প্রচারের শেষ প্রান্তে ঢাকামুখী রাজনীতি: রাজধানীতেই শক্তি দেখাতে ব্যস্ত প্রার্থীরা

নির্বাচনি প্রচারের শেষ সময়ে রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। ঢাকায় টানা জনসভা, দলীয় প্রধানদের সরাসরি বক্তব্য এবং সর্বোচ্চ মিডিয়া কাভারেজ নিশ্চিত করার কৌশল নিয়ে মাঠে নেমেছে বড় দলগুলো।

 

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৫১ পিএম

নির্বাচনি প্রচারের শেষ প্রান্তে এসে ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে দেশের রাজনীতি। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক জনসভা, দলীয় প্রধানদের টানা বক্তব্য আর সমাবেশে ভিড়– সব মিলিয়ে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে ঢাকাই যেন হয়ে উঠেছে পুরো দেশের রাজনৈতিক মঞ্চ। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান একদিনে আটটি জনসভায় বক্তব্য দিয়েছেন, জামায়াতের আমীর ডা. শফিকুর রহমান একাধিক এলাকায় সভা করেছেন, মাঠে নেমেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও। বিশ্লেষকদের মতে, এই ঢাকামুখী প্রচার কেবল জনসমাগমের হিসাব নয়, বরং এর পেছনে আছে বড় রাজনৈতিক বার্তা ও কৌশল। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা শুধু একটি শহর নয়, এটি ক্ষমতা, রাজনীতি, গণমাধ্যম ও জনমতের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক ইমেজ দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাই শেষ মুহূর্তে ঢাকায় নিজেদের শক্ত অবস্থান দেখাতে পারা মানেই জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা। 

ঢাকায় একাধিক সমাবেশ একসঙ্গে আয়োজন করা যায়, মিডিয়ার কাভারেজ নিশ্চিত হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে বার্তা। এই সমীকরণ মাথায় রেখেই বড় দলগুলো প্রচারের শেষটা রাজধানীতে টানছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ঢাকাকেন্দ্রিক কেন

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ খান রবিউল আলম বলেন, “ঢাকা আমাদের কেন্দ্র। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সেন্টার পয়েন্টও ছিল ঢাকা। ঢাকায়, নিজেদের অবস্থা সুদৃঢ় করা যায়, সেটার রিফ্লেকশন সারা বাংলাদেশে পরে।”

রাজনীতি, অর্থনীতি সংস্কৃতি সবকিছুই ঢাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে মন্তব্য করে এই রাজনীতি পর্যবেক্ষক বলছেন, ঢাকায় প্রচার শেষ করা একটা পলিটিকাল স্ট্র্যাটেজির অংশ।

“যত দ্রুত মেসেজ সারাবিশ্বে ছড়ানো যায় সেটাই রাজনৈতিক দলের উদ্দেশ্য থাকে। সেটা ঢাকা থেকে যতটা সম্ভব, অন্য কোনো জেলা বা উপজেলায় সেটা সম্ভব না।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক রেজাউল করিম রনিও মনে করেন, ঢাকায় নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করাটা একটা রাজনৈতিক কৌশল। তিনি বলেন, ঢাকা ঘনবসতি এলাকা। এখানে এক সাথে একাধিক সমাবেশ করা সম্ভব এবং বেশি মানুষের কাছে যাওয়া যায়।

সেজন্যই ঢাকায় এসে নির্বাচনি প্রচারণা শেষ করার একটা প্রবণতা সবসময়ই লক্ষ্য করা যায় বলে মনে করছেন এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

রিপোর্টার্স ফোরাম ফর ইলেকশন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি (আরএফইডি) সভাপতি কাজী জেবেল বলেন, বড় দলগুলোর ঢাকায় নির্বাচনি প্রচার শেষ করার প্রবণতা স্বাভাবিক।  তিনি বলেন, “ঢাকায় ক্যাম্পেইন করলে সারাদেশে যে প্রভাব পড়ে, সেটা অন্য কোথাও পড়বে না।”

তিন আলোচিত দলের প্রধান সবাই ঢাকার আসন থেকে নির্বাচন করছেন। ফলে তাদের ঢাকাতে নির্বাচনি প্রচার শেষ করাটাও যৌক্তিক বলে মত কাজী জেবেলের।

কেমন ছিল প্রচারণা

এবারে নির্বাচনি প্রচারে যুক্ত হয়েছে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণ। জনসভার পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে দলীয় প্রধানরা জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিচ্ছেন। সেই ভাষণে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন তারেক রহমান, শফিকুর রহমান, নাহিদ ইসলামসহ নির্বাচনে অংশ নেওয়া একাধিক দলের প্রধান।

তবে এবার প্রচারের শুরু থেকেই প্রপাগান্ডাভিত্তিক আয়োজন ছিল বলে মনে করছেন রেজাউল করিম রনি। তিনি বলেন, এবার নির্বাচনি প্রচারে বড় দুই দলের স্ট্র্যাটেজিই ছিল প্রপাগান্ডা বনাম পরিকল্পনা।

তিনি বলেন, “প্রচারের প্রথম থেকেই প্রপাগান্ডা করে গিয়েছে একটা পক্ষ। আরেকটি দল পরিকল্পনার কথা বলে গেছে, কারও নাম নেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়াতেও এটার প্রতিফলন ছিল সবচেয়ে বেশি।

কাজী জেবেলও মনে করেন এবারের প্রচার আগের চেয়ে আলাদা ছিল।

পূবর্বর্তী নির্বাচনগুলোতে প্রার্থীরা অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকতো। কিন্তু এবার তারা চেয়েছে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে। তাই তাদের প্রচারের ধরনের পরিবর্তনটা চোখে পড়েছে।

“পরস্পরবিরোধী আক্রমণ এবার কম দেখা গেছে। সবার লক্ষ্য ছিল ভোটারদের আকৃষ্ট করা।”

দলীয় প্রধানরা যা বলছেন

তারেক রহমান

প্রচারের শেষ দিনে সোমবার বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ নির্বাচনি এলাকা এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাতটি সংসদীয় আসনে মোট আটটি জনসভায় অংশ নেন। 

নিজ আসন ঢাকা-১৭ এর বনানী কামাল আতাতুর্ক অ্যাভিনিউর খেলার মাঠে প্রথম জনসভায় বক্তব্য দিয়ে তিনি প্রচার শুরু করেন।  

এরপর কলাবাগান ক্রীড়া চক্র মাঠে, পীরজঙ্গী মাজার রোড, মান্ডা তরুণ সংঘ মাঠ, যাত্রাবাড়ীতে বক্তব্য দেন তিনি। 

বিকালে তারেক রহমান ঢাকা-৪ আসনের জুরাইনে বক্তব্য দেন তিনি। এরপর  ধূপখোলা মাঠ ও লালবাগ বালুর মাঠেও বক্তব্য রাখেন বিএনপির
চেয়ারম্যান।  

এক জনসভায় তারেক রহমান বলেন, বিগত ১৬ বছর নির্বাচনের নামে আমরা তামাশা দেখেছি, আপনারা কেউ সেই নির্বাচনগুলোতে ভোট দিতে পেরেছেন? বাংলাদেশে কেউ ভোট দিতে সক্ষম হয়নি। আজ সেই নির্বাচনের সময় এসেছে, যে নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ ভোট দিতে পারবে।

তিনি আরও বলেছেন, নির্বাচন সম্পর্কে আমাদেরকে সজাগ থাকতে হবে মন্তব্য করে বিএনপির প্রধান বলেন, নির্বাচন নিয়ে কিন্তু একটি মহল ষড়যন্ত্র শুরু করেছে, পত্রিকার পাতায় আমি সেই খবর দেখেছি। বিভিন্নভাবে তাদের লোকজন বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।

এর আগে রবিবারও তারেক রহমান ঢাকা উত্তরের ছয়টি সংসদীয় আসনে জনসভায় অংশ নেন।

শফিকুর রহমান

প্রচারের শেষ দিনে ঢাকায় প্রচারণায় ব্যস্ত ছিল জামায়াতে ইসলামীও। মোহাম্মদপুরে জনসভা করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। 

জামায়াতের আমির বলেছেন, “কোনো জালিয়াত, ভোটচোর, অবৈধ ইঞ্জিনিয়ার যেন জনগণের কপাল নিয়ে খেলতে না পারে, তা রুখে দিতে হবে। এখন থেকে পাহারাদারি শুরু করতে হবে। বিজয়ের মালা গলে পরিয়ে দিয়ে তারপর আপনারা ঘরে ফিরবেন।”

একটা পক্ষ দল, ব্যক্তি, পরিবারের বিজয়ের জন্য পাগলপারা হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ‘জনগণ তাদেরকে অতীতে দেখেছে। আর এখনো তাদের লোভ দেখছে। আমরা বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় জনগণ অবশ্যই তাদেরকে সমর্থন করবে না। তারা জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবে। যারা জনগণের পক্ষে আছে, জুলাই আকাঙ্ক্ষার পক্ষে আছে, জনগণ তাদেরকেই বেছে নেবে। এর আলামত ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।’

তিনি বলেন, “আমরা ক্ষমতায় গেলে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলা হবে। সেখানে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির কোনো স্থান থাকবে না।”

নাহিদ ইসলাম

রবিবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সামাজিক বৈষম্য দূর করে ‘ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র’ প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেন। তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর গত ৫৫ বছরে দেশে যে রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্ত গড়ে উঠেছে, তার ভিত্তি ছিল বৈষম্য। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান একটি ঐতিহাসিক গণবিদ্রোহ।’

এরপর সোমবার মোহাম্মদপুরের ১০ দলের জনসভায় অংশ নিয়েছিলেন  নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, “নির্বাচনের দ্বারপ্রান্তে এসে মিডিয়াকে ‘ব্ল্যাকআউট’ করে দেওয়া হবে। মানুষের কণ্ঠস্বর, মানুষের তথ্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে। এই ধরনের কোনো আইন করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

সব মিলিয়ে প্রচারের শেষ সময়ে প্রশ্ন উঠেছে এবারের প্রচার অন্য সময়ের তুলনায় কেন আলাদা।  ঢাকাকেন্দ্রিক এই ব্যস্ততাও সামনে এনেছে নির্বাচনের লড়াই এখন আর শুধু আসনভিত্তিক নয়, বরং ইমেজ, বার্তা ও মনস্তত্ত্বের লড়াই। রাজধানীতে কে কতটা দৃশ্যমান, সেই হিসাবও প্রভাব ফেলতে পারে ভোটের বাক্সে।