বিতর্কিত রেফারিংয়ে ক্ষুব্ধ ইজিপ্ট, বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর তীব্র অভিযোগ

ম্যাচটি ছিলো রোমাঞ্চ, নাটক, বিতর্ক এবং আবেগে ভরা। পেনাল্টি সেভ, বাতিল হওয়া গোল, লাল কার্ড, ভিএআর বিতর্ক এবং শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন সব মিলিয়ে এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই হয়ে থাকবে। 

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম

বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচগুলোর একটি খেলেও শেষ পর্যন্ত হতাশা নিয়েই মাঠ ছাড়তে হয়েছে ইজিপ্ট। ম্যাচে এক সময় ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ ১২ মিনিটে তিন গোল হজম করে ৩-২ ব্যবধানে হেরে যায় আফ্রিকার দলটি।

তবে পরাজয়ের চেয়েও বেশি আলোচনা হচ্ছে রেফারিং এবং ভিএআরের কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে। ম্যাচ শেষে ইজিপ্টের কোচ হোসাম হাসান অভিযোগ করেন, তার দলকে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, বিশেষ করে লিওনেল মেসিকে টুর্নামেন্টে রাখতেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আটলান্টার স্টেডিয়ামে ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত সবকিছুই ছিলো ইজিপ্টের নিয়ন্ত্রণে। ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে এগিয়ে থাকার পর তারা ব্যবধান বাড়িয়ে ২-০ করে ফেলে। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে যাচ্ছে ফুটবলপাগল দেশটি।

কিন্তু ম্যাচের চিত্র বদলে যায় মুহূর্তের মধ্যে। ৭৯ মিনিটে ক্রিস্তিয়ান রোমেরো একটি গোল শোধ করেন। এরপর ৮৩ মিনিটে সমতায় ফেরান আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে এনজো ফার্নান্দেজের হেডে আসে জয়সূচক গোল। অবিশ্বাস্য এই প্রত্যাবর্তনে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে যায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে বিতর্কিত মুহূর্ত আসে ইজিপ্টের বাতিল হওয়া দ্বিতীয় গোলকে ঘিরে। ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকার সময় মোস্তাফা জিকো দারুণ এক গোল করেছিলেন। কিন্তু ভিএআরের পর্যালোচনায় সেটি বাতিল করা হয়। কারণ, আক্রমণের শুরুতে মারওয়ান আতিয়া নাকি লিসান্দ্রো মার্তিনেজের পায়ে হালকা চাপ দিয়েছিলেন।

এতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইজিপ্ট শিবির। তাদের দাবি, এত সামান্য স্পর্শের জন্য গোল বাতিল করার কোনো যৌক্তিকতা ছিলো না। অন্যদিকে ম্যাচের শেষ দিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের ঠিক আগে পেনাল্টি বক্সে মোহাম্মদ সালাহ ফাউলের শিকার হলেও সেটি ভিএআরে দেখাই হয়নি বলে অভিযোগ করেন তারা।

শেষ বাঁশি বাজার পর ইজিপ্টের অনেক খেলোয়াড় হতাশায় মাঠেই বসে পড়েন। ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ উগরে দেন প্রধান কোচ হোসাম হাসান।

“আমাদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে। মাঠের ভেতরে এবং বাইরে অনেক কিছু নিয়েই প্রশ্ন আছে। যেভাবে সবকিছু ঘটেছে, তাতে বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়েছে।"

তিনি আরও বলেন, “হয়তো তারা চেয়েছিলো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দলটি টুর্নামেন্টে টিকে থাকুক। হয়তো তারা চেয়েছিল মেসি লড়াইয়ে থাকুক। মনে হয়েছে, আর্জেন্টিনা সব দিক থেকেই বাড়তি সুবিধা পেয়েছে।"

বিবিসি স্পোর্টস এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে ফিফার সঙ্গে যোগাযোগ করলেও সংস্থাটি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।

হোসাম হাসান আরও বলেন, “আমরা কোনো সম্মান বা ফেয়ার প্লে দেখিনি। আমাদের প্রাপ্য একটি পেনাল্টি দেওয়া হয়নি। সেটি ভিএআর-এও দেখা হয়নি। আবার আমাদের দ্বিতীয় গোলটিও অদ্ভুতভাবে বাতিল করা হয়েছে। সবাই দেখেছে সালাহ’র জার্সি টানা হয়েছে, কিন্তু সেটিও ভিএআরে দেখা হয়নি। জীবন অনেক সময় অন্যায্য হয়, কিন্তু খেলাধুলাতেও কেন ন্যায়বিচার থাকবে না?”

ইজিপ্টের ফরোয়ার্ড মোস্তাফা জিকোও একই সুরে কথা বলেন।

“রেফারি আমাদের সঙ্গে খুবই অন্যায় করেছেন। ম্যাচের শুরু থেকেই আমরা অবিচারের শিকার হয়েছি।“

বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে কী বলছেন বিশ্লেষক?

বিবিসির ফুটবল বিষয়ক বিশ্লেষক ডেল জনসনের মতে, এই বিশ্বকাপে রেফারিদের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিলো স্বাভাবিক শারীরিক সংস্পর্শকে সহজভাবে নিতে, যাতে খেলার গতি বজায় থাকে। সেই বিবেচনায় মারওয়ান আতিয়ার হালকা স্পর্শের কারণে গোল বাতিল করাটা টুর্নামেন্টজুড়ে অনুসরণ করা রেফারিংয়ের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তার মতে, নিয়ম অনুযায়ী ভিএআর সেই ঘটনাটি পর্যালোচনা করতে পারতো, কারণ ওই ফাউলের পরই আক্রমণ গড়ে ওঠে গোল হয়েছিলো। তবে মাঠে যদি এমন সংস্পর্শে খেলা চালিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে ভিএআর থেকেও একই ধারাবাহিকতা থাকা উচিত ছিলো।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জয়সূচক গোলের আগে সালাহ’র সম্ভাব্য পেনাল্টির ঘটনাটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জনসন। তার মতে, ঘটনাটি অন্তত ভিএআরে খতিয়ে দেখা যেতো। যদিও তিনি বলেন, পেনাল্টি দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় মাত্রার স্পষ্ট ফাউল সেখানে ছিলো না বলেই হয়তো ভিএআর হস্তক্ষেপ করেনি। সে কারণেই আর্জেন্টিনার গোলটি বহাল থাকে।

ম্যাচটি ছিলো রোমাঞ্চ, নাটক, বিতর্ক এবং আবেগে ভরা। পেনাল্টি সেভ, বাতিল হওয়া গোল, লাল কার্ড, ভিএআর বিতর্ক এবং শেষ মুহূর্তের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন সব মিলিয়ে এটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় লড়াই হয়ে থাকবে। তবে ইজিপ্টের কাছে এই ম্যাচটি চিরকালই থেকে যাবে এক আক্ষেপের গল্প হিসেবে।