ইউরোপে ১৪ কোটি ডলার জরিমানার মুখে ইলন মাস্কের এক্স

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স’কে ১২ কোটি ইউরো বা ১৪ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।অর্থের বিনিময়ে ভেরিফায়েড ব্লু টিক বাণিজ্যসহ বেশ কিছু অভিযোগে এ জরিমানার মুখে পড়েছে।

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:৫৫ পিএম

ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এক্স’কে ১২ কোটি ইউরো বা ১৪ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা ইইউ। এক্স-এর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ভেরিফায়েড ব্লু টিক বাণিজ্যসহ বেশ কিছু অভিযোগ এনেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। অনলাইন কন্টেন্টের নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করার অভিযোগে, ৫ই ডিসেম্বর শুক্রবার এক্স-এর উপর এই জরিমানা আরোপ করা হয়।

ইইউ-এর কমিশন বলছে, এক্স প্ল্যাটফর্মে কোনও ব্যবহারকারী চাইলে অর্থের বিনিময়ে তাদের প্রোফাইলে ব্লু টিক বা ব্যাজ পেতে পারেন। এতে ওই ব্লু টিকধারী অ্যাকাউন্ট নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে ‘ভ্রান্ত ধারণা’ তৈরি হয়। কারণ প্লাটফর্মটি আসলে ‘ঠিকভাবে যাচাই’ করছে না, ওই অ্যাকাউন্টের পেছনে কে বা কারা আছেন। কমিশনের আরও একটি অভিযোগ ছিলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে স্বচ্ছ নয় এবং গবেষকদের তথ্যভান্ডার থেকে তথ্য সংগ্রহ করার ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করছে।

কিছুদিন আগেই ইউরোপে এ সংক্রান্ত ’ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট’ বা ডিএসএ জারি করা হয়েছে। এই আইনটি ২০২২ সালের জুলাই মাসে প্রণয়ন করা হয়। ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে পুরো ইউরোপে কার্যকর হয়। এই আইনের লক্ষ্য হলো অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে বেআইনি ও ক্ষতিকর কনটেন্ট মোকাবিলায় আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করা। এর ভিত্তিতেই জরিমানা করা হয় এক্সকে। 

এই আইনের মাধ্যমে ইইউ এখন প্রযুক্তি খাতে বড় কোম্পানিগুলোর উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা চালাচ্ছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছোট প্রযুক্তি সংস্থাগুলো যাতে উপরে উঠে আসতে পারে এবং গ্রাহকরা যাতে আরও বেশি স্বাধীনতা ও বিকল্পের সুযোগ পায়।

তবে ইউরোপের এই নীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সমালোচনা করেছেন। তীব্র আপত্তি জানিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের অভিযোগ, ইউরোপের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করে নেওয়া হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, মার্কো রুবিও ইইউ-এর এই পদক্ষেপটিকে শুধু এক্স-এর উপর আক্রমণ হিসেবে দেখছে না, একে  তিনি দেখছেন সকল মার্কিন প্রযুক্তিমাধ্যম ও জনগণের উপর একটি আক্রমণ হিসেবে। এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট দিয়েই তিনি এই অবস্থান জানিয়েছেন।

ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন বা এফসিসি’এর চেয়ার ব্রেন্ডন কারের মতে ইউরোপ তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং কঠোর নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা ঢাকতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর ওপর জরিমানা চাপাচ্ছে।

এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও এ নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “ইইউ-এর উচিত বাকস্বাধীনতাকে সমর্থন করা, কিন্তু তারা তা না করে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে আক্রমণ করছে।”

অন্যদিকে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। ইইউ-এর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তাদের প্রণীত আইন কোনো নির্দিষ্ট দেশের কোম্পানিকে লক্ষ্য করে তৈরি হয়নি। তাদের মূল লক্ষ্য হলো ডিজিটাল এবং গণতান্ত্রিক মানদণ্ড বজায় রাখা, যা সারা বিশ্বের জন্য একটি অনুসরণীয় উদাহরণ হিসেবে কাজ করবে।

এক্স-এর উপর জরিমানা আরোপকারী কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্লু টিকের ভ্রান্তির কারণে প্রতারণা ও জালিয়াতির মুখে পড়তে পারেন ব্যবহারকারীরা, যেমন কারও পরিচয় নকল করা ও খারাপ ব্যক্তিদের মাধ্যমে বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর বা মিথ্যা প্রভাবের শিকার হতে পারেন তারা। 

ডিএসএ অনুযায়ী এক্স-এর বিরুদ্ধে দুই বছর ধরে তদন্তের পর এই জরিমানা করা হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রযুক্তিবিষয়ক প্রধান হেনা ভার্কুনেন বলেন, ব্যবহারকারীর অধিকার ক্ষুণ্ন করা এবং জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার জন্য এক্স'কে দায়ী করা হয়েছে।

ডিএসএ আইনের প্রথম শিকার এক্স। যদিও এর আগে, ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসেই এই আইনের অধীনে টিকটক ও মেটার বিরুদ্ধেও অভিযোগ এনেছিলো ইইউ। টিকটকের বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছিলো। এজন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটিকে জরিমানাও করা হয়েছিলো। কিন্তু তখন টিকটক প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে জরিমানা এড়াতে পেরেছিলো। আহ্বান জানিয়েছিলো যাতে সবার ক্ষেত্রে এই আইনটি সমানভাবে প্রযোজ্য হয়। তবে টিকটকের ডিজাইন, শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ক আইনের প্রয়োগ ও কারিগরি বিষয় নিয়েও তদন্ত চলছে। 

আর মার্ক জাকার্বার্গের মেটার বিরুদ্ধে স্বচ্ছতা ও ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা বিষয়ক নিয়ম ভাঙ্গার প্রাথমিক অভিযোগ আনা হয়েছিলো। তবে তখন মেটাকে কোনো জরিমানা করা হয়নি। এ নিয়ে এখনও তদন্ত চলছে। 

ইইউ কমিশন জানিয়েছে এক্স নিয়ে এখন আরো একটি তদন্ত চলছে। এই তদন্তের বিষয় এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি কোনো বেআইনি কন্টেন্ট ছড়াচ্ছে কি না, কিংবা তথ্য বিকৃত করছে কি না।