কীভাবে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এলেন মির্জা ফখরুল? কোন অভিজ্ঞতাগুলো তাকে অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে আলাদা করেছে? আর রাষ্ট্রপতি হলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় কতটা সফল হবেন তিনি?
আলাপ রিপোর্ট
প্রকাশ : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:১৮ পিএমআপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম
“আমার সহধর্মিণী আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে সবসময় শুকরিয়া আদায় করি যে, আমি খুব ভাগ্যবান, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিলো,” একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার এই সাক্ষাৎকারের কিছুদিন পরই বিএনপি তাকে দলীয় রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করলো। বাংলাদেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলপর বঙ্গভবনে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তার ঘনিষ্ঠজনরা মনে করেন, বিএনপির এই নেতা যেন রাজনীতিবিদ থেকেও বেশি কিছু।
সংসদ অধিবেশন, বন্ধুদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান কিংবা ছাত্রদলের কর্মসূচি- তার কণ্ঠে শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আল মাহমুদের কবিতার আবৃত্তি।
আবার দলের নেতাকর্মীদের ওপর চলা নির্যাতন ও দুর্দশার বিবরণ দিতে গিয়ে তাকে দেখা গেছে কেঁদে ফেলতে।
তিনি ছিলেন এক সময়কার ছাত্রনেতা, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী।
এরপর দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব এবং মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
এক রাজনৈতিক জীবনে এতগুলো পরিচয় খুব বেশি মানুষের ভাগ্যে জোটে না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাগ্যে জুটেছে। আর সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এসে দাঁড়িয়েছে এক নতুন মোড়ে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হতে যাচ্ছেন তিনি।
যদিও বিরোধী দলের একজন প্রার্থী থাকায় এই পদে এবার ভোটাভুটি হবে। তবে সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কার্যত তার পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে।
এই মানুষটিই বছরের পর বছর বিএনপির দুঃসময়ে ছিলেন দলের ঢাল হয়ে। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতির সময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কারাগারে গেছেন অসংখ্যবার।
বঙ্গভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দা হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে পেছনে, যিনি ষাটের দশকে জড়িয়েছিলেন ছাত্ররাজনীতিতে। তারপর রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষকতা ও সরকারি কর্মকর্তা এবং আবার রাজনীতিতে ফেরা।
ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার পর কীভাবে ধীরে ধীরে মির্জা ফখরুল হয়ে উঠলেন মাঠের তুখোড় রাজনীতিবিদ এবং উঠে এলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে?
আর কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ের প্রধান কাণ্ডারি?
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে যাত্রা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬এ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তখনকার পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথমে এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, “জনাব আলমগীর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, মির্জা আলমগীর সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়।”
ওই সময়টি ছিলো পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে তরুণ ফখরুল রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন।
তবে স্বাধীনতার পর সরাসরি দলীয় রাজনীতি থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে যান তিনি।
রাজনীতির বদলে শিক্ষকতা
১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন সরকারি প্রশাসনেও।
বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে কাজ করেছেন এবং যুক্ত ছিলেন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তখনকার উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৮২ সালে এস এ বারির পদত্যাগের পর আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান মির্জা ফখরুল। যোগ দেন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে।
মির্জা ফখরুলকে বোঝার জন্য শিক্ষকতার পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার রাজনৈতিক ভাষা ও বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায় অর্থনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণের প্রসঙ্গ।
ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় কাছ থেকে রাষ্ট্রপরিচালনা দেখা এবং রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা- এই চার কাঠামোই তাকে ভিন্ন ধাতের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য
ফখরুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দুই দফায় মন্ত্রী ছিলেন।
ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ; তিনিও মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন।
আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে যুব শিবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
তার মানে মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে আসা একেবারে শূন্য থেকে নয়। পরিবারে রাজনীতির পরিবেশ ছিল, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে জানার সুযোগও ছিলো।
তবে বাবার রাজনৈতিক পথ আর ছেলের রাজনৈতিক পথ এক ছিলো না। এই পার্থক্যই ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়কে কখনো কখনো ‘জটিল’ করেছে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিএনপি
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। ১৯৮৮ সালের পৌর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
অদ্ভুত বৈচিত্র্য ছিলো বাবা-সন্তানে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন পৌর চেয়ারম্যান, তখন তার বাবা পূর্ণমন্ত্রী।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
এই ঘটনাকে তার জীবনের দ্বিতীয় রাজনৈতিক জন্মও বলা যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ের ফখরুল ছিলেন ষাটের দশকের ছাত্রনেতা। দ্বিতীয় পর্যায়ের ফখরুল ছিলেন মাঠের রাজনীতিতে ফিরে আসা একজন শিক্ষক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে হারিয়ে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। এরপর খালেদা জিয়ার সরকারে প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
মন্ত্রী হিসেবে তার সময় দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ভেতরের অভিজ্ঞতা সেখান থেকে আরও গভীর হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান
২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপিও বিরোধীদলে।
কিন্তু তখন থেকেই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মির্জা ফখরুল।
২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। ২০১১ সালে মারা যান দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে দেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব।
পাঁচ বছর সেই দায়িত্ব সামলে ২০১৬ সালের ৩০এ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আর এই ঘটনাই সম্ভবত ছিলো তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কারণ তিনি এমন এক সময়ে দলের মহাসচিব হন, যখন বিএনপি ক্ষমতার বাইরে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্রমশ আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে, তারেক রহমান দেশের বাইরে নির্বাসনে এবং দলটির শীর্ষ ও তৃণমূল নেতৃত্বের বড় অংশ তখন মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মুখোমুখি।
মির্জা ফখরুলকে তখন একইসঙ্গে কয়েকটি কাজ করতে হয়েছে। দলকে সংগঠিত রাখা, সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা, খালেদা জিয়ার পক্ষে রাজনৈতিক লড়াই চালানো এবং দল ও জোটের ভেতরের বিভিন্ন মত ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা।
বিএনপির দুঃসময়ের মুখ ও সমালোচনা
২০০৭ আলোচিত ওয়ান ইলেভেনের ছিলো বিএনপির অন্যতম দুঃসময়। এরপর টানা ১৯ বছর রাজনৈতিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয় দলটির নেতাকর্মীরা।
বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির বন্ধুর পথে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক স্বাক্ষর রেখেছেন মির্জা ফখরুল। দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি চাপের মধ্যে পড়ে যায় বিএনপির নেতৃত্ব। খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে করে কারাগারে রাখা হয়। প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় তাকে দেওয়া হয় দণ্ড। দলটির দ্বিতীয় প্রধান নেতৃত্ব তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত।
মাঠপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পরিস্থিতিতে ফখরুল ছিলেন দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ। ২০২৩ সালের ২৮এ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নয়টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর খবর প্রকাশিত হয়।
সেই সময়টি ছিলো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। তবে তার নেতৃত্বের শক্তি ছিলো, ছিলেন বিশ্বস্তও।
দীর্ঘদিন ধরে একই রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখে দলের পক্ষে নিয়মিত প্রকাশ্যে কথা বলে গেছেন।
কিন্তু এখানেই তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
মির্জা ফখরুল বিএনপির অন্য অনেক নেতার তুলনায় অপেক্ষাকৃত সংযত ভাষায় কথা বলার জন্য পরিচিত। তার বক্তব্যে বারবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার দরজা খোলা রাখার দৃষ্টিভঙ্গি।
শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও তাকে অনেকটা আলাদা করেছে। শুধু দলীয় স্লোগানের রাজনীতিবিদ হিসেবে আবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশ্নে নীতিগত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে তার মধ্যে।
আর রাষ্ট্রপতি পদে ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও তিনি থাকেন সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি প্রতীকী ও সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
আর এ কারণেই দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সক্ষমতা এখানে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার, আদর্শ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, তার বাবার রাজনৈতিক আদর্শ, ভিন্ন আদর্শে নিজের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু এবং আরও পরে এসে আরেক ভিন্ন আদর্শের পরিচয়ের মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠিত করা।
তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রথমে মুসলিম লীগের নেতা। পরে তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর আবার যুক্ত হন জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে।
আর মির্জা ফখরুল ষাটের দশকে বামপন্থি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে। পরে সেসব ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে অন্যতম শীর্ষ নেতা।
বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় অনেক ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান। একইভাবে বদলায় দল ও রাষ্ট্রের বাস্তবতাও। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদর্শ ও বাস্তবতার সঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে অনেক দলের আদর্শ ও রাষ্ট্র কাঠামো। এমনকি সংবিধানও বদলেছে বেশ কয়েকবার।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনও সেই পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই গেছে।
তবে রাজনীতির বাইরে তার জীবন অপেক্ষাকৃত সাধারণ মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকের মতো।
স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন এবং বীমা কর্মকর্তা হিসেবে পেশাগত জীবন বেছে নিয়েছেন।
তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং পরে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে যুক্ত হন গবেষণার সঙ্গে।
ছোট মেয়ে সাফারুহ ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে থেকেও তিনি মূলত বক্তা, সংগঠক এবং আলোচনাকারী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।
জনসভায় উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে। যদিও দলীয় রাজনীতির তীব্র সংঘাতের ভেতর তাকে বহুবারই কঠোর অবস্থান নিতেও দেখা গেছে।
যে ব্যক্তি প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপির প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ, তাকে যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসলে কী?
এর উত্তর হলো, দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।
শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংযম এখানে সম্পদ হতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের দলীয় পরিচয় তার জন্য হতে পারে চ্যালেঞ্জও।
কারণ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আইনের দৃষ্টি ছাড়িয়েও উত্তীর্ণ হতে হবে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে।
মির্জা ফখরুলের বাল্যবন্ধু মনতোষ কুমার দে আলাপ-কে বলেন, “মানুষ যখন মনুষ্যত্বের গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয়, তখন প্রকৃত মানুষ হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই রকমই একজন মানুষ।”
“আমরা চাই এই ধরনের মানুষ বিরল না হয়ে, এই ধরনের মানুষ যেন সবাই হয়ে উঠতে পারে। তাহলেই এই দেশটা সুন্দর হবে এবং আমরা সত্যিকার অর্থে একটা সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী হবো।”
এমনকি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের মানুষদের কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিত্ব বলে মেনে করেন মনতোষ কুমার দে।
“সে খালি নিজের লোকজনের কাছে না, প্রতিপক্ষের মানুষদের কাছেও তার এই গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। কোনোরকম প্রতিপক্ষ আচরণ এবং মুখ ফিরিয়ে রাখা, এইরকম মনোভাব তার মধ্যে কখনোই আমরা দেখিনি,” যোগ করেন তিনি।
যতো রকমের বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতা নিয়ে বঙ্গভবনে যাচ্ছেন মির্জা ফখরুল
কীভাবে বামপন্থী ছাত্ররাজনীতি থেকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে এলেন মির্জা ফখরুল? কোন অভিজ্ঞতাগুলো তাকে অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে আলাদা করেছে? আর রাষ্ট্রপতি হলে দলীয় পরিচয়ের বাইরে নিরপেক্ষতার পরীক্ষায় কতটা সফল হবেন তিনি?
“আমার সহধর্মিণী আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি। আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে সবসময় শুকরিয়া আদায় করি যে, আমি খুব ভাগ্যবান, তার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিলো,” একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বিএনপির মহাসচিব এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তার এই সাক্ষাৎকারের কিছুদিন পরই বিএনপি তাকে দলীয় রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসাবে মনোনীত করলো। বাংলাদেশের তেইশতম রাষ্ট্রপতি হিসেবে মির্জা ফখরুলপর বঙ্গভবনে যাওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
তার ঘনিষ্ঠজনরা মনে করেন, বিএনপির এই নেতা যেন রাজনীতিবিদ থেকেও বেশি কিছু।
সংসদ অধিবেশন, বন্ধুদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান কিংবা ছাত্রদলের কর্মসূচি- তার কণ্ঠে শোনা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আল মাহমুদের কবিতার আবৃত্তি।
আবার দলের নেতাকর্মীদের ওপর চলা নির্যাতন ও দুর্দশার বিবরণ দিতে গিয়ে তাকে দেখা গেছে কেঁদে ফেলতে।
তিনি ছিলেন এক সময়কার ছাত্রনেতা, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা, ঠাকুরগাঁওয়ের স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী, পৌর চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী।
এরপর দীর্ঘ দেড় দশক ধরে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির মহাসচিব এবং মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
এক রাজনৈতিক জীবনে এতগুলো পরিচয় খুব বেশি মানুষের ভাগ্যে জোটে না।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভাগ্যে জুটেছে। আর সেই দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা এসে দাঁড়িয়েছে এক নতুন মোড়ে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হতে যাচ্ছেন তিনি।
যদিও বিরোধী দলের একজন প্রার্থী থাকায় এই পদে এবার ভোটাভুটি হবে। তবে সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় কার্যত তার পরাজিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই বললেই চলে।
এই মানুষটিই বছরের পর বছর বিএনপির দুঃসময়ে ছিলেন দলের ঢাল হয়ে। খালেদা জিয়ার কারাবাস ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতির সময়ে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, কারাগারে গেছেন অসংখ্যবার।
বঙ্গভবনের সম্ভাব্য বাসিন্দা হিসেবে মির্জা ফখরুলকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে পেছনে, যিনি ষাটের দশকে জড়িয়েছিলেন ছাত্ররাজনীতিতে। তারপর রাজনীতি ছেড়ে শিক্ষকতা ও সরকারি কর্মকর্তা এবং আবার রাজনীতিতে ফেরা।
ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠার পর কীভাবে ধীরে ধীরে মির্জা ফখরুল হয়ে উঠলেন মাঠের তুখোড় রাজনীতিবিদ এবং উঠে এলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে?
আর কীভাবে হয়ে উঠেছিলেন দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ের প্রধান কাণ্ডারি?
ষাটের দশকের ছাত্ররাজনীতি থেকে যাত্রা
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬এ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হন।
তখনকার পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে প্রথমে এসএম হল ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হন।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে লেখা হয়েছে, “জনাব আলমগীর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের বিভিন্ন স্তরের মধ্য দিয়ে উঠে আসেন এবং ১৯৬৯ সালে রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের তুঙ্গে ওঠার সময়, মির্জা আলমগীর সংগঠনের মর্যাদাপূর্ণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের সভাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাগারে পাঠানো হয়।”
ওই সময়টি ছিলো পাকিস্তানি শাসনের বিরুদ্ধে বাঙালির রাজনৈতিক জাগরণের গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পরবর্তী স্বাধীনতা সংগ্রামের আবহে তরুণ ফখরুল রাজনীতির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকেন।
তবে স্বাধীনতার পর সরাসরি দলীয় রাজনীতি থেকে কিছু সময়ের জন্য সরে যান তিনি।
রাজনীতির বদলে শিক্ষকতা
১৯৭২ সালে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন মির্জা ফখরুল। পরে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন সরকারি প্রশাসনেও।
বাংলাদেশ সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরে কাজ করেছেন এবং যুক্ত ছিলেন ইউনেস্কো জাতীয় কমিশনের সঙ্গেও।
সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রশাসনে তখনকার উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারির ব্যক্তিগত সচিব হিসেবেও কাজ করেন।
১৯৮২ সালে এস এ বারির পদত্যাগের পর আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান মির্জা ফখরুল। যোগ দেন ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে।
মির্জা ফখরুলকে বোঝার জন্য শিক্ষকতার পর্বটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তার রাজনৈতিক ভাষা ও বক্তব্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায় অর্থনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং নীতিনির্ধারণের প্রসঙ্গ।
ছাত্র রাজনীতি, শিক্ষকতা, সরকারি প্রশাসনের অভিজ্ঞতায় কাছ থেকে রাষ্ট্রপরিচালনা দেখা এবং রাজপথের আন্দোলন সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা- এই চার কাঠামোই তাকে ভিন্ন ধাতের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য
ফখরুলের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। তিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দুই দফায় মন্ত্রী ছিলেন।
ফখরুলের চাচা মির্জা গোলাম হাফিজও ছিলেন প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ; তিনিও মন্ত্রী হওয়ার পাশাপাশি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন।
আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস আর মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে যুব শিবির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন।
তার মানে মির্জা ফখরুলের রাজনীতিতে আসা একেবারে শূন্য থেকে নয়। পরিবারে রাজনীতির পরিবেশ ছিল, রাষ্ট্র ও ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে জানার সুযোগও ছিলো।
তবে বাবার রাজনৈতিক পথ আর ছেলের রাজনৈতিক পথ এক ছিলো না। এই পার্থক্যই ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়কে কখনো কখনো ‘জটিল’ করেছে।
স্থানীয় রাজনীতি থেকে বিএনপি
১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচনের প্রস্তুতি নেন। ১৯৮৮ সালের পৌর নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
অদ্ভুত বৈচিত্র্য ছিলো বাবা-সন্তানে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যখন পৌর চেয়ারম্যান, তখন তার বাবা পূর্ণমন্ত্রী।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বিএনপিতে যোগ দেন মির্জা ফখরুল। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি হন।
এই ঘটনাকে তার জীবনের দ্বিতীয় রাজনৈতিক জন্মও বলা যেতে পারে।
প্রথম পর্যায়ের ফখরুল ছিলেন ষাটের দশকের ছাত্রনেতা। দ্বিতীয় পর্যায়ের ফখরুল ছিলেন মাঠের রাজনীতিতে ফিরে আসা একজন শিক্ষক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন।
২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রমেশ চন্দ্র সেনকে হারিয়ে নির্বাচিত হন সংসদ সদস্য। এরপর খালেদা জিয়ার সরকারে প্রথমে কৃষি এবং পরে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
মন্ত্রী হিসেবে তার সময় দীর্ঘ ছিল না। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ভেতরের অভিজ্ঞতা সেখান থেকে আরও গভীর হয়।
বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে উত্থান
২০০৮ সালের নির্বাচনে হেরে যান মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিএনপিও বিরোধীদলে।
কিন্তু তখন থেকেই কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পান ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি মির্জা ফখরুল।
২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন তিনি। ২০১১ সালে মারা যান দলের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেন। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাকে দেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব।
পাঁচ বছর সেই দায়িত্ব সামলে ২০১৬ সালের ৩০এ মার্চ বিএনপির মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
আর এই ঘটনাই সম্ভবত ছিলো তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কারণ তিনি এমন এক সময়ে দলের মহাসচিব হন, যখন বিএনপি ক্ষমতার বাইরে, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ক্রমশ আইনি ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে, তারেক রহমান দেশের বাইরে নির্বাসনে এবং দলটির শীর্ষ ও তৃণমূল নেতৃত্বের বড় অংশ তখন মামলা, গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মুখোমুখি।
মির্জা ফখরুলকে তখন একইসঙ্গে কয়েকটি কাজ করতে হয়েছে। দলকে সংগঠিত রাখা, সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা, খালেদা জিয়ার পক্ষে রাজনৈতিক লড়াই চালানো এবং দল ও জোটের ভেতরের বিভিন্ন মত ও শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ রাখা।
বিএনপির দুঃসময়ের মুখ ও সমালোচনা
২০০৭ আলোচিত ওয়ান ইলেভেনের ছিলো বিএনপির অন্যতম দুঃসময়। এরপর টানা ১৯ বছর রাজনৈতিক নির্যাতনের মুখোমুখি হয় দলটির নেতাকর্মীরা।
বিএনপির দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির বন্ধুর পথে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক স্বাক্ষর রেখেছেন মির্জা ফখরুল। দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ের অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।
২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি চাপের মধ্যে পড়ে যায় বিএনপির নেতৃত্ব। খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তারে করে কারাগারে রাখা হয়। প্রশ্নবিদ্ধ মামলায় তাকে দেওয়া হয় দণ্ড। দলটির দ্বিতীয় প্রধান নেতৃত্ব তারেক রহমান তখন লন্ডনে নির্বাসিত।
মাঠপর্যায়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলার পরিস্থিতিতে ফখরুল ছিলেন দলের প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ। ২০২৩ সালের ২৮এ অক্টোবরের সংঘর্ষের পর তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।
পরে ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা হয়। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নয়টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানোর খবর প্রকাশিত হয়।
সেই সময়টি ছিলো তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। তবে তার নেতৃত্বের শক্তি ছিলো, ছিলেন বিশ্বস্তও।
দীর্ঘদিন ধরে একই রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রেখে দলের পক্ষে নিয়মিত প্রকাশ্যে কথা বলে গেছেন।
কিন্তু এখানেই তার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অনেকে।
মির্জা ফখরুল বিএনপির অন্য অনেক নেতার তুলনায় অপেক্ষাকৃত সংযত ভাষায় কথা বলার জন্য পরিচিত। তার বক্তব্যে বারবার দেখা গেছে, রাজনৈতিক সংঘাতের মধ্যেও আলোচনার দরজা খোলা রাখার দৃষ্টিভঙ্গি।
শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও তাকে অনেকটা আলাদা করেছে। শুধু দলীয় স্লোগানের রাজনীতিবিদ হিসেবে আবদ্ধ না রেখে অর্থনীতি, প্রশাসন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রশ্নে নীতিগত ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রবণতা রয়েছে তার মধ্যে।
আর রাষ্ট্রপতি পদে ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তি হিসেবে তার নাম আলোচনায় আসার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্যগুলোই হয়তো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতি সরাসরি সরকার পরিচালনা না করলেও তিনি থাকেন সংবিধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ভারসাম্যের একটি প্রতীকী ও সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে।
আর এ কারণেই দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে গ্রহণযোগ্যতা তৈরির সক্ষমতা এখানে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ।
পরিবার, আদর্শ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের দ্বন্দ্ব
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক পরিচয়ের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, তার বাবার রাজনৈতিক আদর্শ, ভিন্ন আদর্শে নিজের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু এবং আরও পরে এসে আরেক ভিন্ন আদর্শের পরিচয়ের মধ্যে নিজের প্রতিষ্ঠিত করা।
তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন প্রথমে মুসলিম লীগের নেতা। পরে তিনি যোগ দেন বিএনপিতে। এরপর আবার যুক্ত হন জাতীয় পার্টির রাজনীতিতে।
আর মির্জা ফখরুল ষাটের দশকে বামপন্থি ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরে শিক্ষকতা ও প্রশাসনিক দায়িত্বে। পরে সেসব ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিয়ে অন্যতম শীর্ষ নেতা।
বাংলাদেশে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় অনেক ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান। একইভাবে বদলায় দল ও রাষ্ট্রের বাস্তবতাও। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন আদর্শ ও বাস্তবতার সঙ্গে রূপান্তরিত হয়েছে অনেক দলের আদর্শ ও রাষ্ট্র কাঠামো। এমনকি সংবিধানও বদলেছে বেশ কয়েকবার।
মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবনও সেই পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই গেছে।
তবে রাজনীতির বাইরে তার জীবন অপেক্ষাকৃত সাধারণ মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিকের মতো।
স্ত্রী রাহাত আরা বেগম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন এবং বীমা কর্মকর্তা হিসেবে পেশাগত জীবন বেছে নিয়েছেন।
তাদের দুই মেয়ে মির্জা শামারুহ ও মির্জা সাফারুহ। বড় মেয়ে শামারুহ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন এবং পরে অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে যুক্ত হন গবেষণার সঙ্গে।
ছোট মেয়ে সাফারুহ ঢাকার একটি নামকরা স্কুলে শিক্ষকতা করেন।
দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতিতে থেকেও তিনি মূলত বক্তা, সংগঠক এবং আলোচনাকারী হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করেছেন।
জনসভায় উত্তেজক বক্তৃতা দেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতে দেখা যায় তাকে। যদিও দলীয় রাজনীতির তীব্র সংঘাতের ভেতর তাকে বহুবারই কঠোর অবস্থান নিতেও দেখা গেছে।
যে ব্যক্তি প্রায় দেড় দশক ধরে বিএনপির প্রকাশ্য রাজনৈতিক মুখ, তাকে যখন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে হচ্ছে, তখন তার সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আসলে কী?
এর উত্তর হলো, দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে সাংবিধানিক নিরপেক্ষতার বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা।
শিক্ষকতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক সংযম এখানে সম্পদ হতে পারে। আবার দীর্ঘদিনের দলীয় পরিচয় তার জন্য হতে পারে চ্যালেঞ্জও।
কারণ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত আইনের দৃষ্টি ছাড়িয়েও উত্তীর্ণ হতে হবে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার মাপকাঠিতে।
মির্জা ফখরুলের বাল্যবন্ধু মনতোষ কুমার দে আলাপ-কে বলেন, “মানুষ যখন মনুষ্যত্বের গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হয়, তখন প্রকৃত মানুষ হয়। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই রকমই একজন মানুষ।”
“আমরা চাই এই ধরনের মানুষ বিরল না হয়ে, এই ধরনের মানুষ যেন সবাই হয়ে উঠতে পারে। তাহলেই এই দেশটা সুন্দর হবে এবং আমরা সত্যিকার অর্থে একটা সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী হবো।”
এমনকি প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের মানুষদের কাছে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তিত্ব বলে মেনে করেন মনতোষ কুমার দে।
“সে খালি নিজের লোকজনের কাছে না, প্রতিপক্ষের মানুষদের কাছেও তার এই গ্রহণযোগ্যতা ছিলো। কোনোরকম প্রতিপক্ষ আচরণ এবং মুখ ফিরিয়ে রাখা, এইরকম মনোভাব তার মধ্যে কখনোই আমরা দেখিনি,” যোগ করেন তিনি।