পটুয়াখালীর বাউফলের বাসিন্দা জাকিয়া বেগম। তার সন্তান নাজিরপুর বোর্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণি পড়ে। ২রা ডিসেম্বর সন্তানকে স্কুলে পরীক্ষা দিতে নিয়ে যান তিনি। কিন্তু গিয়ে দেখেন শিক্ষকরা নেই। প্রধান শিক্ষক, কয়েকজন কর্মকর্তাদের নিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তখন কয়েকজন অভিভাবককে নিয়ে তিনিও পরীক্ষার গার্ড দেওয়া শুরু করেন।
জাকিয়া বেগম বলেন, “আমাদেরই শিক্ষকদের দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। বাচ্চারা সারাবছর পড়াশোনা করেছে বার্ষিক পরীক্ষার জন্য, পরীক্ষাই যদি দিতে না পারে। হেডমাস্টার স্যার তো একা পারবেন না। তাই আমরা সাহায্য করেছি।”
দেশের সব সরকারি স্কুলে শুরু হয়েছে বার্ষিক পরীক্ষা। কিন্তু অন্য বছরের থেকে এবারের পরীক্ষার হলের চিত্র ভিন্ন। হলে শিক্ষক না থাকায় অভিভাবকরাই সন্তানদের বার্ষিক পরীক্ষা নিয়েছেন এমন ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি স্কুলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে দেখা গেছে এমন চিত্র। প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ শুরু হয়েছে ৩রা ডিসেম্বর বুধবার। আর ১লা ডিসেম্বর সোমবার থেকে কর্মবিরতিতে রয়েছেন সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষকরা।
কিন্তু অনেক স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হওয়ায় এই কর্মসূচিতে বিপাকে পড়েছেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
মঙ্গলবার পটুয়াখালীর বাউফলে শিক্ষকদের কর্মবিরতির কারণে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেন অভিভাবকরা। কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে গিয়েও ফিরে এসেছেন বলেও জানা গেছে।
তবে শিক্ষকরা বলছেন, বারবার দাবি জানিয়েও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না তারা।
বাংলাদেশ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির নেতা আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান বলেছেন, “আমরা বারবার আমাদের দাবি জানিয়েছি। ২০২৫ এর অগাস্টে আমরা মানববন্ধন করেছি, অক্টোবরে প্রেসক্লাবে প্রেস কনফারেন্স করেছি, পরবর্তীতে শিক্ষক সমাবেশ করেছি। অবস্থান কর্মসূচিও ছিল আমাদের। সবশেষ আমরা কর্মবিরতিতে গেলাম।”
শিক্ষকদের দাবি
মাধ্যমিকের শিক্ষকদের দাবিগুলো হলো:
- সহকারী শিক্ষক পদকে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারভুক্ত করে নবম গ্রেডসহ পদসোপান ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের গেজেট প্রকাশ।
- বিদ্যালয় ও পরিদর্শন শাখায় কর্মরত শিক্ষকদের বিভিন্ন শূন্য পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়ন দ্রুত কার্যকর করা।
- সুপ্রিম কোর্টের রায়ের আলোকে বকেয়া টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের মঞ্জুরি আদেশ দেওয়া।
- ২০১৫ সালের আগের মতো সহকারী শিক্ষকদের ২ থেকে ৩টি ইনক্রিমেন্টসহ অগ্রিম বর্ধিত বেতন-সুবিধা বহাল করে গেজেট প্রকাশ।
সংগঠনটি জানায়, পূর্বের বকেয়া না দেওয়ায় এই পথে নামতে হচ্ছে। দ্রুত সব বকেয়ার গেজেট করে দিয়ে শ্রেণি কার্যক্রমে ফিরিয়ে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
তবে বার্ষিক পরীক্ষার ব্যাপারে তারা অবস্থান নমনীয় করেছে। ১লা ও ২রা ডিসেম্বর দুইদিন কর্মবিরতির পর তারা বার্ষিক পরীক্ষা বিবেচনায় নিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।
আব্দুল্লাহ আল নাহিয়ান বলেন, “শিক্ষার্থীদের বার্ষিক পরীক্ষার ব্যাপারটি আমরা চিন্তা করেছি। তাই আপাতত আমাদের কার্যক্রম স্থগিত করেছি। পরীক্ষার পর আবার আমরা পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবো।”
তবে এখনো কর্মসূচি চলমান রেখেছে প্রাথমিক শিক্ষা পরিষদ ও সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদ। গত ২৭এ নভেম্বর থেকে তিন দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করে ‘প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ’।
সবশেষ ১লা ডিসেম্বর সোমবার তারা বার্ষিক পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচিও শুরু করে। তারা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে কর্মবিরতির পাশাপাশি জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ চেয়ে স্মারকলিপি জমা দেন।
প্রায় একই দাবিতে আরেকটি সংগঠন ‘সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদের’ ব্যানারে ২৩ থেকে ২৭এ নভেম্বর কর্মবিরতি পালন করেছিল।
বুধবারের মধ্যে দাবি পূরণ না হলে ৪ ডিসেম্বর বিদ্যালয়ে ‘তালাবদ্ধ’ কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দিয়ে রেখেছে তারা।
প্রাথমিক শিক্ষকদের তিন দফা দাবি হলো -
সহকারী শিক্ষকদের জাতীয় বেতন স্কেলে আপাতত ১১তম গ্রেড দেওয়া,
চাকরির ১০ ও ১৬ বছর পূর্তিতে উচ্চতর গ্রেডপ্রাপ্তির জটিলতার নিরসন এবং
সহকারী শিক্ষক থেকে প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতি দেওয়া।
বর্তমানে সহকারী শিক্ষকেরা ১৩তম গ্রেডে আছেন। তাদের শুরুর মূল বেতন ১১ হাজার টাকা। একই দাবি প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সংগঠন ঐক্য পরিষদেরও।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২ কোটি ১ লাখেরও বেশি।
শিক্ষক রয়েছেন পৌনে চার ৭ লাখ ৭ হাজারের বেশি। সাধারণ অনুপাতে প্রতি ২৮ জন শিক্ষার্থীর জন্য একজন শিক্ষক দায়িত্বপ্রাপ্ত।
তবে বারবারই শিক্ষকদের আন্দোলনে নামতে হচ্ছে। ২০২১ সালের ১৩ নভেম্বর ১০ গ্রেডের জন্য আন্দোলন শুরু করে প্রাথমিক শিক্ষক দাবি বাস্তবায়ন পরিষদ। সংগঠনের আহ্বায়ক মু. মাহবুবর রহমান বলেন, সে বছর ১৩ই নভেম্বর প্রথম তারা দাবি জানান। কিন্তু লাভ হয়নি। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছেও তাদের দাবি পেশ করেন। বারবার শিক্ষকদের মর্যাদা দেওয়ার দাবি জানানোর একটা পর্যায়ে তারা ২০২৫ সালে ২৪এ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাত্রা করেন।
মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমরা সেই পদযাত্রার নাম দেই ‘মার্চ ফর ডিগনিটি’। কিন্তু আমাদের শাহবাগে আটকে দেওয়া হয় এবং ১০জনকে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নেওয়া হয়। তবে কেনো সমাধান হয়নি।”
সবশেষ ৮ই নভেম্বর শহীদ মিনার থেকে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দেন শিক্ষকরা। মাহবুবুর রহমান বলেন, “সেদিন আমরা ‘কলম সমর্পণ’ করি এবং কর্মবিরতিতে যাই। কিন্তু সেদিনই পুলিশ আমাদের ওপর ভয়াবহ লাঠিচার্জ করে। পুলিশের হামলায় আহত হয়ে ১৬ নভেম্বর আমাদের এক সহকর্মী মারাও যান।”
এই মুহূর্তে তারা পূর্ণকর্মবিরতি থাকবেন বলে জানান। সংগঠনের আহ্বায়ক বলেন, “আমরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। তাদের জন্য আমাদের খারাপ লাগছে। কিন্তু আমরা আমাদের মর্যাদা চাই।”
অন্যদিকে গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠন ঐক্য পরিষদ জানিয়েছে, দাবি আদায় না হলে পরীক্ষা বর্জনসহ ১১ ডিসেম্বর থেকে অনশন কর্মসূচি পালন করবেন তারা।
সরকারের কঠোর বার্তা
এর মধ্যে সোমবার ১লা ডিসেম্বর বাসসকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কঠোর বার্তা দেন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি আর আবরার। তিনি বলেছেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা দেশের বিভিন্ন স্থানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা বন্ধের যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সরকারি কর্মচারী বিধি লঙ্ঘনের দায়ে তাদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
শিক্ষা উপদেষ্টার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে কোনো সংগঠনের নেতা এখনো মন্তব্য করেননি।
সাম্প্রতিক সময়ে দাবি আদায়ে একাধিকবার রাজপথে নেমেছেন বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকরা। গত অক্টোবরেও সেসময় নিজেদের দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা।
২০২৫ সালের ৫ই অগাস্ট, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়ি ভাড়া পাঁচশ টাকা বাড়িয়ে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
মূলত এই প্রজ্ঞাপন ঘিরেই নতুন করে আন্দোলনে নামেন তারা। জারি করা এই প্রজ্ঞাপনকে অপমানজনক উল্লেখ করে মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়াসহ তিন দফা দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে কর্মসূচির ডাক দেয় তারা, যেখানে পুলিশের বাঁধা, লাঠিপেটা, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
এ ছাড়া নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তির দাবিতে ৪৪ দিন পাঠদান বন্ধ করে রাজপথে নামেন শিক্ষকরা।
গত ২৩এ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা। ১২ই মার্চ শিক্ষা উপদেষ্টা ও মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার পর কর্মসূচি স্থগিত করা হলেও দাবি বাস্তবায়নে অগ্রগতি না হওয়ায় আগের অবস্থানে অটল তারা।



