খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও চলমান উদ্বেগ, গুজব, শঙ্কা

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থা, হাসপাতালের সর্বশেষ আপডেট, গুজব-উৎকণ্ঠা, তারেক রহমানের আবেগঘন বার্তা, আন্তর্জাতিক উদ্বেগ ও চিকিৎসা নিয়ে চলমান জটিলতা, হাসপাতালের ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপডেট, রাজনৈতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ও ছড়িয়ে পড়া গুজব এবং বাস্তব অবস্থা। 

আপডেট : ০২ ডিসেম্বর ২০২৫, ০৮:০২ পিএম

সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এখন একজন ভিভিআইপি- অর্থাৎ রাষ্ট্রের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন।

অথচ বছর দেড়েক আগেও তিনি ছিলেন একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। এখন তাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন দেশ-বিদেশের মানুষ। তার সুস্থতা কামনা করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন একজন বিদেশি রাষ্ট্রনায়কও।  

খালেদা জিয়াকে গত তেইশে নভেম্বর এভারকেয়ার হাসপাতালে নেয়ার পর থেকেই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় কাটছে এক একটি মুহূর্ত। 

সেদিন তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ফুসফুস ও হৃদযন্ত্রের গুরুতর সংক্রমণ নিয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন খালেদা জিয়া।  

এরপর থেকে তার অসুস্থতা নিয়ে শুরু হয় নানারকম গুজব, ডালপালা মেলতে শুরু করে গল্প।

এই অবস্থার মধ্যে মঙ্গলবার আরও একবার সাংবাদিকদের সামনে হাজির হন ডা. জাহিদ।

“চিকিৎসা গ্রহণ করতে পারছেন খালেদা জিয়া,” বলেছেন তিনি। 

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান এবং ‘গুজব’ নিয়ে ‘সতর্ক’ থাকতে বলেন জাহিদ।

তিনি বলেন, “বিভিন্ন ধরনের গুজব, বিভিন্ন ধরনের বক্তব্য, বিভিন্ন জায়গায় দেখার পরিপ্রেক্ষিতে- আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ( তারেক রহমান) সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন।” 

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হলেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। নিজের পদের কথা মনে করিয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, বিএনপির চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের বিষয়ে তিনি ছাড়া অন্য কারও কথায় কান দেবেন না। 

“আমি দলের একজন কর্মী, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ব্রিফ করব। এর বাইরে আর কারও ব্রিফিংয়ের প্রতি কোনো ধরনের কান না দেওয়ার জন্য দলের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।” 

উৎকণ্ঠা ও চলমান উদ্বেগ

তেইশে নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তির পর প্রথম দুই দিন স্বাভাবিক সাড়া দিচ্ছিলেন খালেদা জিয়া। কিন্তু অবনতি হতে শুরু করে গত বুধবার থেকে। 

তারপর থেকে টানা তিন দিন মানে শুক্রবার পর্যন্ত ছিলেন প্রায় সাড়াহীন। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে গুজব। 

সবচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্রিফিংয়ের পর। 

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে গত শুক্রবার সাংবাদিকদের মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়ার অবস্থা ‘অত্যন্ত সংকটময়’। 

এরপরই বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশবাসীর কাছে তার আশু সুস্থতার জন্য দোয়া কামনা করে বিবৃতি দেন অন্তর্বর্তী সরকারের ড. মুহাম্মদ ইউনূস। 

ওইদিন রাতেই প্রধান উপদেষ্টার বিবৃতির পর দলীয়ভাবে বিবৃতি দেয় বিএনপি- যেখানে খালেদা জিয়ার অবস্থাকে ‘গুরুতর ও সংকটাপন্ন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

তারেক রহমানের বিবৃতি 

 বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় সহায়তা ও পরামর্শ দিতে চীন থেকে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম ঢাকায় এসেছে। মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন চীনা চিকিৎসকরা।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আশু রোগমুক্তি কামনা করে ফেইসবুকে পোস্ট দেন তার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান- তিনি গত ১৭ বছর ধরে লন্ডনপ্রবাসী।  

তারেক রহমান তার মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়ে নিজের দেশে ফেরা নিয়ে লেখেন। স্ট্যাটাসে তিনি মায়ের প্রতি তীব্র আবেগ, দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতি একধরনের অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। 

“এমন সংকটকালে মায়ের স্নেহ স্পর্শ পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা যে কোন সন্তানের মত আমারও রয়েছে। কিন্তু অন্য আর সকলের মত এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়,” লেখেন তিনি। 

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নেত্রীকে নিয়ে ড. ইউনূসের বিবৃতিতে যে সৌজন্য ও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে, সে জন্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রধান উপদেষ্টাকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। 

তারেক রহমানের ওই পোস্টের পর তার দেশে ফেরা নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। নেটিজেনরা নানা ধরনের মন্তব্য করতে থাকেন। অনেকেরই প্রশ্ন, তাহলে তারেক রহমান দেশে ফিরছেন কবে?  

বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “উনি (তারেক রহমান) শিগগিরই দেশে চলে আসবেন।”

এদিকে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের মধ্যে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

এক্স হ্যান্ডেলে তিনি লিখেছেন, “বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থার বিষয়ে জানতে পেরে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, বহু বছর ধরে তিনি বাংলাদেশের গণজীবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে এসেছেন। তার দ্রুত সুস্থতার জন্য আমাদের আন্তরিক প্রার্থনা ও শুভকামনা রইলো। যে কোনো প্রয়োজনে ভারত সবরকম সম্ভাব্য সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।” 

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা 

এবার হাসপাতালে ভর্তির পর গত বুধবার থেকে তিনদিন সাড়াহীন ছিলেন। শনিবার তিনি সামান্য কথা বলেন। কিন্তু তখন যে সংকট কেটে গিয়েছিল- তেমন আশার কথা বলেননি চিকিৎসকরা। 

এরমধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। 

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন বলেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য উন্নতি হলেই পরিবারের সদস্যরা তাকে লন্ডনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে তাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেয়ার বিষয়ে মেডিকেল বোর্ড এখনো কোনো পরামর্শ দেয়নি বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান রুহুল কবির রিজভী।

তিনি তখন আরও জানিয়েছিলেন, লন্ডনে খালেদা জিয়া যেই হাসপাতালে আগে চিকিৎসা নিয়েছিলেন, সেখানকার চিকিৎসকদের সাথে তারেক রহমান যোগাযোগ রাখছেন। একই সাথে তিনি ঢাকার চিকিৎসকদের সাথেও কথা বলছেন।

কিন্তু রবিবার গভীর রাতে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা খালেদা জিয়াকে ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা দেয়া শুরু করেন। 

কিন্তু বিদেশে নেয়ার মতো অবস্থা এখনো হয়নি। বিএনপি চেয়ারপারসনের চিকিৎসায় সহায়তা ও পরামর্শ দিতে চীন থেকে একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল টিম ঢাকায় এসেছে। মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে বৈঠকে করেছেন চীনা চিকিৎসকরা। 

খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা নিয়ে মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে কথা বলেন ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। 

তিনি বলেন, “আজকে যুক্তরাজ্য থেকে বিশেষজ্ঞ আসবেন। উনাকে দেখবেন, দেখার পর তাকে যদি ট্রান্সফার করার প্রয়োজন পড়ে, মেডিকেল বোর্ড মনে করে, তখনই তাকে যথাযথ সময়ে দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হবে।

“আমাদের সকল প্রস্তুতি আছে। কিন্তু সর্বোচ্চ মনে রাখতে হবে যে রোগীর বর্তমান অবস্থা ও সর্বোপরি মেডিকেল বোর্ডের পরামর্শের বাইরে কিছু করার মতো সুযোগ এই মুহূর্তে আমাদের নেই।”

খালেদা জিয়া বহু বছর ধরেই লিভার সিরোসিস, আর্থরাইটিস, ডায়াবেটিস, কিডনি, ফুসফুস এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন।

তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় হাজিরা এবং পরে কারাগারে থাকাকালীন সময়েই তার শারীরিক অবস্থার সবচেয়ে বেশি অবনতি হতে শুরু করে। 

নানান আইনি জটিলতা দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়নি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার।

আওয়ামী লীগ আমলে ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাকে কারাবন্দি করা হয়। 

তারপর থেকে প্রথমে কারাগারে বিশেষ ব্যবস্থায় ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। 

কোভিড-১৯ মহামারি হানা দিলে ২০২০ সালের মার্চে নির্বাহী আদেশে তাকে মুক্তি দেয়া হয়। তবে জুড়ে দেয়া হয় শর্ত- তিনি বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে পারবেন না। 

যদিও সে সময় দলের পক্ষ থেকে বারবার অনুরোধ করেও চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশ নেয়ার অনুমতি পাওয়া যায়নি। 

২০২১ সালের মে মাসে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন খালেদা জিয়া। ২০২৪ সালের জুনে তার হৃদপিণ্ডে বসানো হয় পেসমেকার। 

তখনো তিনি মূলত হার্ট, কিডনি ও লিভারসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে ভুগছিলেন, যা তার শারীরিক অবস্থাকে জটিল করে তুলেছিল। তখন উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে বিদেশে নিতে সরকারের কাছে বারবার অনুরোধ করা হয়। 

কিন্তু নানান আইনি জটিলতা দেখিয়ে খালেদা জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি দেয়নি তখনকার আওয়ামী লীগ সরকার। 

চব্বিশের পাঁচই অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনার। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গেই সব দণ্ড থেকে মুক্ত হন খালেদা জিয়া। 

গত আটই জানুয়ারি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান তিনি। চার মাস পর দেশে ফেরেন। 

এরপর নিয়মিত খালেদা জিয়া এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে বারবারই সকল উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কাটিয়ে ফিরে এসেছেন বিএনপির নেতাকর্মীদের ‘আপসহীন নেত্রী’। 

গত বছর সাজা মুক্ত হলেও খালেদা জিয়া হাসপাতাল ছাড়া বাসার বাইরে তেমন একটা বের হতেন না। সবশেষ একুশে নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসে তিনি যোগ দেন ঢাকা সেনানিবাসের অনুষ্ঠানে। 

তেইশে নভেম্বর তাকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেয়া হয়। ডাক্তাররা জানান, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন খালেদা জিয়া। 

‘সংকটময়’ এই অবস্থার মধ্যেই সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে সরকার ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি)’ ঘোষণা করেছে। তার নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে, স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ)।