বাংলাদেশে কেউ চুক্তির ফাঁক ব্যবহার করে বাড়তি অধিকার নিয়ে নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যখন জনগণের সম্পদ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়, তখন জনগণের জানা প্রয়োজন সেই অধিকারের সীমানা কোথায়। আস্থা গড়ে উঠতে হলে আশ্বাসের সঙ্গে শর্তগুলো পড়ার সুযোগও থাকতে হয়।
তন্ময় ইমরান
প্রকাশ : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৬ এএমআপডেট : ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৭ এএম
রোমান কবি ভার্জিল তার মহাকাব্য ‘ইনিড’-এ প্রায় দুই হাজার বছর আগে সমুদ্রপাড়ে জমি কেনার একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করেছিলেন। গল্পটি আজও মনে করিয়ে দেয়, চুক্তির একই কথা দুই পক্ষের কাছে কত ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
সেই গল্পের নারী দিদো। তিনি ছিলেন ফিনিশিয় নগরী টায়ারের রাজপরিবারের সদস্য। তার ভাই স্বামীকে হত্যা করার পর কিছু সঙ্গী নিয়ে সমুদ্রপথে পালিয়ে এসেছিলেন দিদো। পেছনে পরিচিত জীবন, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তার প্রয়োজন ছিলো একটু আশ্রয়, যেখানে নিজের মানুষদের নিয়ে আবার জীবন শুরু করা যায়।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছে দিদো স্থানীয় শাসকের কাছে জমি চাইলেন। শর্ত দেওয়া হলো, একটি ষাঁড়ের চামড়া দিয়ে যতটুকু জায়গা ঘেরা যায়, ততটুকুই তিনি পাবেন। শাসক হয়তো ভেবেছিলেন, এক টুকরো চামড়া আর কতখানি জায়গা ঢাকবে? কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর মাথা গোঁজার মতো জমি দিলেইতো হলো।
কিন্তু দিদো চামড়াটি মাটিতে বিছিয়ে দিলেন না। খুব সরু সরু ফালিতে কেটে সেগুলো জুড়ে তৈরি করলেন দীর্ঘ একটি বন্ধনী। সেই বন্ধনী দিয়ে ঘিরে ফেললেন অনেক বড় এলাকা। সেখানে গড়ে উঠল কার্থেজ।
ভার্জিলের কবিতায় ষাঁড়ের চামড়ায় ঘেরা জমির উল্লেখ আছে। চামড়া কেটে সরু ফালি বানানোর বিস্তারিত কাহিনি পাওয়া যায় রোমান ইতিহাসলেখক জাস্টিনের বিবরণে। এটি কিংবদন্তি। তবে গল্পটির প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। একটি চুক্তিতে ঠিক কতটুকু অধিকার দেওয়া হলো, আর সেই অধিকারের ব্যাখ্যা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে?
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে সেই প্রশ্নই এখন নতুন করে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পরিচালনার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু স্বাক্ষরিত পূর্ণ চুক্তিটি প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি বিবৃতি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কিছু শর্ত জানা গেলেও নাগরিকেরা পুরো দলিল পড়ে অধিকার, দায় ও সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে দেখতে পারছেন না। আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাই রয়ে যাচ্ছে চুক্তির শর্ত নিয়ে অস্পষ্টতা।
ভেতরে আশ্বাস, বাইরে প্রতিবাদ
৮ই অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির কথা। বাইরে ছিলো প্রতিবাদ। বাসদ, বাসদ মার্ক্সবাদী, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টিসহ বিভিন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক সংগঠন চুক্তির বিরোধিতা করেছে। বন্দরের শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও আপত্তি রয়েছে। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং চুক্তির স্বচ্ছতা।
দিদোর গল্পের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক এখানেই। বাংলাদেশে কেউ চুক্তির ফাঁক ব্যবহার করে বাড়তি অধিকার নিয়ে নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যখন জনগণের সম্পদ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়, তখন জনগণের জানা প্রয়োজন সেই অধিকারের সীমানা কোথায়। আস্থা গড়ে উঠতে হলে আশ্বাসের সঙ্গে শর্তগুলো পড়ার সুযোগও থাকতে হয়।
নিউমুরিং আসলে কী
ইংরেজি ‘মুরিং’ বলতে জাহাজকে নির্দিষ্ট জায়গায় বেঁধে রাখার ব্যবস্থাকে বোঝায়। চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় নিউমুরিং একটি স্থানের নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সেই নামেই পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। এটি বিশেষ কোনো ধরনের টার্মিনালের কারিগরি নাম নয়।
বন্দর হলো জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় কেন্দ্র। তার ভেতরে নির্দিষ্ট ধরনের পণ্য ওঠানো ও নামানোর জন্য আলাদা অংশ থাকে। সেই অংশই টার্মিনাল। কনটেইনার হলো পণ্য পরিবহনের বড় ধাতব বাক্স। পোশাক, কাপড়, যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল কিংবা ভোগ্যপণ্য এসব বাক্সে বহন করা হয়। একই বাক্স জাহাজ থেকে ট্রাক বা রেলে তোলা যায় বলে পথে বারবার পণ্য খুলে স্থানান্তর করতে হয় না।
জাহাজ ভেড়ানোর নির্দিষ্ট জায়গা ‘বার্থ’, কনটেইনার রাখার জায়গা ‘ইয়ার্ড’। ক্রেন দিয়ে সেগুলো তোলা, নামানো ও সরানো হলো ‘হ্যান্ডলিং’। আর পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘টিইইউ’। একটি ২০ ফুটের কনটেইনার এক টিইইউ, ৪০ ফুটের কনটেইনার সাধারণত দুই টিইইউ।
নিউমুরিং পুরো চট্টগ্রাম বন্দর নয়, তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ২০২৪ সালে বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ হয়েছে এখানে। এই টার্মিনালের পরিচালনায় পরিবর্তন তাই বাংলাদেশের আমদানি, রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশকে প্রভাবিত করতে পারে।
মালিকানা আর পরিচালনার অধিকার
সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে নিউমুরিং ও এর অতিরিক্ত কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড পরিচালনা এবং আধুনিকায়নের ১৫ বছরের অধিকার। জমি ও স্থাপনার মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘কনসেশন’। এতে নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ করার অধিকার দেওয়া হয়, সঙ্গে থাকে বিনিয়োগ, সেবা ও অর্থ প্রদানের শর্ত।
মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব নিয়ন্ত্রণ বুঝতে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সেবামূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? কোন সিদ্ধান্তে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে? কোম্পানি প্রতিশ্রুতি পূরণ না করলে কী শাস্তি হবে? জরুরি অবস্থায় সরকার কীভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নেবে? চুক্তি বাতিল করতে হলে কী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে কাগজে থাকা মালিকানা বাস্তবে কতটা কার্যকর থাকবে।
দুবাইয়ের বন্দর থেকে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা
ডিপি ওয়ার্ল্ডের মূল ব্যবসা বন্দর ও পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থাকে ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো ও নামানোর কাজ করে না। টার্মিনাল, গুদাম, পরিবহন এবং পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ধাপকে একসঙ্গে যুক্ত করার ব্যবসাও করে। কারখানা থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পথের যত বেশি অংশ একটি প্রতিষ্ঠান সামলাতে পারে, ব্যবসায় তার অবস্থান তত শক্তিশালী হয়।
এর উত্থান বুঝতে দুবাইয়ের ইতিহাসে ফিরতে হয়। ১৯৭২ সালে পোর্ট রাশিদ এবং ১৯৭৯ সালে জেবেল আলি বন্দর চালু হয়। জেবেল আলি দুবাইকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করতে সাহায্য করে। বন্দরের পাশে শিল্প, গুদাম ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে ওঠে। লক্ষ্য ছিল জাহাজ ভেড়ানোর জায়গার সঙ্গে একটি বিস্তৃত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা তৈরি করা।
২০০৫ সালে দুবাইয়ের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনার ব্যবসা একত্র হয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয়। পরের বছর প্রায় ৬৮০ কোটি ডলারে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান পি অ্যান্ড ও অধিগ্রহণ তার আন্তর্জাতিক বিস্তারকে বড় গতি দেয়। পরে গুদাম ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে আরও বিস্তৃত ব্যবসায় প্রবেশ করে কোম্পানিটি।
দুবাইয়ের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, মূলধন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিদেশে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা কেনার কৌশল এই উত্থানের ভিত্তি। এক দেশে টার্মিনাল চালানোর অভিজ্ঞতা অন্য দেশে চুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। সঙ্গে বেড়েছে সরকার, ব্যবসায়ী ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক।
ভারত ও চীন কেন বাংলাদেশের বন্দর নিয়ে আগ্রহী
বাংলাদেশের বন্দর শুধু বাংলাদেশের বাজারের প্রবেশদ্বার নয়। এর অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার স্থলবেষ্টিত এলাকার কাছাকাছি। ফলে পণ্য পরিবহনের সুবিধার সঙ্গে এখানে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও যুক্ত হয়।
ভারতের স্বার্থের সবচেয়ে স্পষ্ট দিক যোগাযোগ। বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য নেওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে। চট্টগ্রামের অবস্থান ত্রিপুরাসহ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা আবার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ এবং সড়ক ও রেল সংযোগকে ঘিরে আলাদা সম্ভাবনা তৈরি করে। খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথে ভারতীয় অর্থায়ন সেই যোগাযোগের স্বার্থের একটি বাস্তব উদাহরণ।
চট্টগ্রাম ও মোংলা দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু বন্দর ব্যবহারের অধিকার আর টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার এক বিষয় নয়। ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে গেলেই ভারত সেই বন্দরের অপারেটর হয়ে যায় না।
মোংলার টার্মিনাল পরিচালনায় ভারতের আগ্রহ নিয়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে পরিচালনার অধিকার পাওয়ার দাবিও এসেছে। তবে পূর্ণ চুক্তি ও বাস্তব পরিচালনার অবস্থা যাচাই ছাড়া মোংলা ভারতের হাতে চলে গেছে বলা ঠিক হবে না।
চীনের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের বাজার, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থায়ন এবং বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি। মোংলার উন্নয়নে চীনা ঋণসহ প্রকল্পের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল ও অন্যান্য সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প চীনা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা দেয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে।
তবে ঋণ দেওয়া, বন্দর নির্মাণ করা এবং বন্দর পরিচালনা করা তিনটি আলাদা ভূমিকা। এগুলোকে এক করে দেখলে ভূরাজনীতির আলোচনা বিভ্রান্তিকর হয়। চীনা অর্থায়নের প্রকল্প মানেই চীনের মালিকানাধীন বন্দর নয়।
তাহলে কোনটি বেশি কৌশলগত, চট্টগ্রাম না মোংলা? এক কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যের কেন্দ্রে চট্টগ্রাম। ভারতের পশ্চিম দিকের সংযোগ এবং নতুন অবকাঠামো গড়ার সুযোগের কারণে মোংলার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। উভয় বন্দরে বিভিন্ন শক্তির আগ্রহ আছে, তবে সেই আগ্রহের উদ্দেশ্য ও ধরন এক নয়।
নিউমুরিংয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড আসায় এই মানচিত্রে আমিরাতভিত্তিক আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলো। তাকে ভারত বা চীনের প্রতিনিধি ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। তবে বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অবস্থান অর্জন করায় কোম্পানিটির গুরুত্ব বাড়বে। সেই গুরুত্ব সামলাতে বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক সক্ষমতাও বাড়তে হবে।
বাণিজ্যিক টার্মিনাল কি সামরিক ঘাঁটি হয়ে যায়
বিদেশি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল চালালে তার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদেশি সেনা মোতায়েন পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। বাণিজ্যিক পরিচালনার চুক্তি থেকে সামরিক অধিকার অনুমান করার সুযোগ নেই। বিদেশি যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ কিংবা সামরিক উপস্থিতির জন্য আলাদা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও অনুমতি প্রয়োজন।
কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্ন কেবল সেনা সমাবেশে সীমিত নয়। পণ্য চলাচলের তথ্য কার হাতে থাকবে, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সংকটে সরকার কত দ্রুত দায়িত্ব নিতে পারবে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কতটা বাড়বে, এসবও নিরাপত্তার বিষয়।
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি চীনা ইজারা নিয়ে বিতর্ক এই উদ্বেগকে বাড়িয়েছে। তবে ঋণ শোধ করতে না পেরে চীন বন্দরটি সরাসরি কেড়ে নিয়েছে, এমন সরল বর্ণনা নিয়ে গবেষণায় আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষা নিতে হবে চুক্তির মেয়াদ, আর্থিক দায়, পরিচালনার অধিকার ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরীক্ষা করে। অন্য দেশের একটি ঘটনাকে হুবহু ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করে নয়।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সংকটের ইতিহাস
২০০৬ সালে পি অ্যান্ড ও কেনার পর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাওয়ার কথা ছিল। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন রাজনীতিতে প্রবল আপত্তি ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিক্রি করে দেয়। আন্তর্জাতিক বিস্তারের পথে এটি ছিল বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
তবে সেই বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোম্পানিটির সম্পর্কের স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটায়নি। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরবরাহব্যবস্থার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ২০২৬ সালে টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি বন্দরে কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়নের বিষয়ে একচেটিয়া আলোচনার ব্যবস্থাও হয়েছে। আলোচনা অবশ্য চূড়ান্ত পরিচালনচুক্তি নয়।
আরেকটি বড় সংকট আসে ২০২২ সালে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিকানাধীন পি অ্যান্ড ও ফেরিজ প্রায় ৮০০ কর্মীকে হঠাৎ চাকরিচ্যুত করে। ব্রিটেনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় পরামর্শপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করার বিষয়টি সংসদীয় তদন্তেও উঠে আসে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের উদ্বেগের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকলেই শ্রমিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
জিবুতির ডোরালেহ কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে বিরোধ দেখিয়েছে আরেক ধরনের ঝুঁকি। সরকার ও বিদেশি অপারেটরের সম্পর্ক ভেঙে গেলে তা দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সালিস ও আদালতের লড়াইয়ে গড়াতে পারে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি হলো, চুক্তি করার সময়ই বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তি থেকে বের হওয়ার শর্ত বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণটি ভিন্ন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অস্ট্রেলীয় কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত হওয়ার পর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন ও ফ্রিম্যান্টলে টার্মিনালের স্থলভাগে পণ্য আনা ও নেওয়ার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কাজ চালু হওয়ার পরও জমে যাওয়া কনটেইনার সরাতে সময় লাগে।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, বন্দরের নিরাপত্তা এখন তথ্য ও কম্পিউটার ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। নিউমুরিংয়ে নতুন প্রযুক্তি এলে জানতে হবে তথ্য কোথায় থাকবে, কারা দেখতে পারবে এবং ব্যবস্থা অচল হলে বিকল্প কী থাকবে।
এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের ছায়া
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টিনের সম্পর্ক প্রকাশ। যৌন অপরাধে দণ্ডিত এপস্টিনকে নিয়ে প্রকাশিত নথিতে তাঁদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ উঠে আসে। এর জেরে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ও কানাডার লা কেস ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে। ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিন সুলায়েম পদ ছাড়েন। চেয়ারম্যান হন ইসা কাজিম এবং প্রধান নির্বাহী হন যুবরাজ নারায়ণ। তবে প্রকাশিত যোগাযোগকে এপস্টিনের অপরাধে বিন সুলায়েমের অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
তারপরও দীর্ঘদিনের শীর্ষ ব্যক্তির এমন সম্পর্ক প্রকাশ পেলে প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল ওঠে বৈকি। প্রশ্ন ওঠে নেতৃত্বের বিচারবোধ, পরিচালনা পর্ষদের নজরদারি এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মান নিয়ে। এখানে সেই প্রশ্ন ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির মধ্যে সীমিতও থাকেনি, বিনিয়োগ সহযোগীদের সিদ্ধান্তে ব্যবসায়িক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নতুন নেতৃত্ব এসেছে বলেই যাচাই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। জানতে হবে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সুনামের সংকট সামলাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় চুক্তির অংশীদার হিসেবে তার জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
ব্যানানা বন্দরের অনুসন্ধানী প্রশ্ন
কঙ্গো নদীর মোহনায় আটলান্টিকের পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরু ভূখণ্ডে ব্যানানা বন্দরের অবস্থান। মানচিত্রে এমন সরু, বাঁকানো ভূখণ্ড দেখে কলার কথা মনে হতে পারে। তবে এই আকৃতি থেকেই জায়গাটির নাম ‘ব্যানানা’ হয়েছে, এমন ব্যাখ্যার নির্ভরযোগ্য সমর্থন পাওয়া যায়নি। আকৃতির তুলনাটি একটি চিত্রকল্প হতে পারে, নিশ্চিত নামকরণের ইতিহাস নয়।
কঙ্গোর ব্যানানা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ডিপি ওয়ার্ল্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নতুন বন্দর গড়ে তোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে এখানে প্রকল্পের আলোচনা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধানী প্রশ্ন উঠেছে।
হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপিএলএএএফ প্রকল্পের প্রাথমিক আলোচনায় রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেছিল। পরে পিপিএলএএএফ ও দ্য ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের অনুসন্ধানে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ এলাকা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন আসে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং স্থানীয় আইন অনুসরণের কথা জানিয়েছে। অভিযোগগুলোকে আদালতে প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে লেখা যাবে না। তবে এগুলো দেখায়, বন্দর প্রকল্প মূল্যায়নে বিনিয়োগের অঙ্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী, ব্যবসার কাঠামো ও পরিবেশগত দায়ও পরীক্ষা করা দরকার।
শ্রমিকদের জীবিকা কোথায় থাকবে
নিউমুরিংয়ের পরিবর্তনে কতজন চাকরি হারাতে পারেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। তাই সম্ভাব্য ছাঁটাইয়ের সংখ্যা বানিয়ে বলা যাবে না। নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, চুক্তির কারণে বন্দরের কর্মকর্তা বা শ্রমিক চাকরি হারাবেন না এবং বিদ্যমান মোট বেতনের কাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সরকারি ঘোষণায় প্রশিক্ষণের কথাও রয়েছে।
কিন্তু এই আশ্বাসের আওতায় কারা পড়ছেন, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বন্দর কর্তৃপক্ষের স্থায়ী কর্মী, অপারেটরের কর্মী, ঠিকাদারের শ্রমিক এবং দৈনিক বা অনিয়মিত কাজ করা মানুষদের অবস্থা এক নয়। চাকরি বজায় থাকলেও কাজের ধরন, অতিরিক্ত কাজের আয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়োগের সুযোগ বদলাতে পারে।
নিউমুরিংয়ের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কত মানুষের জীবিকা যুক্ত, তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য হিসাব প্রয়োজন। ক্রেনচালক ও শ্রমিকের পাশাপাশি ট্রাকচালক, মেরামতকর্মী, পরিবহন এবং আশপাশের সেবাব্যবসার মানুষদেরও বিবেচনায় আনতে হবে।
সরকারের উচিত কর্মীদের শ্রেণিভিত্তিক সংখ্যা এবং তাঁদের সুরক্ষার শর্ত প্রকাশ করা। নতুন প্রযুক্তিতে কাজ বদলালে প্রশিক্ষণ কে পাবেন, কোনো পদ অপ্রয়োজনীয় হলে পুনর্বিন্যাস কীভাবে হবে এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কী, এসব জানা দরকার। আধুনিকায়নের সাফল্য কনটেইনারের সংখ্যার সঙ্গে মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা দিয়েও মাপতে হবে।
বাংলাদেশের অনাস্থার পুরোনো ইতিহাস
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্দরসংক্রান্ত অধিকার দেওয়ার বিতর্ক আজকের নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টিভেডোরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা বা এসএসএকে ঘিরে বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনালের প্রস্তাব আসে। শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিকদের আপত্তি শুরু হয়। বিষয়টি আদালতেও যায়।
২০০২ সালে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ সেই বিরোধিতাকে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করে। ২০০৩ সালে মোংলা অভিমুখেও লংমার্চ হয়। তবে সেটিকে শুধু মোংলা বন্দর ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলন বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। গ্যাস রপ্তানি, জ্বালানি অধিকার ও সুন্দরবনসংক্রান্ত দাবিও ছিল।
এসএসএর প্রস্তাব আর বর্তমান নিউমুরিং চুক্তি একই প্রকল্প নয়। তবু মানুষের স্মৃতিতে এগুলো যুক্ত হয় একটি সাধারণ উদ্বেগের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কিন্তু নাগরিকের অংশগ্রহণ ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ কতটা?
এই অনাস্থাকে শুধু বিদেশিবিরোধিতা বলে সরিয়ে দিলে সমস্যাটি বোঝা যায় না। আবার প্রতিবাদকারী সংগঠনগুলোর অবস্থানকে বাংলাদেশের সব মানুষের মতামত বলাও ঠিক হবে না। কারও কাছে বিদেশি অপারেটর দক্ষতা আনার সুযোগ, কারও কাছে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি। প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতেই এই দুই অবস্থানের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
আয় বাড়বে, না কমবে
সরকারি ঘোষণায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রাথমিক অর্থপ্রদান এবং প্রথম দশ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সঙ্গে থাকবে রাজস্ব ভাগাভাগি ও নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থপ্রদান। কিন্তু প্রাথমিক অর্থ, বিনিয়োগ এবং নিয়মিত আয় আলাদা বিষয়। সব যোগ করে তাকে বাংলাদেশের লাভ বলা যায় না।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে নিউমুরিংয়ের মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকা এবং নিট আয় প্রায় ৫৭৪ কোটি টাকা। নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে হলে জানতে হবে কোন আয়ের ওপর কত অংশ দেওয়া হবে, কোন খরচ কার এবং বিনিয়োগের দায় কতটা নিশ্চিত। সংবাদমাধ্যমে রাজস্ব ভাগের হার নিয়েও ভিন্ন বিবরণ এসেছে। পূর্ণ চুক্তির হিসাবের সূত্র ছাড়া লাভ বা ক্ষতির নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।
এই অস্পষ্টতা থেকেই কম আয় হওয়ার একটি আপাত হিসাব মানুষের মনে তৈরি হতে পারে। একটি প্রতিবেদনে বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ৬৭ শতাংশ রাজস্ব এবং বছরে ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট অর্থপ্রদানের কথা এসেছে। শুধু উদাহরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাক, পুরোনো ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার পুরো আয়ই নতুন ব্যবস্থায় ভাগাভাগির আওতায় পড়বে এবং আয় অপরিবর্তিত থাকবে। তাহলে ৬৭ শতাংশ ও বার্ষিক অর্থ মিলিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাপ্তি হবে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে পুরোনো হিসাবে দেশীয় অপারেটরকে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। মোট আয় থেকে শুধু সেই অর্থ বাদ দিলে থাকে প্রায় ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্ক পাশাপাশি রাখলে বছরে প্রায় ৩১২ কোটি টাকা কম পাওয়ার ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু এটি নিট লাভের তুলনা নয়। পুরোনো ব্যবস্থায় ওই অবশিষ্ট টাকা থেকেই বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরও ব্যয় বহন করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় সেই ব্যয়ের কতটা ডিপি ওয়ার্ল্ড নেবে, কোন আয় ভাগাভাগির বাইরে থাকবে এবং আয় কতটা বাড়বে, তা না জানলে এই পার্থক্যকে প্রকৃত ক্ষতি বলা যাবে না।
ঠিক এখানেই চুক্তি প্রকাশের প্রয়োজন। আপাত হিসাবে দেখা এই ঘাটতি যদি পরিচালন ব্যয় সাশ্রয়, নতুন বিনিয়োগ বা বাড়তি আয় দিয়ে পুষিয়ে যায়, সরকারকে সেটি দেখাতে হবে। আর না গেলে কেন এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। পূর্ণ হিসাব খোলাসা না করলে প্রায় ৩১২ কোটি টাকা কম প্রাপ্তির এই শর্তসাপেক্ষ উদাহরণই কারও কাছে নিশ্চিত লোকসানের হিসাব বলে মনে হতে পারে। তথ্যের ঘাটতি তখন অনাস্থার জায়গা আরও বড় করে।
তুলনা করতে হবে দুটি ভবিষ্যৎ। ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে কী হবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজে বিনিয়োগ করে আধুনিকায়ন করলে কী হতে পারত। কেবল আজকের ব্যবস্থার সঙ্গে একটি উন্নত ভবিষ্যতের তুলনা করলে হিসাব অসম্পূর্ণ থাকে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আয় ছাড়াও দেশের ব্যবসার খরচ দেখতে হবে। দ্রুত কনটেইনার ছাড় হলে অপেক্ষা ও গুদামের ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু সেবামূল্য বাড়লে সুবিধার কিছু অংশ হারিয়েও যেতে পারে। সুফল রপ্তানিকারক, আমদানিকারক ও ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের অংশ।
অন্য দেশে চুক্তি প্রকাশ হয় কীভাবে
সর্বত্র এক নিয়ম নেই। বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় চিলি ও পেরুর মতো দেশে পূর্ণ পিপিপি চুক্তি প্রকাশের নজির রয়েছে। যুক্তরাজ্যে বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল কিছু অংশ বাদ দিয়ে চুক্তি প্রকাশ করা হয়। কোথাও চুক্তির পাশাপাশি সহজ ভাষায় সারসংক্ষেপ এবং নিয়মিত কাজের অগ্রগতিও জানানো হয়।
বাংলাদেশেও সত্যিকার সংবেদনশীল অংশ বাদ দিয়ে মেয়াদ, রাজস্ব ভাগ, বিনিয়োগ, সেবামূল্য, শ্রমিকের অধিকার, জরিমানা, বাতিলের শর্ত ও রাষ্ট্রের আর্থিক দায় জনসমক্ষে আনা সম্ভব।
পূর্ণ নিউমুরিং চুক্তি কেন প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না, তার যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সারসংক্ষেপ প্রকাশ হয়েছে, ফলে কোনো তথ্যই জানানো হয়নি বলা যাবে না। আবার সারসংক্ষেপ পূর্ণ দলিলের বিকল্প নয়। চুক্তি সদ্য স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে প্রকাশের একটি সময়সূচি জানানো যেতে পারে। কোনো অংশ গোপন রাখতে হলে কোন অংশ এবং কেন, সেটিও ব্যাখ্যা করা উচিত।
উদ্যোগ আওয়ামী লীগ আমলে, ধারাবাহিকতা বিএনপি আমলেও
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুনরাবৃত্তি চোখ এড়ানো কঠিন। এসএসএ এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে আলোচিত এই দুটি উদ্যোগের সূচনা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময়েও উদ্যোগ এগিয়েছে এবং বড় প্রতিবাদ হয়েছে। তবে প্রতিটি বন্দরচুক্তির ইতিহাস পরীক্ষা না করে ‘প্রত্যেকবারই’ এমন হয়েছে বলা নির্ভুল হবে না।
এসএসএর প্রস্তাব আওয়ামী লীগ আমলে এলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করেনি। প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। পরে আদালতের সিদ্ধান্তে তা বাস্তবায়িত হয়নি। নিউমুরিংয়েও আওয়ামী লীগ আমলের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এগিয়েছে। এরপর বিএনপি সরকার আলোচনা অব্যাহত রেখে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
বিএনপি কেন পিছিয়ে আসেনি, সেই প্রশ্ন তাই যৌক্তিক। সরকারের প্রকাশ্য যুক্তি বিনিয়োগ, আধুনিকায়ন ও দক্ষতা। এর বাইরে গোপন সমঝোতার কথা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়। পরস্পরের প্রবল বিরোধী দুই দল ক্ষমতায় এসে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে কেন একই পথে হাঁটে? এটি কি নীতিগত ঐকমত্য, আগের প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা, নাকি বিকল্প পরিকল্পনার অভাব? উত্তরটি সরকারেরই দেওয়া প্রয়োজন।
দিদোর গল্পে শাসক হয়তো এক টুকরো চামড়ার সম্ভাবনা বুঝতে পারেননি। আধুনিক রাষ্ট্রের সেই অজুহাত থাকার কথা নয়। তার হাতে আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আছে। নিউমুরিংয়ের প্রশ্ন তাই কে টার্মিনাল চালাবে তার সঙ্গে কোন শর্তে চালাবে, সেটিও। আর সেই শর্ত জানার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের।
নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা: দিচ্ছে কোন ইশারা?
বাংলাদেশে কেউ চুক্তির ফাঁক ব্যবহার করে বাড়তি অধিকার নিয়ে নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যখন জনগণের সম্পদ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়, তখন জনগণের জানা প্রয়োজন সেই অধিকারের সীমানা কোথায়। আস্থা গড়ে উঠতে হলে আশ্বাসের সঙ্গে শর্তগুলো পড়ার সুযোগও থাকতে হয়।
রোমান কবি ভার্জিল তার মহাকাব্য ‘ইনিড’-এ প্রায় দুই হাজার বছর আগে সমুদ্রপাড়ে জমি কেনার একটি কিংবদন্তির উল্লেখ করেছিলেন। গল্পটি আজও মনে করিয়ে দেয়, চুক্তির একই কথা দুই পক্ষের কাছে কত ভিন্ন অর্থ বহন করতে পারে।
সেই গল্পের নারী দিদো। তিনি ছিলেন ফিনিশিয় নগরী টায়ারের রাজপরিবারের সদস্য। তার ভাই স্বামীকে হত্যা করার পর কিছু সঙ্গী নিয়ে সমুদ্রপথে পালিয়ে এসেছিলেন দিদো। পেছনে পরিচিত জীবন, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। তার প্রয়োজন ছিলো একটু আশ্রয়, যেখানে নিজের মানুষদের নিয়ে আবার জীবন শুরু করা যায়।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, উত্তর আফ্রিকার উপকূলে পৌঁছে দিদো স্থানীয় শাসকের কাছে জমি চাইলেন। শর্ত দেওয়া হলো, একটি ষাঁড়ের চামড়া দিয়ে যতটুকু জায়গা ঘেরা যায়, ততটুকুই তিনি পাবেন। শাসক হয়তো ভেবেছিলেন, এক টুকরো চামড়া আর কতখানি জায়গা ঢাকবে? কয়েকজন আশ্রয়প্রার্থীর মাথা গোঁজার মতো জমি দিলেইতো হলো।
কিন্তু দিদো চামড়াটি মাটিতে বিছিয়ে দিলেন না। খুব সরু সরু ফালিতে কেটে সেগুলো জুড়ে তৈরি করলেন দীর্ঘ একটি বন্ধনী। সেই বন্ধনী দিয়ে ঘিরে ফেললেন অনেক বড় এলাকা। সেখানে গড়ে উঠল কার্থেজ।
ভার্জিলের কবিতায় ষাঁড়ের চামড়ায় ঘেরা জমির উল্লেখ আছে। চামড়া কেটে সরু ফালি বানানোর বিস্তারিত কাহিনি পাওয়া যায় রোমান ইতিহাসলেখক জাস্টিনের বিবরণে। এটি কিংবদন্তি। তবে গল্পটির প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক। একটি চুক্তিতে ঠিক কতটুকু অধিকার দেওয়া হলো, আর সেই অধিকারের ব্যাখ্যা কত দূর পর্যন্ত যেতে পারে?
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে সেই প্রশ্নই এখন নতুন করে উঠছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে পরিচালনার চুক্তি হয়েছে। কিন্তু স্বাক্ষরিত পূর্ণ চুক্তিটি প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি বিবৃতি ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কিছু শর্ত জানা গেলেও নাগরিকেরা পুরো দলিল পড়ে অধিকার, দায় ও সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে দেখতে পারছেন না। আধুনিকায়নের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি তাই রয়ে যাচ্ছে চুক্তির শর্ত নিয়ে অস্পষ্টতা।
ভেতরে আশ্বাস, বাইরে প্রতিবাদ
৮ই অক্টোবর ঢাকার আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের অনুষ্ঠানে বলা হয়েছে বিনিয়োগ, নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষতা বৃদ্ধির কথা। বাইরে ছিলো প্রতিবাদ। বাসদ, বাসদ মার্ক্সবাদী, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টিসহ বিভিন্ন বাম ও গণতান্ত্রিক সংগঠন চুক্তির বিরোধিতা করেছে। বন্দরের শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও আপত্তি রয়েছে। তাদের উদ্বেগের কেন্দ্রে জাতীয় সম্পদের নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান এবং চুক্তির স্বচ্ছতা।
দিদোর গল্পের সঙ্গে এই ঘটনার সম্পর্ক এখানেই। বাংলাদেশে কেউ চুক্তির ফাঁক ব্যবহার করে বাড়তি অধিকার নিয়ে নিচ্ছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রমাণ নেই। কিন্তু রাষ্ট্র যখন জনগণের সম্পদ ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি অধিকার কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেয়, তখন জনগণের জানা প্রয়োজন সেই অধিকারের সীমানা কোথায়। আস্থা গড়ে উঠতে হলে আশ্বাসের সঙ্গে শর্তগুলো পড়ার সুযোগও থাকতে হয়।
নিউমুরিং আসলে কী
ইংরেজি ‘মুরিং’ বলতে জাহাজকে নির্দিষ্ট জায়গায় বেঁধে রাখার ব্যবস্থাকে বোঝায়। চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় নিউমুরিং একটি স্থানের নাম হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সেই নামেই পরিচিত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল। এটি বিশেষ কোনো ধরনের টার্মিনালের কারিগরি নাম নয়।
বন্দর হলো জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় কেন্দ্র। তার ভেতরে নির্দিষ্ট ধরনের পণ্য ওঠানো ও নামানোর জন্য আলাদা অংশ থাকে। সেই অংশই টার্মিনাল। কনটেইনার হলো পণ্য পরিবহনের বড় ধাতব বাক্স। পোশাক, কাপড়, যন্ত্রপাতি, শিল্পের কাঁচামাল কিংবা ভোগ্যপণ্য এসব বাক্সে বহন করা হয়। একই বাক্স জাহাজ থেকে ট্রাক বা রেলে তোলা যায় বলে পথে বারবার পণ্য খুলে স্থানান্তর করতে হয় না।
জাহাজ ভেড়ানোর নির্দিষ্ট জায়গা ‘বার্থ’, কনটেইনার রাখার জায়গা ‘ইয়ার্ড’। ক্রেন দিয়ে সেগুলো তোলা, নামানো ও সরানো হলো ‘হ্যান্ডলিং’। আর পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয় ‘টিইইউ’। একটি ২০ ফুটের কনটেইনার এক টিইইউ, ৪০ ফুটের কনটেইনার সাধারণত দুই টিইইউ।
নিউমুরিং পুরো চট্টগ্রাম বন্দর নয়, তবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ২০২৪ সালে বন্দরের মোট কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ হয়েছে এখানে। এই টার্মিনালের পরিচালনায় পরিবর্তন তাই বাংলাদেশের আমদানি, রপ্তানি ও সরবরাহব্যবস্থার বড় অংশকে প্রভাবিত করতে পারে।
মালিকানা আর পরিচালনার অধিকার
সরকারের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়া হয়েছে নিউমুরিং ও এর অতিরিক্ত কনটেইনার রাখার ইয়ার্ড পরিচালনা এবং আধুনিকায়নের ১৫ বছরের অধিকার। জমি ও স্থাপনার মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘কনসেশন’। এতে নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ করার অধিকার দেওয়া হয়, সঙ্গে থাকে বিনিয়োগ, সেবা ও অর্থ প্রদানের শর্ত।
মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাস্তব নিয়ন্ত্রণ বুঝতে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। সেবামূল্য কীভাবে নির্ধারিত হবে? কোন সিদ্ধান্তে বন্দর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন লাগবে? কোম্পানি প্রতিশ্রুতি পূরণ না করলে কী শাস্তি হবে? জরুরি অবস্থায় সরকার কীভাবে পরিচালনার দায়িত্ব নেবে? চুক্তি বাতিল করতে হলে কী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে?
এসব প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করে কাগজে থাকা মালিকানা বাস্তবে কতটা কার্যকর থাকবে।
দুবাইয়ের বন্দর থেকে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা
ডিপি ওয়ার্ল্ডের মূল ব্যবসা বন্দর ও পণ্য সরবরাহের ব্যবস্থাকে ঘিরে। প্রতিষ্ঠানটি শুধু জাহাজ থেকে কনটেইনার ওঠানো ও নামানোর কাজ করে না। টার্মিনাল, গুদাম, পরিবহন এবং পণ্য সরবরাহের বিভিন্ন ধাপকে একসঙ্গে যুক্ত করার ব্যবসাও করে। কারখানা থেকে ক্রেতার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পথের যত বেশি অংশ একটি প্রতিষ্ঠান সামলাতে পারে, ব্যবসায় তার অবস্থান তত শক্তিশালী হয়।
এর উত্থান বুঝতে দুবাইয়ের ইতিহাসে ফিরতে হয়। ১৯৭২ সালে পোর্ট রাশিদ এবং ১৯৭৯ সালে জেবেল আলি বন্দর চালু হয়। জেবেল আলি দুবাইকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত করতে সাহায্য করে। বন্দরের পাশে শিল্প, গুদাম ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম গড়ে ওঠে। লক্ষ্য ছিল জাহাজ ভেড়ানোর জায়গার সঙ্গে একটি বিস্তৃত ব্যবসায়িক ব্যবস্থা তৈরি করা।
২০০৫ সালে দুবাইয়ের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনার ব্যবসা একত্র হয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড গঠিত হয়। পরের বছর প্রায় ৬৮০ কোটি ডলারে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান পি অ্যান্ড ও অধিগ্রহণ তার আন্তর্জাতিক বিস্তারকে বড় গতি দেয়। পরে গুদাম ও সরবরাহব্যবস্থার প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করে আরও বিস্তৃত ব্যবসায় প্রবেশ করে কোম্পানিটি।
দুবাইয়ের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা, মূলধন, ভৌগোলিক অবস্থান এবং বিদেশে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা কেনার কৌশল এই উত্থানের ভিত্তি। এক দেশে টার্মিনাল চালানোর অভিজ্ঞতা অন্য দেশে চুক্তি পাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। সঙ্গে বেড়েছে সরকার, ব্যবসায়ী ও পরিবহন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক।
ভারত ও চীন কেন বাংলাদেশের বন্দর নিয়ে আগ্রহী
বাংলাদেশের বন্দর শুধু বাংলাদেশের বাজারের প্রবেশদ্বার নয়। এর অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর প্রান্তে, ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার স্থলবেষ্টিত এলাকার কাছাকাছি। ফলে পণ্য পরিবহনের সুবিধার সঙ্গে এখানে আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রশ্নও যুক্ত হয়।
ভারতের স্বার্থের সবচেয়ে স্পষ্ট দিক যোগাযোগ। বাংলাদেশের বন্দর ও ভূখণ্ড ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পণ্য নেওয়ার বিকল্প পথ তৈরি হতে পারে। চট্টগ্রামের অবস্থান ত্রিপুরাসহ পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মোংলা আবার বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, পশ্চিমবঙ্গ এবং সড়ক ও রেল সংযোগকে ঘিরে আলাদা সম্ভাবনা তৈরি করে। খুলনা থেকে মোংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথে ভারতীয় অর্থায়ন সেই যোগাযোগের স্বার্থের একটি বাস্তব উদাহরণ।
চট্টগ্রাম ও মোংলা দিয়ে ভারতীয় পণ্য পরিবহনের চুক্তি রয়েছে। কিন্তু বন্দর ব্যবহারের অধিকার আর টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার এক বিষয় নয়। ভারতীয় পণ্য বাংলাদেশের বন্দর দিয়ে গেলেই ভারত সেই বন্দরের অপারেটর হয়ে যায় না।
মোংলার টার্মিনাল পরিচালনায় ভারতের আগ্রহ নিয়ে বিদেশি সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন হয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে পরিচালনার অধিকার পাওয়ার দাবিও এসেছে। তবে পূর্ণ চুক্তি ও বাস্তব পরিচালনার অবস্থা যাচাই ছাড়া মোংলা ভারতের হাতে চলে গেছে বলা ঠিক হবে না।
চীনের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশের বাজার, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থায়ন এবং বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি। মোংলার উন্নয়নে চীনা ঋণসহ প্রকল্পের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে। নতুন জেটি, কনটেইনার টার্মিনাল ও অন্যান্য সুবিধা তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্প চীনা প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসা দেয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরি করে।
তবে ঋণ দেওয়া, বন্দর নির্মাণ করা এবং বন্দর পরিচালনা করা তিনটি আলাদা ভূমিকা। এগুলোকে এক করে দেখলে ভূরাজনীতির আলোচনা বিভ্রান্তিকর হয়। চীনা অর্থায়নের প্রকল্প মানেই চীনের মালিকানাধীন বন্দর নয়।
তাহলে কোনটি বেশি কৌশলগত, চট্টগ্রাম না মোংলা? এক কথায় উত্তর দেওয়া কঠিন। বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্যের কেন্দ্রে চট্টগ্রাম। ভারতের পশ্চিম দিকের সংযোগ এবং নতুন অবকাঠামো গড়ার সুযোগের কারণে মোংলার আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। উভয় বন্দরে বিভিন্ন শক্তির আগ্রহ আছে, তবে সেই আগ্রহের উদ্দেশ্য ও ধরন এক নয়।
নিউমুরিংয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড আসায় এই মানচিত্রে আমিরাতভিত্তিক আরেকটি বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হলো। তাকে ভারত বা চীনের প্রতিনিধি ধরে নেওয়ার ভিত্তি নেই। তবে বাংলাদেশের প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্রে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক অবস্থান অর্জন করায় কোম্পানিটির গুরুত্ব বাড়বে। সেই গুরুত্ব সামলাতে বাংলাদেশের নিজস্ব নিয়ন্ত্রক সক্ষমতাও বাড়তে হবে।
বাণিজ্যিক টার্মিনাল কি সামরিক ঘাঁটি হয়ে যায়
বিদেশি প্রতিষ্ঠান টার্মিনাল চালালে তার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিদেশি সেনা মোতায়েন পর্যন্ত বিস্তৃত হয় না। বাণিজ্যিক পরিচালনার চুক্তি থেকে সামরিক অধিকার অনুমান করার সুযোগ নেই। বিদেশি যুদ্ধজাহাজের প্রবেশ কিংবা সামরিক উপস্থিতির জন্য আলাদা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও অনুমতি প্রয়োজন।
কিন্তু নিরাপত্তার প্রশ্ন কেবল সেনা সমাবেশে সীমিত নয়। পণ্য চলাচলের তথ্য কার হাতে থাকবে, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সংকটে সরকার কত দ্রুত দায়িত্ব নিতে পারবে এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা কতটা বাড়বে, এসবও নিরাপত্তার বিষয়।
শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি চীনা ইজারা নিয়ে বিতর্ক এই উদ্বেগকে বাড়িয়েছে। তবে ঋণ শোধ করতে না পেরে চীন বন্দরটি সরাসরি কেড়ে নিয়েছে, এমন সরল বর্ণনা নিয়ে গবেষণায় আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে শিক্ষা নিতে হবে চুক্তির মেয়াদ, আর্থিক দায়, পরিচালনার অধিকার ও রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরীক্ষা করে। অন্য দেশের একটি ঘটনাকে হুবহু ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে ব্যবহার করে নয়।
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সংকটের ইতিহাস
২০০৬ সালে পি অ্যান্ড ও কেনার পর যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার অধিকার ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে যাওয়ার কথা ছিল। জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে মার্কিন রাজনীতিতে প্রবল আপত্তি ওঠে। শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিক্রি করে দেয়। আন্তর্জাতিক বিস্তারের পথে এটি ছিল বড় রাজনৈতিক ধাক্কা।
তবে সেই বিতর্ক যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোম্পানিটির সম্পর্কের স্থায়ী বিচ্ছেদ ঘটায়নি। পরবর্তী সময়ে মার্কিন সরবরাহব্যবস্থার ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছে ডিপি ওয়ার্ল্ড। ২০২৬ সালে টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টি বন্দরে কনটেইনার টার্মিনাল উন্নয়নের বিষয়ে একচেটিয়া আলোচনার ব্যবস্থাও হয়েছে। আলোচনা অবশ্য চূড়ান্ত পরিচালনচুক্তি নয়।
আরেকটি বড় সংকট আসে ২০২২ সালে। ডিপি ওয়ার্ল্ডের মালিকানাধীন পি অ্যান্ড ও ফেরিজ প্রায় ৮০০ কর্মীকে হঠাৎ চাকরিচ্যুত করে। ব্রিটেনে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। প্রয়োজনীয় পরামর্শপ্রক্রিয়া অনুসরণ না করার বিষয়টি সংসদীয় তদন্তেও উঠে আসে। বাংলাদেশের শ্রমিকদের উদ্বেগের সঙ্গে এই ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বিনিয়োগের সক্ষমতা থাকলেই শ্রমিকদের প্রতি আচরণ নিয়ে প্রশ্ন শেষ হয়ে যায় না।
জিবুতির ডোরালেহ কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে বিরোধ দেখিয়েছে আরেক ধরনের ঝুঁকি। সরকার ও বিদেশি অপারেটরের সম্পর্ক ভেঙে গেলে তা দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সালিস ও আদালতের লড়াইয়ে গড়াতে পারে। বাংলাদেশের জন্য শিক্ষাটি হলো, চুক্তি করার সময়ই বিরোধ নিষ্পত্তি এবং চুক্তি থেকে বের হওয়ার শর্ত বুঝে নেওয়া প্রয়োজন।
অস্ট্রেলিয়ার উদাহরণটি ভিন্ন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অস্ট্রেলীয় কম্পিউটার নেটওয়ার্কে অননুমোদিত প্রবেশ শনাক্ত হওয়ার পর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। সিডনি, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন ও ফ্রিম্যান্টলে টার্মিনালের স্থলভাগে পণ্য আনা ও নেওয়ার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। কাজ চালু হওয়ার পরও জমে যাওয়া কনটেইনার সরাতে সময় লাগে।
ঘটনাটি দেখিয়েছে, বন্দরের নিরাপত্তা এখন তথ্য ও কম্পিউটার ব্যবস্থার সঙ্গেও জড়িত। নিউমুরিংয়ে নতুন প্রযুক্তি এলে জানতে হবে তথ্য কোথায় থাকবে, কারা দেখতে পারবে এবং ব্যবস্থা অচল হলে বিকল্প কী থাকবে।
এপস্টিনের সঙ্গে সম্পর্কের ছায়া
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাম্প্রতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে দীর্ঘদিনের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী সুলতান আহমেদ বিন সুলায়েমের সঙ্গে জেফ্রি এপস্টিনের সম্পর্ক প্রকাশ। যৌন অপরাধে দণ্ডিত এপস্টিনকে নিয়ে প্রকাশিত নথিতে তাঁদের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ উঠে আসে। এর জেরে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট ও কানাডার লা কেস ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নতুন বিনিয়োগ স্থগিত করে। ২০২৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বিন সুলায়েম পদ ছাড়েন। চেয়ারম্যান হন ইসা কাজিম এবং প্রধান নির্বাহী হন যুবরাজ নারায়ণ। তবে প্রকাশিত যোগাযোগকে এপস্টিনের অপরাধে বিন সুলায়েমের অংশগ্রহণের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায় না।
তারপরও দীর্ঘদিনের শীর্ষ ব্যক্তির এমন সম্পর্ক প্রকাশ পেলে প্রতিষ্ঠানের দিকে আঙুল ওঠে বৈকি। প্রশ্ন ওঠে নেতৃত্বের বিচারবোধ, পরিচালনা পর্ষদের নজরদারি এবং প্রতিষ্ঠানের নৈতিক মান নিয়ে। এখানে সেই প্রশ্ন ব্যক্তিগত ভাবমূর্তির মধ্যে সীমিতও থাকেনি, বিনিয়োগ সহযোগীদের সিদ্ধান্তে ব্যবসায়িক প্রভাব পড়েছে। বাংলাদেশের জন্য তাই নতুন নেতৃত্ব এসেছে বলেই যাচাই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। জানতে হবে প্রতিষ্ঠানটি কীভাবে সুনামের সংকট সামলাচ্ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় চুক্তির অংশীদার হিসেবে তার জবাবদিহির ব্যবস্থা কতটা কার্যকর।
ব্যানানা বন্দরের অনুসন্ধানী প্রশ্ন
কঙ্গো নদীর মোহনায় আটলান্টিকের পাশে প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সরু ভূখণ্ডে ব্যানানা বন্দরের অবস্থান। মানচিত্রে এমন সরু, বাঁকানো ভূখণ্ড দেখে কলার কথা মনে হতে পারে। তবে এই আকৃতি থেকেই জায়গাটির নাম ‘ব্যানানা’ হয়েছে, এমন ব্যাখ্যার নির্ভরযোগ্য সমর্থন পাওয়া যায়নি। আকৃতির তুলনাটি একটি চিত্রকল্প হতে পারে, নিশ্চিত নামকরণের ইতিহাস নয়।
কঙ্গোর ব্যানানা গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ডিপি ওয়ার্ল্ডের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। নতুন বন্দর গড়ে তোলার অর্থনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গে এখানে প্রকল্পের আলোচনা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে অনুসন্ধানী প্রশ্ন উঠেছে।
হুইসেলব্লোয়ারদের সুরক্ষা নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপিএলএএএফ প্রকল্পের প্রাথমিক আলোচনায় রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সম্ভাব্য সুবিধা পাওয়ার অভিযোগ তুলে ধরেছিল। পরে পিপিএলএএএফ ও দ্য ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজমের অনুসন্ধানে সংরক্ষিত ম্যানগ্রোভ এলাকা ও পরিবেশগত মূল্যায়ন নিয়েও প্রশ্ন আসে।
ডিপি ওয়ার্ল্ড অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং স্থানীয় আইন অনুসরণের কথা জানিয়েছে। অভিযোগগুলোকে আদালতে প্রতিষ্ঠিত অপরাধ হিসেবে লেখা যাবে না। তবে এগুলো দেখায়, বন্দর প্রকল্প মূল্যায়নে বিনিয়োগের অঙ্কের পাশাপাশি রাজনৈতিক সুবিধাভোগী, ব্যবসার কাঠামো ও পরিবেশগত দায়ও পরীক্ষা করা দরকার।
শ্রমিকদের জীবিকা কোথায় থাকবে
নিউমুরিংয়ের পরিবর্তনে কতজন চাকরি হারাতে পারেন, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পূর্বাভাস পাওয়া যায়নি। তাই সম্ভাব্য ছাঁটাইয়ের সংখ্যা বানিয়ে বলা যাবে না। নৌপরিবহনমন্ত্রী বলেছেন, চুক্তির কারণে বন্দরের কর্মকর্তা বা শ্রমিক চাকরি হারাবেন না এবং বিদ্যমান মোট বেতনের কাঠামো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সরকারি ঘোষণায় প্রশিক্ষণের কথাও রয়েছে।
কিন্তু এই আশ্বাসের আওতায় কারা পড়ছেন, তা পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বন্দর কর্তৃপক্ষের স্থায়ী কর্মী, অপারেটরের কর্মী, ঠিকাদারের শ্রমিক এবং দৈনিক বা অনিয়মিত কাজ করা মানুষদের অবস্থা এক নয়। চাকরি বজায় থাকলেও কাজের ধরন, অতিরিক্ত কাজের আয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়োগের সুযোগ বদলাতে পারে।
নিউমুরিংয়ের সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কত মানুষের জীবিকা যুক্ত, তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য হিসাব প্রয়োজন। ক্রেনচালক ও শ্রমিকের পাশাপাশি ট্রাকচালক, মেরামতকর্মী, পরিবহন এবং আশপাশের সেবাব্যবসার মানুষদেরও বিবেচনায় আনতে হবে।
সরকারের উচিত কর্মীদের শ্রেণিভিত্তিক সংখ্যা এবং তাঁদের সুরক্ষার শর্ত প্রকাশ করা। নতুন প্রযুক্তিতে কাজ বদলালে প্রশিক্ষণ কে পাবেন, কোনো পদ অপ্রয়োজনীয় হলে পুনর্বিন্যাস কীভাবে হবে এবং শ্রমিকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা কী, এসব জানা দরকার। আধুনিকায়নের সাফল্য কনটেইনারের সংখ্যার সঙ্গে মানুষের জীবিকার নিরাপত্তা দিয়েও মাপতে হবে।
বাংলাদেশের অনাস্থার পুরোনো ইতিহাস
বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্দরসংক্রান্ত অধিকার দেওয়ার বিতর্ক আজকের নয়। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্টিভেডোরিং সার্ভিসেস অব আমেরিকা বা এসএসএকে ঘিরে বেসরকারি কনটেইনার টার্মিনালের প্রস্তাব আসে। শ্রমিক সংগঠন ও নাগরিকদের আপত্তি শুরু হয়। বিষয়টি আদালতেও যায়।
২০০২ সালে তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ, বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ সেই বিরোধিতাকে বড় রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করে। ২০০৩ সালে মোংলা অভিমুখেও লংমার্চ হয়। তবে সেটিকে শুধু মোংলা বন্দর ইজারার বিরুদ্ধে আন্দোলন বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। গ্যাস রপ্তানি, জ্বালানি অধিকার ও সুন্দরবনসংক্রান্ত দাবিও ছিল।
এসএসএর প্রস্তাব আর বর্তমান নিউমুরিং চুক্তি একই প্রকল্প নয়। তবু মানুষের স্মৃতিতে এগুলো যুক্ত হয় একটি সাধারণ উদ্বেগের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত হচ্ছে, কিন্তু নাগরিকের অংশগ্রহণ ও তথ্য পাওয়ার সুযোগ কতটা?
এই অনাস্থাকে শুধু বিদেশিবিরোধিতা বলে সরিয়ে দিলে সমস্যাটি বোঝা যায় না। আবার প্রতিবাদকারী সংগঠনগুলোর অবস্থানকে বাংলাদেশের সব মানুষের মতামত বলাও ঠিক হবে না। কারও কাছে বিদেশি অপারেটর দক্ষতা আনার সুযোগ, কারও কাছে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার ঝুঁকি। প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতেই এই দুই অবস্থানের বিচার হওয়া প্রয়োজন।
আয় বাড়বে, না কমবে
সরকারি ঘোষণায় প্রায় ৬০০ কোটি টাকা প্রাথমিক অর্থপ্রদান এবং প্রথম দশ বছরে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের কথা বলা হয়েছে। সঙ্গে থাকবে রাজস্ব ভাগাভাগি ও নির্দিষ্ট বার্ষিক অর্থপ্রদান। কিন্তু প্রাথমিক অর্থ, বিনিয়োগ এবং নিয়মিত আয় আলাদা বিষয়। সব যোগ করে তাকে বাংলাদেশের লাভ বলা যায় না।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৩ অর্থবছরে নিউমুরিংয়ের মোট আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকা এবং নিট আয় প্রায় ৫৭৪ কোটি টাকা। নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করতে হলে জানতে হবে কোন আয়ের ওপর কত অংশ দেওয়া হবে, কোন খরচ কার এবং বিনিয়োগের দায় কতটা নিশ্চিত। সংবাদমাধ্যমে রাজস্ব ভাগের হার নিয়েও ভিন্ন বিবরণ এসেছে। পূর্ণ চুক্তির হিসাবের সূত্র ছাড়া লাভ বা ক্ষতির নিশ্চিত সিদ্ধান্ত দেওয়া কঠিন।
এই অস্পষ্টতা থেকেই কম আয় হওয়ার একটি আপাত হিসাব মানুষের মনে তৈরি হতে পারে। একটি প্রতিবেদনে বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য ৬৭ শতাংশ রাজস্ব এবং বছরে ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট অর্থপ্রদানের কথা এসেছে। শুধু উদাহরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাক, পুরোনো ১ হাজার ২১৬ কোটি টাকার পুরো আয়ই নতুন ব্যবস্থায় ভাগাভাগির আওতায় পড়বে এবং আয় অপরিবর্তিত থাকবে। তাহলে ৬৭ শতাংশ ও বার্ষিক অর্থ মিলিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রাপ্তি হবে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে পুরোনো হিসাবে দেশীয় অপারেটরকে দেওয়া হয়েছিল প্রায় ৭৯ কোটি টাকা। মোট আয় থেকে শুধু সেই অর্থ বাদ দিলে থাকে প্রায় ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকা। এই দুই অঙ্ক পাশাপাশি রাখলে বছরে প্রায় ৩১২ কোটি টাকা কম পাওয়ার ধারণা তৈরি হয়। কিন্তু এটি নিট লাভের তুলনা নয়। পুরোনো ব্যবস্থায় ওই অবশিষ্ট টাকা থেকেই বন্দর কর্তৃপক্ষকে আরও ব্যয় বহন করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় সেই ব্যয়ের কতটা ডিপি ওয়ার্ল্ড নেবে, কোন আয় ভাগাভাগির বাইরে থাকবে এবং আয় কতটা বাড়বে, তা না জানলে এই পার্থক্যকে প্রকৃত ক্ষতি বলা যাবে না।
ঠিক এখানেই চুক্তি প্রকাশের প্রয়োজন। আপাত হিসাবে দেখা এই ঘাটতি যদি পরিচালন ব্যয় সাশ্রয়, নতুন বিনিয়োগ বা বাড়তি আয় দিয়ে পুষিয়ে যায়, সরকারকে সেটি দেখাতে হবে। আর না গেলে কেন এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো, তার ব্যাখ্যা দিতে হবে। পূর্ণ হিসাব খোলাসা না করলে প্রায় ৩১২ কোটি টাকা কম প্রাপ্তির এই শর্তসাপেক্ষ উদাহরণই কারও কাছে নিশ্চিত লোকসানের হিসাব বলে মনে হতে পারে। তথ্যের ঘাটতি তখন অনাস্থার জায়গা আরও বড় করে।
তুলনা করতে হবে দুটি ভবিষ্যৎ। ডিপি ওয়ার্ল্ড এলে কী হবে এবং বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজে বিনিয়োগ করে আধুনিকায়ন করলে কী হতে পারত। কেবল আজকের ব্যবস্থার সঙ্গে একটি উন্নত ভবিষ্যতের তুলনা করলে হিসাব অসম্পূর্ণ থাকে।
বন্দর কর্তৃপক্ষের আয় ছাড়াও দেশের ব্যবসার খরচ দেখতে হবে। দ্রুত কনটেইনার ছাড় হলে অপেক্ষা ও গুদামের ব্যয় কমতে পারে। কিন্তু সেবামূল্য বাড়লে সুবিধার কিছু অংশ হারিয়েও যেতে পারে। সুফল রপ্তানিকারক, আমদানিকারক ও ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে কি না, সেটিও মূল্যায়নের অংশ।
অন্য দেশে চুক্তি প্রকাশ হয় কীভাবে
সর্বত্র এক নিয়ম নেই। বিশ্বব্যাংকের পর্যালোচনায় চিলি ও পেরুর মতো দেশে পূর্ণ পিপিপি চুক্তি প্রকাশের নজির রয়েছে। যুক্তরাজ্যে বাণিজ্যিকভাবে সংবেদনশীল কিছু অংশ বাদ দিয়ে চুক্তি প্রকাশ করা হয়। কোথাও চুক্তির পাশাপাশি সহজ ভাষায় সারসংক্ষেপ এবং নিয়মিত কাজের অগ্রগতিও জানানো হয়।
বাংলাদেশেও সত্যিকার সংবেদনশীল অংশ বাদ দিয়ে মেয়াদ, রাজস্ব ভাগ, বিনিয়োগ, সেবামূল্য, শ্রমিকের অধিকার, জরিমানা, বাতিলের শর্ত ও রাষ্ট্রের আর্থিক দায় জনসমক্ষে আনা সম্ভব।
পূর্ণ নিউমুরিং চুক্তি কেন প্রকাশ্যে পাওয়া যাচ্ছে না, তার যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা প্রয়োজন। সারসংক্ষেপ প্রকাশ হয়েছে, ফলে কোনো তথ্যই জানানো হয়নি বলা যাবে না। আবার সারসংক্ষেপ পূর্ণ দলিলের বিকল্প নয়। চুক্তি সদ্য স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে প্রকাশের একটি সময়সূচি জানানো যেতে পারে। কোনো অংশ গোপন রাখতে হলে কোন অংশ এবং কেন, সেটিও ব্যাখ্যা করা উচিত।
উদ্যোগ আওয়ামী লীগ আমলে, ধারাবাহিকতা বিএনপি আমলেও
বাংলাদেশের রাজনীতির একটি পুনরাবৃত্তি চোখ এড়ানো কঠিন। এসএসএ এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ঘিরে আলোচিত এই দুটি উদ্যোগের সূচনা আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে। পরবর্তী বিএনপি সরকারের সময়েও উদ্যোগ এগিয়েছে এবং বড় প্রতিবাদ হয়েছে। তবে প্রতিটি বন্দরচুক্তির ইতিহাস পরীক্ষা না করে ‘প্রত্যেকবারই’ এমন হয়েছে বলা নির্ভুল হবে না।
এসএসএর প্রস্তাব আওয়ামী লীগ আমলে এলেও বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তা সঙ্গে সঙ্গে বাতিল করেনি। প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। পরে আদালতের সিদ্ধান্তে তা বাস্তবায়িত হয়নি। নিউমুরিংয়েও আওয়ামী লীগ আমলের উদ্যোগ অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এগিয়েছে। এরপর বিএনপি সরকার আলোচনা অব্যাহত রেখে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে।
বিএনপি কেন পিছিয়ে আসেনি, সেই প্রশ্ন তাই যৌক্তিক। সরকারের প্রকাশ্য যুক্তি বিনিয়োগ, আধুনিকায়ন ও দক্ষতা। এর বাইরে গোপন সমঝোতার কথা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত করে বলা যাবে না। কিন্তু প্রশ্নটি থেকেই যায়। পরস্পরের প্রবল বিরোধী দুই দল ক্ষমতায় এসে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে কেন একই পথে হাঁটে? এটি কি নীতিগত ঐকমত্য, আগের প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা, নাকি বিকল্প পরিকল্পনার অভাব? উত্তরটি সরকারেরই দেওয়া প্রয়োজন।
দিদোর গল্পে শাসক হয়তো এক টুকরো চামড়ার সম্ভাবনা বুঝতে পারেননি। আধুনিক রাষ্ট্রের সেই অজুহাত থাকার কথা নয়। তার হাতে আইনজীবী, অর্থনীতিবিদ, প্রকৌশলী ও নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান আছে। নিউমুরিংয়ের প্রশ্ন তাই কে টার্মিনাল চালাবে তার সঙ্গে কোন শর্তে চালাবে, সেটিও। আর সেই শর্ত জানার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের।