বাংলাদেশ কেন মূল্যস্ফীতিতে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে

এডিবির নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে বাংলাদেশে। সংস্থাটি সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত তীব্র হলে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বেড়ে এই চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে প্রবৃদ্ধি ও প্রবাসী আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৭:৩২ পিএম

দক্ষিণ এশিয়ায় একসময় সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতির জন্য আলোচনায় ছিলো শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান। কয়েক বছরের ব্যবধানে ওই দুই দেশ মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে পারলেও বাংলাদেশ পারছে না।

অথচ গত চার বছর ধরে বাংলাদেশের মানুষ বাজারে গিয়ে পরিচিত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হচ্ছে, একই পণ্য কিনতে কেন প্রতিদিনই পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আগের চেয়ে বেশি টাকা?

এমন পরিস্থিতিতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) নতুন পূর্বাভাস উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে।

সংস্থাটি বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে বাংলাদেশে। এসময় বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হবে বলে জুলাইয়ের এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক (এডিও) প্রতিবেদনে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের চেয়ে বেশি।

একইসঙ্গে এডিবি সতর্ক করেছে, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত, জ্বালানির দাম, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা ও দেশের কাঠামোগত দুর্বলতা মূল্যস্ফীতি কমানোর পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে নিম্নমুখী ঝুঁকি এখনও ভালোভাবেই রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাত আরও তীব্র হলে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়ে যেতে পারে। আর তাতে বৈদেশিক খাতে চাপ বাড়বে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও দুর্বল হতে পারে এবং প্রবাসী আয়ও কমে যেতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

আর এজন্য বাংলাদেশকে সংস্কারের ওপর জোর দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা।

“আরও শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা জোরদার করা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নত করা, আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দূর করতে সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এসব সংস্কার বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে, মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে,” বলেছেন তিনি।

অথচ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক টানা সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে গত কয়েক বছর ধরেই। এ সময় ঋণের সুদহার বাড়ানো হয়েছে, সরকার বিভিন্ন পণ্যে শুল্ক কমিয়েছে, বাজার তদারকির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যায়নি।

প্রশ্ন হচ্ছে, সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি, ১০ শতাংশ নীতিগত সুদহার, শুল্ক কমানো এবং বাজার তদারকির নানা উদ্যোগের পরও কেন চার বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির বৃত্ত থেকে বের হতে পারছে না বাংলাদেশ? কী বলছে এডিবির রিপোর্ট ও অর্থনীতিবিদরা?

মূল্যস্ফীতি কী, কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

সহজভাবে বললে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্য বেড়ে যাওয়াকেই মূল্যস্ফীতি বলা হয়। অর্থাৎ আগে যে পরিমাণ টাকা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বা সেবা কেনা যেত, মূল্যস্ফীতি বাড়লে একই জিনিস কিনতে আরও বেশি টাকা লাগে। এর ফলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। কিন্তু অর্থনীতির ভাষার এই সংজ্ঞার বাস্তব অর্থ আরও কঠিন। কারণ এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও।

মনে করুন, ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে একজনের বেতন বেড়েছে ৮ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেছে ৯ শতাংশ। তাহলে কাগজে-কলমে আপনার আয় তো বাড়েইনি উল্টো ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। অর্থাৎ আগের মতো একই পরিমাণ পণ্য কিনতে আরও বেশি টাকা খরচ করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষে জুন মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। একই সময়ে জাতীয় গড় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ।

অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির চাপে আসলে আয় কমেছে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বিবিএসের তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ।

এদিকে এডিবির পূর্বাভাস সত্য হলে আগের বছরের এই মূল্যস্ফীতির চেয়েও বেশি মূল্যস্ফীতি হবে চলতি অর্থ অর্থবছরে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে বাংলাদেশ

এডিবির প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় সবার ওপরে বাংলাদেশ। তবে সেটা ‘মূল্যস্ফীতিতে’।

এডিবির হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ।
বাংলাদেশের পরেই রয়েছে পাকিস্তান, যেখানে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ।

আফগানিস্তানে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৫ দশমিক ২ শতাংশ এবং নেপালে ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।

ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে জানিয়েছে এডিবি।

এখানেই বাংলাদেশের জন্য বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি একসময় ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। ২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশের বেশি এবং পাকিস্তানে ৫০ শতাংশের ওপরে উঠেছিল।

কঠোর আর্থিক সংস্কার, রাজস্ব শৃঙ্খলা, বিনিময় হার সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে দেশ দুটি ধীরে ধীরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে পরিস্থিতি ভিন্ন। এখানে মূল্যস্ফীতি টানা প্রায় চার বছর ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং এখনও তা কাঙ্ক্ষিতভাবে কমেনি।

মূল্যস্ফীতির প্রভাব প্রবৃদ্ধিতেও

এডিবির প্রতিবেদনে শুধু মূল্যস্ফীতি নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৭ সালে তা কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। যদিও এই প্রবৃদ্ধি দক্ষিণ এশিয়ার গড় প্রবৃদ্ধির চেয়ে কম।

এডিবি বলছে, দুর্বল রপ্তানি, বেসরকারি বিনিয়োগের ধীরগতি, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, অব্যাহত মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধিকে চাপে রাখবে।

অন্যদিকে ভারতের প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং আগামী বছর ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি হিসেবে ভারত শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখবে বলেই মনে করছে সংস্থাটি।

জ্বালানির দাম বাড়ার প্রথম ধাক্কার পর দ্বিতীয় ধাপে প্রায় সব পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে শুরু করে।

কেন কমছে না মূল্যস্ফীতি?

এডিবি বলছে, সম্প্রতি পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব এখনও পুরো অর্থনীতিতে কাজ করছে। জ্বালানির দাম বাড়লে শুধু পরিবহন খরচই বাড়ে না, উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ে। সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপানো হয়।

অর্থনীতিতে একে অনেক সময় 'সেকেন্ড রাউন্ড ইফেক্ট' বলা হয়। অর্থাৎ জ্বালানির দাম বাড়ার প্রথম ধাক্কার পর দ্বিতীয় ধাপে প্রায় সব পণ্য ও সেবার দাম বাড়তে শুরু করে।

এডিবির মতে, জ্বালানি ব্যয়ের এই দ্বিতীয় ধাপের প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয় এবং খাদ্য ও সেবা খাতে স্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে আগামী কয়েক মাসেও মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমবে না।

অন্যদিকে সারের ঘাটতির কারণে কৃষি খাতও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। তবে প্রবাসী আয়নির্ভর পারিবারিক ব্যয়ের কারণে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছে এডিবি।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ডিস্টিংগুইশড ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “সরকার শুল্ক কমানোসহ বিভিন্ন রাজস্ব সংক্রান্ত উদ্যোগ নিলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা বাজার; পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে কোথাও না কোথাও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।”

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টাকার অবমূল্যায়নের প্রভাব যা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বাড়ানোর একটি প্রভাবক হিসাবে আসতে পারে। রপ্তানি আয় কমলে প্রভাব পড়তে পারে ডলারে।

যার ফলে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়ায় আমদানিনির্ভর কাঁচামাল, জ্বালানি ও শিল্প উপকরণের খরচ বাড়বে। আর স্বাভাবিকভাবেই উৎপাদকরা সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামে সমন্বয় করবে। যাতে বাড়বে আপনার খরচ।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক প্রস্তাবে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি

দেশীয় বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার পাশাপাশি বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্কনীতি। গত ৩রা জুন যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশসহ প্রায় ৮৬টি দেশের (৬০টি অর্থনীতি) পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ১০ থেকে সাড়ে ১২ শতাংশ শুল্ক আরোপের একটি প্রস্তাব প্রকাশ করে।

প্রস্তাবটি কার্যকর হলে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় একক রপ্তানি বাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার, যার প্রায় ৮০ শতাংশই তৈরি পোশাক।

অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানি আয় কমতে পারে, ফলে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার দাম কমতে পারে।

আর টাকার মান কমলে জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য, শিল্পের কাঁচামাল ও খাদ্যপণ্য আমদানির খরচ বাড়বে, যার প্রভাব উৎপাদন ব্যয় ও পরিবহন ব্যয় হয়ে শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাবে।

অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্ক প্রস্তাব কেবল রপ্তানি খাতেই নয়, আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির ওপরও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

এডিবিও তাদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক অগ্রগতি সত্ত্বেও বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি ঘিরে অনিশ্চয়তা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।

এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হলে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে নতুন চাপ তৈরি হয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও জানানো হয়েছে।

মুদ্রানীতি ও উচ্চ সুদহারে সমাধান নেই

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক গত কয়েক বছর ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। তবে তাতে খুব একটা নাগালে আনা যায়নি মূল্যস্ফীতি।

দীর্ঘ সময় ধরে চলা মূল্যস্ফীতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেন, “২০২২ সালের শুরু থেকেই টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে বাংলাদেশের মানুষ। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, কিন্তু গত কয়েক মাসে তা আবারো বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে।”

উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর না করে কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)।

সংস্থাটির মতে, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর পরিবেশ তৈরি করতে হবে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে বেশ কিছু নিম্নমুখী ঝুঁকি রয়ে গেছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অতিরিক্ত চাহিদার কারণে নয়; বরং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, বিনিময় হারের সমন্বয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার সম্মিলিত প্রভাবে উচ্চ পর্যায়ে আটকে আছে।

অর্থাৎ বর্তমান মূল্যস্ফীতির বড় অংশই কস্ট-পুশ ইনফ্লেশন বা ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ায় পণ্যের দাম বাড়ছে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে শুধু সুদহার বাড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান।

“শুধু মুদ্রানীতি বা রাজস্বনীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়,” বলেছেন তিনি।

এদিকে সর্বশেষ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতেও নীতিগত সুদহার বা পলিসি রেপো রেট ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে রাখা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি, উচ্চ সুদহার বজায় থাকলে ঋণের চাহিদা কমবে, বাজারে অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হবে এবং মূল্যস্ফীতিও ধীরে ধীরে কমে আসবে।
কিন্তু বাস্তবে সেই ফল এখনও স্পষ্ট নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকও সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে স্বীকার করেছে, মূল্যস্ফীতির পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা বড় ভূমিকা রাখছে। তাই চাহিদা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করাও জরুরি।

বাজার ব্যবস্থাপনা কি সমাধান?

উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে শুধু আন্তর্জাতিক বাজার বা জ্বালানির দামকে দায়ী করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যায় না। অর্থনীতিবিদদের মতে, দেশের বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও মূল্যস্ফীতিকে দীর্ঘস্থায়ী করে তুলেছে। যা বর্তমান সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি বলে মনে করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

তিনি আলাপ-কে বলেন, “মূল্যস্ফীতির লাগাম টানা যাচ্ছে না। এর পেছনে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা অন্যতম কারণ হতে পারে। বাজার তদারকিতে যারা আছেন, তাদের পদক্ষেপ কাঙ্ক্ষিত ফল দিচ্ছে না। এর মধ্যে তেল-গ্যাসের পর বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হবে।”

ড. মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, সরকার শুল্ক কমানোসহ বিভিন্ন রাজস্ব-সংক্রান্ত উদ্যোগ নিলেও সেই সুবিধা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। আমদানিকারক, পাইকারি ও খুচরা বাজার পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে কোথাও না কোথাও অতিরিক্ত মুনাফার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সরকারকে তাই, একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। উৎপাদন বাড়াতে হবে। বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে।

চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান কমানো না গেলে মূল্যচাপ কমবে না বলেই মনে করেন তিনি।

এডিবির সর্বশেষ পূর্বাভাস ইঙ্গিত দিচ্ছে, সমস্যাটি সাময়িক নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা। জ্বালানি ব্যয়, বিনিময় হার, সরবরাহ ব্যবস্থা, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, উৎপাদন ব্যয় এবং দুর্বল বিনিয়োগ- সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ একটি জটিল চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ে ভালো কোনো সংবাদ না দিলেও দুটি প্রধান সেক্টরে বাংলাদেশর অর্থনীতি এখনও চাপ সামলে এগিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে করেন এডিবির বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আকিরা মাতসুনাগা।

তার ভাষায়, “কঠিন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিবেশের মধ্যেও রেমিট্যান্সের শক্তিশালী প্রবাহ এবং সেবা খাতের স্থিতিশীলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও চাপ সামলে এগিয়ে যাচ্ছে।”