মন্তব্য প্রতিবেদন

হাসনাতের জার্সি, মকিমের লুঙ্গি ও সংসদের ড্রেসকোড

আব্দুল মকিম ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর একজন সংসদ সদস্য। তিনি লুঙ্গি পরে সংসদে যেতেন। একদিন একজন এমপি সংসদের জন্য একটি ড্রেসকোড ঠিক করার দাবি জানালেন। তারপর কী হল?

আপডেট : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৩ পিএম

সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের যেসব ঘটনাবলি নিয়ে ফেসবুকে রগড় চলছে - তার মধ্যে আছে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলনের দৌড়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের দেরি করে আসা এবং হাসনাত আবদুল্লাহর জার্সি। “গনি সাহেব আমি কি নিচে যাব”, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়ার পর তারেক রহমান কী করবেন ভেবে না পেয়ে করে বসা এই মন্তব্যটি নিয়েও সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে ‘এটা সেটা’ লিখছেন। কিন্তু আমার মন কেড়েছে হাসনাতের ওই জার্সিটাই।  

সবুজ রঙের জার্সির বুকের ওপর লেখা ‘ইংলিশ', পিঠে ‘হাসনাত’ এবং নাম্বার ‘১০’ - এই পোশাকটাকে আইকনে পরিণত করে ফেলেছেন কুমিল্লা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত এনসিপির তরুণ সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্য বিভাগের সাবেক ছাত্র হাসনাত সম্ভবত ডিপার্টমেন্টের কোন ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে এই জার্সি পরেই খেলেছিলেন। সেই যে গায়ে তুলেছেন এই জার্সি তারপর আর খোলেননি।

২০২৪ সালে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করার আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এই গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়ক তার এই জার্সিটাকে ইউনিফর্মে পরিণত করে ফেলেছেন। সরকার পতনের আন্দোলনের বেশিরভাগ কর্মসূচিতেই তাকে দেখা গেছে এই জার্সি পরিহিত।

পরবর্তীতে যখন এই তরুণরা রাষ্ট্রক্ষমতার হিস্যায় পরিণত হন, তখনও এই জার্সি পরিত্যাগ করেননি হাসনাত। এই তরুণদের কেউ কেউ যোগ দিয়েছিলেন সরকারে, বাকি যারা রাজনৈতিক দল গঠন করে তাতে যোগ দিয়েছিলেন সেই দলে ছিলেন হাসনাত। জামায়াতের জোটসঙ্গী হয়ে নির্বাচন করা এনসিপির ছয় বিজয়ী এমপির একজন তিনি।

নির্বাচনি প্রচারণার প্রায় পুরোটা সময় তার পরনে ছিল এই জার্সি। ফলে তিনি সেই জার্সি পরেই যে শপথ নিতে আসবেন সেটা অনেকটাই অনুমেয় ছিল।

হাসনাত কি তার জার্সিটি ধুতে দেন না? নিজেই নিজেকে এই প্রশ্ন করি আর উত্তর খুঁজি শাইখ সিরাজ কিংবা মার্ক জাকারবার্গের মধ্যে।

টিভি ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজকে ছোটোবেলা থেকেই দেখছি জলপাই রঙের একটা শার্টই পরে টিভিতে হাজির হতে। ২০১৮ সালে নিয়মিত চ্যানেল আই’তে যেতে হতো আমাকে।

একদিন শাইখ ভাইকে জিজ্ঞেস করে বসেছিলাম, আপনার এই জলপাই রঙের শার্টের ফান্ডা কী? এটা পুরোনো হয় না কেন কখনো? 

শাইখ ভাই জানিয়েছিলেন, তার টেইলর থেকে একই রঙের এবং একই ডিজাইনের ডজন ডজন শার্ট বানিয়ে রাখেন তিনি। তার গাড়ির ডিকিতে অন্তত ছয়টি প্যাকেট করা জলপাইরঙা শার্ট থাকে সবসময়। তাই এই শার্ট পুরোনো হওয়ার সুযোগ নেই কোন। 

মার্ক জাকারবার্গের ওয়ারড্রোবেও নাকি ছাইরঙা একই রকমের টিশার্ট আছে ডজন ডজন। তাকে একবার এক সাক্ষাৎকারে বলতে শুনেছিলাম - একইরকম পোশাক প্রতিদিন পরার সুবিধা হল, সকালে কী পরব সেটা ভেবে ভেবে সময় এবং মাথা কোনোটাই নষ্ট করতে হয় না।

হাসনাতের জার্সির ফান্ডা হয়ত এখানেই লুকিয়ে আছে। 

কিংবা এই জার্সি তার ‘লাকি জার্সি’ - সেকারণেই তিনি তার সব ভালোর সাথে এই জার্সিটাকে জড়িয়ে রাখতে চান। 

তবে এই জার্সির শুরুটা কীভাবে হয়েছিল তা একবার একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন হাসনাত আবদুল্লাহ।

২০২৪ সালের অগাস্ট মাসে দৈনিক প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ওই বছর জুলাই মাসে বনশ্রীর বাড়ি থেকে এই পোশাকেই আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেদিনই তাদের উপর ছাত্রলীগ অতর্কিতে হামলা করে এবং তিনি মার খান। এরপর তিনি প্রতিজ্ঞা করেন স্বৈরাচার পতন না হওয়া পর্যন্ত জার্সিটি তিনি খুলবেন না।

স্বৈরাচার পতন হওয়ার পরও অবশ্য জার্সিটি খোলেননি হাসনাত। সংসদে পর্যন্ত তিনি পরে গেছেন সেটি।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে একজন সংসদ সদস্য কি সংসদে এ ধরনের ক্যাজুয়াল পোশাক পরে যেতে পারেন? 

সকালবেলা চা খেতে খেতেই কথা হচ্ছিল তরুণ বিজ্ঞাপনকর্মী তাসমি তামান্নার সাথে। তিনি বলছিলেন, কিছু কিছু জায়গা আছে যেখানে উপযুক্ত পোশাক পরে যাওয়া উচিৎ। হাসনাতের এই জার্সি পরে শপথ নিতে যাওয়াটা তার চোখে ভালো কোন কাজ হয়নি।

কিন্তু বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের ড্রেসকোড কী? 

চলুন আব্দুল মকিমের গল্প শুনে আসি।

আব্দুল মকিম ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর একজন সংসদ সদস্য। 

তিনি ছিলেন একজন শ্রমিক নেতা এবং ঝালকাঠি ও নলছিটি আসনের আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য। তিনি লুঙ্গি পরে সংসদে যেতেন। শেখ মুজিবুর রহমান তখন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী। 

একদিন একজন সংসদ সদস্য পয়েন্ট অব অর্ডারে উঠে দাঁড়িয়ে সংসদে লুঙ্গি পরা নিয়ে আপত্তি জানালেন এবং সংসদের জন্য একটি ড্রেসকোড ঠিক করার দাবি জানালেন। 

শেখ মুজিবুর রহমান প্রায় চূড়ান্ত করে ফেলেছিলেন সংসদে লুঙ্গি নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে, ২০১৩ সালে এক নিবন্ধে লিখেছিল ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর।

তবে শেষ মুহূর্তে আবদুল মকিম সংসদ নেতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “মুই ঠোঙ্গার মধ্যে হানতে পারমু না। আপনি আইন-ফাইন যা করেন ওসব হবে না’।

শেষ পর্যন্ত সংসদে লুঙ্গি বন্ধের উদ্যোগ বাতিল হয়। আজ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে সুনির্দিষ্ট কোন ড্রেসকোডও নেই। যার যা ইচ্ছে পরতে পারেন। 

ফলে হাসনাত আব্দুল্লাহর জার্সি পরে সংসদে যাওয়ায় আইনগত কোন বাধা নেই। শুধু জার্সি কেন, জাতীয় সংসদে লুঙ্গি পরে যেতেও এখন পর্যন্ত কোন বাধা নেই।

ঝালকাঠির সংসদ আব্দুল মকিম অবশ্য তার জীবদ্দশায় কখনো লুঙ্গি ছাড়া আর কোন পোশাক পরেননি। ১৯৭৩ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হবার আগ পর্যন্ত তিনি লুঙ্গি পরা অব্যাহত রেখেছিলেন, আমাকে জানিয়েছেন বরিশালের সিনিয়র সাংবাদিক আকতার ফারুক শাহীন।

বাংলাদেশে নানা সময়ে নানা মানুষ লুঙ্গিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ফরহাদ মজহারকেতো সবাই চেনেন এবং জানেন। তাকে যারা ঘৃণা করেন, তারা তাকে ‘লুঙ্গি মজহার’ বলে ডাকেন।

সুপরিচিত সংগীতশিল্পী কনক আদিত্যকে আমি বহু প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরে যেতে দেখেছি। ২০১১ সালে আমি আর কনক ভাই একসাথে আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে গিয়েছিলাম ভিসা ইন্টারভিউ দিতে। সেখানে তিনি লুঙ্গি পরেই গিয়েছিলেন। পরে আমেরিকায় অবশ্য তিনি গিয়েছিলেন পাজামা পরে। 

মাওলানা ভাসানীর লুঙ্গিপ্রীতি ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান বাড়িতে লুঙ্গি পরতেন। ভাসানী পড়তেন সর্বত্র, ২০২২ সালে প্রথম আলোতে এই কথা লিখেছিলেন ফারুক ওয়াসিফ। 

এমনকি জাতিসংঘে বাংলাদেশের একজন প্রতিনিধি জাতিংঘের অধিবেশনে লুঙ্গি পরে গিয়েছিলেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।

বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর তাদের ২০১৩ সালের নিবন্ধে লিখেছে, “১৯৮৬ সালে যিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি ছিলেন তিনি লুঙ্গি পরেই সেখানে অধিবেশনে যোগ দিতেন”।

১৯৯১ সালের পহেলা অগাস্ট তৎকালীন দৈনিক বাংলার খবরে লেখা হয়, ওই সময়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি জাতিসংঘ মহাসচিব পেরেজ দ্য কুয়েলারের সঙ্গে প্রথমদিন লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি পরে দেখা করতে গিয়েছিলেন। 

আমি নিজে লুঙ্গি পরে থাকতে পারি না। এটা আমার অদক্ষতার কারণে। কিন্তু ঈদের দিন আমি ঘটা করে লুঙ্গি এবং পাঞ্জাবি পরে নামাজ পড়তে যাই এবং আমার কন্যার সাথে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি সহযোগে ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতে একবার বিটলামি করে লুঙ্গি পরে ক্লাসে গিয়েছিলাম। 

কিন্তু সেই লুঙ্গির ওপর আঘাত এসেছে বারবার। ২০১৩ সালে ঢাকার অভিজাত এলাকা বারিধারায় লুঙ্গি পরা রিকশাওয়ালাদের ওপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার ঘটনা ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। এই ঘটনার প্রতিবাদে পরে একদল তরুণ লুঙ্গি পরে সাইকেল চালিয়ে বারিধারা এলাকায় গিয়েছিল বিক্ষোভ দেখাতে।

ঢাকার স্টার সিনেপ্লেক্সেও একবার লুঙ্গি পরিহিত ব্যক্তিদের কাছে টিকিট বিক্রি না করার অভিযোগ ওঠায় ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। 

যাইহোক জার্সির গল্প করতে গিয়ে ফেঁদে বসলাম লুঙ্গির ইতিহাস।

কিন্তু কথা হল - পোশাকে কী আসে যায়? জার্সি কিংবা লুঙ্গি যেটাই পরুক না কেন, একজন ব্যক্তি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব কতটা যোগ্যতার সাথে পালন করতে পারছেন সেটাই গুরুত্বপূর্ণ।

আহরার হোসেন

আলাপ-এর নির্বাহী সম্পাদক