আন্দোলনে মোদীর পতন ঘটানোর স্বপ্ন দেখা একদল বিভ্রান্ত মানুষ

আন্দোলন করে কি আসলেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পতন ঘটানো যায়?  ‘জ্ঞানেশগেট’ কি দিল্লির মসনদে ঢোকার গেট? সোশাল মিডিয়ায় মোদীর পতন ‘কাল-পরশু কিংবা বড়জোর সামনের মাস, আর তা না হলে - ‘এই তো বছর শেষে হবেই হবে’ বলে নিয়মিত ফোরকাস্ট দিয়ে ‘ট্রিকবেইট’ করছেন যারা, তাদের দর্শক বা পাঠকদের জন্যই এই লেখা। 

আপডেট : ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:২৫ পিএম

“জ্ঞানেশগেট’ কেলেঙ্কারিতে উত্তাল দিল্লি, মোদীর বিমান প্রস্তুত”। ধরুন এমন শিরোনামে পত্রিকায় একটি সংবাদ দেখলেন। এবং নিশ্চয়তা দিয়ে বলছি শিরোনামে লেখা তথ্যগুলো মিথ্যা নয়। নিশ্চয়ই আপনি আগ্রহ নিয়ে খবরটি পড়তে বসে যাবেন। পড়তে পড়তে আপনি জানবেন- তরুণদের আন্দোলনে সত্যি সত্যিই দিল্লি উত্তাল। বিব্রত মোদী সরকার ও বিজেপি। তিন মাসের মধ্যে মোদী সরকারের জন্য এটি দ্বিতীয় ধাক্কা। 

এই পর্যন্ত পড়ার পর পাঠক সম্পূর্ণ নতুন এক তথ্য পাবেন, মোদীর উড্ডয়নের জন্য বিমানও প্রস্তুত রয়েছে। হ্যাঁ, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দীর্ঘপথের বিদেশ সফরের জন্য বিশেষভাবে তৈরি ও উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন বোয়িং৭৭৭-৩০০ইআর বিমান ব্যবহার করেন, যেটি 'এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান' নামেই পরিচিত। ভারতের রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির সফরেও এই বিমান ব্যবহার করা হয়।

সামনের নভেম্বর মাসের শুরুতেই কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের সম্মেলনে যোগ দিতে অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডার সেন্ট জনসে যাওয়ার কথা রয়েছে নরেন্দ্র মোদীর। আর এ ধরনের সফরের অন্তত তিন বা চার সপ্তাহ আগে থেকেই 'এয়ার ইন্ডিয়া ওয়ান'কে প্রস্তুত করা হয়। কাজেই ‘মোদীর বিমান প্রস্তুত।’ শিরোনামের তথ্য দুটো আলাদাভাবে সত্য হলেও ইঙ্গিতটি বিভ্রান্তিকর।

সাংবাদিকতায়, এ ধরনের শিরোনামকে ‘ফলস কানেকশন’ বলা হয়। আবার ইদানীং ‘ট্রিকবেইট’ শব্দটিও বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে, যার অর্থ পাঠককে ভুল ধারণা দিয়ে ক্লিক করানো।

যা হোক, এটুকু বলার উদ্দেশ্য হলো শুরুতেই পাঠককে জানিয়ে দেওয়া যে, ভারতের মতো বৃহৎ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে দিল্লির রাস্তায় গণআন্দোলন শুরু হলেই কেন্দ্রীয় সরকারের পতন হয় না। দেশটির প্রশাসনিক কাঠামো, রাজ্য দ্বারা যুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা, সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং নির্বাচনের প্রক্রিয়াই সেই জায়গার বড় বাধা। বাংলাদেশে সোশাল মিডিয়ায় যারা মোদীর পতন ‘কাল-পরশু কিংবা বড়জোর সামনের মাস, আর তা না হলে- এই তো বছর শেষে হবেই হবে’ বলে নিয়মিত ফোরকাস্ট দিয়ে ‘ট্রিকবেইট’ করছেন, তাদের দর্শক বা পাঠকদের জন্যই এই দীর্ঘ লেখাটি।

দিল্লির আন্দোলনের লক্ষ্য নির্বাচন কমিশন

দিল্লির বর্তমান অস্থিরতার কেন্দ্রে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ভোটার তালিকা সংশোধন, নতুন ভোটার নিবন্ধনের ফরম এবং ভোটার তথ্যের সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ করার অভিযোগে তার পদত্যাগের দাবি উঠেছে। প্রশ্নটি কেবল একজন কর্মকর্তাকে ঘিরে নয়। যে প্রতিষ্ঠান ঠিক করবে কার নাম ভোটার তালিকায় থাকবে, তার ওপর মানুষ কতটা আস্থা রাখতে পারছে, আন্দোলনের আঘাতের কেন্দ্রবিন্দু সেই জায়গাতে।

কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তালিকা যাচাইয়ের নামে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং সেই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পক্ষপাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করছে। তাদের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত, একাধিকবার নিবন্ধিত এবং খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ব্যক্তিদের নাম সরিয়ে তালিকা শুদ্ধ করা হয়েছে। বিরোধীদের প্রশ্ন, তালিকা শুদ্ধ করার কাজে এত জীবিত ও যোগ্য মানুষের ভোট দেওয়ার অধিকার কেন অনিশ্চিত হবে?

এই বিরোধের মানবিক দিকটি সহজ। কাউকে বলতে হচ্ছে, তিনি মারা যাননি। কাউকে দেখাতে হচ্ছে, তিনি ভারতেই থাকেন। আবার কেউ নিজের নাম ফেরানোর জন্য কাগজ নিয়ে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরছেন। ভোটের দিন চলে গেলে পরে নাম ফিরে পাওয়াও হারানো ভোটটি ফিরিয়ে দেয় না। প্রশাসনিক ভুলের মূল্য তখন একজন নাগরিক নিজের রাজনৈতিক অধিকার দিয়ে দেন।

১১ই অক্টোবরের ভোরে ককরোচ কোথায়

নামটি শুনলে প্রথমে ব্যঙ্গ মনে হতে পারে। ব্যঙ্গ থেকেই এর যাত্রা, কিন্তু এখন সেই ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপির কর্মসূচি ঘিরে পুলিশ মোতায়েন হচ্ছে, আন্দোলনকারীদের আটক করা হচ্ছে, দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় চলাচলে বিধিনিষেধ আসছে। এমনকি কোনও কোনও জায়গায় ইন্টারনেট পরিষেবাও বন্ধ করছে সরকার।
এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দল নয়, বরং ‘পলিটিকাল প্রেশার গ্রুপ’ হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছে সিজেপি। যদিও ভারতজুড়ে তারা ইতিমধ্যে ধীরে ধীরে একটি সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে শুরু করেছে।

১০ই অক্টোবরের কর্মসূচি ঘিরে দিল্লিতে অন্তত তিন হাজার মানুষকে আটক করা হয়েছে। এনডিটিভির রাতের হালনাগাদ হিসাবে এই সংখ্যা রয়েছে, টাইমস অব ইন্ডিয়ার হিসাবে সংখ্যাটি সাত হাজারের বেশি। সিজেপি আরও বড় সংখ্যা দাবি করেছে। ফলে দেশজুড়ে মোট কতজনকে আটক করা হয়েছে, তার একটি অভিন্ন, স্বাধীনভাবে যাচাইকৃত হিসাব এখনো নেই। আটক সবাইকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, এমনও নয়। অনেককে রাতে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে ভারতীয় সময় ১১ই অক্টোবর রাত সোয়া বারোটা পর্যন্ত এনডিটিভির খবর অনুযায়ী সিজেপির শীর্ষ নেতারা ও ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি পুলিশের হেফাজতেই ছিলেন।

সংগঠনের পরিচিত মুখ অভিজিৎ দিপকে’কে দিল্লিতে বিমান নামার পর সেখান থেকেই আটক করা হয়। নেহা বোরা, যোগেন্দ্র যাদব, প্রশান্ত ভূষণ এবং একাধিক বিরোধী নেতাও আটক হন। ইন্টারনেট ও মেট্রো চলাচলে বিধিনিষেধ এবং ব্যাপক পুলিশি উপস্থিতি আন্দোলনকে ছড়িয়ে পড়তে বাধা দিয়েছে। তবু বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ থামেনি। সিজেপির পক্ষ থেকে রবিবার সকালেও যন্তর মন্তরমুখী কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছে।

এই অবস্থায় সংগঠনটির শক্তি যেমন দেখা যাচ্ছে, সীমাবদ্ধতাও দেখা যাচ্ছে। অনলাইনে বহু মানুষের সমর্থন পাওয়া, তাদের একটি নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে আসা এবং দীর্ঘ সময় একটি আন্দোলন টিকিয়ে রাখা - তিনটি ভিন্ন ধরনের কাজ। পুলিশি ও প্রশাসনিক বাধা সিজেপির সাংগঠনিক পরীক্ষা নিচ্ছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রেরও পরীক্ষা হচ্ছে: প্রতিবাদকারীদের দাবি অস্বীকার করার সঙ্গে তাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার অধিকার রক্ষা করা যাচ্ছে কিনা। রবিবার সকাল পর্যন্ত কোনও প্রাণহানি বা গুরুতর আহত হওয়ার খবর না থাকলেও, যে কোনও ভুল পদক্ষেপ পরিস্থিতি চরম অবনতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

পরীক্ষার খাতা থেকে ভোটার তালিকা

তরুণদের ক্ষোভের শুরু ভোটার তালিকা দিয়ে নয়। চাকরির অভাব, নিয়োগের অনিশ্চয়তা, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা ব্যবস্থার অব্যবস্থা এর আগে তাদের রাস্তায় এনেছে।

সিজেপির উত্থান মূলত এসব ক্ষোভকে যথাযথভাবে চিহ্নিত করে রাজপথের কর্মসূচিতে নামার মধ্য দিয়েই। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেকার যুবকদের ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ বলার প্রতিক্রিয়ায় অভিজিৎ দিপকে’র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রশ্ন ছিল- “সব ককরোচ যদি এক হয়...”। সেই ব্যঙ্গই দলটির পরিচয় হয়ে ওঠে। যদিও বিচারপতি সূর্য কান্ত তার ওই মন্তব্যটি নিয়ে পরবর্তীতে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তবু ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ হলো এবং তারা প্রথমেই পরীক্ষা ও শিক্ষা নিয়ে আন্দোলন করে এ বছরের জুলাইয়ে ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের উইকেট ফেলে দিলো। সেই অভিজ্ঞতা তরুণদের এই আত্মবিশ্বাস দিয়েছে যে, চাপ তৈরি করে প্রবল ক্ষমতাশীল সরকারকেও জবাবদিহির কঠিন পরীক্ষায় ফেলা সম্ভব।

কিন্তু ভারতে মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ একই প্রক্রিয়া নয়। প্রথমটি রাজনৈতিক নির্বাহীর ভেতরের সিদ্ধান্ত। দ্বিতীয়টির সঙ্গে ভারতীয় সাংবিধানিক সুরক্ষা অত্যন্ত জটিলভাবে জড়িত।

আপত্তি কমিশনের ভেতর থেকেও

ভারতের নির্বাচন কমিশনে বর্তমানে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে আরও দুই নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন। তিন সদস্যবিশিষ্ট এই নির্বাচন কমিশনে জ্ঞানেশ কুমারের সহকর্মী বাকি দুই কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশির লিখিত আপত্তিই চলমান আন্দোলন ও বিতর্কে ঘি ঢেলেছে। অভিযোগ, তাদের আপত্তির তোয়াক্কা না করেই বিগত দশ মাসে অন্তত ১৪ বার জ্ঞানেশ কুমার একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ভোটার নিবন্ধন এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন বলে নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত অভ্যন্তরীণ নথির বিবরণে উঠে এসেছে।

অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল কমিশনার সান্ধু ও যোশির অজ্ঞাতে কমিশনের নামে সিদ্ধান্ত নেওয়া, লিখিত আপত্তির পরও অনলাইন ফরমে পরিবর্তন রাখা, ভোটার তথ্যের সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা এবং কমিশনের অনুমোদন ছাড়া দায়িত্ব বণ্টনের আদেশ জারি করা। প্রতিটি বিষয়ে কমিশনের (পড়ুন জ্ঞানেশ কুমারের) ব্যাখ্যা ও পাল্টা বক্তব্য (পড়ুন বাকি দুই কমিশনারের) আছে। তাই অভিযোগগুলোকে আদালতে প্রমাণিত অপরাধের তালিকা হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু কমিশনের ভেতরের সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছে, সেই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই।

এই দুই কমিশনার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধস্তন নন। তিন সদস্যের কমিশনে সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের ভূমিকা আছে, মতভেদ হলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার সভায় সভাপতিত্ব করেন বলেই যে অন্য দুই সদস্যের মতামত উপেক্ষা করবেন সেই সুযোগ নেই।

ফরমের ছোট পরিবর্তন, বড় বাধা

বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা ‘ফরম ৬’ মূলত ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনপত্র। অনলাইনে এর সঙ্গে তিনটি অতিরিক্ত প্রশ্ন জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। আবেদনকারীকে জানাতে হচ্ছিল, আগের ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধনের’ ভোটার তালিকায় তার নিজের নাম ছিল কি না, বাবা-মা অথবা দাদা-দাদি বা নানা-নানির নাম ছিল কি না, অথবা উল্লিখিত তালিকায় নিজের বা বাবা-মায়ের নাম ছিল কি না। এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যে ‘বাধ্যতামূলক’, তা ফরমে কোথাও বলা ছিল না। কিন্তু উত্তর না দিয়ে অনলাইনে আবেদনও জমা দেওয়া যাচ্ছিল না।

ধরা যাক, একজন তরুণের সদ্য ১৮ বছর হয়েছে। তিনি নিজের বয়স ও ঠিকানার কাগজ জোগাড় করেছেন। এবার তাকে জানতে হচ্ছে, বহু বছর আগের ভোটার তালিকায় তার পরিবারের কার নাম ছিল। পরিবার বারবার বাসাবদল করলে, পুরোনো কাগজ হারিয়ে গেলে কিংবা আগের তালিকাতেই ভুল থাকলে এই অতিরিক্ত ধাপটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই বাড়তি তথ্য সংযোজনের জটিলতা, এর অস্পষ্ট পরিণতি এবং আবেদন জমা দেওয়ার বাধা নিয়ে জনমনে তৈরি হয় উদ্বেগ।

কমিশনার যোশি ও সান্ধুর আপত্তির আরেকটি দিক ছিল পরিবর্তনের আইনগত পদ্ধতি। তাদের অবস্থান ছিল, বিধিমালার অন্তর্ভুক্ত ফরমে এমন পরিবর্তনের জন্য যথাযথভাবে বিধি সংশোধন প্রয়োজন। আপত্তি সত্ত্বেও অনলাইন ব্যবস্থায় ঘোষণাটি থাকায় বিষয়টি ফরমের ভাষা বদলানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সফটওয়্যার যখন প্রতিবন্ধকতার নাম

ভোটার তালিকা এখন কেবল কাগজের খাতা নয়। নাম যোগ, সংশোধন, বাদ দেওয়া এবং আপিলের ফল কার্যকর করার সঙ্গে সফটওয়্যার জড়িত। মাঠপর্যায়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা যদি সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, অথচ তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় প্রবেশাধিকার না পান, তাহলে নাগরিকের সমস্যার সমাধান আটকে যেতে পারে।

গোয়ায় যোগ্য বলে বিবেচিত ৯৭ জনের নাম ফেরানো নিয়ে এমন জটিলতার বিবরণ সামনে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গেও আপিল নিষ্পত্তির সঙ্গে যুক্ত বিচারকেরা পোর্টালের সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এসব ঘটনা থেকে সফটওয়্যার দিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে ভোট চুরি হয়েছে, এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। কিন্তু আইনগত সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে প্রযুক্তিই বাধা হয়ে দাঁড়ালে তার দায় কার, সে প্রশ্নের উত্তর তো লোকে খুঁজবেই।

কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থার সুবিধা থাকতে পারে: একই নিয়ম প্রয়োগ, তথ্যের নিরাপত্তা, পরিবর্তনের হিসাব রাখা। ঝুঁকিও আছে। কার হাতে নাম বদলানোর ক্ষমতা, কে সেই পরিবর্তন পরীক্ষা করবেন এবং ভুল হলে কত দ্রুত সংশোধনহবে, তা অস্পষ্ট থাকলে ক্ষমতা কয়েকটি দরজার আড়ালে আটকে যায়। কমিশনের সফটওয়্যার নিয়ে আপত্তির রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই।

কত নাম বাদ পড়ল, কোথায় পড়লো

ভারতজুড়ে চলমান বিশেষ নিবিড় সংশোধনের বিভিন্ন পর্যায় মিলিয়ে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার হিসাব সামনে এসেছে। তবে এই সংখ্যাকে ভারতের চূড়ান্ত ভোটার সংখ্যার নিট হ্রাস বলা যাবে না। খসড়া থেকে বাদ পড়া, আপিলের পরে নাম ফিরে আসা এবং নতুন ভোটার যুক্ত হওয়া পৃথক হিসাব। আবার বাদ পড়া সব নামই যোগ্য ভোটারের, এমন দাবিও এই মোট সংখ্যা থেকে করা যায় না।

পার্থক্যটি বোঝার জন্য বিহারের হিসাব দেখা যায়। ২০২৫ সালের সংশোধনে সেখানে প্রথমে ৬৫ লাখ এবং পরে আরও ৩ লাখ ৬৬ হাজার নাম বাদ যায়। সব মিলিয়ে বাদ পড়া ভোটারের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৮ লাখ ৬৬ হাজারে। অন্যদিকে যুক্ত হয় ২১ লাখ ৫৩ হাজার নাম। ফলে নিট ভোটার কমে প্রায় ৪৭ লাখ ১৩ হাজার, মোট ভোটার প্রায় ৭ কোটি ৮৯ লাখ থেকে নেমে আসে ৭ কোটি ৪২ লাখে। ‘কত নাম বাদ গেছে’ এবং ‘শেষ পর্যন্ত কত ভোটার কমেছে’ এক প্রশ্ন নয়।

উত্তর প্রদেশের ২০২৬ সালের এপ্রিলের চূড়ান্ত তালিকায় সংশোধনের আগের তুলনায় প্রায় ২ কোটি ৪ লাখ ভোটার কমে যাওয়ার হিসাব রয়েছে। তামিলনাড়ুতে প্রায় ৭৪ লাখ, গুজরাটে প্রায় ৬৮ লাখ এবং কেরালায় প্রায় ৯ লাখ নিট হ্রাসের হিসাবও এসেছে। এগুলো নির্দিষ্ট সময়ের সংশোধনপূর্ব ও সংশোধনপরবর্তী তুলনা।

মুসলিম বা ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বীরাই কি বাদ পড়েছেন

মুসলিম ভোটারদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার প্রশ্নে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও মালদহ। সেখানে মুসলিমপ্রধান একাধিক আসনে বিপুল নাম বাদ পড়েছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের হিসাব অনুযায়ী, শুধু বিচারিক যাচাইয়ের পর্যায়ে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে বাদ যায় ৭৪ হাজার ৭৭৫ জন ভোটারের নাম, যা সংশোধনের আগের ভোটারের প্রায় ২৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ। লালগোলায় বাদ যায় ৫৫ হাজার ৪২০টি, ভগবানগোলায় ৪৭ হাজার ৪৯৩টি এবং মালদহের মোথাবাড়িতে ৩৭ হাজার ২৫৫টি নাম। এগুলো ওই নির্দিষ্ট পর্যায়ের হিসাব, সব পর্যায়ের সম্মিলিত সংখ্যা নয়।

এই ভূগোলের রাজনৈতিক অর্থও আছে। ওই পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি নাম বাদ পড়া দশটি আসনই তখন তৃণমূল কংগ্রেসের দখলে ছিল। ফলে বিরোধীদের শক্তিশালী এলাকায় ভোটার বাদ পড়ার অভিযোগকে শুধু ‘তারা কোনদলের সমর্থক, জানা নেই’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একই সঙ্গে মুসলিমপ্রধান এলাকায় বাদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তিকে মুসলিম কিংবা তৃণমূলের ভোটার ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। মতুয়া ও অন্য জনগোষ্ঠীর অধ্যুষিত এলাকাতেও বিপুল নাম বাদ পড়ার ঘটনা রয়েছে।

কাউকে তার ভোটের পছন্দ জিজ্ঞেস না করেও একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি কঠিন যাচাই চাপিয়ে নির্বাচনী ভারসাম্য বদলানো সম্ভব। এখানে সেটিই ঘটেছে কি না, তার উত্তর পেতে দেখতে হবে, কোথায় কী কারণে নাম বাদ গেছে, একই নিয়ম অন্য এলাকায় কীভাবে প্রয়োগ হয়েছে এবং আপিল করে কতজন ভোটের আগে নাম ফেরত পেয়েছেন। নাম বাদ দেওয়ার ভৌগোলিক ধরন তদন্তের যথেষ্ট কারণ হতে পারে। উদ্দেশ্যমূলক কারচুপির চূড়ান্ত প্রমাণ পেতে আরও তথ্য প্রয়োজন।

ভারতে নির্বাচন কমিশনের কত ক্ষমতা

ভারতের সংসদে দুটি কক্ষ: লোকসভা ও রাজ্যসভা। লোকসভার ৫৪৩টি নির্বাচিত আসনে মানুষ সরাসরি ভোট দেন। যে দল বা জোট লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন ধরে রাখতে পারে, কেন্দ্রীয় সরকার তার ভিত্তিতেই টিকে থাকে। রাজ্যসভার নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা ২৪৫, এর মধ্যে ২৩৩টি নির্বাচিত এবং ১২টি রাষ্ট্রপতির মনোনীত আসন। শূন্যপদের কারণে কার্যরত সদস্যসংখ্যা কম থাকতে পারে।

মানুষ রাজ্যের বিধানসভায় বিধায়ক বা এমএলএ নির্বাচন করেন। সেই নির্বাচিত বিধায়কেরা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের নিয়মে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচন করেন। রাজ্যসভায় পৌঁছানোর পর তারা সংসদ সদস্য বা এমপি। লোকসভার সদস্যরাও এমপি। ফলে একজন ভোটারের সরাসরি ভোট বিধানসভা গঠনের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে রাজ্যসভার গঠনেও ভূমিকা রাখে।

নির্বাচন কমিশন লোকসভা, রাজ্যসভা, বিধানসভা এবং রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতির নির্বাচন তত্ত্বাবধান করে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য রাজ্য নির্বাচন কমিশন পৃথক সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সেটিকে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের রাজ্য শাখা ভাবলে ভুল হবে। লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনের রাজ্য পর্যায়ের ব্যবস্থাপনায় প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তা বা সিইও কাজ করেন, জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা, ভোটার নিবন্ধন কর্মকর্তা ও বুথপর্যায়ের কর্মীরা তালিকা ও ভোটের কাজ এগিয়ে নেন।

রাজ্যের প্রধান নির্বাচনী কর্মকর্তাকে নির্বাচন কমিশন রাজ্য সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে মনোনীত করে। জেলা নির্বাচনী কর্মকর্তা ও ভোটার নিবন্ধন কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও কমিশনের নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারের সঙ্গে পরামর্শের ব্যবস্থা আছে। বুথ পর্যায়ের কর্মীরা বাড়ি বাড়ি তথ্য সংগ্রহ ও যাচাইয়ে সাহায্য করেন, নাম বাদ দেওয়ার চূড়ান্ত আইনগত সিদ্ধান্ত তাদের ব্যক্তিগত ক্ষমতা নয়। দায়িত্বের এই স্তরগুলো কার্যকর না হলে ওপরের একটি নির্দেশের ভুল নিচে হাজার মানুষের ভোগান্তি হয়ে পৌঁছায়।

নিয়োগের নিয়ম বদল, প্রশ্নের শুরু

দীর্ঘদিন ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতেন রাষ্ট্রপতি, কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। ২০২৩ সালের মার্চে সুপ্রিম কোর্ট একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা নির্ধারণ করে: সংসদ আইন না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা বা বৃহত্তম বিরোধী দলের নেতা এবং ভারতের প্রধান বিচারপতির কমিটির পরামর্শে নিয়োগ হবে।

সেই বছরের ডিসেম্বরে নতুন আইন হয়। নতুন বাছাই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর মনোনীত একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা থাকেন। প্রধান বিচারপতি বাদ পড়েন। ফলে তিন সদস্যের কমিটিতে সরকারের পক্ষে দুই সদস্য থাকার কাঠামো তৈরি হয়। এই নিয়মের অধীনেই জ্ঞানেশ কুমারের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ হয়। তিনি ২০২৫ সালের ১৯এ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেন।

নিয়োগের কাঠামোয় সরকারের প্রাধান্য থাকা মানেই নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি পক্ষপাত করবেন, এমন নয়। কিন্তু নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক উঠলে নিয়োগের এই কাঠামোও আলোচনায় আসে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু সরকারের কাছ থেকে আলাদা হয়ে কাজ করবে, সেটিই যথেষ্ট নয়, নাগরিকের চোখেও সেই দূরত্ব দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন।

কে এই জ্ঞানেশ কুমার

জ্ঞানেশ কুমার ১৯৮৮ ব্যাচের কেরালা ক্যাডারের আইএএস কর্মকর্তা। তার প্রকাশ্য কর্মজীবনের পরিচয় আমলা হিসেবে। তার বিজেপি-সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে প্রভাবশালী বিজেপি নেতা অমিত শাহর দায়িত্বাধীন স্বরাষ্ট্র ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে তিনি কাজ করেছেন। জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার-পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং অযোধ্যার রামমন্দির ট্রাস্ট-সংক্রান্ত কাজেও তার ভূমিকা ছিল। রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিতও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের এই অভিজ্ঞতা তার সঙ্গে বিজেপি সরকারের ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্কের প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করে।

অন্যদিকে কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধুও ১৯৮৮ ব্যাচের আইএএস কর্মকর্তা। উত্তরাখণ্ডের মুখ্যসচিব এবং জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। আর অপর কমিশনার বিবেক যোশি ১৯৮৯ ব্যাচের হরিয়ানা ক্যাডারের কর্মকর্তা, রেজিস্ট্রার জেনারেল ও সেনসাস কমিশনার, আর্থিক পরিষেবা সচিব এবং হরিয়ানার মুখ্যসচিব ছিলেন। অর্থাৎ কমিশনের বর্তমান তিন সদস্যই দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছেন। তাদের মধ্যে মতবিরোধকে নতুন কর্মীর ভুল বোঝাবুঝি বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ সীমিত।

‘জ্ঞানেশগেট’ নামটির ভেতরে কী আছে

‘ওয়াটারগেট’ ছিল যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি ও তা ধামাচাপা দেওয়ার কেলেঙ্কারি, যার পরিণতিতে ১৯৭৪ সালে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন পদত্যাগ করেন। এরপর রাজনৈতিক কেলেঙ্কারির নামের শেষে ‘গেট’ জুড়ে দেওয়ার চল তৈরি হয়। জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিতর্কেও ‘জ্ঞানেশগেট’ শব্দটি রাজনৈতিক বক্তব্যে ব্যবহার হয়েছে।

জট খুলবে কীভাবে

ভারতে নির্বাচন কমিশনের সদস্যদের পদত্যাগের নজির রয়েছে। এর আগে দেশটির প্রধান নির্বাচন কমিশনার নগেন্দ্র সিং ১৯৭৩ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে যোগ দিতে দায়িত্ব ছাড়েন। নির্বাচন কমিশনার অশোকলাভাসা ২০২০ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকে যান। অরুণ গোয়েল ২০২৪ সালে নির্বাচন কমিশনারের পদ ছাড়েন। কিন্তু এগুলো গণআন্দোলনে বাধ্য হয়ে পদত্যাগের উদাহরণ নয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদী চাইলেও প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণ করতে পারবেন না। এমনকি রাষ্ট্রপতির হাতেও সেই ক্ষমতা নেই। নির্বাচন কমিশনারের পদের সুরক্ষা দেশটির সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির মতো। তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত অসদাচরণ বা অক্ষমতার ভিত্তিতে সংসদের উভয় কক্ষে প্রয়োজনীয় বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রক্রিয়া পেরোতে হয়। প্রতিটি কক্ষে মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। এরপর রাষ্ট্রপতির আদেশে অপসারণ হয়। প্রধানমন্ত্রী তাকে পদত্যাগের অনুরোধ করতে পারেন, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তে বরখাস্ত করতে পারেন না।

ফলে স্লোগান থেকে অপসারণের দূরত্ব অনেক। অভিযোগকে প্রমাণে পরিণত করতে হবে, তদন্ত ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এগোতে হবে এবং সংসদে প্রয়োজনীয় সমর্থন পেতে হবে। সরকারপক্ষ সমর্থন না দিলে সেই অঙ্ক আরও কঠিন। আদালত কোনও সিদ্ধান্তের বৈধতা পরীক্ষা করতে বা বেআইনি সিদ্ধান্ত বাতিল করতে পারে। তাতেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে শূন্য হয়ে যায় না।

অচলাবস্থা তাই মূলত আস্থার। প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, কিন্তু তার সিদ্ধান্তে নাগরিকের একটি বড় অংশ বিশ্বাস করতে পারছেন না।

এই বিতর্ক মোদীর ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। কিন্তু প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি থেকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের দিকে এটি যাওয়ার কোনও সুযোগ বা সাংবিধানিক পথও নেই। মোদীর সরকার টিকে থাকার তাৎক্ষণিক পরীক্ষা লোকসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার। সেই সমর্থন বদলানো, জোট ভাঙা অথবা নির্বাচনে পরাজয়ের মতো ঘটনা ছাড়া শুধু একজন কমিশনারকে ঘিরে বিতর্ককে সরকারের পতনের আলামত হিসেবে দেখা বিবেচনাপ্রসূত রাজনৈতিক বিশ্লেষণ হবে না।

যারা এবার সামনে

অভিজিৎ দিপকে এবার আন্দোলনে ককরোচ পার্টির হয়ে যোগাযোগ ও রাজনৈতিক প্রচারের কাজ করেছেন। আম আদমি পার্টির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কাজের অভিজ্ঞতাও তার রয়েছে। ফলে তাকে সম্পূর্ণ রাজনীতির বাইরের, হঠাৎ আবির্ভূত এক তরুণ বললে তার অভিজ্ঞতার একটি অংশ হারিয়ে যায়। তিনি জানেন, মানুষের ক্ষোভকে ছোট বাক্যে কীভাবে প্রকাশ করতে হয় এবং সেই বাক্যকে কীভাবে বহু মানুষের নিজের কথা করে তুলতে হয়।

আন্দোলনের আরেক নেতা অমেয় রাঙ্কা আইআইটি কানপুরে প্রকৌশল এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে জনপ্রশাসন বিষয়ে পড়েছেন। খবরের শিরোনাম হয়ে ওঠা সৌরভ দাস অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন এবং অজিঙ্ক্য শিন্ডে প্রকৌশলী। সংগঠনের কাজেও সামনে এসেছেন। তাদের পরিচয়ে শিক্ষা, পেশাগত অভিজ্ঞতা ও ডিজিটাল যোগাযোগের দক্ষতা আছে। কিন্তু আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া এবং নির্বাচনী এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী সংগঠন গড়ে তোলা আলাদা পরীক্ষা, যেটি তাদের সামনে এখনো খোলা।

এবারের আন্দোলনে সোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া নেহা বোরা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা করেন এবং বামপন্থি ছাত্রসংগঠন আইসার জাতীয় সভাপতি। তার রাজনীতি সংগঠিত ছাত্র আন্দোলনের ধারায় গড়ে উঠেছে। সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে অনশনের অভিজ্ঞতাও আছে। তাকে সিজেপির আনুষ্ঠানিক নেতৃত্বের অংশ ধরে নেওয়া যাবে না। বৃহত্তর প্রতিবাদের পরিসরে তার মতো ছাত্রনেতার উপস্থিতি দেখায়, নতুন আন্দোলনের পাশে পুরোনো বাম ছাত্ররাজনীতির ধারাও সক্রিয়।

এই মুখগুলোর সবাইকে একই বয়সের খোপে রাখা কঠিন। কেউ বিশের শেষ দিকে, কেউ ত্রিশের কোঠায়। ‘জেনজি ও প্রি-জেনজি’ কথাটি এখানে একটি প্রজন্মগত বর্ণনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। জন্মসালের এক-দুই বছরের সীমারেখার চেয়ে তাদের অভিজ্ঞতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ: অনিশ্চিত চাকরি, ব্যয়বহুল শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস। তবে এসব অভিজ্ঞতা এক হলেই সবার মতাদর্শ এক হয়ে যায় না।

আম আদমির পরে, কিন্তু একই পথে নয়

ভারতে আন্দোলন থেকে রাজনৈতিক দল হওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। জরুরি অবস্থার পরে ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি ক্ষমতায় আসে মূলত একাধিক প্রতিষ্ঠিত বিরোধী শক্তির সমন্বয়ে। ১৯৮৫ সালে আসাম আন্দোলনের ছাত্রনেতারা আসাম গণপরিষদ গড়ে রাজ্যের ক্ষমতায় যান। আবার দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ভেতর থেকে ২০১২ সালে আম আদমি পার্টি গড়ে ওঠে এবং পরের বছর দিল্লিতে সরকার গঠন করে।

ককরোচ জনতা পার্টির আলাদা বৈশিষ্ট্য হলো ব্যঙ্গ, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং তরুণদের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাথেকে দ্রুত আন্দোলনের ভাষা তৈরি করা। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে পারদর্শিতা কিংবা কম বয়স নিজে কোনও রাজনৈতিক মতাদর্শ নয়।

নতুন মুখ এসেছে বলে কংগ্রেস, তৃণমূল বা বাম দলগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে, এমন নয়। তাদের স্থানীয় সংগঠন, ভোটের অভিজ্ঞতা, কর্মী এবং সংসদীয় উপস্থিতি আছে। তরুণেরা কিছু প্রশ্নকে সামনে আনতে পারেন, যেগুলো পুরোনো নেতৃত্ব বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলতে পারছে না। আবার পুরোনো দলগুলোও সেই আন্দোলনের সহযাত্রী হতে পারে, নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে কিংবা তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারে।

বাংলাদেশে ডানপন্থার উত্থান, ভারতে অন্য সম্ভাবনা

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরির কোটা নিয়ে। কিন্তু বৈষম্য, দমন-পীড়ন এবং রাজনৈতিক জবাবদিহির অভাবের ক্ষোভ তার সঙ্গে যুক্ত হয়। দীর্ঘদিনের ভোটাধিকার সংকট ও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অংশ ছিল। তাই ঘটনাটিকে শুধু চাকরির একটি নিয়ম পরিবর্তনের আন্দোলনবলে শেষ করা যায় না।

আওয়ামী লীগ নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল বলে দাবি করত। সেই সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উগ্র ডানপন্থার প্রভাব বাড়তে দেখা গেছে। নারীর প্রতি সহিংসতা ও হয়রানি, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা এবং মাজারে আগুন দেওয়া ও ভাঙচুরের ঘটনা এই সময়ের উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিপরীতে বর্তমান প্রতিবাদে ধর্মনিরপেক্ষ, প্রগতিশীল ও বামপন্থি তরুণদের দৃশ্যমান উপস্থিতি আছে। সে কারণে এখানে উল্টো দিকে রাজনৈতিক পরিসর প্রসারিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ভারতের অনিবার্য ভবিষ্যৎ নয়। আবার তরুণেরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন বলেই ভারতের আন্দোলন নিশ্চিতভাবে প্রগতিশীল পরিণতি পাবে, সেটিও বলা যায় না। সুযোগটিকে বাস্তব করতে হলে ভোটাধিকারের দাবি যেমন থাকবে, তেমনি ধর্ম, জাতপাত ও লিঙ্গ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকারের প্রশ্নও ধরে রাখতে হবে।

পঞ্চাশ বছর আগের সতর্কতা

ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা ঘোষণার ৫০ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০২৫ সালে। আর ১৯৭৭ সালে জরুরি অবস্থার অবসান ও কংগ্রেসের নির্বাচনী পরাজয়ের অর্ধশতক পূর্ণ হবে ২০২৭ সালে। কংগ্রেস প্রায় ৩০ বছর কেন্দ্রে ক্ষমতায় ছিল। সেই দীর্ঘ শাসনও পরাজয় ঠেকাতে পারেনি। ইন্দিরা ১৯৭৭ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন, জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ ও বিরোধী ঐক্য ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে। শুধু গণআন্দোলনে বাধ্য হয়ে তিনি নির্বাচন দিয়েছিলেন, এমন সরল ব্যাখ্যা সঠিক নয়।

সেই অভিজ্ঞতার পরে ভারত কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক রক্ষাকবচ তৈরি করেছে। ১৯৭৮ সালের ৪৪তম সংশোধনীতে জাতীয় জরুরি অবস্থার কারণ হিসেবে অস্পষ্ট ‘অভ্যন্তরীণ গোলযোগের’ জায়গায় ‘সশস্ত্র বিদ্রোহ’ আনা হয়। কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার লিখিত সিদ্ধান্ত ছাড়া রাষ্ট্রপতির কাছে এমন ঘোষণা করার পথ বন্ধ করা হয়। সংসদের উভয় কক্ষে এক মাসের মধ্যে বিশেষ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদন এবং বহাল রাখতে প্রতি ছয় মাসে নতুন অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হয়। লোকসভার অসম্মতির ভিত্তিতে প্রত্যাহারের পথও শক্তিশালী হয়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, জরুরি অবস্থার সময়ও সংবিধানের ২০ ও ২১ অনুচ্ছেদের অধিকার কার্যকর করার জন্য আদালতে যাওয়ার সুযোগ স্থগিত করা যায় না। এর মধ্যে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা রয়েছে। এই পরিবর্তনগুলো ১৯৭৫ সালের অভিজ্ঞতা হুবহু ফিরিয়ে আনার বিরুদ্ধে বাধা তৈরি করেছে।

উপমহাদেশের তুলনায় ভারতের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য সামরিক ও বেসামরিক ক্ষমতার সম্পর্ক। ভারতে স্বাধীনতার পর সেনাবাহিনী অভ্যুত্থান করে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দখল করেনি কিংবা সরকার গঠন ও অপসারণের নিয়মিত রাজনৈতিক মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠেনি। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সেনা মোতায়েনের ঘটনা আছে, সেটি রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের সমার্থক নয়। দিল্লির আন্দোলনের পরিণতি বোঝার সময় তাই সেনাবাহিনী কোন পক্ষে যাবে- এমন প্রশ্ন আসছেই না।

মোদীর শাসন প্রায় ১২ বছরের। কিন্তু ৩০ বছর বনাম ১২ বছর দিয়ে রাজনৈতিক পতনের হিসাব হয় না। দেখতে হয় জনসমর্থন, বিরোধীদের গ্রহণযোগ্যতা, মানুষের অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং ক্ষমতাসীন জোটের স্থায়িত্ব।

২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। সরকার গঠনে শরিকদের সমর্থন প্রয়োজন হয়েছে। শরিকেরা কোনও দিন সরে যাবেন না, তার নিশ্চয়তা নেই।

রাস্তায় ক্ষোভ যদি নির্বাচনী ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করে, তখন জোটের অঙ্ক বদলাতে পারে। সে জন্যই কোনও গণআন্দোলনের গুরুত্ব শুধু তাৎক্ষণিক সরকার পতন দিয়ে মাপা যায় না। আন্দোলন সরকারের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারে, বিরোধীদের এক জায়গায় আনতে পারে, নতুন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারে এবং পরের নির্বাচনে মানুষের পছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।

তবে ‘জ্ঞানেশগেট’ নিয়ে যতই আন্দোলন হোক আপাতত মোদী থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরেই। কারণ ‘জ্ঞানেশগেট’ দিল্লির মসনদে ঢোকার গেটই নয়।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী