সেমিফাইনালে চার দলকে ঘিরে নজর রাখার মতো চারটি বড় বিষয়

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ০৩:২৬ পিএম

বিশ্বকাপ এবারও নাটকীয়তা আর স্মরণীয় মুহূর্তে ভরপুর। দীর্ঘ লড়াই শেষে এখন শিরোপার দৌড়ে টিকে আছে মাত্র চার দল। ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। এই চার দলের সামনে এখন আর মাত্র দুটি ম্যাচ। দুটি জয়ই তাদের বিশ্বকাপের শিরোপা এনে দিতে পারে। তাই সেমিফাইনালে ভুলের সুযোগ বলতে গেলে নেই বললেই চলে।

তাহলে শেষ চারের এই দুই লড়াইয়ে কী কী বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকবে? এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।

এমবাপ্পে বনাম ইয়ামাল, ইউরোপের দুই পরাশক্তির লড়াই

ফ্রান্স বনাম স্পেন, ডালাস স্টেডিয়াম

এই ম্যাচকে অনেকেই সম্ভাব্য একটি বিশ্বকাপ ক্লাসিক হিসেবে দেখছেন। ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে রোমাঞ্চের সব উপাদানই রয়েছে।

কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোকে ২-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠেছে ফ্রান্স। আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা এখন আট। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় লিওনেল মেসির থেকে তিনি এখন মাত্র এক গোল দূরে।

তবে ফ্রান্সের শক্তি শুধু এমবাপ্পেকে ঘিরেই নয়। দলে রয়েছে একাধিক ম্যাচজয়ী ফুটবলার। মরক্কোর বিপক্ষে দ্বিতীয় গোলটি করেছেন উসমান দেম্বেলে। এই বিশ্বকাপে তার গোল এখন পাঁচটি। অন্যদিকে আক্রমণ গড়ে তোলার দায়িত্বে দুর্দান্ত ভূমিকা রাখছেন মাইকেল অলিসে। পাঁচটি অ্যাসিস্ট নিয়ে তিনিই এখন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা সৃষ্টিশীল খেলোয়াড়।

ফ্রান্সের এই গভীরতা স্পেনের বিপক্ষে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। তবে স্পেনের আত্মবিশ্বাসও কম নয়। ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে তারা ফ্রান্সকে ২-১ গোলে হারিয়েই শিরোপার পথে এগিয়েছিল।

তবু অনেকের বিশ্বাস, স্পেন এখনও তাদের সেরা ফুটবলটা খেলেনি।

বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম আলোচিত তরুণ তারকা লামিন ইয়ামাল এখনও বিশ্বকাপে নিজের সেরাটা দেখাতে পারেননি। বার্সেলোনার এই উইঙ্গারের একমাত্র গোলটি এসেছে গ্রুপ পর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে।

অন্যদিকে চার গোল করা মিকেল ওয়ারসাবালও নকআউট পর্বের শেষ দুই ম্যাচে গোলের দেখা পাননি। ফলে পর্তুগাল ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেনকে উদ্ধার করতে বেঞ্চ থেকে নেমে শেষ মুহূর্তে গোল করতে হয়েছে মিকেল মেরিনোকে।

২০১০ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন দেখা স্পেন চাইবে, সেমিফাইনালেই যেন ইয়ামাল তার প্রতিভার প্রকৃত ঝলক দেখান। ম্যাচের আগের দিনই ১৯ বছরে পা দেবেন এই তরুণ।

যে পরিসংখ্যান নজরে রাখার মতো

ফ্রান্স খেলতে যাচ্ছে তাদের অষ্টম বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল। ব্রাজিলের সমান এই রেকর্ডের ওপরে রয়েছে শুধু জার্মানি, যারা ১২ বার শেষ চারে খেলেছে।

অন্যদিকে স্পেন এখন নিজেদের ইতিহাসের দীর্ঘতম অপরাজিত ধারায় রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চে কলম্বিয়ার বিপক্ষে হারের পর টানা ৩৬ ম্যাচে তারা হারেনি। এই সময়ে ২৭টি ম্যাচ জিতেছে, ড্র করেছে ৯টি।

বিশ্বকাপে দুই দলের এটি হবে মাত্র দ্বিতীয় মুখোমুখি। ২০০৬ সালের শেষ ষোলোতে পিছিয়ে পড়েও স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়েছিল ফ্রান্স।

পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন অধ্যায়

ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা, আটলান্টা স্টেডিয়াম

বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইগুলোর একটি আবারও ফিরছে। ২০১৮ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে খেলছে ইংল্যান্ড। তবে ফাইনালে উঠতে হলে তাদের টপকাতে হবে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে।

ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই মানেই ফুটবল ইতিহাসের বহু স্মৃতি। ঠিক ৪০ বছর আগে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার অনবদ্য নৈপুণ্যে বিদায় নিতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে।

এবার সেই আর্জেন্টিনার জার্সিতে আছেন আরেক কিংবদন্তি নাম্বার টেন, লিওনেল মেসি। ক্যারিয়ারে কখনও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে না খেলা মেসির জন্য প্রথম দেখাই হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মতো বিশাল মঞ্চে।

এই টুর্নামেন্টেই বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন মেসি। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও তিনি ও কিলিয়ান এমবাপ্পে সমানতালে এগিয়ে আছেন। দুজনেরই গোল আটটি।

তবে ইংল্যান্ডেরও রয়েছে নিজেদের নাম্বার টেন জুড বেলিংহাম। শেষ দুটি নকআউট ম্যাচেই তিনি জোড়া গোল করেছেন। ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার পর বিশ্বকাপে এমন কীর্তি গড়া প্রথম ফুটবলার তিনি। অধিনায়ক হ্যারি কেইনও ছয় গোল করে দারুণ ছন্দে আছেন।

দুই দলই অবশ্য এখনও নিজেদের সেরা ছন্দে খেলতে পারেনি। নকআউট পর্বে লড়াই করে, ধৈর্য ধরে জয় তুলে নিয়েই তারা সেমিফাইনালে এসেছে।

তাই বুধবারের ম্যাচেও আবেগ, লড়াই আর মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা দেখার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেল নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের চেয়ে আরও পরিণত ও মানসম্পন্ন ফুটবল দেখতে চান তার দলের কাছ থেকে।

যে পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ

২০১৮ সালের পর থেকে চারটি বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে উঠেছে ইংল্যান্ড। এর আগে নিজেদের পুরো ইতিহাসে যতবার শেষ চারে উঠেছিল, এই সময়ে ঠিক ততবারই সেই কীর্তি গড়েছে তারা।

এই বিশ্বকাপে টানা চার ম্যাচ জিতেছে থ্রি লায়ন্সরা। ১৯৬৬ সালের পর এক আসরে এটিই তাদের দীর্ঘতম জয়ের ধারা।

টমাস টুখেল ইংল্যান্ডের ইতিহাসে মাত্র দ্বিতীয় কোচ, যিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ছয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে অপরাজিত থেকেছেন। এর আগে একই কীর্তি ছিল ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপজয়ী কোচ আলফ র‍্যামসির।

অন্যদিকে ২০১৪, ২০২২ ও ২০২৬ বিশ্বকাপে শেষ চারে উঠেছে আর্জেন্টিনা। ২০১৪ সালের আগে ১৯৯০ সালের পর দীর্ঘ সময় তারা আর সেমিফাইনালে পৌঁছাতে পারেনি।