সম্পদ-নেতৃত্বের টানাপোড়েনে বিভক্ত ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার 

বুধবার রাতে এই সংগঠনের ৬ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ‘ওসমান হাদির পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে’ তারা ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সব দলিল হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৩ পিএম

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ইনকিলাব মঞ্চের সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট ‘ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন শরিফ ওসমান বিন হাদির বড়ভাই ওমর বিন হাদি। 

শুরুতে সংগঠনের সাংগঠনিক ব্যয়ের বড় অংশের জোগানও দিতেন তিনি। ট্রেড লাইসেন্স থেকে শুরু করে কালচারাল সেন্টারের দলিল-দস্তাবেজ তৈরিতেও ভূমিকা ছিলো তার। 

ওমর এখন যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে দ্বিতীয় সচিব পদে কর্মরত। 

প্রতিষ্ঠার পর জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে প্রামান্যচিত্র নির্মাণ, বই প্রকাশনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে আলোচনায় আসে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। তবে প্রতিষ্ঠাতা শরিফ ওসমান বিন হাদি নিহত হওয়ার পর সংগঠনের কার্যক্রম অনেকটাই স্তিমিত হয়ে পড়েছে। 

বুধবার রাতে এই সংগঠনের ৬ জন নেতা পদত্যাগ করেছেন। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ‘ওসমান হাদির পরিবারের দাবির প্রেক্ষিতে’ তারা ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের সব দলিল হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

নিজেদের ফেইসবুকে দেওয়া পোস্টে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সংগঠনের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের, সহ-সভাপতি ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ ৬ জন। অন্যরা হলেন, কালচারাল সেন্টারের সভাপতি সালাউদ্দিন শুভ, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক ফাহিম আব্দুল্লাহ, অর্থ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রায়হান ও উপ-নির্বাহী পরিচালক হাবিবুল্লাহ মিসবাহ।

এদের মধ্যে জাবের ইনকিলাব মঞ্চেরও সদস্য সচিব। ওসমান হাদি হত্যা মামলার বাদীও তিনি। 

পদত্যাগের কারণ নিয়ে ফেইসবুক পোস্টে যা বলেছেন সংগঠনের নেতারা 

পদত্যাগের বিষয়ে ইনকিলাব সেন্টারের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল জাবের ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “শহীদ ওসমান হাদি শাহাদাতের পূর্বে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ট্রাস্ট গঠনের উদ্যোগ নিলেও শেষ করে যেতে পারেননি। যেহেতু এটি প্রতিষ্ঠাকালীন সময় হতে জনতার আমানত হিসেবে পরিচিত ও পরিকল্পনাও এমনই ছিল, তাই আমরা বিগত ছয় মাস শাহাদাত পরবর্তী উত্থাপিত ওয়ারিশ সংক্রান্ত ইস্যু সমাধানের চেষ্টা করেছি। সমসাময়িক সময়ে আমরা নানাবিধ প্রোডাক্টিভ কাজের পরিকল্পনাও হাতে নিই, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে। তবে ইতোমধ্যে আপনারা দেখেছেন বিষয়গুলো আরো জটিল হয়ে পড়েছে।” 

তিনি বলেন ওসমান হাদির “ওয়ারিশদের দাবির প্রেক্ষিতে ও সমস্ত দলিল দস্তাবেজ সাপেক্ষে ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার দাবিকারীদের” কাছে হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

সভাপতি সালাহ উদ্দিন শুভ তার ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, নানারকম  ‘অভ্যন্তরীণ জটিলতা ও প্রতিনিয়ত মানসিক চাপের’ কারণে তাদের ‘লড়াই অত্যন্ত কঠিন’ হয়ে উঠেছে।

“ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারকে শহীদ ওসমান হাদি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন জনতার আমানত হিসেবে। দায়িত্ব গ্রহণ করার পর তাই বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করেছি এই সমস্যা সমাধানের। কিন্তু বিষয়গুলো এতটাই স্পর্শকাতর যা আমার জন্যে সামনে এগিয়ে চলার পথ বাধাগ্রস্ত করছে,” তিনি বলেছেন।

একইভাবে সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ফাতিমা তাসনিম জুমা ফেইসবুকে ‘নানাবিধ ওয়ারিশ সংক্রান্ত ঝামেলার’ কথা লিখেছেন।

তিনি লেখেন, “এইসকল সমস্যা চিন্তা করে ট্রাস্ট গঠনের চেষ্টা চালালেও শেষ করে যেতে পারেননি হাদি ভাই। শহিদ ওসমান হাদির পর জনগণ আমাদের ওপর বিশ্বাস রেখেছে সেই বিশ্বাসের জায়গা থেকে আমরা জনতার আমানত রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছি।”

তার ফেইসবুক পোস্টে জুমা দাবি করেছেন ওয়ারিশ সংক্রান্ত বিষয় নানারকম অপপ্রচার ও মানহানিকর মন্তব্য প্রচারিত হয়েছে।

পদত্যাগের বিষয়ে জানেন না ওসমান হাদির বড়ভাই আবু বকর সিদ্দিক 

পদত্যাগ ও ওয়ারিশ দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ওসমান হাদির বড়ভাই মাদ্রাসা শিক্ষক ড. আবু বকর সিদ্দিক আলাপ-কে বলেন, “পদত্যাগের বিষয় জানা নেই। আপনার কাছেই প্রথম শুনলাম। ঝালকাঠিতে প্রধানমন্ত্রী আসবেন। সেজন্য ব্যস্ত আছি। কেউ আমাকে কিছু জানায়নি।”

তিনি বলেন, “এখানে দাবির কোনো বিষয় নেই। এখানে বিষয় কাজের। সংগঠনকে এগিয়ে নেওয়া। সংগঠনের দায়িত্বে যারা আছেন তাদের উচিত আমাদের পরিবারের সাথে সমন্বয় করা। আমাদের পরিবারের উচিত তাদেরকে শক্তি-সাহস জোগানো। এভাবে যখন ইউনিটি থাকবে তখন কাজটা ভালো হবে। উভয় উভয়কে রেসপেক্ট করতে হবে।”

সংগঠন পরিচালনায় সমন্বয়ের ঘাটতি আছে বলে মনে করেন আবু বকর সিদ্দিক।  

“হাদি মারা যাওয়ার পর আজ পর্যন্ত ওরা আমাকে কোনো ফোন দেয়নি। কোনো কর্মসূচির কথাও জানায়নি। অথচ ওখানে আমার অনেক ছাত্র আছে। এমনকি জাবেরও আমার ছাত্র,” আলাপ-কে বলেন আবু বকর। 

সংগঠনের কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ ওমর বিন হাদির নামে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “যতটুকু জানি কাগজপত্র, দলিল-দস্তাবেজ ওমরের নামে। ব্যাংকের নমিনিও সে।”

সংগঠন নিয়ে বিভক্তি

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংগঠনের এক নেতা জানান, ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার কার্যত দুইভাগে বিভক্ত। একপক্ষে আছেন ওসমান হাদির পরিবার। যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ওমর বিন হাদি। 

আরেক পক্ষে আছেন ওসমান হাদির স্ত্রী রাবেয়া ইসলাম শম্পা এবং পদত্যাগ করা নেতারা। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই নেতা বলেন, ওসমান হাদি বেঁচে থাকতে ট্রাস্ট করতে চেয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর শম্পা এবং পদত্যাগ করা নেতারাও তাই চেয়েছিলেন। তবে ওমর বিন হাদি এতে বাধা দেন। ফলে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

জাবের ও অন্য নেতারা মূলত শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই পদত্যাগ করেছেন বলে তার দাবি।  

তিনি জানান, ওসমান হাদির সন্তান ফিরনাস বিন ওসমানের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্ন্তবর্তী সরকার ফ্ল্যাট ও নগদ টাকা দিয়েছেন। ওই সম্পদের জিম্মাদার শম্পা। 

ওসমান হাদির ভাইবোনেরা মনে করেন শম্পা নিজের ভবিষ্যত চিন্তা করে কখনো যদি বিয়ে করেন তাহলে ফিরনাসের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে যাবে। ফলে ফিরনাসের সম্পদের জিম্মাদার তাদেরই হওয়া উচিত। 

এসব বিষয়ে জানতে রাবেয়া ইসলাম শম্পার সাথে যোগাযোগে চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। ওমর বিন হাদির সাথেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। 

২০২৫ সালের ১২ই ডিসেম্বর ঢাকার পল্টন মডেল থানার বক্স কালভার্ট রোড এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। 

এরপর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার সার্জারি হয়। পরে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১৫ই ডিসেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো। সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান তিনি।