একসময় জামায়াতের তীব্র সমালোচক ছিলেন, জুলাই আন্দোলনকারীদেরও বলেছিলেন ‘রাজাকার’। সেই আখতারুজ্জামানই এখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো একজন রাজনীতিবিদ। বিএনপি থেকে দুইবার সংসদ সদস্য, পাঁচবার বহিষ্কার; কখনো সংস্কারপন্থি, কখনো সমালোচক, আবার কখনো শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রাজনীতিতে বারবার অবস্থান বদলের এই পথচলার শেষ কোথায়?
দীপু সারোয়ার
প্রকাশ : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:১৭ পিএমআপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:২০ পিএম
রাজনীতিতে অবস্থান বদল নতুন কোনো ঘটনা না হলেও একই ব্যক্তি যদি বারবার এমনভাবে পালটায় যে, গতকালের বক্তব্যই আজকের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে, এটি কি কৌশল, নাকি ভোল বদলের রাজনীতি?
সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের রাজনৈতিক জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই এক নাটকীয় উদাহরণ।
বিতর্ক আর বৈপরীত্যে ভরা রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আখতারুজ্জামান পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘আনপ্রেডিক্টেবল ম্যান’ হিসাবে।
রাজনীতির মাঠে কখন কার পক্ষে যাবেন তিনি, কার বিপক্ষে বলবেন অথবা ক্ষুব্ধ হয়ে কার ‘জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলার’ হুমকি দেবেন, এই অনুমান করতে পারেন না কেউই।
পুরোনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্কহীন এই মানুষটি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন আরো বেশি। অথচ দলটিতে যোগ দেওয়ার কদিন আগেও ছিলেন ঘোর ‘জামায়াতবিরোধী’ হিসাবে পরিচিত।
জুলাই আন্দোলনের সময় তার বক্তব্যও ছিল তীব্রভাবে জামায়াতবিরোধী। তিনি আন্দোলনের সঙ্গে ‘রাজাকার’, ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন।
তখন এক আলোচনায় তিনি দাবি করে বসেন, “রাজাকারদের আন্দোলনই তো হচ্ছে এটা। রাজাকাররাই আন্দোলনটা করতেছে ভাই।”
“আন্দোলন কি মুক্তিযোদ্ধারা করতেছে? রাজাকারের ফ্যামিলিরা করতেছে। সমস্ত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত এটাতে ইনভলভ। এর বাইরে কেউ আছে?” ইউটিউব চ্যানেল ‘ফেস দ্যা পিপলের’ ওই শোতে বলেন তিনি।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই আন্দোলনের পক্ষের শক্তি হিসেবেই জামায়াতে যোগ দেন তিনি।
বিএনপিতে থাকতে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। দীর্ঘদিন বিএনপি করলেও সেখান থেকে বিতাড়িত হতেন বারবারই।
বেফাঁস মন্তব্য ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে আখতারুজ্জামানকে পাঁচবার বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
এই ব্যক্তিই সম্প্রতি জড়িয়ে পড়েছেন আরেক বিতর্কে। বিমানবন্দরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, গায়ে হাত তোলার অভিযোগ এবং গ্রেপ্তারের পর আদালতেও পুলিশের দেওয়া হেলমেট ছুড়ে ফেলার ঘটনায় সেই বিতর্ক পেয়েছে নতুন মাত্রা।
দল পরিবর্তন, আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং ব্যক্তিগত আচরণের কারণে আখতারুজ্জামান এখন পরিণত হয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের এক ‘ভাঁড়’ হিসাবে।
এ কারণেই তার রাজনৈতিক পথচলা প্রশ্ন তুলেছে- বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ, ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের সম্পর্ক নিয়ে।
বিমানবন্দরের ও আদালতে ঘটনায় বিতর্ক
বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে হুমকি দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আখতারুজ্জামান।
উত্তেজিত অবস্থায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদকে তিনি ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেন।
ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় সমালোচনা। এরপর মামলা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য, তাদের পরিবার ও দলটির নেতারা মিলে ৭১ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি কয়েকটি দেশ সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আখতারুজ্জামানও। ফেরার দিনই ওই ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই মামলা দায়ের করা হয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। ওই মামলায় শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয় আখতারুজ্জামনকে।
এরপর শনিবার প্রিজনভ্যানে করে তাকে নেওয়া হয় ঢাকার সিএমএম আদালতে। ভ্যান থেকে নামার সময় মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট পরানো হয় তাকে। কিন্তু সেই হেলমেট ছুঁড়ে ফেলেন আখতারুজ্জামান। হুমকি-ধামকি দেন পুলিশ সদস্যদের।
প্রিজনভ্যান থেকে নামার সময় তিনি বলেন, “আমি হেলমেট পড়বো না। আমাকে অন্যায়ভাবে-অবৈধভাবে হেলমেট পরানো হচ্ছে। আমি আওয়ামী লীগ না। হালের হেলমেট এখন আওয়ামী লীগের ফ্যাশন হয়েছে। আমাকে হাতকড়া পরান।”
বিএনপি থেকে বারবার বহিষ্কৃত ও বারবার অবস্থান বদল
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। দলীয় মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
তবে দলবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় পাঁচবার বহিষ্কারও হতে হয়েছিলো তাকে। দলীয়শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগে সবশেষ বহিষ্কার হন ২০২২ সালের ২০এ ফেব্রুয়ারি। এরপর দলে ফেরার চেষ্টা করেও সফল হননি।
শেষবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কারের পর ২০২৩ সালের ৮ই জুন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন আখতারুজ্জামান।
‘কিশোরগঞ্জ গ্রিন পাওয়ারের’ পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার হাতে একটি লিখিত আবেদন দিয়েছিলেন। ওই আবেদনে, ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিলো। এই সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের উদ্যোক্তা ছিলেন তার ছেলে সাব্বির জামান।
ওই সাক্ষাতের পর থেকে বিভিন্ন বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রশংসায় রীতিমতো পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন আখতারুজ্জামান।
টকশোতে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানেরও কড়া সমালোচনা শুরু করেন তিনি।
একসময় বলেই ফেলেন, “আমাদের নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশভুজা দেবীর মতো, সবকিছু উনি একা সামলাচ্ছেন।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আসলে তিনি কখন কার এটা কখনো নিশ্চিত হওয়া যায় না। আজ এখানে তো কাল ওখানে- এই হলো তার অবস্থান।
কখনো সংস্কারপন্থি, কখনোবা বিএনপিপন্থি আবার কখনো বিএনপিবিরোধী, কখনোবা মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা নিয়ে সরব, কখনোবা জামায়াতের পক্ষেই সাফাই গাইছেন।
এক-এগারোর সময় বিএনপির সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াসহ যে অংশটি সংস্কারবাদী হিসেবে পরিচিতি পান আখতারুজ্জামান ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
জামায়াতবিরোধী থেকে জামায়াতের পক্ষে
আখতারুজ্জামান ১৯৭১ সালে তিন নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম শফিউল্লাহর অধীনে যুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন বিতর্কিত এই রাজনীতিবীদ।
টক শোতে নিজেকে ভারতের দালাল দাবি করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘গোলাম আযমের বাচ্চা’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন এক সময়।
আবার সেই তিনিই বলেছেন, “১৬ই ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো, কিন্তু তারা গণহত্যা করে নাই।”
সবশেষ জামায়াতের বিরোধিতা করে দেওয়া সব বক্তব্য ধুয়েমুছে গত বছরের ১৩ই ডিসেম্বর ওই দলেই যোগ দিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনেরও তুমুল বিরোধী ছিলেন আখতারুজ্জামান। জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ও ‘রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এখন অবশ্য জুলাই আন্দোলনের পক্ষে সরব।
আখতারের পক্ষে মাঠে নেমেছে জামায়াত
গ্রেপ্তার হওয়ার পর আখতারুজ্জামানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, “কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।”
রবিবার সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, বিমানবন্দরে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ-ভোগান্তি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অনিয়ম ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আখতারুজ্জামান আওয়াজ তুলেছেন। কার্যত তিনি ভুক্তভোগী যাত্রী সাধারণ, বিশেষ করে বিদেশফেরত প্রবাসীদের প্রতিবাদের কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশে করে জামায়াত।
সেখানে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার, রিমান্ড বাতিল ও অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।
পরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।
জুলাই আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের বাচ্চা' বলেছিলেন আখতার
জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ও ‘রাজাকার’ বলা আখতারুজ্জামান এখন জামায়াতে ইসলামীর ‘রিফাইনারি মেশিনে’ ঢুকে দেশপ্রেম, অভ্যুত্থান আর ইসলামের বড় ‘ধ্বজাধারী’ বনে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আপনার আশপাশের সুবিধাবাদী ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বুড়া পলিটিশিয়ানদের লক্ষ্য করলেই প্রমাণ পেয়ে যাবেন।”
আবদুল কাদের আরো লেখেন, “অভ্যুত্থানের পরে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে দৃশ্যমানভাবে; এই পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানের আগের বিতর্কিত ভূমিকা থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি জামায়াত-শিবিরের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন, পেয়েছেনও বলা যায়।”
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান কোন দলে আছেন, প্রশ্ন কিন্তু এটা নয়। প্রশ্ন হলো, তার রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিটা আসলে কী?
সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে অবস্থান বদল করা কি তার রাজনৈতিক কৌশল, নাকি আদর্শ থেকেও বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশ?
বিএনপি থেকে বহিষ্কার, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা, জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা থেকে সেই আন্দোলনের পক্ষের শক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জামায়াতে যোগদান; দীর্ঘ এই পথের প্রতিটি বাঁকই সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
বিমানবন্দর ও আদালতের সাম্প্রতিক ঘটনাও যুক্ত হয়েছে বিতর্কের সেই তালিকায়।
‘আনপ্রেডিকটেবল’ আখতারুজ্জামান বৃত্তান্ত
একসময় জামায়াতের তীব্র সমালোচক ছিলেন, জুলাই আন্দোলনকারীদেরও বলেছিলেন ‘রাজাকার’। সেই আখতারুজ্জামানই এখন জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে দলটির নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়ানো একজন রাজনীতিবিদ। বিএনপি থেকে দুইবার সংসদ সদস্য, পাঁচবার বহিষ্কার; কখনো সংস্কারপন্থি, কখনো সমালোচক, আবার কখনো শেখ হাসিনার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। রাজনীতিতে বারবার অবস্থান বদলের এই পথচলার শেষ কোথায়?
রাজনীতিতে অবস্থান বদল নতুন কোনো ঘটনা না হলেও একই ব্যক্তি যদি বারবার এমনভাবে পালটায় যে, গতকালের বক্তব্যই আজকের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়, তখন প্রশ্ন ওঠে, এটি কি কৌশল, নাকি ভোল বদলের রাজনীতি?
সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জনের রাজনৈতিক জীবন যেন সেই প্রশ্নেরই এক নাটকীয় উদাহরণ।
বিতর্ক আর বৈপরীত্যে ভরা রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী আখতারুজ্জামান পরিচিত হয়ে উঠেছেন ‘আনপ্রেডিক্টেবল ম্যান’ হিসাবে।
রাজনীতির মাঠে কখন কার পক্ষে যাবেন তিনি, কার বিপক্ষে বলবেন অথবা ক্ষুব্ধ হয়ে কার ‘জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলার’ হুমকি দেবেন, এই অনুমান করতে পারেন না কেউই।
পুরোনো বন্ধুদের সাথে সম্পর্কহীন এই মানুষটি গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়ে বিতর্কিত হয়েছেন আরো বেশি। অথচ দলটিতে যোগ দেওয়ার কদিন আগেও ছিলেন ঘোর ‘জামায়াতবিরোধী’ হিসাবে পরিচিত।
জুলাই আন্দোলনের সময় তার বক্তব্যও ছিল তীব্রভাবে জামায়াতবিরোধী। তিনি আন্দোলনের সঙ্গে ‘রাজাকার’, ‘যুদ্ধাপরাধী’ ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন।
তখন এক আলোচনায় তিনি দাবি করে বসেন, “রাজাকারদের আন্দোলনই তো হচ্ছে এটা। রাজাকাররাই আন্দোলনটা করতেছে ভাই।”
“আন্দোলন কি মুক্তিযোদ্ধারা করতেছে? রাজাকারের ফ্যামিলিরা করতেছে। সমস্ত রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী, জামায়াত এটাতে ইনভলভ। এর বাইরে কেউ আছে?” ইউটিউব চ্যানেল ‘ফেস দ্যা পিপলের’ ওই শোতে বলেন তিনি।
কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সেই আন্দোলনের পক্ষের শক্তি হিসেবেই জামায়াতে যোগ দেন তিনি।
বিএনপিতে থাকতে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। দীর্ঘদিন বিএনপি করলেও সেখান থেকে বিতাড়িত হতেন বারবারই।
বেফাঁস মন্তব্য ও দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে আখতারুজ্জামানকে পাঁচবার বহিষ্কার করেছে বিএনপি।
এই ব্যক্তিই সম্প্রতি জড়িয়ে পড়েছেন আরেক বিতর্কে। বিমানবন্দরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, গায়ে হাত তোলার অভিযোগ এবং গ্রেপ্তারের পর আদালতেও পুলিশের দেওয়া হেলমেট ছুড়ে ফেলার ঘটনায় সেই বিতর্ক পেয়েছে নতুন মাত্রা।
দল পরিবর্তন, আদর্শ থেকে বিচ্যুতি এবং ব্যক্তিগত আচরণের কারণে আখতারুজ্জামান এখন পরিণত হয়েছেন রাজনৈতিক অঙ্গনের এক ‘ভাঁড়’ হিসাবে।
এ কারণেই তার রাজনৈতিক পথচলা প্রশ্ন তুলেছে- বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ, ব্যক্তিস্বার্থ, দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক সুবিধাবাদের সম্পর্ক নিয়ে।
বিমানবন্দরের ও আদালতে ঘটনায় বিতর্ক
বৃহস্পতিবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদকে হুমকি দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন আখতারুজ্জামান।
উত্তেজিত অবস্থায় গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদকে তিনি ‘আমি কিন্তু পিটাবো ধইরা’, ‘ঘাড় ধরে বের করে দিবো’ বলে প্রকাশ্যে হুমকি দেন।
ওই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শুরু হয় সমালোচনা। এরপর মামলা হয়। গ্রেপ্তার করা হয় তাকে।
জামায়াতের সংসদ সদস্য, তাদের পরিবার ও দলটির নেতারা মিলে ৭১ সদস্যের প্রতিনিধিদল সম্প্রতি কয়েকটি দেশ সফরে গিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আখতারুজ্জামানও। ফেরার দিনই ওই ঘটনা ঘটে।
ঘটনার পরপরই মামলা দায়ের করা হয় বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে। ওই মামলায় শুক্রবার গ্রেপ্তার করা হয় আখতারুজ্জামনকে।
এরপর শনিবার প্রিজনভ্যানে করে তাকে নেওয়া হয় ঢাকার সিএমএম আদালতে। ভ্যান থেকে নামার সময় মাথায় নিরাপত্তা হেলমেট পরানো হয় তাকে। কিন্তু সেই হেলমেট ছুঁড়ে ফেলেন আখতারুজ্জামান। হুমকি-ধামকি দেন পুলিশ সদস্যদের।
প্রিজনভ্যান থেকে নামার সময় তিনি বলেন, “আমি হেলমেট পড়বো না। আমাকে অন্যায়ভাবে-অবৈধভাবে হেলমেট পরানো হচ্ছে। আমি আওয়ামী লীগ না। হালের হেলমেট এখন আওয়ামী লীগের ফ্যাশন হয়েছে। আমাকে হাতকড়া পরান।”
বিএনপি থেকে বারবার বহিষ্কৃত ও বারবার অবস্থান বদল
বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালেই দলটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছিলেন আখতারুজ্জামান। দলীয় মনোনয়নে কিশোরগঞ্জ-২ আসন থেকে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে টানা দুবার সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
তবে দলবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় পাঁচবার বহিষ্কারও হতে হয়েছিলো তাকে। দলীয়শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগে সবশেষ বহিষ্কার হন ২০২২ সালের ২০এ ফেব্রুয়ারি। এরপর দলে ফেরার চেষ্টা করেও সফল হননি।
শেষবারের মতো বিএনপি থেকে বহিষ্কারের পর ২০২৩ সালের ৮ই জুন গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে এসেছিলেন আখতারুজ্জামান।
‘কিশোরগঞ্জ গ্রিন পাওয়ারের’ পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার হাতে একটি লিখিত আবেদন দিয়েছিলেন। ওই আবেদনে, ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট করার অনুমতি চাওয়া হয়েছিলো। এই সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের উদ্যোক্তা ছিলেন তার ছেলে সাব্বির জামান।
ওই সাক্ষাতের পর থেকে বিভিন্ন বক্তব্যে শেখ হাসিনার প্রশংসায় রীতিমতো পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন আখতারুজ্জামান।
টকশোতে বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী) তারেক রহমানেরও কড়া সমালোচনা শুরু করেন তিনি।
একসময় বলেই ফেলেন, “আমাদের নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দশভুজা দেবীর মতো, সবকিছু উনি একা সামলাচ্ছেন।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, আসলে তিনি কখন কার এটা কখনো নিশ্চিত হওয়া যায় না। আজ এখানে তো কাল ওখানে- এই হলো তার অবস্থান।
কখনো সংস্কারপন্থি, কখনোবা বিএনপিপন্থি আবার কখনো বিএনপিবিরোধী, কখনোবা মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের পাকিস্তানপন্থী ভূমিকা নিয়ে সরব, কখনোবা জামায়াতের পক্ষেই সাফাই গাইছেন।
এক-এগারোর সময় বিএনপির সাবেক মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়াসহ যে অংশটি সংস্কারবাদী হিসেবে পরিচিতি পান আখতারুজ্জামান ছিলেন তাদের মধ্যে অন্যতম।
জামায়াতবিরোধী থেকে জামায়াতের পক্ষে
আখতারুজ্জামান ১৯৭১ সালে তিন নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম শফিউল্লাহর অধীনে যুদ্ধ করেন। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে একেক সময় একেক রকম বক্তব্য দিয়েছেন বিতর্কিত এই রাজনীতিবীদ।
টক শোতে নিজেকে ভারতের দালাল দাবি করে জামায়াতের নেতাকর্মীদের ‘রাজাকারের বাচ্চা’, ‘গোলাম আযমের বাচ্চা’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন এক সময়।
আবার সেই তিনিই বলেছেন, “১৬ই ডিসেম্বরের আগ পর্যন্ত জামায়াত পাকিস্তানের পক্ষে ছিলো, কিন্তু তারা গণহত্যা করে নাই।”
সবশেষ জামায়াতের বিরোধিতা করে দেওয়া সব বক্তব্য ধুয়েমুছে গত বছরের ১৩ই ডিসেম্বর ওই দলেই যোগ দিয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনেরও তুমুল বিরোধী ছিলেন আখতারুজ্জামান। জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ও ‘রাজাকার’ বলে মন্তব্য করেছিলেন তিনি। এখন অবশ্য জুলাই আন্দোলনের পক্ষে সরব।
আখতারের পক্ষে মাঠে নেমেছে জামায়াত
গ্রেপ্তার হওয়ার পর আখতারুজ্জামানের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, “কোনো মানুষই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়।”
রবিবার সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে শফিকুর রহমান লেখেন, বিমানবন্দরে যাত্রী সাধারণের দুর্ভোগ-ভোগান্তি, কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, অনিয়ম ও অন্যায় কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আখতারুজ্জামান আওয়াজ তুলেছেন। কার্যত তিনি ভুক্তভোগী যাত্রী সাধারণ, বিশেষ করে বিদেশফেরত প্রবাসীদের প্রতিবাদের কণ্ঠে পরিণত হয়েছেন।
এর আগে শনিবার আখতারুজ্জামানকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশে করে জামায়াত।
সেখানে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার আখতারুজ্জামানের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার, রিমান্ড বাতিল ও অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানান।
পরে জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও মহানগর নেতাদের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়।
জুলাই আন্দোলনকারীদের 'রাজাকারের বাচ্চা' বলেছিলেন আখতার
জুলাই আন্দোলনকারীদের ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ ও ‘রাজাকার’ বলা আখতারুজ্জামান এখন জামায়াতে ইসলামীর ‘রিফাইনারি মেশিনে’ ঢুকে দেশপ্রেম, অভ্যুত্থান আর ইসলামের বড় ‘ধ্বজাধারী’ বনে গেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আবদুল কাদের।
শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এসব মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, “আপনার আশপাশের সুবিধাবাদী ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, বুড়া পলিটিশিয়ানদের লক্ষ্য করলেই প্রমাণ পেয়ে যাবেন।”
আবদুল কাদের আরো লেখেন, “অভ্যুত্থানের পরে দক্ষিণপন্থার উত্থান ঘটেছে দৃশ্যমানভাবে; এই পরিস্থিতিতে অভ্যুত্থানের আগের বিতর্কিত ভূমিকা থাকা অধিকাংশ ব্যক্তি জামায়াত-শিবিরের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন, পেয়েছেনও বলা যায়।”
মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান কোন দলে আছেন, প্রশ্ন কিন্তু এটা নয়। প্রশ্ন হলো, তার রাজনৈতিক অবস্থানের ভিত্তিটা আসলে কী?
সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে অবস্থান বদল করা কি তার রাজনৈতিক কৌশল, নাকি আদর্শ থেকেও বড় হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত হিসাবনিকাশ?
বিএনপি থেকে বহিষ্কার, আওয়ামী লীগ সরকারের প্রশংসা, জুলাই আন্দোলনের বিরোধিতা থেকে সেই আন্দোলনের পক্ষের শক্তির সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জামায়াতে যোগদান; দীর্ঘ এই পথের প্রতিটি বাঁকই সেই প্রশ্নকে আরও জোরালো করেছে।
বিমানবন্দর ও আদালতের সাম্প্রতিক ঘটনাও যুক্ত হয়েছে বিতর্কের সেই তালিকায়।