অস্ট্রেলিয়ার ১৩ বছরের কিশোরী ইসোবেল, দেশটিতে তার বয়সী বাকি সবার মতো তার জন্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ। ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাটের মতো অ্যাপগুলো নিজেরাই গেটওয়ে তৈরি করেছিল, যেন ১৬ বছরের কম বয়সী কেউ এগুলো ব্যবহার করতে না পারে। কিন্তু বড় এই অ্যাপগুলোকে ফাঁকি দিতে মাত্র ৫ মিনিট লেগেছে।
স্ন্যাপচ্যাট থেকে যখন ইসোবেলের কাছে বয়স নিশ্চিত করার নোটিফিকেশন আসে, তখন ক্যামেরার সামনে সে তার মায়ের একটি ছবি ধরে। আর তাতেই স্ন্যাপচ্যাটের মনে হয় যে, গ্রাহক প্রাপ্তবয়স্ক।
ইসোবেল বলে, “আমি ক্যামেরার সামনে আমার মায়ের একটা ছবি ব্যবহার করি। এতেই ওরা আমাকে ঢুকতে দেয় এবং বলে, বয়স নিশ্চিত করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।”
এই পদ্ধতিতে কেউ একজন পপ তারকা বিয়ন্সের ছবি ব্যবহার করেও স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার শুরু করেছে বলেও শুনেছে ইসোবেল।
১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য অস্ট্রেলিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু শিশু-কিশোররা ঠিকই তা ব্যবহার করছে। দেশটির কিশোররা কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়ার গেটওয়েকে ফাঁকি দিচ্ছে, এক প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসোবেল তার মাকেও জানিয়েছে যে সে নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দিয়ে স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহার শুরু করেছে। তার মা মেলও হাসতে হাসতে তাকে বকা দিয়েছে।
বিবিসিকে মেল বলেন, “আমি জানতাম এমনই কিছু হবে।” ইসোবেলকে টিকটক ও স্ন্যাপচ্যাট ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন তিনি। তিনি জানান, নাহলে তারা ঠিকই গোপনে ব্যবহার করতো।
তবে মেল আশাবাদী যে, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে এবং শিশুদের অনলাইন দুনিয়ার ক্ষতিকারক দিক থেকে সুরক্ষা দিতে তার মতো অভিভাবকদের সহায়তা করবে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, যে সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা ভেঙে পড়তে পারে। অস্ট্রেলিয়ার এই পরিস্থিতি সারা বিশ্ব থেকে নজর রাখা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে যে প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, তার ওপর ভরসা রাখা যায় কি না, তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা গেছে। এমন শঙ্কাও আছে যে, অনেক শিশু হয়তো অনলাইনের আরও অন্ধকার জগতে ঢুকে পড়তে পারে, বিচরণ বাড়তে পারে ডার্ক ওয়েবেও।
অস্ট্রেলিয়ার অভ্যন্তরীণ হলেও, সারাবিশ্বই বিষয়টি নিয়ে আগ্রহী। সবার মনেই প্রশ্ন আর শঙ্কা, এই পদ্ধতি কি আসলে কাজ করবে? নিষেধাজ্ঞার সুফল মিলবে কি?
অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন

অস্ট্রেলিয়ায় এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া কঠিন, যে বিশ্বাস করে শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো যথাযথ ভূমিকা নিচ্ছে। পাঁচ সন্তানের জনক ও অ্যান্টি স্মার্টফোন ক্যাম্পেইনার ড্যানি এলাচি বলেন, “এই টেক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আমার কোনো ভরসা নেই, তারা নিজেদের লাভের জন্য যেকোনো কিছু করতে পারে। শিশুদের সুরক্ষার ব্যাপারটি নিশ্চিত করার দারুণ সুযোগ এসেছিল তাদের সামনে। তবে তারা প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে।”
নভেম্বরে জাতিসংঘে এমা ম্যাসন নামে এক মা সোশ্যাল মিডিয়ার বুলিং নিয়ে আওয়াজ তুলেছিলেন। তার ১৫ বছরের মেয়ে টিলিস অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা করে। জাতিসংঘ বিশ্ব নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে এমা ম্যাসন প্রশ্ন তোলে “আর কত টিলিসকে মরতে হবে?”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর শিশুদের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা কোনো সমাধান না, বরং অভিভাবক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে করা একটি ‘দায়সারা’ পদক্ষেপ।
যেভাবে পাস হয় এই আইন
২০২৪ সালের নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ায় প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি অ্যালবানিজ যখন এই আইনের ব্যাপারে ঘোষণা করেন, তখন তিনি অভিভাবকদের অঙ্গীকার করেছিলেন যে, শিশুদের শাস্তি দেওয়া হবে না। বরং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে ‘দায়িত্বশীল পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য করা হবে। তাদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে যেন, ব্যবহারকারীরা অন্তত ১৬ বছরের হয়, নাহলে তিন কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত জরিমানা হতে পারে তাদের- বাংলাদেশের মুদ্রায় যা ৪০৩ কোটি টাকারও বেশি।
অ্যান্থনি অ্যালবানিজ বলেছিলেন, “এই পদক্ষেপ মা-বাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছে, আমার মতো তারাও নিজেদের সন্তানদের অনলাইন সুরক্ষা নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন।”
এর আগেও বিশ্বের একাধিক দেশে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। মনে করা হচ্ছিল, এতে করে শিশুরা আসক্তি তৈরি করে এমন অ্যালগরিদম থেকে দূরে থাকবে এবং সহিংসতা, পর্নোগ্রাফি ও ভুল তথ্যের মতো ক্ষতিকারক কিছু তাদের সামনে আসবে না।
এ ছাড়া সাইবার বুলিং, অনলাইনে শিশু নিপীড়নও কমে যাবে। শিশুরা অনলাইনে সময় না দিয়ে বাস্তব জীবনে বেশি ব্যস্ত থাকবে, ভালো ঘুমাবে এবং তাদের সঠিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ হবে। কিন্তু কোথাও খুব বেশি সাফল্য আসেনি।
অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আশ্বাস থাকলেও, ঠিক কীভাবে তার সরকার এটি বাস্তবায়ন করবে তা স্পষ্ট করে বলা ছিল না। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তারা পার্লামেন্টে খসড়া বিল উপস্থাপন করে এবং ৪৮ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে তা আইনে পরিণত হয়। এরপর অবশ্য বিষয়টি নিয়ে কাজ করার জন্য এক বছর সময় পেয়েছে অস্ট্রেলীয় সরকার।
কীভাবে কাজ করবে নিষেধাজ্ঞা
এক বছর পর যখন আনুষ্ঠানিকভাবে এই আইনের যাত্রা শুরু, তখনও প্রশ্ন থেকে গেছে। সরকারি অর্থায়নে শুরু হওয়া প্রাথমিক ট্রায়ালে বলা হয়েছিল যে বয়স নিশ্চিতকরণের ব্যাপারটি প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব। কিন্তু এটা শতভাগ সফল প্রক্রিয়া হবে না।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, আইডি দিয়ে বয়স যাচাই প্রক্রিয়াই সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হতে পারতো। তবে সেজন্য গ্রাহককে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য দিতে হতো সোশ্যাল মিডিয়াকে আর অস্ট্রেলীয়রা তাদের একদমই বিশ্বাস করে না।
বয়স নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখন গ্রাহকের অনলাইন কার্যক্রম এবং ফেসিয়াল অ্যাসেসমেন্ট প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু কিশোরদের জন্য এই প্রযুক্তি খুব ফলপ্রসূ হবে না। যেমন মেটা ও স্ন্যাপচ্যাটের যখন বয়স নির্ধারণের জন্য ফেসিয়াল রিকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১৬ বছরের কিশোরদের ব্যাপারে নিশ্চিত করতে পারছে না। বয়স দুই-এক বছর কম কিংবা বেশি অ্যাসেসমেন্ট করছে তারা।
এরপরও এই বয়স নির্ধারণ প্রযুক্তি ফলপ্রসূ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘এইজ চেক সার্টিফিকেশন স্কিম’-এর প্রধান টনি অ্যালেন বলেন, “আপনি যখন কোনো মদের দোকানে যান, তখন আপনাকে আগে ভালোভাবে দেখা হয়, নিশ্চিত না হলে আপনার পরিচয়পত্র চাওয়া হয়। এখানেও একইভাবে কাজ করতে হবে।”
কিন্তু পরিচয়পত্র সরবরাহ নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় বিভক্তি আছে। তাই সেটা ছাড়া ট্রায়াল চালায় সংশ্লিষ্টরা। পরীক্ষামূলক পদক্ষেপের ফল নিয়েও তাই বিতর্ক ছিল। উপদেষ্টা বোর্ডের দুই সাবেক সদস্য অভিযোগ করেন যে, এতে পক্ষপাত ছিল। আর গবেষণায় কিশোর-কিশোরীরা কীভাবে এসব বাধা এড়িয়ে যেতে পারে তা নিয়ে ভাবা হলেও, সেগুলো আসলে কাজ করে কি না- তা পরীক্ষা করার দায়িত্ব এই ট্রায়ালের ছিল না।
আরও পরামর্শ আসছে
ইসোবেলের তো ছিল শুধু মায়ের ছবি ব্যবহার করার ঘটনা। আরও কীভাবে লুকিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করা যায় সে পরামর্শও আসছে অনলাইনে। কেউ অভিভাবকদের মেইল এড্রেস দিয়ে অ্যাকাউন্ট খোলার পরামর্শ দিয়েছেন, কেউ বলছেন সরকারের তালিকায় নেই- এমন কোনো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার শুরু করতে। কেউ কেউ ভিপিএন ব্যবহার করারও পরামর্শ দিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে যেন এই পরামর্শগুলো।
চলতি বছর শুরুর দিকে যুক্তরাজ্যে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণে বয়সসীমা যাচাইয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পর সেখানে ভিপিএন ব্যবহারের প্রবণতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়াতেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
২০২৫ সালের মে মাসে করা এক জরিপে দেখা যায়, এক তৃতীয়াংশ অভিভাবক নিজেরাই তাদের বাচ্চাদের এই নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তা করেন। ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের করা এক পরীক্ষায় দেখা যায় ২২ ডলারের একটি হ্যালোউইন মুখোশের মাধ্যমেই ফেসিয়াল অ্যাসেসমেন্ট প্রযুক্তি এড়ানো সম্ভব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষের দাবি, ফেসিয়াল অ্যাসেসনমেন্ট প্রযুক্তি এড়িয়ে যাওয়ার যে বিষয়টি সামনে এসেছে তা রোধ করার সক্ষমতা এখনো রয়েছে। ইসোবেল ছবি ব্যবহার করে যেভাবে ফাঁকি দিয়েছে, তা দিয়ে সাধারণত এই প্রযুক্তিকে বোকা বানানো সম্ভব ছিল না।
স্ন্যাপচ্যাটের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, তারা এসব প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ নিয়ে খুবই উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, “আমরা কিছু কারিগরি ব্যাপার নিয়ে উদ্বিগ্ন, এটা তেমনই এক সমস্যা।” তার দাবি, প্রতিনিয়তই প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন তারা, যেন এই ফাঁকগুলো আর না থাকে।
১৩ বছর বয়সী ইসোবেল অবশ্য বেশ আত্মবিশ্বাসী। এই নিষেধাজ্ঞা যে ফলপ্রসূ হবে না এই বিষয়ে সে নিশ্চিত। সে স্ক্রিনের প্রতি আসক্ত নয় উল্লেখ করে বলছে, অস্ট্রেলীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের স্ক্রিন থেকে দূরে রাখতে যে পদ্ধতি বেছে নিয়েছে, সেটা তার কাছে ‘বোকামি’ মনে হয়েছে।
ইসোবেল বলছে, যদি তাকে নিষিদ্ধ করাই হয়, তবে অন্য কোনো অ্যাপ খুঁজে ব্যবহার করবে সে।
ইসোবেলের মা মনে করেন, বিষয়টি আসলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। তিনি বিখ্যাত গেম ‘হেয়াক অ্যা মোল’ এর কথা উল্লেখ করেন। এই আরকেড গেমে যেভাবে ‘মোলকে আঘাত করার চেষ্টা করা হয় ও সে বারবার গর্তে ঢুকে যায়’- নিষেধাজ্ঞা নিয়ে কিশোরদের সঙ্গে বাবা-মা ও কর্তৃপক্ষের এমন লুকোচুরিই চলবে বলে মনে করেন মেল।
তিনি বলেন, “একটার পর একটা আইনি ফাঁক বের হবে, আর শিশুদের জন্য নতুন নতুন প্ল্যাটফর্ম সামনে আসবে।”
বাস্তবায়নে যত চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোও এই নীতির পুরোপুরি পক্ষে না। তারা ধীরে ধীরে এটা দুর্বল করে দিতে চায় যেন, অন্যান্য দেশ এটি অনুসরণ না করে। তারা সরকারকে বলবে যে খুবই যৌক্তিক পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে ‘দরজাতেও কিছুটা ফাঁক’ রেখে দেবে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ফেসবুকের নেতৃত্ব দেয়া স্টিফেন স্কিলার বলেন, “তারা চায় ছোট দরজা দিয়ে একটি ট্রাক ঢোকাতে। ব্যাপারটা এমন যে, আপনি আপনার সন্তানদের বাসন পরিষ্কার করতে বলছেন, তারা করছেও। কিন্তু ভালোভাবে করছে না এবং মুখে হাসি নিয়ে করছে না।”
২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত এই দুই দেশে ফেসবুক এর শীর্ষ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন স্টিফেন। তিনি বলছেন, কোম্পানিগুলোকে যে জরিমানার কথা বলা হয়েছে তা আয়ের তুলনায় খুবই নগণ্য। ফেসবুকের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন যে প্রতিষ্ঠানটির এই পরিমাণ আয় করতে দুই ঘণ্টা লাগে। তাদের কাছে এটি ‘গাড়ি পার্কিংয়ের জরিমানা’র মতো।
এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়াকে আইনি জটিলতার মধ্যেও পড়তে হতে পারে। ইতোমধ্যে অস্ট্রেলিয়ার দুই কিশোর রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে মামলা করেছে। তাদের দাবি, এই আইন অসাংবিধানিক ও কতৃর্ত্ববাদী। গুগল ও ইউটিউবের মালিক প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটও আইনি লড়াইয়ের কথা ভাবছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোও একই পথে হাঁটতে পারে।
অস্ট্রেলীয় সরকার সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলোকে চাপ দিচ্ছে যেন তারা এমন প্রযুক্তি আনে যে আইনটি বাস্তবায়ন করা যায়। দেশটির তথ্যমন্ত্রী আনিকা ওয়েলস বলেন, “এই পথ একটু কঠিন, যেকোনো সংস্কারের ক্ষেত্রেই এটি সত্য।”
‘এইজ চেক সার্টিফিকেশন স্কিম’ এর টনি অ্যালেন বলেন, “আইনটি সফল হওয়ার মানে এই না যে শতভাগ শিশু সোশ্যাল মিডিয়া থেকে সরে যাবে। ব্যাপারটি হচ্ছে, যেন অন্তত ৮০ শতাংশ শিশু এটি ব্যবহার বন্ধ করে। তাদের দেখে বাকিরাও এমনিতেই সরে আসবে।”
অনেক অভিভাবকরা মনে করেন, এটা অবৈধ বলাই যথেষ্ট। তারা শিশুদের আলাদা করে চাপে রাখতে চান না। ড্যানি এলাচি বলেন, “আমরা সবসময় একই কথা বলে আসছি। আইন বাস্তবায়ন হোক বা না হোক, আমরা একটি নতুন সামাজিক আচার তৈরি করতে চাই।”
ক্ষতি কি কমবে?
নতুন এই আইন বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, এই প্রশ্ন ছাপিয়ে অনেকে প্রশ্ন করছেন যে আসলেই এটা করা উচিত কি না। প্রথমত, ভয় রয়েছে এই আইন কঠোর হলে শিশুরা ইন্টারনেটের আরও অন্ধকার জগতে প্রবেশ করতে পারে।
কেউ বলছেন, এটা গেমিং সাইট চ্যাটরুম হতে পারে, অস্ট্রেলীয় পুলিশ ইতিমধ্যে এই চ্যাটরুমগুলোকে উগ্রবাদের ‘উৎস’ বলে আখ্যা দিয়েছে। যদিও এখনো এই চ্যাটরুমগুলোর ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা জারি হয়নি।
এ ছাড়া ওমেগলের মতো সাইটের কথাও সামনে চলে আসছে। একটা সময় এই প্ল্যাটফর্মও বেশ জনপ্রিয় ছিল। এতে করে যেকোনো অপরিচিত মানুষের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করা যায়। দুই বছর আগে শিশুদের সুরক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে এটি বন্ধ করা হয়। তবে একইরকম সাইট তৈরি হয়েছে আরও।
এ ছাড়া টিকটক ও ইউটিউবের মতো সাইটে অ্যাকাউন্ট না খুলেই প্রবেশ করতে পারে শিশুরা। এতে করে তাদের সামনে ক্ষতিকারক বিজ্ঞাপন ও কনটেন্ট আসার শঙ্কা আরও বেশি। ইউটিউবের একজন মুখপাত্র জানান, “এই আইনে শিশুরা আসলে সুরক্ষিত হবে না বরং তাদের নিরাপত্তা আরও কমে যাবে।”
বড় প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ থাকলেও এটা সত্যি যে তাদের সুরক্ষাব্যবস্থা ছোট প্ল্যাটফর্মগুলোর চেয়ে শক্তিশালী। যেমন ফেসবুকে যদি কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি বারবার কোনো শিশুকে মেসেজ পাঠায় তবে তাকে সিগনাল পাঠায় কর্তৃপক্ষ।
অনলাইন সুরক্ষা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘কোরিয়া’র প্রধান টিম লেভি বলেন, “আপনি যদি আচরণ বদলাতে না পারেন তাহলে লাভ নেই, কারণ আপনি তখন অন্য প্ল্যাটফর্মে চলে যাবেন। তাই ‘সব ঠিক আছে’-বলে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের আশ্বাস দেওয়া আরও বিপজ্জনক।”
সোশ্যাল মিডিয়া ও এর স্বাস্থ্যগত দিকের বিষয়টি বেশ জটিল ও পরিবর্তনশীল। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গিয়েছে, শুধু ক্ষতিই নয়, অনেক সময় শিশুদের জন্য এটি ‘মুক্তি’ও নিশ্চিত করে। বিশেষ করে এলজিবিটিকিউ কিংবা প্রত্যন্ত এলাকার জনগোষ্ঠী থেকে আসা শিশুদের জন্য অনেক সময় সোশ্যাল মিডিয়া লাইফলাইনের মতো কাজ করে।
অস্ট্রেলিয়ার শিশুবিষয়ক কমিশনের সাবেক কমিশনার অ্যানে হোলন্ড বলেন, “আমরা ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিয়ে খুব কম কথা বলি। তারা যে অনলাইনে যুক্ত হয়ে সাহায্য পাচ্ছে বা স্বস্তি বোধ করছে সেই প্রয়োজন কীভাবে মেটাবো তা নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে খুব বেশি আলাপ হয় না।”
তিনি অনেকদিন ধরেই শিশুদের অনলাইন সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছেন। কিন্তু নতুন আইন পাস হওয়ার পর খুবই অবাক হয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, এই ‘অকার্যকর’ পদক্ষেপ নেওয়ায় তিনি হতাশ। তিনি বলেন, এই আইন দিয়ে আসলে কিছু অর্জন করা যাবে না।
অনেকে বলছেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিষিদ্ধ না করে ক্ষতিকারক কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ ও অ্যালগরিদম আরও শক্তিশালী করা উচিত। একইসঙ্গে শিশুদেরকে অনলাইন দুনিয়ার সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্যও বোঝাতে হবে।
১৪০ জনেরও বেশি অস্ট্রেলীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ এই আইন পাস হওয়ার আগেই এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে খোলা চিঠি লিখেছিলেন। হোলন্ড বলেন, “১৬ বছর বয়সের আলাদা কোনো জাদু নেই। এখানে আলাদা করে কিছু হয় না।”
অনলাইন সুরক্ষা বিষয়ক সরকারি কমিশন ইসেফটি-র কমিশনার জুলি ইনম্যাট গ্র্যান্ট্রও একই কথা বলছেন। তিনি বলেন, “শিশুদের সুরক্ষায় আমরা পুরো সমুদ্রকে আটকে রাখি না। বরং আমরা তাদের জন্য সুরক্ষিত সাঁতারের পরিবেশ তৈরি করি এবং ছোট বয়স থেকেই তাদের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিতে থাকি।”
এর জবাবে সোশাল মিডিয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ইঙ্গিত করে তথ্যমন্ত্রী আনিকা ওয়েলস বলছেন, “আমরা তো অন্তত হাঙরকে ঠেকাতে পারবো।”
পরের ধাপ হলো আমাদের ডিজিটাল দায়িত্ববোধ ও একটি আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যার মাধ্যমে কোম্পানিগুলো সম্ভাব্য ক্ষতি থেকে তাদের গ্রাহকদের সুরক্ষা দেবে।”
আনিকা ওয়েলস বলেন, “কেউ আমাকে বলছে, কেন এত বড় বিষয়গুলো আমি অন্তর্ভুক্ত করিনি? আরেকদল বলছে, যেটুকু করার কথা বলেছি, সেটা করাই নাকি অসম্ভব।”
তিনি বলেন, “এটা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়। এটা এক ধরনের চিকিৎসা পরিকল্পনা, আর চিকিৎসা পরিকল্পনা সময়ের সাথে বদলাতেই থাকে। দিনশেষে, এই কাজটা একটা পুরো প্রজন্মকে রক্ষা করার চেষ্টা।”
(বিবিসির প্রতিবেদন অবলম্বনে)



