১৯৮৬ সালের ২২ জুন। মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও আসতেকা স্টেডিয়ামের ওপর খাঁ খাঁ করছে দুপুরের সূর্য। গ্যালারি আর ড্রেসিংরুমে তখন অদ্ভূত একটা নীরবতা। চার বছর আগের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের স্মৃতিটা তখনও তরতাজা। দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড দ্বীপের জমে যাওয়া কাদায় যে দেশের তরুণেরা একে-অপরের দিকে রাইফেল তাক করেছিলো, আজ তাদের লড়াই ফুটবল মাঠে।
কাগজে-কলমে এটি ছিলো বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল। কিন্তু মাঠের আবহে ছিলো ছায়াযুদ্ধের ছাপ। বহু বছর পর নিজের আত্মজীবনীতে ডিয়েগো ম্যারাডোনা লিখেছিলেন, ‘ম্যাচের আগে আমরা মুখে বলছিলাম ফকল্যান্ড (মালভিনাস) যুদ্ধের সাথে ফুটবলের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু মনে মনে আমরা জানতাম, আর্জেন্টিনার অনেক তরুণ সেখানে পাখির মতো গুলি খেয়ে মরেছে। আমাদের কাছে এটা ছিলো প্রতিশোধের মঞ্চ।’
ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনার ফুটবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন এক বৈরিতার সৃষ্টি হয়েছিলো সেদিন। প্রায় পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে যখন আরও একটা বিশ্বকাপ চলছে এখন, তবু তা ফুরোয়নি। ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই রাত পেরিয়ে আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনালে হয়তো একটা নতুন অধ্যায়ই যোগ হবে তাতে। এর আগে ফিরে যাওয়া যাক ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ‘রাইভ্যালরি’র একটির পেছনের গল্পে…
আর্জেন্টাইনরা ‘পশু’
১৯৮৬ সালের ম্যাচটি কেন প্রতিশোধের মঞ্চ হয়ে উঠেছিলো, তা বুঝতে হলে ফিরে যেতে হবে আরও একটু পেছনে। উনিশ শতকের শেষের দিকে ব্রিটিশ নাবিক, রেল প্রকৌশলী আর স্কুলশিক্ষকদের হাত ধরে বুয়েনস এইরেসের বন্দরে ফুটবলের হাতেখড়ি হয়। দশকের পর দশক আর্জেন্টাইনরা ইংলিশদের দেখতো ফুটবলের আদি গুরু আর ‘ফেয়ার প্লের’ প্রতীক হিসেবে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে তা বদলে যায়। ইংলিশরা পছন্দ করতো শারীরিক শক্তি, গতি আর সুশৃঙ্খল রক্ষণভাগ ধরে রাখার ফুটবল। আরেকদিকে আর্জেন্টাইনরা তৈরি করলো তাদের নিজস্ব ধারা—‘লা নুয়েস্ত্রা’ বা ‘আমাদের পথ’। যেই ফুটবলের মূল ভিত্তি পায়ের জাদু, ইম্প্রোভাইজেশন আর মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
দুই ভিন্ন সংস্কৃতির এই লড়াই প্রথমবার মুখোমুখি হয় ১৯৬৬ বিশ্বকাপে। এই ম্যাচের একটা পর্যায়েই আর্জেন্টিনার আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ থেকে বেরিয়ে যেতে বলেন রেফারি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, মুখে কোনো একটা গালি দিয়েছেন তিনি। অথচ রেফারি আর রাত্তিন ছিলেন ভিন্নভাষী। রাত্তিন তাই মাঠ ছাড়তে রাজি হননি। তার অভিযোগ, ইউরোপের রেফারি তাদের সঙ্গে অন্যায় করছেন!
ওই কথার রেশ থাকলো ম্যাচের পরও। ম্যাচশেষে ইংল্যান্ডের ফুটবলারদের জার্সি বদলানোয় বাধ সাধলেন কোচ আলফ রামস। শুধু তাই নয় তিনি বলে বসলেন, ‘আরে, ওরা তো পশু!’
তার এই মন্তব্য আর্জেন্টাইনদের আত্মসম্মানে আঘাত করেছিলো বেশ ভালোভাবেই। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে বিদায় নেওয়া আর্জেন্টিনা দেশে ফিরে পেলো বীরোচিত সংবর্ধনা। শুরু হলো ফুটবলের এক বৈরিতার ইতিহাসও।
ফকল্যান্ডের কালো ছায়া
এবারের ঘটনা ১৯৮২ সালের। আর্জেন্টিনার তৎকালীন সামরিক জান্তা ব্রিটিশ শাসনাধীন ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ দখল করে নেয়। জবাবে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার নৌবাহিনী পাঠান। ৭৪ দিনের সেই নির্মম যুদ্ধে ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ জন ব্রিটিশ সেনা নিহত হন। যুদ্ধে আর্জেন্টিনার পরাজয় দেশটির মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। অন্যদিকে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো মেতে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদী উল্লাসে।
চার বছর পর ১৯৮৬ বিশ্বকাপে যখন এই দুই দল কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হলো, ফিফা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলো বিষয়টিকে স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবে দেখাতে। কিন্তু কেউ তা বিশ্বাস করেনি। ইতিহাসের দায়টাই যে তখন বড় হয়ে গিয়েছিল!
মেক্সিকো সিটির সেই চার মিনিট
মেক্সিকো সিটিতে ১৯৮৬ বিশ্বকাপের সেই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের মাত্র চার মিনিট কেবল একটা ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেনি, বদলে দিয়েছিলো ফুটবলের দর্শনকেও।
ম্যাচের ৫১ মিনিটে ম্যারাডোনা ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে ফাঁকি দিয়ে শূন্যে লাফিয়ে হাত দিয়ে বল জালে ঠেলে দেন। রেফারিকে ফাঁকি দিয়ে যখন তিনি উল্লাস করছেন, ইংলিশ খেলোয়াড়রা তখন ক্ষোভে ফুঁসছে।
ইংলিশদের কাছে এটা ছিলো প্রতারণা, ফুটবলের নিয়মের অমর্যাদা। কিন্তু আর্জেন্টিনার মানুষের কাছে তা ‘ভিভেসা’ বা চাতুর্যের চূড়ান্ত রূপ। ম্যারাডোনা পরে এই গোলের একটা নামও ঠিক করে দিয়েছিলেন ‘হ্যান্ড অব গড।’
ইংলিশরা যখন সেই ক্ষোভ হজম করার চেষ্টা করছে, তখনই অবিশ্বাস্য একটা ঝড় বয়ে গেছে তাদের ওপর দিয়ে। ৫৫ মিনিটে নিজের রক্ষণভাগ থেকে বল পেয়ে ম্যারাডোনা দৌড় শুরু করেন। ৬০ গজ দূরত্ব, ১০ সেকেন্ড সময় আর একে একে পিটার বিয়ার্ডসলি, পিটার রিড, টেরি বুচার ও ফেনউইককে ড্রিবলিংয়ের মায়াজালে বোকা বানিয়ে, গোলরক্ষক শিলটনকে মাটিতে ফেলে বল জড়ালেন জালে। তৈরি হলো ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। চার মিনিটের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো ইংল্যান্ডও।
বেকহ্যাম ও সিমেওনে
নতুন শতাব্দীতে এসে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা অনেকটাই কমে আসে, তবে মাঠের নাটকীয়তা কমেনি। ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে আবারও মুখোমুখি হয় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডের পোস্টার বয় ডেভিড বেকহ্যামকে ফাউল করেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ডিয়েগো সিমেওনে। মাটিতে পড়ে থাকা অবস্থায় মেজাজ হারিয়ে সিমেওনেকে হালকা লাথি মারেন বেকহ্যাম। সিমেওনেও মাঠের নাটকীয়তা বাড়িয়ে ঘাসে লুটিয়ে পড়েন। রেফারি বেকহ্যামকে লাল কার্ড দেখান। টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় ইংল্যান্ড। নতুন একটা মাত্রাও খুঁজে পায় ইংল্যান্ড–আর্জেন্টিনা লড়াই।
সেই লড়াইটা আটলান্টায় এবার নতুন এক উচ্চতায় যায় কি না, তাই এখন দেখার। আর্জেন্টিনার এখনকার মহাতারকা লিওনেল মেসি প্রথমবার ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ায় রোমাঞ্চটা একটু বেশিই আছে!



