মতামত

একটি ইন্টারভিউ, এরপর ফটোকার্ড অতঃপর ফেইসবুকে বিচারসভা

সামাজিক মাধ্যম আমাদের খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ দিয়েছে। আর সেই দ্রুততার সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত হয়েছে অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা।

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম

একটি সম্পর্কের ভেতরের সত্য কখনোই বাইরে থেকে সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। বিশেষ করে স্বামী-স্ত্রীর মতো দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে দু-একটি বাক্য, একটি ভিডিও কিংবা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো বক্তব্য দিয়ে বিচার করা কতটা যুক্তিসঙ্গত, সেই প্রশ্নটি আমাদের নিজেদেরই করা উচিত। 

অভিনেতা মুকিত জাকারিয়ার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে, সেটি সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে এসেছে এবং এটিই আমার লেখার বিষয়। ভোর চারটার দিকে বাড়ি ফিরে তিনি তার স্ত্রীর কাছে পরোটা খেতে চেয়েছেন এবং তখন তার স্ত্রীর জ্বর ছিলো ১০২ ডিগ্রি। এই বক্তব্যের অংশবিশেষ ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি দ্রুত নেতিবাচকভাবে ভাইরাল হয়। এরপর সামাজিক মাধ্যমে যেন এক ধরনের বিচারসভা বসে যায়। কেউ তার কথার সমালোচনা করেছেন, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কিন্তু অনেকেই সমালোচনার সীমা পেরিয়ে সরাসরি ব্যক্তিগত আক্রমণে গেছেন। তাকে ‘অমানুষ’ বলা হয়েছে, নানা ধরনের কটূ ও অশালীন মন্তব্য করা হয়েছে। তার চরিত্র ও ব্যক্তিজীবন নিয়েও নানা সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। অথচ যে ঘটনাটি নিয়ে এত বিচার, তার পুরোটা আমরা কেউই জানি না।

বিষয়টি শুনে কারও অস্বস্তি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একজন মানুষ যখন অসুস্থ, বিশেষ করে উচ্চ জ্বরে আক্রান্ত, তখন তার ওপর কোনো ধরনের প্রত্যাশা চাপিয়ে দেওয়া সংবেদনশীল বিষয়। তাই বক্তব্যটি প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও পরিমিত শব্দ ব্যবহার করা যেতো। এমন মতের যথেষ্ট কারণ আছে। এ ক্ষেত্রে যে মিডিয়া হাউজটি এরকম চটকদার টাইটেল দিয়ে খবর প্রকাশ করেছে তারা কি ঠিক করেছে? 

এ প্রশ্নটাও কি করা উচিত নয়? অভিনেতা ইন্টারভিউয়ে নিশ্চয়ই আরো অনেক কিছু বলেছেন। কিন্তু ক্যাপশন হিসাবে ফটোকার্ডে এমন লাইন কেন তুলে দেওয়া হলো? তারপর শুরু হলো সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়।

কিন্তু এখানেই কি গল্পটির শেষ? আমরা কি সত্যিই জানি, সেই মুহূর্তে তাদের দুজনের মধ্যে কী ধরনের বোঝাপড়া ছিলো? জানি কি, মুকিত জাকারিয়া ঠিক কোন আবেগ বা অভিব্যক্তি থেকে কথাটি বলেছেন? তিনি কি আক্ষরিক অর্থেই তার অসুস্থ স্ত্রীকে রান্না করতে বলেছেন, নাকি কোনো ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ বা স্মৃতি বলতে গিয়ে কথাটি এমনভাবে প্রকাশ করেছেন, যা বাইরে থেকে শুনলে অন্য অর্থ তৈরি করছে? এমনকি ‘১০২ ডিগ্রি’ বলাটিও আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করছি, সেটিও ভাবার বিষয়। মানুষ যখন কোনো ঘটনা বর্ণনা করে, তখন সব সময় প্রতিটি শব্দকে পরিমিত বা আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করে না। কেউ আবেগ দিয়ে কথা বলে, কেউ উদাহরণ দিতে গিয়ে সংখ্যা বাড়িয়ে বলে, কেউ গল্প বলার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাকে একটু নাটকীয় করে তোলে। একজন অভিনেতার কথাবলার মধ্যেও হয়তো সেই অভ্যাসের প্রভাব থাকতে পারে। পারে না?

অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে অসুস্থ স্ত্রীকে দিয়ে কাজ করানো স্বাভাবিক কিংবা এমন আচরণকে সমর্থন করা উচিত। বরং কথাটি বলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কিন্তু একটি বক্তব্যের ভাষা নিয়ে আপত্তি করা আর সেই বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষের পুরো ব্যক্তিত্ব, দাম্পত্য জীবন কিংবা তার স্ত্রীকে তিনি কতটা ভালোবাসেন—এসবের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিয়ে দেওয়া এক বিষয় নয়।

সমস্যাটা হয়তো এখানেই। আমরা সমালোচনা করতে গিয়ে অনেক সময় মানুষটাকেই বিচার করে ফেলি। একটি কথাকে ভুল মনে হলে বলতে পারি, ‘এই কথাটা ভালো লাগেনি’, ‘এভাবে বলা ঠিক হয়নি’ কিংবা ‘এখানে আরও সংবেদনশীল হওয়া দরকার ছিলো।’ কিন্তু সেখান থেকে কাউকে অমানুষ বলা, গালাগাল করা কিংবা তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করা কোনোভাবেই সুস্থ সমালোচনার মধ্যে পড়ে না।

সামাজিক মাধ্যম আমাদের খুব দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সুযোগ দিয়েছে। আর সেই দ্রুততার সঙ্গে অনেক সময় যুক্ত হয়েছে অসম্পূর্ণ তথ্যের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা। একটি ভিডিওর কয়েক সেকেন্ড, একটি বক্তব্যের দুটো লাইন কিংবা একটি সংবাদ শিরোনাম দেখেই আমরা পুরো ঘটনাটির বিচার করে ফেলি।

অথচ মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এত সরল নয়। একটি দাম্পত্যে এমন অনেক ভাষা, অভ্যাস, রসিকতা, বোঝাপড়া ও ব্যক্তিগত সংকেত থাকে, যার কোনোটি বাইরে থেকে শুনলে অদ্ভুত লাগতে পারে, কিন্তু সম্পর্কটির দুই মানুষ হয়তো সেটিকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বোঝেন। আবার এর উল্টোটাও সত্য—বাইরে থেকে খুব স্বাভাবিক দেখানো সম্পর্কের ভেতরেও অনেক অস্বস্তি থাকতে পারে। তাই কোনো দিক থেকেই বাইরে দাঁড়িয়ে খুব দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো নিরাপদ নয়।

আমাদের আবেগ প্রবল। কোনো কিছু আমাদের মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে হলে আমরা তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া জানাই। সেটি মানবিক। কিন্তু প্রতিক্রিয়া আর বিচার এক জিনিস নয়। আর সমালোচনা আর অপমানও এক জিনিস নয়।

আমার মনে হয়, মুকিত জাকারিয়ার বক্তব্যের ক্ষেত্রে সমালোচনার জায়গা থাকলে সেটি তার বক্তব্যের প্রকাশভঙ্গি নিয়ে হতে পারে। হয়তো আরও পরিষ্কার করে বলা দরকার ছিলো। হয়তো এমন একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ আরও সংবেদনশীলভাবে উপস্থাপন করা উচিত ছিলো। কিন্তু সেই দু-একটি বাক্যকে কেন্দ্র করে একজন মানুষকে ‘অমানুষ’ বানিয়ে ফেলা, তার চরিত্র নিয়ে রায় দেওয়া কিংবা তার সংসারের ভেতরের সম্পর্ক সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়া আমাদের কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। কারণ আমরা সেখানে ছিলাম না।

আমরা শুধু একটি বক্তব্য ফটোকার্ড মারফত জানতে পেরেছি। ঘটনাটি হয়তো যতটা বড় করে আমরা দেখছি, বাস্তবে ততটা কিছুই নয়। আবার আমাদের জানা তথ্যের বাইরেও হয়তো এমন কিছু আছে, যা আমরা জানি না।

তাই সবকিছুর আগে একটু থামা দরকার। কারও কথায় আপত্তি থাকতেই পারে। সমালোচনাও হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষকে অপমান করার আগে অন্তত এটুকু মনে রাখা দরকার—আমরা গল্পটির শুধু দর্শক, চরিত্র নই।

আর একটি সম্পর্কের পুরো গল্প কখনোই ফ্রেমের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখা যায় না।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী