আইনের প্রয়োগ নাকি ‘মোরাল পুলিশিং’: ক্ষমতার সীমা কোথায়?

“পুলিশ কোনো অভিযুক্তকে প্রহার করার অধিকার রাখে না। পুলিশ যদি কারো বিরুদ্ধে প্রমাণও পায় তাকে প্রহার করতে পারবে না।"

আপডেট : ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৯:০২ পিএম

ছাত্রদের একটি দল বিক্ষোভ নিয়ে শাহবাগ থানায় গেলে গেইট বন্ধ করে দেওয়া হয়। ভেতরে পুলিশদের দেখা যায়, অনেকেরই মুখ ঢাকা, নেইমপ্লেট নেই। এটি মঙ্গলবার দুপুরের ঘটনা।

সোমবার রাতে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মাদকবিরোধী অভিযানে শিক্ষার্থী ও সংবাদকর্মীদের ওপর পুলিশের লাঠিচার্জের জেরে এই বিক্ষোভ হয়।

তল্লাশির নামে ‘অপমান’, যুক্তিতর্কের জবাবে ‘লাঠিচার্জ’, এমনকি দায়িত্বরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা, সব মিলিয়ে ‘পুলিশি ইগো’, ‘মোরাল পুলিশিং’ বনাম পোশাকধারীদের আইনের সীমা বিতর্ক আবারও তীব্র।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও ধানমন্ডি লেকের দুটি ভাইরাল ভিডিও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে পুলিশ কি আইন প্রয়োগ করছে, নাকি ‘নৈতিকতার রক্ষক’ হয়ে উঠছে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘মোরাল পুলিশিং’ বলতে বোঝানো হয় রাষ্ট্র বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন আইন প্রয়োগের সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক বা নৈতিক আচরণ নিয়ন্ত্রণে নামে। রবিবারের ঘটনায় তা ফের আলোচনায়।

বিশেষ করে শিক্ষামন্ত্রীর সেই বক্তব্য, “রাতে রাস্তায় ঘুরলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এতে কন্সটিটিউশনাল ভায়োলেশন (সংবিধান লঙ্ঘন) হলে সেটি আমরা পরে দেখব।”

শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্য মোরাল পুলিশিংকে অনুপ্রাণিত করল কি-না সেই প্রশ্নও উঠছে।

তল্লাশি নয় চড়-থাপ্পড়

বয়স ১৮-২০ বছরের বেশি হবে না। পুলিশের তল্লাশিতে পড়েছে। পকেট সার্চ করে একটা পকেট টিস্যুর প্যাকেটে কিছু টাকা রাখা।
পুলিশের প্রশ্ন, ‘এভাবে কেউ টাকা রাখে?’

লাল টি-শার্ট পরা ছেলেটি বলছিলেন, ’আর কিচ্ছু নাই স্যার। আমি নেশা করি না স্যার’। ছেলেটি ঢাকার সিটি কলেজের স্টুডেন্ট। শ্যুটিং দেখছিলেন ধানমন্ডি লেকের পাড়ে।

আরো সার্চ করে তার কাছে কিছুই পাওয়া গেল না। আবারও ছেলেটি বললেন, ‘স্যার আমি আসলে শ্যুটিং দেখছিলাম’।

চলে যেতে বলা হলো। যেই না যেতে শুরু করলো ছেলেটি, প্রথমে বাম কাঁধে ধাক্কা। তারপর ডান কানের ওপর সপাটে চড়। স্যোশাল মিডিয়ায় ভিডিওটি ভাইরাল।

প্রশ্ন উঠছে কোনো অভিযোগ বা জব্দকৃত আলামত ছাড়াই শারীরিক আঘাত কি আইনসম্মত বলপ্রয়োগ?

বিতর্কের জেরে লাঠিচার্জ

আরেকটি ভাইরাল ভিডিওতে দেখা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ভেতরের রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বচসায় জড়িয়ে পড়ে ওই সময় তল্লাশি চালানো পুলিশের একটি দলের সাথে।

ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে একজন পুলিশকে শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে বলতে শোনা যায়, ‘এখানে সার্চ করবে, না পাইলেতো সুন্দর করে চলে যাবা, ব্যাস।’

এ সময় আরেকজনের উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা কোনো নাগরিক সমাজে বসবাস করিনা? আমরা তো একটা গণতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করি।’

তখন আবার আগের পুলিশের যুক্তি, ‘এটা এমনিতেই একটা অন্ধকার জায়গা। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দিনে একটি ভিন্ন জিনিস। কিন্তু এখন একটা রোজা রমজানের দিন। ইফতার করতেছে, ইফতারের পর যারা ভদ্র মানুষ তারা চলে যাবে।’

ছেলেটি বলছে, ‘এটা একটা রাস্তা। আপনারা আজকে এখানে রেইড দিচ্ছেন তার মানে এই না এখানে মানুষ যাতায়াত করে না প্রত্যেক দিন। আমি… নেমে এখান দিয়ে যাচ্ছি…’

পুলিশের সাফ জবাব, ‘না এটা রাস্তা না।’

তিনি কোন পথে হাঁটবেন এটা তার চয়েস বলে জানান ওই শিক্ষার্থী।

ঢাবি শিক্ষার্থীর কথার উত্তরে আরেকজনকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার ল্যাঙ্গুয়েজ হচ্ছে না। ছোট ভাই আর্গুমেন্ট বেশি করতেছ।’

পুলিশের আবার প্রশ্ন, ‘এখানে কারা থাকে?’

শিক্ষার্থীর উত্তর, ‘কারা থাকে আমি জানি না তো।’

পুলিশের উত্তর, ‘যারা গাঞ্জাখোর, ইয়াবাখোর তারা এখানে থাকে।’

‘তো শুনলাম, তার মানে সমীকরণ কী দাঁড় করাচ্ছেন আপনি?’ ছেলেটির এই উত্তরের সঙ্গে সঙ্গে বলতে শোনা যায়, ‘এই নিয়ে যা’।

এরপর পুলিশের বেধড়ক লাঠিপেটা। ছেলেটির মাথা লক্ষ্য করে এই মারের পর ছেলেটা মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।

রেহাই পায়নি কর্তব্যরত সাংবাদিকও। অভিযানের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচার করছিলেন, বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোরের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার তোফায়েল আহমেদ ও আজকের পত্রিকার কাওসার আহমেদ রিপন। অভিযোগ, লাইভ বন্ধ করতে বললে তারা প্রতিবাদ করেন। এরপর তাদের ওপরও হামলা চালানো হয়। পরে পুলিশই তাদের ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়।

ঘটনার বর্ণনায় আলাপকে রিপন বলেন, “অভিযান চলার সময় অনেক সাধারণ মানুষ, কিছু কাপলকেও পুলিশ লাঠিচার্জ করছিল। এটা ভিডিও করছিল তোফায়েল। কিন্তু পুলিশ তাকে লাইভ ভিডিও করতে দেবে না।”

“এটা নিয়ে প্রতিবাদ করলে পুলিশ তাকে মারতে শুরু করে। সেটা আবার আমি ভিডিও করছিলাম। তখন আমাকেও ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে পায়ে মারতে শুরু করে।”

আইন কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৫(৫) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, “কোনো ব্যক্তিকে যন্ত্রণাদায়ক, নিষ্ঠুর বা লাঞ্ছনাকর দণ্ড দেওয়া যাবে না”।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পলাশ কান্তি দাস আলাপকে বলেন, “গ্রেপ্তার বা জিজ্ঞাসাবাদের ক্ষমতা পুলিশের আছে; কিন্তু কোথাও পুলিশকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়নি।”

ফৌজদারি কার্যবিধি বা সিআরপিসি’র ৫৪ ও ৫৫ নাম্বার ধারায় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ক্ষমতা রয়েছে। ১০৯ নাম্বার ধারায় ভবঘুরেদের ক্ষেত্রে শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে মুচলেকার বিধান আছে।

কিন্তু কোথাও কি বলা আছে যুক্তিতর্ক করলে বা ‘অকারণে ঘোরাঘুরি’ করলে তাৎক্ষণিক শারীরিক শাস্তি দেওয়া যাবে?

আইনজীবী পলাশ কান্তি দাস মনে করেন, ১৯৭৬ সালের ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশে পুলিশের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন এবং নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষমতা প্রদানের মাধ্যমে বল প্রয়োগের আইনগত ভিত্তি দেওয়া হয়েছে।

কী আছে সেখানে? ডিএমপি অধ্যাদেশের ধারা ১৮তে বলা হয়েছে, এই অধ্যাদেশের অধীনে দায়িত্ব পালনকালে পুলিশ কর্মকর্তা যে যুক্তিসংগত নির্দেশ প্রদান করবেন, তা সকল ব্যক্তির জন্য মান্য করা বাধ্যতামূলক হবে।

পরে ধারা ১৯-এ বলা হয়েছে, ধারা ১৮-এ উল্লিখিত কোনো নির্দেশ মানতে কেউ প্রতিরোধ করলে, অস্বীকার করলে বা অবহেলা করলে, একজন পুলিশ কর্মকর্তা তাকে বাধা দিতে বা সেখান থেকে সরিয়ে দিতে পারেন।

এটাকেই ‘বল প্রয়োগের ফাঁক ফোকর’ বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

প্রশাসনের বক্তব্য ও ব্যবস্থা

পুলিশের এমন আচরণ সম্পর্কে জানতে চেয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি আলাপকে বলেন, “আমি ঘটনাটি পত্রিকায় দেখেছি। এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারছি না। আপনি কমিশনারের সঙ্গে কথা বলেন।”

এই প্রতিবেদন লেখার সময় তিনি আইজিপি থাকলেও বিকালে নতুন আইজিপির নিয়োগ হয়।

এ বিষয়ে ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম), যুগ্ম পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম) কোনো মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন।

এদিকে এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে কর্তব্যরত চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার বিকেলে গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ডিএমপির রমনা বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদ আলম।

তিনি বলেন, “ তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে এবং অভিযোগের গুরুত্ব অনুযায়ী পরবর্তী স্থায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি সাদিক কায়েম ফেসবুক পোস্টে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, নিরস্ত্র শিক্ষার্থী ও দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকের ওপর হামলা মানবাধিকারের পরিপন্থি।

“কারও কাছে বেআইনি কিছু পাওয়া গেলে বা অভিযোগ থাকলে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার করে আদালতে সোপর্দ করাই বিধিসম্মত পন্থা; বিনা উসকানিতে বলপ্রয়োগ গ্রহণযোগ্য নয়”, বিবৃতিতে লিখেছেন সাদিক কায়েম।

‘স্রেফ ইগোর বশে’ বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের নেতা নাইম আহমেদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করেছে বলে মনে করেন ডাকুস সদস্য সর্ব মিত্র চাকমা।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সাংবাদিকদের উপর পুলিশি হামলায় প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (এমআরএ)। সংগঠনটির সভাপতি ফখরুল ইসলাম বলেন, “পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সংস্কারের ঘাটতি ও দায়বদ্ধতার অভাবে এখন তাদের মধ্যে এক ধরনের স্বৈরাচারী মানসিকতা কাজ করছে।”

দোষীদের শাস্তি না হলে সাংবাদিক সমাজ কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যেই কী সূচনা?

রাতে কিশোররা অযাচিত ঘোরাঘুরি করলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন।

শুক্রবার নিজ নির্বাচনি এলাকা চাঁদপুরের কচুয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, 'রাতে কিশোরদের রাস্তায় অযাচিত ঘোরাঘুরি বন্ধ করতে হবে। এখন রাতে রাস্তায় ঘুরলে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করবে। এতে কন্সটিটিউশনাল ভায়োলেশন [সংবিধান লঙ্ঘন] হলে সেটি আমরা পরে দেখব।'

কিশোর গ্যাংয়ের বিষয়ে একদম জিরো টলারেন্সের নির্দেশ দিয়ে জানিয়েছিলেন, তিনি নির্বাচনের সময় দেখেছেন সারা রাত কিশোরেরা রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, কেন ঘুরছে, জিজ্ঞেস করলে তারা মব অ্যাটাক করে।

শিক্ষামন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর চাঁদপুরে ১২ কিশোরসহ ২১ জনকে আটক করে পুলিশ। পরে মুচলেকা নিয়ে তাদের অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, রবিবার সন্ধ্যা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শহরের হাসান আলী সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠ, লেকের পাড়, স্টেডিয়াম রোড, মাদ্রাসা রোড, পৌর পার্ক, কবরস্থান রোড, প্রেসক্লাব রোডসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২১ জনকে আটক করা হয়।

এদের মধ্যে ১২ জনের বয়স ১৪–১৭ বছর। অন্যদের মধ্যে ছয়জনের বয়স ১৮ বছর, দুজনের ১৯ ও একজনের ২৩ বছর।

আইনের সীমা কোথায়?

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ অপরাধ প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সেই ক্ষমতা প্রয়োগের সময় নাগরিকের মর্যাদা, মৌলিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষা করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।

পুলিশ যদি কারো গায়ে হাত তোলে সেটা ‘অপরাধ’ বলছেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

“পুলিশ কোনো অভিযুক্তকে প্রহার করার অধিকার রাখে না। পুলিশ যদি কারো বিরুদ্ধে প্রমাণও পায় তাকে প্রহার করতে পারবে না”, আলাপকে বলেছেন তিনি।

আবদুন নূর তুষার বলেন, “নির্দেশ ছাড়া যখন তখন যাকে তাকে থাপ্পড় দেওয়া, কিল দেওয়া ঘুসি দেওয়া অথবা লাঠি দিয়ে প্রহার করা, এই অধিকার পুলিশের নাই।”

কিছু পুলিশের এমন আচরণ পুরো পুলিশকেই বিতর্কিত করে বলেই মনে করেন তিনি।

প্রশ্ন উঠছে পুলিশ কি নিরাপত্তার জন্য, নাকি আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য?