মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ছিল বিএনপির; যার সঙ্গে ছিলেন কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তা- এমন অভিযোগ অন্যান্য দলগুলোর। কিন্তু মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণ নিয়ে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ কী বলছে? কী বলছেন প্রার্থীরা? কারণগুলো কতটা যৌক্তিক?
মেরাজ মেভিজ
প্রকাশ : ০৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৭:১৮ পিএমআপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:৪০ এএম
মনোনয়ন বাতিল -‘তুচ্ছ অভিযোগ’ নাকি যৌক্তিক কারণ
মেহেরপুর-১ আসন। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত বিএনপির টিকিট মিলেছে মাসুদ অরুনের ভাগ্যে। বাকি তিন জন দলীয় মনোনয়নপত্র এবং দলীয় অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে না পারায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপি থেকে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে তাদের সবার ঘটনা একইরকম। অর্থাৎ যারা বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পেরেছেন তাদের কারোরই মনোনয়ন বাতিল হয়নি। বিএনপি থেকে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই প্রার্থিতা বাতিলের কারণ হিসাবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ‘দলীয় মনোনয়নপত্র ও দলীয় অঙ্গীকারনামা’ দাখিল করেননি তারা। এর সত্যতা উঠে আসে মেহেরপুর-১ আসনে মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থী কামরুল হাসানের বক্তব্য থেকে। আলাপকে তিনি বলেন, “আমি যখন মনোনয়নপত্র দাখিল করি তখন ভেবেছিলাম, যদি কোনো কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় তখন যাতে দলের কাছে বিকল্প সুযোগ থাকে।“ এই আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এনসিপির প্রার্থী মো. সোহেল রানার। এর কারণ হিসাবে নির্বাচন কমিশন যে কারণগুলো দেখিয়েছে সেগুলোকে ‘তুচ্ছ’ কারণ মনে করছেন এই প্রার্থী। আশা করছেন নিজের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার। আলাপকে মো. সোহেল রানা বলেন, “একেবারেই সিলি (তুচ্ছ) কারণে আমার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগনেচার না করা, টিআইএন সার্টিফিকেটে থাকা ঠিকানার সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানার মিল না থাকার মতো বিষয়।” মঙ্গলবার প্রার্থিতা ফিরে চেয়ে আপিল করবেন বলেও জানান তিনি। তবে এ আসনে তিনি বৈধতা না পেলে এ আসনে আর লড়তে পারবে না এনসিপি। এদিকে নেত্রকোনা-৫ আসনে প্রার্থীতা বাতিল হওয়াদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতের একমাত্র প্রার্থী মাসুম মোস্তফা। এর কারণ জানতে চাইলে নেত্রকোনার রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান আলাপকে বলেন, “হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন তার বিরুদ্ধে একটি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে মামলাটি এখনো চলমান। তাই আইন অনুযায়ী তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।” প্রার্থিতা বাতিলের বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের তথ্যে। যেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে উঠে এসেছে ১ শতাংশ সমর্থন স্বাক্ষর তালিকার ভুল ভ্রান্তিগুলো। ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করা তাসনিম জারার ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ এনে মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
অভিযোগের কেন্দ্রে বিএনপি
এদিকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ছিল বিএনপির; এমন অভিযোগ এনে কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বিএনপি’র প্রভাব খাটানোর বিষয়টি নিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেছেন এনসিপির প্রার্থী ও দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলছেন, “আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে।” এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে নিজের শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন এ তরুণ রাজনীতিবিদ। তিনি বলেন, “প্রশাসনের যে দ্বিচারিতামূলক আচরণ এমন অবস্থায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কতটুকু হতে পারে সেটি নিয়ে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি।” কুমিল্লা-৪, অর্থাৎ দেবীদ্বার আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির হয়ে লড়বেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার অভিযোগ ছিল, একই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত তথ্য গোপন ইস্যুতে। এসব অভিযোগের পর্যাপ্ত যুক্তি এবং পর্যাপ্ত তথ্য তুলে ধরার পরও রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব আমলে নেননি বলে দাবি করেন হাসনাত। তবে এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বিএনপি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান এ নিয়ে কথা বলেছেন। রবিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, “আমরা এমন কোনও কাজ কোথাও করিনি। একটি পক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে পরিকল্পিত মিথ্যাচার করছে। গণমাধ্যমের উচিত এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা।” এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “বিএনপি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই দ্রুত নির্বাচন দাবি করে আসছে।”
অভিযুক্ত নির্বাচন কমিশন
নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়, জামায়াতে ইসলামীর উদ্বেগ কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে। দলটির অভিযোগ, তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন অজুহাতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনেক যোগ্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে, যা ‘কোন একটি মহলের ইন্ধনে’ সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ জামায়েতের। এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগ করেন। মনোনয়নপত্র দাখিলের পর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও রিটার্নিং অফিসারের ব্যক্তিগত বিবেচনায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কঠোর নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, আবার কোথাও আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন বিষয় দেখিয়ে প্রার্থিতা বাতিল করা হচ্ছে। প্রদত্ত কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এভাবে প্রার্থিতা বাতিল মোটেও সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেন জামায়াত সেক্রেটারি। জামায়াতের অন্যতম এই শীর্ষ নেতা প্রশ্ন তোলেন, “এ ধরনের বাড়াবাড়ি চলতে থাকলে নির্বাচন কীভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে- তা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।” তুচ্ছ অজুহাতে যাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, তাদের প্রার্থিতা অবিলম্বে বৈধ ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। তবে, নির্বাচন কমিশনে বিএনপির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন না সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ড. মো. শাহজাহান। আলাপকে তিনি বলেন, “আইনের বাইরে নির্বাচন কমিশনের যাওয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ প্রার্থিতা বাতিলের কারণ জানাতে হয়। এরপর প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ রয়েছে। সেখানেও বিষয়টির সমাধান না হলে হাইকোর্টে রিট করা যায়।” নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন আপিলের সুযোগ আছে। যাদের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে তাদের, এমনকি যাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও আপিল করার সুযোগ আছে। এই আপিল করা যাবে ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত ।
কার কত বাতিল
১২ই ফ্রেবুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জনকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে তালিকা ভুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। সব মিলে বৈধ প্রার্থী ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ। সেই হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৭২৩ জন প্রার্থীর। মনোনয়নপত্র বাতিলের এই হার মোট প্রার্থীর ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ। নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীর সংখ্যা ২৫ জন। অবশ্য বাতিল হওয়া এই প্রার্থীদের কাছে বিএনপির আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ছিল না। যাদের মনোনয়ন আছে বিএনপির এরকম একজন প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়নি সারাদেশে। জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি’র প্রার্থিতা বাতিলের সংখ্যা মাত্র ৩ জন। দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে জাতীয় পার্টির। শেষ পর্যন্ত জাপা’র মনোনয়ন পাননি ৫৯ জন প্রার্থী। অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩৯ জন এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি’র ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ২৫ জন। তবে বিশ্লেষণ বলছে, মনোনয়ন বাতিল তালিকার শীর্ষে রয়েছেন একক প্রার্থীরা। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৩৩৮ জন প্রার্থীর।
মনোনয়ন বাতিল: ‘তুচ্ছ অভিযোগ’ নাকি যৌক্তিক কারণ
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ছিল বিএনপির; যার সঙ্গে ছিলেন কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তা- এমন অভিযোগ অন্যান্য দলগুলোর। কিন্তু মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণ নিয়ে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ কী বলছে? কী বলছেন প্রার্থীরা? কারণগুলো কতটা যৌক্তিক?
মেহেরপুর-১ আসন। বিএনপির পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ৪ জন প্রার্থী। এর মধ্যে শেষ পর্যন্ত বিএনপির টিকিট মিলেছে মাসুদ অরুনের ভাগ্যে। বাকি তিন জন দলীয় মনোনয়নপত্র এবং দলীয় অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে না পারায় তাদের প্রার্থিতা বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিএনপি থেকে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে তাদের সবার ঘটনা একইরকম। অর্থাৎ যারা বিএনপির দলীয় মনোনয়নপত্র দাখিল করতে পেরেছেন তাদের কারোরই মনোনয়ন বাতিল হয়নি।
বিএনপি থেকে যাদের প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে, তাদের বেশিরভাগের ক্ষেত্রেই প্রার্থিতা বাতিলের কারণ হিসাবে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ‘দলীয় মনোনয়নপত্র ও দলীয় অঙ্গীকারনামা’ দাখিল করেননি তারা।
এর সত্যতা উঠে আসে মেহেরপুর-১ আসনে মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থী কামরুল হাসানের বক্তব্য থেকে।
আলাপকে তিনি বলেন, “আমি যখন মনোনয়নপত্র দাখিল করি তখন ভেবেছিলাম, যদি কোনো কারণে দলীয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় তখন যাতে দলের কাছে বিকল্প সুযোগ থাকে।“
এই আসনে প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে এনসিপির প্রার্থী মো. সোহেল রানার।
এর কারণ হিসাবে নির্বাচন কমিশন যে কারণগুলো দেখিয়েছে সেগুলোকে ‘তুচ্ছ’ কারণ মনে করছেন এই প্রার্থী। আশা করছেন নিজের প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার।
আলাপকে মো. সোহেল রানা বলেন, “একেবারেই সিলি (তুচ্ছ) কারণে আমার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সিগনেচার না করা, টিআইএন সার্টিফিকেটে থাকা ঠিকানার সঙ্গে স্থায়ী ঠিকানার মিল না থাকার মতো বিষয়।”
মঙ্গলবার প্রার্থিতা ফিরে চেয়ে আপিল করবেন বলেও জানান তিনি। তবে এ আসনে তিনি বৈধতা না পেলে এ আসনে আর লড়তে পারবে না এনসিপি।
এদিকে নেত্রকোনা-৫ আসনে প্রার্থীতা বাতিল হওয়াদের তালিকায় রয়েছেন জামায়াতের একমাত্র প্রার্থী মাসুম মোস্তফা।
এর কারণ জানতে চাইলে নেত্রকোনার রিটার্নিং অফিসার ও জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান আলাপকে বলেন, “হলফনামায় তিনি দাবি করেছেন তার বিরুদ্ধে একটি মামলা থেকে তিনি খালাস পেয়েছেন। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে মামলাটি এখনো চলমান। তাই আইন অনুযায়ী তার প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে।”
প্রার্থিতা বাতিলের বিভিন্ন কারণ উঠে এসেছে নির্বাচন কমিশনের তথ্যে।
যেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে উঠে এসেছে ১ শতাংশ সমর্থন স্বাক্ষর তালিকার ভুল ভ্রান্তিগুলো।
ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মনোনয়নপত্র দাখিল করা তাসনিম জারার ক্ষেত্রেও এমন অভিযোগ এনে মনোনয়ন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
অভিযোগের কেন্দ্রে বিএনপি
এদিকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ছিল বিএনপির; এমন অভিযোগ এনে কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ও জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি।
মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে বিএনপি’র প্রভাব খাটানোর বিষয়টি নিয়ে সরাসরি অভিযোগ করেছেন এনসিপির প্রার্থী ও দলটির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ।
তিনি বলছেন, “আমাদের কাছে মনে হচ্ছে, প্রশাসন বিএনপির দিকে ঝুঁকে গিয়েছে।”
এমনকি সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে নিজের শঙ্কার কথাও জানিয়েছেন এ তরুণ রাজনীতিবিদ। তিনি বলেন, “প্রশাসনের যে দ্বিচারিতামূলক আচরণ এমন অবস্থায় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কতটুকু হতে পারে সেটি নিয়ে আমরা শঙ্কা প্রকাশ করছি।”
কুমিল্লা-৪, অর্থাৎ দেবীদ্বার আসন থেকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এনসিপির হয়ে লড়বেন হাসনাত আবদুল্লাহ।
তার অভিযোগ ছিল, একই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত তথ্য গোপন ইস্যুতে।
এসব অভিযোগের পর্যাপ্ত যুক্তি এবং পর্যাপ্ত তথ্য তুলে ধরার পরও রিটার্নিং কর্মকর্তা এসব আমলে নেননি বলে দাবি করেন হাসনাত।
তবে এ ধরনের অভিযোগ সরাসরি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে বিএনপি।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম খান এ নিয়ে কথা বলেছেন।
রবিবার সন্ধ্যায় গুলশানে বিএনপির নির্বাচনি কার্যালয়ে দলের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রথম বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি বলেন, “আমরা এমন কোনও কাজ কোথাও করিনি। একটি পক্ষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ নিয়ে পরিকল্পিত মিথ্যাচার করছে। গণমাধ্যমের উচিত এ বিষয়ে প্রকৃত সত্য খুঁজে বের করা।”
এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা জানিয়ে নজরুল ইসলাম খান বলেন, “বিএনপি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, বরং দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্যই দ্রুত নির্বাচন দাবি করে আসছে।”
অভিযুক্ত নির্বাচন কমিশন
নির্বাচনে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায়, জামায়াতে ইসলামীর উদ্বেগ কিছু রিটার্নিং কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়ে।
দলটির অভিযোগ, তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন অজুহাতে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অনেক যোগ্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হচ্ছে, যা ‘কোন একটি মহলের ইন্ধনে’ সংঘটিত হচ্ছে বলে অভিযোগ জামায়েতের।
এক বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এসব অভিযোগ করেন।
মনোনয়নপত্র দাখিলের পর যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও রিটার্নিং অফিসারের ব্যক্তিগত বিবেচনায় ছাড় দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কঠোর নীতি প্রয়োগ করা হচ্ছে, আবার কোথাও আইনের দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ নয় এমন বিষয় দেখিয়ে প্রার্থিতা বাতিল করা হচ্ছে। প্রদত্ত কাগজপত্র ও তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও এভাবে প্রার্থিতা বাতিল মোটেও সমীচীন নয় বলে মন্তব্য করেন জামায়াত সেক্রেটারি।
জামায়াতের অন্যতম এই শীর্ষ নেতা প্রশ্ন তোলেন, “এ ধরনের বাড়াবাড়ি চলতে থাকলে নির্বাচন কীভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হবে- তা নিয়ে দেশবাসীর মধ্যে বড় প্রশ্ন তৈরি হবে।”
তুচ্ছ অজুহাতে যাদের প্রার্থিতা বাতিল করা হয়েছে, তাদের প্রার্থিতা অবিলম্বে বৈধ ঘোষণার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
তবে, নির্বাচন কমিশনে বিএনপির প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন না সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ও অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র জেলা জজ ড. মো. শাহজাহান।
আলাপকে তিনি বলেন, “আইনের বাইরে নির্বাচন কমিশনের যাওয়ার খুব একটা সুযোগ নেই। কারণ প্রার্থিতা বাতিলের কারণ জানাতে হয়। এরপর প্রার্থীদের আপিলের সুযোগ রয়েছে। সেখানেও বিষয়টির সমাধান না হলে হাইকোর্টে রিট করা যায়।”
নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদও জানিয়েছেন আপিলের সুযোগ আছে।
যাদের মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে তাদের, এমনকি যাদের মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও আপিল করার সুযোগ আছে।
এই আপিল করা যাবে ৯ই জানুয়ারি পর্যন্ত ।
কার কত বাতিল
১২ই ফ্রেবুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ছিলেন ২ হাজার ৫৬৮ জন। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বাছাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জনকে বৈধ প্রার্থী হিসেবে তালিকা ভুক্ত করেছে নির্বাচন কমিশন। সব মিলে বৈধ প্রার্থী ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ।
সেই হিসেবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৭২৩ জন প্রার্থীর।
মনোনয়নপত্র বাতিলের এই হার মোট প্রার্থীর ২৮ দশমিক ৩ শতাংশ।
নির্বাচন কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীর সংখ্যা ২৫ জন। অবশ্য বাতিল হওয়া এই প্রার্থীদের কাছে বিএনপির আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন ছিল না। যাদের মনোনয়ন আছে বিএনপির এরকম একজন প্রার্থীর মনোনয়নও বাতিল হয়নি সারাদেশে।
জামায়াতে ইসলামীর ১০ জন এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি’র প্রার্থিতা বাতিলের সংখ্যা মাত্র ৩ জন।
দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থিতা বাতিল হয়েছে জাতীয় পার্টির। শেষ পর্যন্ত জাপা’র মনোনয়ন পাননি ৫৯ জন প্রার্থী।
অন্যদিকে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ৩৯ জন এবং বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি- সিপিবি’র ক্ষেত্রে এই সংখ্যা ২৫ জন।
তবে বিশ্লেষণ বলছে, মনোনয়ন বাতিল তালিকার শীর্ষে রয়েছেন একক প্রার্থীরা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে ৩৩৮ জন প্রার্থীর।