প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি: রাষ্ট্রপতি

“তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া।”

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:৩৪ পিএম

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে বেশ কয়েকবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন তিনি নিজেই। 

দৈনিক কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, “আমার ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, এ রকম ঝড় সহ্য করার মতো ক্ষমতা অন্য কারো ছিল কি না আমি জানি না।”

সাক্ষাতকারে তুলে ধরেছেন ‘প্রাসাদবন্দি’ এক রাষ্ট্রপতির গল্প। বলেছেন কিভাবে তাকে অসাংবিধানিক উপায়ে ‘উপড়ে’ ফেলার চেষ্টা হয়েছিল। জানিয়েছেন দুইবার তাকে বিদেশ যেতে বাধা দেওয়া হয়েছে।

১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি হলেও অনেকগুলোর কোন প্রয়োজন ছিলো না বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোনো বিধান মেনে চলেননি।” 

রাজনৈতিক সরকার আসার পর ভালো আছেন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, “ওই দেড় বছর আমি কোনো আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলে নানা চক্রান্ত। দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে।”

দেড় বছরে তৈরি হওয়া বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বঙ্গভবনের পরিবেশ কেমন ছিল এমন প্রশ্নের রাষ্ট্রপতি বলেন, “আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব।”

যেসব ‘দল’ ও ‘মঞ্চ’ রাষ্ট্রপতিকে অপসারণে বিভিন্ন সময়ে যারা আন্দোলন করেছে তারা “এতো টাকা কোথায় পেল” সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।

২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর রাতটি নিজের জন্য বিভীষিকাময় ছিল জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? সেই অবস্থা যদি হতো, তখন একটা কথা ছিল। তিন স্তরের নিরাপত্তা দিয়ে কভার করা হয়েছে। সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে, আবার এপিসি দিয়ে ঠেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।”

রাষ্ট্রপতি জানান ওই সময় তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম তাকে ফোন করে বলেন, “এ রকম একটা খবর পাওয়া গেছে, ওরা আমাদের লোক না। আমি এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে কথা বলেছি। এগুলো সব আমরা ডিসপার্স করার চেষ্টা করছি।”

কঠিন সময়গুলোতে বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব রাষ্ট্রপতির পাশে ছিলেন বলে জানিয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন।

তিনি বলেন, “তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল।”

গণঅভ্যুত্থানের কিছু নেতার চাপে তাকে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি। এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দুই ভাগ হয়ে যায় বলেও জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, “গ্রুপে গ্রুপে মিটিং হলো, আলোচনা হলো। তারা বিভিন্ন দল ও জোটের কাছে গেল। তখন এ রকম একটা অবস্থা ছিল—যেকোনো মুহূর্তে মেজরিটি হয়ে গেলেই আমি অপসারিত হয়ে যাব বা আমার মনস্তাত্ত্বিক দিক ভেঙে যাবে। তখন তারা আমাকে অনুরোধ করবে পদত্যাগের জন্য।”

তবে তখনও বিএনপির সমর্থন দিয়েছেন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, “বিএনপি থেকে উচ্চপদে আসীন নেতা আমাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, ‘আপনার প্রতি আমাদের সমর্থন আছে। আমরা সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখতে চাই। কোনো অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের পক্ষে আমরা নই।”

রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হয়ে অন্তর্বর্তী সরকার একজন বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানোর পদক্ষেপ নেয় বলে সাক্ষাতকারে জানান সাহাবুদ্দিন। তবে তিনি রাজি হননি বলে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

এই সময়গুলোতে সশস্ত্রবাহিনী থেকেও রাষ্ট্রপতির প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা হয়েছিল বলেও জানান রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “তারা শুধু একটা কথাই বলেছে, মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।”

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সাক্ষাতকারে জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস তার সাথে কোন যোগাযোগ করেননি।

সাবেক প্রধান উপদেষ্টা সংবিধানের কোন বিধান মেনে চলেননি বলেও অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “সংবিধানে বলা আছে, উনি যখনই বিদেশ সফরে যাবেন, সেখান থেকে ফিরে এসে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করবেন এবং আমাকে ওই আউটপুটটা জানাবেন। কী আলোচনা হলো, কী হলো, কোনো চুক্তি হলো কি না, কী ধরনের কথাবার্তা হলো, এটা আমাকে লিখিতভাবে অবহিত করার কথা। তো, উনি তো বোধহয় ১৪ থেকে ১৫ বার বিদেশ সফরে গেছেন। একবারও আমাকে জানান নাই। একবারও আমার কাছে আসেননি।”

রাষ্ট্রপতি বলেন, “তিনি একটিবারের জন্যও আমার কাছে আসেননি। আমাকে সম্পূর্ণভাবে আড়ালে রাখার চেষ্টা করে গেছেন।”

দুইবার তাকে বিদেশ যেতে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তুলেছেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, “একটা ছিল কসোভো। গত ডিসেম্বরের ঘটনা। সেখান থেকে রাষ্ট্রপতিকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল কি-নোট পেপার ওখানে একটা অ্যাসেম্বলিতে পড়ার জন্য। কিন্তু আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি।”

তিনি বলেন, “কাতারের আমির আমাকে দাওয়াত করল ওখানে একটা সামিটে অংশগ্রহণের জন্য। রাষ্ট্রপতি অ্যাড্রেস করবেন। সেই সেমিনারে রাষ্ট্রপতি ছাড়া আর কেউ থাকবে না। তখন আমার কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে আমাকে একটি চিঠি দেওয়া হলো। চিঠিটি বানিয়ে দেওয়া হলো, তারাই ড্রাফট করল। ড্রাফট করে আমার কাছে পাঠায়। আর ওই দাওয়াতপত্রটাও পাঠায়। চিঠিটার মধ্যে ছিল যে, আমি রাষ্ট্রীয় কাজে ভীষণ ব্যস্ত। সুতরাং এই সেমিনারে অংশগ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি দুঃখিত। ওই চিঠিতে আমি যেন সই করে দিই।”

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে থাকা দূতাবাস-হাইকমিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি সরিয়ে দেওয়া নিয়েও উষ্মা প্রকাশ করেন তিনি।

নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, “কোনো একজন উপদেষ্টা তিনি বিদেশে গিয়ে আমার ছবিটা দেখেছেন। দেখে ওখানেই কনস্যুলেটের প্রধানকে গালিগালাজ করেছেন, এই ছবি এভাবে থাকবে কেন? তারপর এক রাতের মধ্যে সারা পৃথিবীর সব হাইকমিশন থেকে আমার ছবি নামিয়ে দেওয়া হলো। দীর্ঘদিনের একটা রেওয়াজ রাতারাতি শেষ করে দেওয়া হলো। ওই ঘটনাটি গণমাধ্যমে এলে আমি জানতে পারি। তখন আমার মনে হয়েছে যে এটি বোধহয় আমাকে অপসারণের প্রথম ধাপ। সুতরাং পরবর্তী ধাপে হয়তো আমাকে সরিয়ে দেবে। এ জন্য আমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।”

এ নিয়ে ক্ষোভ জানিয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টাকে চিঠিও দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি। তবে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন কোন উত্তর দেননি।

বঙ্গভবনের প্রেস উইং প্রত্যাহারের বিষয়েও অভিযোগ করেন রাষ্ট্রপতি। বলেন, “আমি রাষ্ট্রপতি হয়ে নিজে কেবিনেট সেক্রেটারিকে বারবার ফোন করেছি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে ফোন করেছি, এস্টাবলিশমেন্ট সেক্রেটারিকে ফোন করেছি। কেউই পাত্তা দেয়নি। এসব করা হয়েছে বাংলাদেশের জনগণের কাছে আমার এক্সপোজারটা বন্ধ করার জন্য।”

দেড় বছরে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের কোন ক্রোড়পত্রে তার বাণী প্রকাশিত হয়নি বলেও জানান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।