ঢাকার মোহাম্মদপুরের শাহজাহান রোডের একটি আটতলা ভবন। মেইন গেট খোলা। বোরখা পরে ভবনটিতে ঢুকলেন এক নারী। ঘড়িতে তখন সকাল ৭টা ৫১ মিনিট।
এক ঘণ্টা ৪৪ মিনিট পর বেরিয়ে যাওয়ার সময় সেই নারীর পরনে স্কুল ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ। তখন সপ্তম তলায় নিজ ফ্ল্যাটে পড়ে আছে মা ও মেয়ের রক্তাক্ত মরদেহ।
আজিজুল ইসলাম যখন সকাল ১১টার দিকে ফ্ল্যাটে আসেন তখন দরজা খোলা। বেডরুমে ঢুকে দেখেন স্ত্রী-কন্যার নিথর দেহ।
গৃহিনী মালাইলা আফরোজের শরীরে ৩০বার আর স্কুল পড়ুয়া মেয়ে নাফিসা বিনতে আজিজের শরীরে ৬বার ছুরির আঘাতের চিহ্ন।
ট্রিপল নাইনে ফোন করেন আজিজুল ইসলাম। পুলিশ আসে। সুরতহালের পর মরদেহ পাঠানো হয় পোস্টমর্টেমের জন্য। কিন্তু খুন করলো কে?
সিসিটিভি ফুটেজ দেখে যে নারীর প্রতি পুলিশের সন্দেহের তীর, সেই নারী চারদিন ধরে কাজ করছিলেন ওই বাসায়। পুলিশ বলছে, মা ও মেয়ে খুন হয়েছে নতুন কাজে যোগ দেওয়া গৃহকর্মীর হাতেই। ৮ই ডিসেম্বর সোমবার হওয়া এই খুনের কারণ খুঁজছে তদন্তকারীরা।
যা দেখা গেল ঘটনাস্থলে
ট্রিপল নাইনে ফোন পেয়ে পুলিশের যে দলটি ঘটনাস্থলে যায় তারা বলছে, সুরতহালের সময় নাফিসার গলায় একাধিক গভীর ক্ষত এবং লায়লার শরীরে অনেকগুলো আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ছুরি দিয়ে মা-মেয়েকে আঘাত করার পর প্রমাণ মুছে ফেলতে ছুরি ধুয়ে রেখে দেয়া হয় বাথরুমের বালতিতে।
স্কুল শিক্ষক আজিজুল ইসলামের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, প্রতিদিনের মতো সোমবার সকাল ৭টার দিকে স্কুলের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বেরিয়ে যান আজিজুল। স্কুলে পরীক্ষা থাকায় তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরেন।
বাসায় ফিরেই স্ত্রী-কন্যার রক্তাক্ত দেহ দেখতে পান। পরে তার চিৎকারে আশেপাশের বাসিন্দারা বেরিয়ে এলে খবর দেয়া হয় ট্রিপল নাইনে।
পুলিশ বলছে, ওই বাসা থেকে পুলিশ দুটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করেছে। হত্যাকারী ঘটনার পর বাসার বাথরুম ব্যবহার করেছেন, এমন আলামত পাওয়ার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
একাধিক সিসিটিভি ফুটেজে প্রাথমিকভাবে একজনকে দেখার কথাই জানিয়েছে পুলিশ। পরে আরও বিশ্লেষণ করে দেখা হবে, আশেপাশে আরও কেউ ছিল কি না।
মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ জানায়, ভবনটির সাত তলায় লিফটের সামনে থেকে বাসার দরজা পর্যন্ত ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ছিল। বাসায় ঢুকেই আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় দেখা গেছে।
ভেতরের অবস্থা বিষয়ে পুলিশ বলছে, বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত আছে, মেঝেতে ও দেয়ালে রক্তের দাগ আছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ ছিল তছনছ অবস্থায়। তবে কিছু চুরি গেছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
যা বলছে পুলিশ
মোহাম্মদপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) রকিবুজ্জামান তালুকদার বলেন, সন্দেহভাজন যে গৃহকর্মীর কথা বলা হচ্ছে, তার নাম শুনেছি আয়েশা। বয়স ২০ থেকে ২৫। তার নাম বা বয়স কোনোটাই নিশ্চিত না। কারণ যাদের বাসায় কাজ করত, তারা কোন ডকুমেন্টস রাখেনি।
মাত্র চার দিন আগে বাসার দারোয়ান খালেকের মাধ্যমে ওই মেয়েকে আনা হয়। পরে গৃহকর্মী হিসেবে নিহত মালাইলা আফরোজের বাসায় কাজ দেওয়া হয়। তখন নিজের নাম আয়েশা বলে পরিচয় দেয়। পরে মা-মেয়েকে হত্যার পর নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বের হয়ে যায় সেই মেয়ে।
আজিজুল ইসলাম বলেছেন, “আমাদের একজন কাজের মহিলার দরকার ছিল। সাধারণত গেটে অনেকেই কাজের সন্ধানে আসেন। আমরা দারোয়ানকে এমন কেউ আসলে জানানোর কথা বলে রেখেছিলাম।’’
গৃহকর্মী আয়েশাকে আসামি করে সোমবার রাতে হত্যা মামলা রেকর্ড করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশ পরিদর্শক রকিবুজ্জামান তালুকদার বলেন, “নিহতের স্বামী আজিজুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন। ওই গৃহকর্মীকে গ্রেফতারের জন্য আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি।”
আয়েশা যেভাবে বাসায় ঢোকে
ডিএমপির মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘‘দারোয়ান খালেককে জিজ্ঞাসাবাদ করে আমরা জানতে পারি ওই বাসা থেকে তাকে বলা হয়েছিল, কাজের খোঁজে কোন মহিলা এলে যেন তাদেরকে জানানো হয়। এভাবেই এই মহিলা গেটে এসে কাজের খোঁজ করলে খালেক চারদিন আগে তাকে ওই বাসায় দিয়ে আসে। এরপর থেকেই সে ওই বাসায় কাজ শুরু করে। তবে প্রাথমিকভাবে নাম ছাড়া আর কোন তথ্য তাদের কাছে নেই।’’
সিটিটিভি ফুটেজই ভরসা
এডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন বলছেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং দারোয়ানের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কারণ ওই নারীর প্রবেশ এবং বের হওয়ার মাঝে আর কেউ এভাবে ওই ভবনে আসেনি। বের হওয়ার সময় চিনতে না পারলেও ঢোকার সময় দারোয়ান তাকে চিনতে পেরেছে।
তার পরনে থাকা বোরখা উদ্ধার হয়নি জানিয়ে আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘটনাস্থলে বোরখা পাওয়া যায়নি। যে স্কুল ব্যাগ তার কাঁধে ছিল, তার মধ্যে নিয়ে গেছে বলে ধারণা করছেন তারা। তবে বাথরুমের বালতি থেকে ছুরি উদ্ধার করা গেছে।
আজিজুল ইসলামের সাথে কথা বলেছে পুলিশ। তার কাছ থেকে সমস্ত তথ্য নেয়া হচ্ছে। তবে ওই মেয়ের সাথে অন্য কেউ ছিল কি না, এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে। পুলিশ বলছে, তাকে আটক করার জন্য অভিযান চলছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান ঘটনাস্থল। পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, তাদেরকে ছুরির আঘাতে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে আমাদের কাছে মনে হয়েছে। আরো বিস্তারিত জানতে পোস্টমর্টেমের জন্য মরদেহ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তবে নাম আর সিসিটিভি ফুটেজ ছাড়া আর কোনো সূত্র না থাকায় সন্দেহভাজন নারী আয়শাকে ধরা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ।



