আপনি যদি মঙ্গলবার রাতে আর্জেন্টিনা বনাম মিশরের রাউন্ড অফ সিক্সটিনের ম্যাচটি দেখে থাকেন, তাহলে এই বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত সেরা ম্যাচটি দেখে ফেলেছেন।
একটা ম্যাচকে সেরা বলতে যা যা উপকরণ লাগে, তার সবই উপস্থিত ছিলো এখানে। আন্ডারডগের লড়াই, সেরা খেলোয়াড়দের সর্বোচ্চ পারফরম্যান্স, শুরুতে পিছিয়ে পড়েও ফিরে আসার গল্প- মানে ৯০ মিনিটের একটা ম্যাচকে চাইলে ক্লাইম্যাক্স, এন্টি ক্লাইম্যাক্স, রোমাঞ্চ আর ট্রাজেডির একেবারে হলিউডি চিত্রনাট্য বলা যায়। সেই সাথে “চেরি অন টপ” রেফারিং নিয়ে বিতর্ক।
আর এই বিতর্কটাই ম্যাচ শেষের রেশে রয়ে গেছে বেশি করে। দুর্দান্ত ফুটবল খেলে ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ তে এগিয়ে মিশর। সেখান থেকে শেষ ১৩ মিনিটে সব লন্ডভন্ড করে ৩-২ এর জয় লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার। যে ম্যাচে একদলের অদম্য ফুটবল ও আরেকদলের অভূতপূর্ব কামব্যাকের গল্প আছে, সেই ম্যাচে আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে তিনটা।
১. রেফারি
২. ভিএআর
৩. ফিফা।
আবার বিতর্কের বিষয়ও তিনটা।
১. ১৮ মিনিটে পাওয়া আর্জেন্টিনার পেনাল্টি।
২. ৫৯ মিনিটে মিশরের ২য় গোল ও এরপর ভিএআরে সেটা বাতিল হওয়া।
৩. আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে ফাউল ও মিশরকে পেনাল্টি না দেওয়া।
শেষ বাশির পর মাঠেই নিজের প্রতিক্রিয়ায় মিশরের ফরোয়ার্ড জিকো বলেন, “রেফারি নিরপেক্ষ ছিলেন না।” এমনকি রেফারিকে জালিম বলে সম্বোধন করেন তিনি।
দলের কোচ হোসাম হাসানের প্রতিক্রিয়াও একইরকম। এমনকি মাঠেই রেফারিং নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি হলুদ কার্ড ও তার সহকারী দেখেন লাল কার্ড। সবমিলে ৫টা হলুদ কার্ড দেখেছে মিশর।
ভিএআর (VAR) কী ও কীভাবে কাজ করে?
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা সংক্ষেপে ভিএআরকে সোজা কথায় বলে, মাঠে অন ফিল্ড রেফারিকে প্রযুক্তির সাহায্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহযোগিতা করা।
এটি প্রথম ব্যবহার করা হয় ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে। অনেকটা ক্রিকেটের থার্ড আম্পায়ারের মতো বলা যায়।
ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারিরা তাদের সামনে মনিটরে বিভিন্ন ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল নিয়ে পুরো ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করেন ও মাঠের রেফারির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখেন।
ভিএআর এতদিন চার ধরনের সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করে আসছিলো—
- গোল এবং গোলের আগে আক্রমণের পুরো ধাপ
- পেনাল্টি
- সরাসরি লাল কার্ড এবং
- ভুল খেলোয়াড়কে শাস্তি দেওয়া
এর সাথে ২০২৬ বিশ্বকাপে যুক্ত হয়েছে কর্নার কিকের সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ এই পাঁচ রকমের পরিস্থিতিতে রেফারিকে পরামর্শ দেয় ভিএআর। যদি রেফারির চোখ কোনো কিছু এড়িয়ে যায় তাহলে ভিএআর সেটা রেফারিকে জানিয়ে মন্তব্য করে যে, চাইলে সে এটা মনিটরে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। এরপর রেফারি যদি মনে করেন, তাহলে সে মাঠের পাশে মনিটর দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এক্ষেত্রে সবসময় চূড়ান্ত ক্ষমতা মাঠের রেফারিরই থাকে।
প্রথম বিতর্ক: আর্জেন্টিনার পেনাল্টি
ম্যাচের তখন ১৯ মিনিট। ইয়াসির ইব্রাহিমের দুর্দান্ত এক গোলে ১-০ তে পিছিয়ে থাকা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা গোলের জন্য মরিয়া। এসময় আকাশি সাদার ডিফেন্ডার নিকোলাস তাগলিয়াফিকোকে নিজেদের বক্সের ভেতর ফাউল করেন হাইসেম হাসান। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান।
রিপ্লেতে দেখা যায়, হাসান তাগলিয়াফিকোর জার্সি টেনে ধরেছিলেন এবং তার বুটের উপর পা দিয়ে তাকে ফেলে দেন। যা নিয়ম অনুযায়ী পেনাল্টি।
এরপর লিওনেল মেসি পেনাল্টি মিস করায় ঘটনাটি নিয়ে তুলনামূলকভাবে কম বিতর্ক থাকলেও ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে এটিও একটি। ওই গোলটি হলে ম্যাচের চিত্র ভিন্নরকম হতে পারতো এবং এই সিদ্ধান্ত নিয়ে হয়তো আরো আলোচনা চলতো।
দ্বিতীয় বিতর্ক: কেন বাতিল হলো মিশরের গোল?
ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্ত এটি। দ্বিতীয়ার্ধে তখনো ১-০ গোলে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা সমতার খোঁজে আক্রমণে মিশরের ডিবক্সের কাছে। এই মুহূর্তেই একটা কাউন্টার অ্যাটাকে যায় মিশর।
৫৯ মিনিটের দিকে আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজের কাছ থেকে বল কেড়ে নেন মিশরের মিডফিল্ডার মারওয়ান আতিয়া। সেই সময় মার্টিনেজ পড়ে গেলেও রেফারি কোনো ফাউল দেননি।
পরে সেই বল টেনে মোহাম্মদ সালাহর দ্রুতগতির দৌড় ও নিখুঁত পাস সতীর্থ জিকোর দিকে। আর সেখান থেকেই দারুণ ফিনিশ এই ফরোয়ার্ডের। উল্লাসে মাতে মিশর, জার্সি খুলে উদযাপন করছিলেন মোস্তফা জিকো। কিন্তু বাধ সাধেন রেফারি। দীর্ঘ সময় নিয়ে ভিএআর চেক করে বাতিল করে দেন গোল।
রিপ্লেতে দেখা যায়, গোলের আক্রমণ শুরুর সময় মার্টিনেজের জার্সি টানেন আতিয়া এবং তার পায়ের ওপর পা দেন। ফিফার নিয়ম অনুযায়ী যা স্পষ্ট ফাউল। তাই তখন মাঠের রেফারি খেলা চালিয়ে গেলেও ভিএআর ঘটনাটি পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দেয়।
ফিফার ভিএআর প্রোটোকল অনুযায়ী, প্রতিটি গোলের আগে পুরো অ্যাটাকিং পজেশন ফেজ বা এপিপি পরীক্ষা করা হয়। অর্থাৎ, একটি টানা ধারাবাহিক অ্যাটাকের মধ্যে যদি সেই দল ফাউল, অফসাইড বা হ্যান্ডবলের মাধ্যমে বলের দখল নিয়ে থাকে, তাহলে সেই অ্যাটাক থেকে হওয়া গোল বাতিল করা যায়।
এই ঘটনায় মিশর ফাউলের মাধ্যমেই বলের দখল নিয়েছিলো এবং সেই একই ধারাবাহিক আক্রমণ থেকে গোল আসে। তাই ভিএআর-এর হস্তক্ষেপ নিয়মের আওতায় ছিল।
তবে বিতর্কের জায়গা অন্যত্র। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ঘটনাটি ছিল খুবই সামান্য সংস্পর্শ এবং মাঠের রেফারি সেটিকে ফাউল হিসেবে দেখেননি, তাই এত পরে ভারের হস্তক্ষেপ যথার্থ হয় কি করে?
এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন সাবেক মার্কিন খেলোয়াড় ও রেফারি এবং বর্তমানে ফক্স স্পোর্টসের বিশ্লেষক ড. জো মাখনিক। “এইটা বহুদিন ধরেই ভারের প্রটোকলে আছে, ফাউল থেকে হওয়া কোন গোল যাতে না হয় সেটা দেখা।”
তিনি যোগ করেন, “এখানে কিন্তু বলা নাই যে, ওই ফাউলের ৫ সেকেন্ডের মধ্যে বা ৭৫ গজের মধ্যেই সিদ্ধান্ত দিতে হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত প্রতিপক্ষ দল বলের দখল না পায় এবং যদি ঐ ফাউলের পরই বল দখল নিয়ে আরেকটা দল গোল দেয় তাহলে সেটা বাতিল হবে।”
তবে এই ব্যাখ্যা সবাইকে সন্তুষ্ট করছে না। সাবেক ইংলিশ ফুটবলার জেমি ক্যারাঘার যেমন বলছেন, “এমন ঘটনা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগা বা সেরি আ-তে হলে সম্ভবত গোলই বহাল থাকতো।”
তার মতে, এবারের টুর্নামেন্টে ভিএআর ব্যবহারে ধারাবাহিকতার অভাব রয়েছে।
তৃতীয় বিতর্ক: এনজো ফার্নান্দেজের জয়সূচক গোলের আগে কী ঘটেছিল?
বিতর্ক উসকে যায় খেলার শেষ মুহূর্তে এসে। ততক্ষণে ২-২ সমতা, নির্ধারিত ৯০ মিনিটের পর অতিরিক্ত ৭ মিনিটের খেলা চলছে। এসময় আচমকা এনজো ফার্নান্দেজের করা গোলে জয়ের উল্লাসে মাতে পুরো আর্জেন্টিনা।
কিন্তু রেফারির কাছে আপত্তি জানাতে থাকে মিশর। তাদের দাবি এই গোলের আগে মো. সালাহকে ফাউল করা হয়েছে এবং তারা পেনাল্টির আবেদন করে।
রিপ্লেতে দেখা যায় যেকারণে মিশরের গোল বাতিল হয়েছিল, অনেকটা একই রকম ঘটনা ঘটেছে এখানেও। অর্থাৎ আর্জেন্টাইন ডি বক্সে সালাহর পায়ে ছিল বল, তার কাছ থেকে সেটা কেড়ে নেন হুলিয়ান আলভারেজ এবং সেসময় সালাহ পড়ে যান। এরপর সেই বল নিয়েই পালটা কাউন্টার অ্যাটাকে এসে গোল করেন এনজো।
তাহলে যদি মিশরের গোল ফাউলের কারণে বাতিল হয় তাহলে এটা বাতিল হবে না কেন?
দুই ঘটনার একটা বড় পার্থক্য হচ্ছে, লিসান্দ্রো মার্টিনেজের ফাউলের ঘটনাটি ছিল বক্সের বাইরে এবং সালাহ ছিলেন বক্সের ভেতরে। আর পেনাল্টি দিতে হলে রেফারির দরকার শক্ত প্রমাণ এবং একটু জোর ফাউল।
সাবেক ফিফা রেফারি ও বর্তমানে বাফুফেতে কর্মরত আজাদ রহমান বলেন, “রিপ্লেতে দেখা যায় সালাহর ঘটনায় আলভারেজ আগে বল স্পর্শ করেছেন এবং সালাহর বুটে অনিচ্ছাকৃত ‘সফট টাচ’ লেগেছে, এবং তিনি সম্ভবত ডাইভ দিয়েছেন।”
ফিফার আইন অনুযায়ী, আগে বলে টাচ করলে পরবর্তী সংস্পর্শ অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক ফুটবলীয় সংঘর্ষ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ভিএআর রেফারিকে মনিটরে ডাকার প্রয়োজন মনে করেনি এবং আর্জেন্টিনার গোল বহাল থাকে।
অনেকে এই ঘটনার সামান্য আগে আরেকটা বিষয়ও নজরে আনছেন। সেটা হলো, বল সালাহর কাছে যাবার আগে মিশরের মিডফিল্ডার হামদি ফাথিকে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার জার্সি টেনে ফেলেছিলেন এবং সেটি ফাউল হওয়া উচিত ছিলো।
ভিএআর এই ঘটনাও পরীক্ষা করে। তবে ভিডিও সহকারী রেফারিরা মনে করেন, মাঠের রেফারির সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনার মতো "স্পষ্ট এবং সুনিশ্চিত এরর" ঘটেনি।
মিশরের অভিযোগ দাখিল
মিশরের কাঠগড়ায় এখন এই ম্যাচে দায়িত্ব পালন করা ফরাসি রেফারি ফ্রানসুয়া লুটিক্সিয়ে। তারা ফিফার কাছে দাবি জানিয়েছে, যাতে এই রেফারিকে বিশ্বকাপ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
ইজিপশিয়ান ফুটবল ফেডারেশন-ইএফএ আনুষ্ঠানিক অভিযোগো দাখিল করেছে এবং তারা চায় এই ম্যাচ পরিচালনায় রেফারিদের ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড” ভূমিকার তদন্ত হোক।
ইএফএ তাদের বিবৃতিতে বলছে, হানি আবু রিদা ইজিপশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি ফিফার কাছে ফ্রেঞ্চ রেফারি ও তার দলের মারাত্মক ভুল রেফারিং, যে কারণে তাদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছে, সেটার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেছে ও তদন্তের দাবি জানিয়েছে।
তবে ফিফায় সাধারণত বিশ্বকাপে এমন অভিযোগ করে লাভ হয় না। এক্ষেত্রে ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা বরাবরই রেফারিদের পাশে থাকে।


বিতর্কিত রেফারিংয়ে ক্ষুব্ধ ইজিপ্ট, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর তীব্র অভিযোগ
