পাকিস্তান সফরের ভিডিও নিয়ে বিতর্ক: মুক্তিবাহিনীকে ‘গুণ্ডা’ বলা গানকে ‘ফেইক’ বলছে শিবির 

‘মুক্তি বাহিনীর গুণ্ডাদের সাথে ঢাকায় কে লড়াই করেছিলো? দেশের অখণ্ডতার জন্য “আলবদর বাঙ্গাল” নিজেদের উৎসর্গ করেছিলো।’ অনেকেরই দাবি শিবির সভাপতির পাকিস্তান সফরকে ঘিরে জমিয়ত-ই-তালাবি পাকিস্তান নিজেদের ফেইসবুক পেইজে একটি ভিডিওতে এই গানটি ব্যবহার করেছে। অবশ্য শিবির সভাপতি অস্বীকার করেছেন।

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত কয়েকদিন ধরে আলোচনায় একটি ভিডিও ফুটেজ ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম পাকিস্তান সফরে জমিয়ত-ই-তালাবি’র কেন্দ্রীয় একজন নেতার সঙ্গে কোলাকুলি করছেন। আর ব্যাকগ্রাউন্ডে উর্দু ভাষায় গান হচ্ছে, যার বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায়- “মুক্তি বাহিনীর গুণ্ডাদের সাথে ঢাকায় কে লড়াই করেছিলো? দেশের অখণ্ডতার জন্য “আলবদর বাঙ্গাল” নিজেদের উৎসর্গ করেছিলো। জামায়াত এই মাটিকে হীরা, মুক্তা ও লাল (মনি) দিয়েছে।”

এই ভিডিও ঘিরেই নেট দুনিয়ায় চলছে আলোচনা-সমালোচনা।  

ভিডিও-তে ব্যবহৃত গান কতটা সত্য

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন ব্যক্তিগত ফেসবুকে শেয়ার করলেও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির কিংবা জমিয়ত-ই-তালাবি পাকিস্তানের ফেসবুক পেইজে এমন কোনো ভিডিও’র অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

যদিও সাংবাদিক আরিফ রহমান আলাপ-কে নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, ইসলামী জমিয়ত-ই-তালাবি পাকিস্তান-এর ফেসবুক পেইজে ভিডিওটি এই গানসহ আপলোড হয়েছিলো।

“ভিডিওটি আমি নিজে দেখেছি। ওদের পেইজেই ভিডিওটি ছিলো। পরে অনেকেই রি-পোস্ট করেন। এখন আর তালাবি’র পেইজে পাওয়া যাচ্ছে না। হয়তো সরিয়ে ফেলা হয়েছে,” বলেন আরিফ রহমান।

অন্যদিকে এই ভিডিও’র সঙ্গে গানটির সত্যতা নিশ্চিত করতে যোগাযোগ করা হলে ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম আলাপ-কে বলেন, “এটা ইন্টেনশনালি বাম ব্লকের চরমপন্থি কিছু গ্রুপ শেয়ার করছে। ওটা মূলত অফিশিয়াল কেউ দেয়নি। ব্যাক ভয়েস দিয়ে তো যে কেউ এটা করতে পারে। জমিয়ত-ই-তালাবি বা তাদের অফিশিয়াল কেউ দেয়নি। ইন্ডিভিজ্যুয়ালি কেউ যদি কিছু দেয় সেটার দায়-দায়িত্ব তো আমাদের না।”

অনেকেই দাবি করছেন জমিয়ত-ই-তালাবি’র ফেসবুক পেইজে ভিডিওটি ছিলো এবং পরবর্তীতে সরিয়ে ফেলা হয়- এমন দাবিকে অস্বীকার করে নুরুল ইসলাম সাদ্দাম আলাপ-কে বলেন, “তাদের ফেসবুক গ্রুপ তো এখনও আছে। আপনি দেখতে পারেন। সফর সংক্রান্ত নির্ধারিত পোস্ট এবং ছবি সবই তাদের পেইজে আছে। এটা সম্পূর্ণ ফেইক। প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য করা হয়েছে।”  

তবে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিশ্লেষণ করলে তুফাইল মাহমুদ নামে এক ব্যক্তির লোগো দেখা যায়। তুফাইলের ফেসবুক প্রফাইল বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি পাকিস্তানি নাগরিক এবং জমিয়ত-ই-তালাবির একজন সদস্য। তার নিজের ফেসবুক একাউন্টে আরেকটি ভিডিওতেও একই লোগো আছে। যদিও তার একাউন্টে শিবির সভাপতির ভিডিও পাওয়া যায়নি।  

এছাড়াও ইউটিউবে তিন বছর আগে আপলোড হওয়া একটি ভিডিওর অস্তিত্ব পাওয়া যায়। যার শিরোনাম “জমিয়ত নে ইস ধারতি কো হীরা মোতি লাল দিয়ে”। 

যে গানের একটি লাইনে আছে- “মুক্তি বাহিনীর গুণ্ডাদের সাথে ঢাকায় কে লড়াই করেছিলো? দেশের অখণ্ডতার জন্য “আলবদর বাঙ্গাল” নিজেদের উৎসর্গ করেছিলো। জামায়াত এই মাটিকে হীরা, মুক্তা ও লাল (মনি) দিয়েছে।”

ভিডিওতে ব্যবহার হওয়া গানটির বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধ গবেষক সালেক খোকন আলাপ-কে বলেন, “মুক্তিযোদ্ধাদের পাকিস্তানপন্থিরা বলতো ইসলামের শত্রু কিংবা ভারতের চর। তো এখন তারা গুণ্ডা বলবে। এটাই তো স্বাভাবিক।”

সালেক খোকন মনে করেন, স্বাধীনতার এত বছর পর পাকিস্তানও যদি এ ধরনের গান বানিয়ে থাকে, তাহলেও রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের উচিত প্রতিবাদ জানানো।

“১৯৭১ সালে জামায়াতের ছাত্র সংগঠনের নাম ছিলো ইসলামী ছাত্র সংঘ। ছাত্র সংঘের সদস্যরাই মুক্তিযুদ্ধের সময় আল-বদর হয়েছিলো। এই ছাত্র সংঘই এখন ছাত্রশিবির।”

তিনি আরও বলেন, “পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলীর নির্দেশে বুদ্ধিজীবী হত্যার নীলনকশা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নও করেছে এই আল-বদর।”

ট্রিসানগাম ইন্টারন্যাশনাল রেফার্ড জার্নালে ২০২৫ এর এপ্রিলে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধে মৃদুল বনিক উল্লেখ করেন, জামায়েত ইসলামের শিক্ষিত লোকদের নিয়ে তৈরি হয়েছিল আল-বদর বাহিনী। এই আল-বদর বাহিনী ছিল মূলত তাদের বুদ্ধিজীবী সংগঠন। আল-বদরদের প্রধান কাজ ছিল বিভিন্ন অভিযানের এবং গণহত্যার নীলনকশা তৈরি করা।

তার গবেষণা প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, আল-বদর বাহিনীর সদস্যরা পাকিস্তান রাষ্ট্রকে রক্ষা করার জন্য যে আদর্শ ধারণ করতো তা বেশ শক্ত ছিল।

শিবির সভাপতির পাকিস্তান সফর

শিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম গত জুনে তিন দিনের সফরে পাকিস্তান যান উল্লেখ করে আলাপ-কে বলেন, মূলত ইউনিভার্সিটি কেন্দ্রিক কিছু অনুষ্ঠানে অংশ নিতে পাকিস্তান গিয়েছিলেন। 

“আমার সাবজেক্ট রিলেটেড কয়েকজন প্রফেসারের সঙ্গে দেখা করা মূল উদ্দেশ্য ছিলো। প্রফেসার আনিস, লিড ইউনিভার্সিটি, পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি- এসব জায়গায় ইকনোমিকসের প্রফেসারদের সঙ্গে দেখা করার জন্য গিয়েছিলাম। এর পাশাপাশি কিছু প্রোগ্রামেও অংশ নিয়েছি।”

ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক গণমাধ্যম সাবাহ নিউজ শিবির সভাপতির পাকিস্তান সফর নিয়ে ১৮ই জুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। যেখানে বলা হয়, “নূরুল ইসলাম সাদ্দাম জমিয়ত-ই-তালাবি পাকিস্তানের আমন্ত্রণে তিন দিনের সফরে পাকিস্তান আসেন। সফরের শুরুতে তিনি লাহোরের ঐতিহাসিক ফুল বিল্ডিং পরিদর্শন করেন, যেখানে ১৯৪৭ সালে ইসলামী জমিয়ত-ই-তালাবি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।”

প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, এই সফরের সময়ে ছাত্র শিবিরের দলটি মিনার-ই-পাকিস্তান, গ্রেটার ইকবাল পার্কে অবস্থিত ন্যাশনাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম, বাদশাহী মসজিদ এবং কবি আল্লামা মুহাম্মদ ইকবালের মাজার জিয়ারত করে দোয়া করেন। এ ছাড়া প্রতিনিধি দল সৈয়দ আবুল আ’লা মওদূদী একাডেমি পরিদর্শন করেন। 

প্রতিবেদনে এও উল্লেখ করা হয়, ইসলামী জমিয়তে তলাবা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাহেবজাদা ওয়াসিম হায়দারের সঙ্গে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এ সময় সাহেবজাদা ওয়াসিম হায়দার শিবির সভাপতিকে বলেন, “পাকিস্তান ও বাংলাদেশ বন্ধুত্ব, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক সম্পর্কের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে।”

তিনি আরও বলেন, “দুই দেশের জনগণ ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ এবং তাদের একে অপরের থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। তিনি দুই দেশের শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।” 

প্রতিবেদনে বলা হয়, লাহোরে অবস্থানকালে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানের আমির হাফেজ নাঈমুর রহমান মানসুরায় প্রতিনিধি দলের সম্মানে নৈশভোজে অংশ নেন শিবির সভাপতি।