এক সময় বিশ্বকাপে মরক্কোকে দেখা হতো ‘চমক দেখাতে পারে’ এমন একটি দল হিসেবে। এখন সেই পরিচয় বদলে যাচ্ছে। তারা আর শুধু অঘটন ঘটানো দল নয়। ধীরে ধীরে বিশ্ব ফুটবলের নতুন শক্তি হয়ে উঠছে উত্তর আফ্রিকার দেশটি।
এই পরিবর্তন রাতারাতি আসেনি। এর পেছনে আছে দীর্ঘ পরিকল্পনা, কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, আধুনিক অবকাঠামো, প্রবাসী প্রতিভা খুঁজে বের করার অভিনব উদ্যোগ। সবচেয়ে বড় কথা, তাদের আছে বিশ্ব সেরাদের কাতারে ওঠার অদম্য স্বপ্ন।
ফুটবল উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ নিল ওয়ার্ডের বিশ্বাস, “মরক্কোর বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হয়ে ওঠার সব সামর্থ্য আছে।"
ওয়েলসে ফুটবল প্রশাসনের দায়িত্ব পালনের পর ২০২০ সালে তিনি রয়্যাল মরক্কান ফুটবল ফেডারেশনে যোগ দেন। খুব কাছ থেকে দেখেছেন দেশটির ফুটবল বিপ্লব।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে ইতিহাস গড়ে প্রথম আফ্রিকান দল হিসেবে সেমিফাইনালে উঠেছিলো মরক্কো। সেই সময় রাজধানী রাবাতে ছিলেন ওয়ার্ড।
তার ভাষায়, “পুরো শহর যেন আনন্দে বিস্ফোরিত হয়েছিলো। গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ রাস্তায় ছিলো। রাজাও নেমে এসেছিলেন মানুষের সঙ্গে উদযাপনে।"
সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে স্বপ্ন থেমে গেলেও মরক্কোর যাত্রা থামেনি। এবার আবারও ফ্রান্সের সামনে দাঁড়িয়েছে তারা। লক্ষ্য আরও একটি ইতিহাস লেখা।
ফল যাইহোক, একটি বিষয় এখন স্পষ্ট। মরক্কো আর ক্ষণিকের সাফল্যে সন্তুষ্ট নয়। তারা এমন একটি দল গড়তে চায়, যারা বছরের পর বছর বিশ্ব ফুটবলের শীর্ষে থাকবে।
ফুটবল উন্নয়ন কর্মসূচিতে ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কাজ করা সাইমন জেনিংস বলেন, “এটি কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়। এটি অনেক দিনের পরিকল্পনার ফল।"
রাজপ্রাসাদ থেকে শুরু হয়েছে ফুটবল বিপ্লব
মরক্কোর ফুটবল বদলে দেওয়ার পরিকল্পনা এসেছে দেশের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।
রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদের সমর্থনে ফুটবলে হয়েছে বড় বিনিয়োগ। তৈরি হয়েছে আধুনিক জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ফুটবল একাডেমি, আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। নতুন করে সাজানো হয়েছে স্টেডিয়াম। দেশের নানা প্রান্তে তৈরি হয়েছে হাজার হাজার ফুটবল মাঠ।
ওয়ার্ড বলেন, “ইউরোপে খেলা ফুটবলাররা যেসব সুযোগ সুবিধা দেখে অভ্যস্ত, এখানেও তারা একই মানের পরিবেশ পায়। এতে খেলোয়াড়দের মনে বিশ্বাস তৈরি হয় যে তারা বড় কিছু করতে এসেছে।"
অবশ্য এই বিনিয়োগ নিয়ে বিতর্কও আছে। অনেকের প্রশ্ন, ফুটবলের পেছনে এতো অর্থ ব্যয়ের বদলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা কর্মসংস্থানে আরও বেশি বিনিয়োগ করা উচিত ছিলো।
তবে সরকারের বক্তব্য, দুটি ক্ষেত্রই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সে কারণেই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাজেটও বাড়ানো হয়েছে।
ওয়ার্ডের মতে, ফুটবলে এই বিনিয়োগের আরেকটি লক্ষ্য আছে। সেটি হলো বিশ্ব মঞ্চে মরক্কোর অবস্থান আরও শক্ত করা।
প্রবাসীদের মধ্যেও চলে প্রতিভা খোঁজার অভিযান
মরক্কোর সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তাদের বিশাল প্রবাসী জনগোষ্ঠী।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৫০ লাখের বেশি মরক্কান বাস করেন। তাদের সন্তানদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের অনেক তারকা। সেই কারণেই ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে স্থায়ী স্কাউট নিয়োগ দিয়েছে মরক্কো।
কোনো প্রতিভাবান ফুটবলারের মরক্কোর সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেই তার খোঁজ শুরু হয়ে যায়।
জেনিংস বলেন, “তাদের কখনো বাইরের মানুষ মনে করা হয় না। সবাইকে নিজের দেশের সন্তান হিসেবেই গ্রহণ করা হয়।"
বর্তমান বিশ্বকাপ দলে থাকা ২৬ জনের মধ্যে ১৯ জনই মরক্কোর বাইরে জন্মেছেন।
এর মধ্যে কয়েকজন চাইলে ফ্রান্সের হয়েও খেলতে পারতেন। লিলের মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি তার অন্যতম উদাহরণ।
স্পেনের তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালকেও ছোটবেলা থেকেই দলে টানার চেষ্টা করেছিলো মরক্কো। তার পরিবারের সঙ্গে বৈঠকও করেছিলো দেশটির ফুটবল ফেডারেশন।
ওয়ার্ড বলেন, “প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে তারা কোনো সুযোগ নষ্ট করে না।"
এবার লক্ষ্য নিজের মাটির তারকা
এখন মরক্কোর নতুন লক্ষ্য দেশের ভেতর থেকেই আরও বেশি আন্তর্জাতিক মানের ফুটবলার তৈরি করা।
দেশটির সাবেক টেকনিক্যাল ডিরেক্টর ক্রিস ভ্যান পুইভেলদের আশা, ২০৩০ বিশ্বকাপের মধ্যে জাতীয় দলে দেশে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড় এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়ের সংখ্যা প্রায় সমান হবে।
তবে তিনি মনে করেন, এ জন্য দেশের ফুটবল কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করতে হবে।
বর্তমান কোচ মোহাম্মদ ওয়াহবি সেই পরিবর্তনেরই অংশ।
২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব ২০ আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে ব্যর্থ হওয়ার পরও তার ওপর আস্থা রেখেছিল ফেডারেশন। সেই আস্থার প্রতিদান দিয়ে ২০২৫ সালে অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ জিতেছিলেন তিনি।
এর কিছুদিন পর সিনিয়র দলের দায়িত্বও তুলে দেওয়া হয় তার হাতে। শুধু বর্তমান নয়, ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তাকেই ভবিষ্যতের পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে রাখা হয়েছে।
স্পেন ও পর্তুগালের সঙ্গে যৌথভাবে ২০৩০ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে মরক্কো। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় কাজ শুধু নতুন স্টেডিয়াম বানানো নয়।
ভ্যান পুইভেলদের ভাষায়, “তারা নিচের স্তর থেকে পুরো ফুটবল ব্যবস্থাটাই নতুন করে গড়ে তুলছে।"
কাতার বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে ওঠার পর যে আত্মবিশ্বাস জন্মেছিলো, সেটি এখন পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।
এক সময় বিশ্বকাপে নকআউট পর্বে ওঠাই ছিলো মরক্কোর স্বপ্ন। এখন তাদের লক্ষ্য ট্রফি জেতা।
এই বদলে যাওয়া মানসিকতাই হয়তো বলে দিচ্ছে, বিশ্ব ফুটবলের নতুন পরাশক্তির জন্ম আর খুব বেশি দূরে নয়।



