানুষের মস্তিষ্কের নিউরন নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হবে? গেয়র্গ নাগেল কি জানতেন, তিনি যে আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন নিয়ে কাজ করছেন, সেটি একদিন নিউরোসায়েন্সে বিপ্লব ঘটাবে? আর কার্ল ডাইসেরথ যখন প্রথম নিউরনকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছিলেন, তখন কি তিনি জানতেন এর ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? সম্ভবত না।

বিজ্ঞানের বড় আবিষ্কারগুলো অনেক সময় এভাবেই আসে। কেউ শুরুতে জানেন না, তার কাজ কোথায় গিয়ে শেষ হবে। একজন শুধু একটা ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে থাকেন। তারপর আরেকজন সেই আবিষ্কারকে অন্য জায়গায় নিয়ে যান। তারপর তৃতীয় একজন সেটাকে সম্পূর্ণ নতুন একটা সমস্যার সমাধানে ব্যবহার করেন। এই গল্পেও ঠিক সেটাই হয়েছে।

একটি ছোট্ট শৈবাল। একটি সাধারণ প্রশ্ন। একটি আলো-সংবেদনশীল প্রোটিন। তারপর কয়েক দশকের গবেষণা। আর শেষ পর্যন্ত- নোবেল জয়ের গল্প! আর, বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলো এমনই!