খালেদা জিয়ার জন্য চিকিৎসকরা ‘আপ্রাণ চেষ্টা করছেন’

খালেদা জিয়া ‘খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে চলে গেছেন’- একজন ভাইস চেয়ারম্যান এই বক্তব্য দেয়ার পর বিএনপি অনুরোধ জানাচ্ছে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের ব্যাপারে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেন ছাড়া আর কারো বক্তব্যে কান না দিতে।

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫৪ পিএম

সংকটাপন্ন অবস্থায় আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়েই তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্ব।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সোমবার দুপুরে বলেন, “আমাদের চিকিৎসকরা কাজ করছেন, আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। দেশি-বিদেশি সমস্ত চিকিৎসকদেরকে যুক্ত রেখেই তারা চিকিৎসাটা করছে।”

খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তির জন্য ফের দোয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব। 

দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী জানিয়েছেন গত কয়েকদিনের মতোই খালেদা জিয়াকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। এ নিয়ে ’বিভ্রান্ত না হওয়ার’ অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমদ আযম খান ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া ‘খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ চলে গেছেন।

পয়লা ডিসেম্বর সোমবার দুপুরে তিনি বলেন, “উনি খুব ডিপ কন্ডিশনে, আমি ঠিক ডিপ কন্ডিশনের ব্যাখ্যাটা আপনাদের কাছে দিতে চাই না, এটুকু বলতে চাই, উনি খুব ডিপ কন্ডিশনেই আছেন। এটাকে আপনারা ভেন্টিলেশনও বলতে পারেন বা খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনও বলতে পারেন।” 

তবে ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য ছাড়া অন্য কোনো সূত্র বা কারও বক্তব্য ব্যবহার করে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সংবাদ প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি। বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। 

গত একুশে নভেম্বর শুক্রবার খালেদা জিয়া সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

এরপর স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য তেইশে নভেম্বর রাতে তাকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ফুসফুসে ‘সংক্রমণ’ ধরা পড়ায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ওই দিন থেকেই তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হয়। ২৭এ নভেম্বর তাকে ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়।

এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে।

এই বোর্ডে তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাজ্যের লন্ডন ক্লিনিকের চিকিৎসকরাও আছেন। লন্ডন থেকে খালেদা জিয়ার ছেলে ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি ঘটলে চিকিৎসকরা যদি ‘ফিট টু ট্রাভেল’ অনাপত্তি দেন তবেই তাকে বিদেশ নেয়া হতে পারে।

রবিবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টাও জানিয়েছিলেন দলের পাশাপাশি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে বিদেশ নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারের যা কারণীয় তার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখা আছে।

ফার্স্ট লেডি থেকে প্রধানমন্ত্রী

১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে লড়ে জিতেছিলেন সবকটিতেই। হয়েছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর সরকার প্রধান ছিলেন আরো দুইবার।

১৯৮১ সালের ৩০এ মে, যেদিন জিয়াউর রহমানকে হত্যা করা হয়, সেদিনও তিনি ছিলেন গৃহবধূ। ফার্স্ট লেডি হয়েও জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খালেদা জিয়া হয়ে ক্রমেই উঠেছেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক অপরিহার্য নাম।

চার দশকেরও বেশি সময় বিএনপির হাল ধরে রেখেছেন। দীর্ঘ পথচলায় সামলেছেন নানা বাধা-বিপত্তি। আশির দশকে অনেক রাজনৈতিক দলই যখন স্বৈরশাসক এরশাদের দেয়া ভোটে অংশ নেয়, তখনও দুই দফা নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্তে ছিলেন অবিচল। হয়েছিলেন গ্রেপ্তারও।

সমর্থকদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন আপসহীন নেত্রী। সেই দৃঢ়তা অটুট ছিল ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময়ও। যখন কথিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ বাস্তবায়নের তোড়জোড় ছিল তখনও তিনি ছিলেন দেশ না ছাড়ার সিদ্ধান্তে অটল।

পাঁচবার লড়েছেন জাতীয় নির্বাচনে। কোনদিন কোন সংসদ নির্বাচনের ভোটে হারেননি। তিনবার হয়েছেন সরকার প্রধান আর দুইবার বিরোধীদলীয় নেতা। 

এক মধ্যবিত্ত পরিবারের আটপৌরে সেই নারী ক্রমেই হয়ে উঠলেন দেশের ক্ষমতার অন্যতম ভরকেন্দ্র। এইচ এম এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি আসন থেকে লড়ে জিতেছিলেন সবকটিতেই। হয়েছিলেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। এরপর সরকার প্রধান ছিলেন আরো দুইবার।

২০০৮ সালে সংসদে গিয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা হিসাবে। এরপর আর নির্বাচনে অংশ নেননি। কিন্তু ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের রোষানলে পড়ে ঘরবন্দি ছিলেন। তারপর অসুস্থতা নিয়ে দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। ২০২০ সালে সাজা স্থগিত হয়ে জেল থেকে ছাড়া পেলেও ছিলেন কার্যত গৃহবন্দি। রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞাতো বটেই, চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়ারও অনুমতি মেলেনি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বন্দিদশা থেকে মুক্তি মিললেও ততদিনে রোগ জেঁকে বসেছে শরীরে। আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিসসহ নানা শারীরিক জটিলতা আঁকড়ে ধরেছে তাকে।