মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিবাদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা প্রস্তুত
চার মাস আগে কেরাণীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় তেমন গুরুত্ব না দিলেও এখন হঠাৎ করেই জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ, পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি, লুট হওয়া অস্ত্র এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বলতা-সব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি আবার জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে?
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৪ এএমআপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২৬, ১০:০৬ এএম
চার মাস আগে গত ২৬এ ডিসেম্বর কেরাণীগঞ্জের উম্মুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে নানা ‘জল্পনা’ তৈরি হয়। নারী ও শিশুসহ আহত হন ৪ জন।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম।
কিন্তু ওই ঘটনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘শক্ত কোনো’ প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তদন্তেও ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়নি বলে গণমাধ্যমে খবর বের হচ্ছে।
মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাদ্রাসায় তৈরি বোমা দিয়ে দেশের একাধিক স্থানে একসাথে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গিদের।
তখন কেরাণীগঞ্জের মাদ্রাসার ঘটনা গুরুত্ব না পেলেও এখন এসে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘উগ্রবাদী’ সংগঠনের সদস্য ও সমর্থকদের দ্বারা সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা হতে পারে বলে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
তেইশে এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী সংগঠনের গ্রেফতার করা সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুইজন সেনা সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর বাংলাদেশে ‘নতুন করে জঙ্গিবাদ’-এর উত্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে ‘গুরুতর’ দুর্বলতার কথা তুলছেন অনেকেই।
সতর্কতা জারির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে কি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিবাদ?
অবশ্য এ নিয়ে ‘আতঙ্কিত’ হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন।
শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আমরা কাজ করছি, ইনশা আল্লাহ আমরা এটাকে ফেইস করতে পারবো। এটা আমরা সমন্বিতভাবেই ফেইস করবো।”
এরপরও শহরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। প্রশ্ন আসছে, বাংলাদেশ কি আবারও জঙ্গি হামলার শিকার হতে যাচ্ছে?
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অতীত ও বর্তমান
বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার হুমকি এই প্রথম নয়। শেষবার বড় পরিসরের জঙ্গি হামলা হয়েছিল ২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে। সেখানে ২০ জনকে জিম্মি করে হত্যা করা হয়। পরে প্যারা কমান্ডোরা অভিযানে চালিয়ে পাঁচ জঙ্গিকে হত্যা করে। ওই ঘটনায় জিম্মি, পুলিশ ও জঙ্গিসহ মোট ২৯ জন নিহত হন।
তবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের শুরু আরো আগেই। ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে ‘ত্রাস’ সৃষ্টি করেছিল জেএমবি।
নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে ইসলামপন্থি জঙ্গিবাদ। এই সন্ত্রাসের উৎস বাম মতাদর্শ কিংবা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। মূল ভিত্তি ধর্মীয় উগ্রবাদ।
কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টার মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে আলোচনায় আসে হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশ।
সাউথ এশিয়া টেরর পোর্টাল ও ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর রেফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, হরকতুল জিহাদের সদস্যরা সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়। আফগানিস্তানে পক্ষে প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শ নিয়ে দেশে ফিরে এসে তৎপরতা শুরু করে।
আরো তিনটা বড় হামলা চালানো হয় ১৯৯৯ সালে। যশোরে উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান, সিলেটে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের বাসভবনে এবং খুলনার এক আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে হামলার দায় স্বীকার করে হরকতুল জিহাদ। ওইসব ঘটনায় ২০ জন নিহত ও প্রায় ২০০ জন আহত হন।
এরপর ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় হরকতুল জিহাদ। সেই হামলায় একজন জঙ্গিসহ নিহত হন ১০জন।
একই বছরে মোট ছয়টি বড় আকারের বোমা হামলা হয় বাংলাদেশে। রমনা বটমূল ছাড়াও হামলা হয় রোমান ক্যাথলিক চার্চে, কমিউনিস্ট পার্টির একটি ও আওয়ামী লীগের চারটি রাজনৈতিক র্যালিতে।
এসব হামলায় সব মিলিয়ে ৬০ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। রোমান ক্যাথলিক চার্চে হামলা করে জেএমবি এবং বাকি প্রায় সবগুলোতে হরকতুল জিহাদ জড়িত ছিল।
ওই বছরই চট্টগ্রামে নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে হত্যা করায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজনের।
জেএমবির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে ২০০২ সাল থেকে। ওই বছর ময়মনসিংহে চারটি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। সেখানে ২৭ জন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।
একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২০০৪ সালে লেখক ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদকে হত্যা চেষ্টায় জেএমবির নাম আসে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে আটটি বড় পরিসরের বোমা হামলা করে জেএমবি। ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
নেত্রকোণায় উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর কার্যালয়, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে আদালত ভবনে হামলা এবং ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হত্যা করা হয়।
পরের বছরগুলোতেও জেএমবি ও হরকতুল জিহাদ বিভিন্ন পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায় এবং আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট)-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে যোগসাজশও করে।
ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১এ অগাস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার অভিযুক্তদের মধ্যেও হরকতুল জিহাদের সদস্যদের নাম আসে।
এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের জঙ্গিগোষ্ঠী।
লেখক ও ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড এ সময় আলোচনায় আসে। অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজিব হায়দার, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস ও একেএম শফিউল ইসলামদের হত্যার দায় স্বীকার করে।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে
সাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশ ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’ বলে আশার বাণী শোনালেও মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের চার মাস পর আবার জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের আগে ও পরে কয়েক ডজন চিহ্নিত ‘জঙ্গি’ কারাগারের বাইরে চলে আসে, যাদের মধ্যে ফাঁসির আসামিও রয়েছেন কয়েকজন। এছাড়া বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া ১,৩৬২ অস্ত্রের এখনো উদ্ধার করতে না পারাটাও ‘ঝুঁকি’ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন উঠছে, জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি এবং লুট হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক কি আছে এর সাথে?
আর বিএনপি সরকার কি এবার জঙ্গিবাদ দমনে আগের মেয়াদের তুলনায় কার্যকর ভূমিকায় নামতে পারবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “শংকার কারণ হচ্ছে, ইন্টারিমের আগেই, মানে ৫ই অগাস্টের পরে জেলখানাগুলো থেকে প্রায় ৭৯জন জঙ্গি পালিয়েছে, যার মধ্যে নয় জন ফাঁসির আসামি। কাশিমপুর জেলখানায় মব করে জঙ্গিদের ছাড়িয়ে আনা হয়েছে।”
জুলাই আন্দোলনের সময় ১৭টা কারাগারে হামলা হয়েছিল। কারাগার থেকে যে অস্ত্রগুলো লুট হয়েছিল, সেখান থ্রি পয়েন্ট সিক্স টু বোরের রাইফেল আছে। যদি সামনে জঙ্গিরা সেগুলো ব্যবহার করে, তাহলে কী হবে?”
পুলিশ সদর থেকে দেওয়া সতর্কতামূলক নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারাগারে বন্দী নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যের সাথে যোগসাজশ আছে সেনাবাহিনীর দু’জন সাবেক সদস্যের।
এটিকে “বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই” বলে মন্তব্য করেন একসময় জঙ্গিবাদ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সাংবাদিক সাইফুল আলম চৌধুরী।
“যেহেতু পুলিশ নিজেই বলছে যে, দুইজন স্কিলড ডিফেন্সের লোক আছে এবং তাদের কাছে এই লুট হওয়া অস্ত্র যদি কিছুটাও থাকে এবং তাদের সাথে যদি জঙ্গিগুলার সম্পর্ক থাকে, তাহলে দুই যোগ দুই করলে বিরাট কিছু হতেই পারে। এটা আশংকা তো করা যেতেই পারে।”
তবে চাকরিচ্যুত সেনা সদস্যদের সাথে যোগসাজশের মধ্যে কোনো ‘প্যাটার্ন নেই’ বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামান।
“এটা প্যাটার্ন না, তবে একদম বিচ্ছিন্নও না। এর আগেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এটা স্বাভাবিক না,” মন্তব্য করেন তিনি।
আর এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
“যদি তথ্যটা সত্যি হয়, তাহলে ঝুঁকির মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দেয়। এবং এটা নতুন মাত্রা যোগ করে এই কারণে যে, যারা সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, তারা প্রশিক্ষিত হয়।
“দ্বিতীয়ত হচ্ছে তাদের সাথে তাদের পুরোনো যারা কলিগ ছিলো, তাদের অনেকের যোগাযোগ থাকে। কাজেই সব মিলিয়ে এখানে যে ঝুঁকির মাত্রাটা, সেটা আরও বাড়িয়ে দেয় এক্ষেত্রে।”
এদিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্যেদের চাকরিচ্যুতি, প্রশিক্ষণের অভাব ও বদলির কারণে সন্ত্রাস দমনকারী বাহিনীর দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টানেন অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী।
“স্পেশাল ফোর্স হিসেবে এই ধরনের টেরোরিস্ট অ্যাটাকের জন্য সোয়াট, সিটিটিসি অথবা এটিইউ- এদের প্রত্যেককেই ৫ই আগস্টের পরে একেবারে ডিসফাংশনাল করে ফেলা হয়েছে। আমেরিকান অর্থায়নে তাদের ওয়েল-ট্রেইন করিয়েছিল। ম্যাক্সিমামের চাকরি গেছে। কেউ পুলিশে আর নাই। যারা আছে তাদের আদৌ এই ধরনের নেটওয়ার্ক সার্ভেইল্যান্স করার মতো সেই ট্রেইনিং এবং অভিজ্ঞতা আছে কিনা সেটা একটা বড় বিষয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের সুপারিশেই সন্ত্রাস দমনকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
“অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটগুলোতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল জঙ্গিবাদের, তাদের পছন্দমতোই ওখানকার পদায়ন করা হয়েছে।”
তাহলে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থাকলে বর্তমান সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে?
এই প্রশ্নের জবাবে সাইফুল আলম বলেন, এবার সরকারকে ভিন্নভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
“বিএনপির আগের টার্মে সত্যি কথা হচ্ছে, জঙ্গিবাদটা তারা পলিটিক্যালি দেখত। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই তাদের অতীত রেকর্ড দেখলে। সেখান থেকে এখন তারা বেরিয়ে আসবে কিনা বা নতুন করে ভাববে কিনা, তা দেখার বিষয়। এখান থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
তবে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামানের মনে করেন, বর্তমান সরকারের নীতি এ বিষয়ে পরিষ্কার।
“জঙ্গির ব্যাপারে তো সরকারের নীতি পরিষ্কার যে, এ ধরনের কিছু তারা এখানে হতে দেবে না। কাজেই যদি এখানে এ ধরনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়, সরকার কঠোরভাবে নির্মূল করবে। এবং সেটাই হচ্ছে সঠিক পন্থা।”
তিনি আরো বলেন, “তাদের (জঙ্গি) বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে কার্যক্রম আছে, সেগুলো হয়তো বৃদ্ধি করবে এটাকে নির্মূল করার জন্যে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, যেটুকু তথ্য তারা পেয়েছে, সেটার জন্য জনজীবন যাতে বিঘ্নিত না হয়, তার কারণে সতর্কতামূলক বার্তা ইতোমধ্যে দিয়েছে। এবং এটাই সঠিক পন্থা।”
সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা দমনে সব ক্ষেত্রে নজরদারি বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে মনিরুজ্জামানের বলেন, “একটা হলো ফিজিক্যাল নজরদারি এবং আরেকটা হলো যে ইন্টারনেটে, মানে সাইবার জগতে নজরদারি। সেখানেও বাড়াতে হবে, দুই জায়গাতেই বাড়াতে হবে।
“সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নজরদারি বাড়াতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে।”
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস নতুন নয়, এর আগেও উত্থান হয়েছে। তবে প্রতিবারই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সমন্বিত উদ্যোগে দমন করাও সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নাকি বড় কোনো নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত, তা নির্ধারণে দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা পুনর্গঠন, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয় জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা।
মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিবাদ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতটা প্রস্তুত
চার মাস আগে কেরাণীগঞ্জের একটি মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় তেমন গুরুত্ব না দিলেও এখন হঠাৎ করেই জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন। গ্রেপ্তার জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ, পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি, লুট হওয়া অস্ত্র এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দুর্বলতা-সব মিলিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ কি আবার জঙ্গিবাদের ঝুঁকিতে?
চার মাস আগে গত ২৬এ ডিসেম্বর কেরাণীগঞ্জের উম্মুল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা নিয়ে নানা ‘জল্পনা’ তৈরি হয়। নারী ও শিশুসহ আহত হন ৪ জন।
ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয় ককটেল, দাহ্য পদার্থ ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম।
কিন্তু ওই ঘটনা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে ‘শক্ত কোনো’ প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি। তদন্তেও ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়নি বলে গণমাধ্যমে খবর বের হচ্ছে।
মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে যে, মাদ্রাসায় তৈরি বোমা দিয়ে দেশের একাধিক স্থানে একসাথে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গিদের।
তখন কেরাণীগঞ্জের মাদ্রাসার ঘটনা গুরুত্ব না পেলেও এখন এসে জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন।
নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘উগ্রবাদী’ সংগঠনের সদস্য ও সমর্থকদের দ্বারা সংসদ ভবন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় হামলা হতে পারে বলে সতর্কতামূলক নির্দেশনা জারি করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
তেইশে এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, উগ্রবাদী সংগঠনের গ্রেফতার করা সদস্য ইসতিয়াক আহম্মেদ ওরফে সামী ওরফে আবু বক্কর ওরফে আবু মোহাম্মদের সাথে চাকরিচ্যুত দুইজন সেনা সদস্যের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে।
এই ঘটনা সামনে আসার পর বাংলাদেশে ‘নতুন করে জঙ্গিবাদ’-এর উত্থান নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে ‘গুরুতর’ দুর্বলতার কথা তুলছেন অনেকেই।
সতর্কতা জারির পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশে কি আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে জঙ্গিবাদ?
অবশ্য এ নিয়ে ‘আতঙ্কিত’ হওয়ার কিছু নেই বলে মন্তব্য করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) যুগ্ম কমিশনার মুনশী শাহাবুদ্দীন।
শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, “আমরা কাজ করছি, ইনশা আল্লাহ আমরা এটাকে ফেইস করতে পারবো। এটা আমরা সমন্বিতভাবেই ফেইস করবো।”
এরপরও শহরে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। প্রশ্ন আসছে, বাংলাদেশ কি আবারও জঙ্গি হামলার শিকার হতে যাচ্ছে?
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের অতীত ও বর্তমান
বাংলাদেশে জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার হুমকি এই প্রথম নয়। শেষবার বড় পরিসরের জঙ্গি হামলা হয়েছিল ২০১৬ সালে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে। সেখানে ২০ জনকে জিম্মি করে হত্যা করা হয়। পরে প্যারা কমান্ডোরা অভিযানে চালিয়ে পাঁচ জঙ্গিকে হত্যা করে। ওই ঘটনায় জিম্মি, পুলিশ ও জঙ্গিসহ মোট ২৯ জন নিহত হন।
তবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের শুরু আরো আগেই। ২০০৫ সালে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়ে ‘ত্রাস’ সৃষ্টি করেছিল জেএমবি।
নব্বইয়ের দশক থেকে বাংলাদেশে মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে শুরু করে ইসলামপন্থি জঙ্গিবাদ। এই সন্ত্রাসের উৎস বাম মতাদর্শ কিংবা জাতীয়তাবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদ নয়। মূল ভিত্তি ধর্মীয় উগ্রবাদ।
কবি শামসুর রাহমানকে হত্যার চেষ্টার মাধ্যমে ১৯৯৯ সালে আলোচনায় আসে হরকত-উল-জিহাদ-আল-ইসলামী বাংলাদেশ।
সাউথ এশিয়া টেরর পোর্টাল ও ইউনাইটেড নেশনস হাই কমিশন ফর রেফিউজিস (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী, হরকতুল জিহাদের সদস্যরা সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়। আফগানিস্তানে পক্ষে প্রশিক্ষণ ও মতাদর্শ নিয়ে দেশে ফিরে এসে তৎপরতা শুরু করে।
আরো তিনটা বড় হামলা চালানো হয় ১৯৯৯ সালে। যশোরে উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর অনুষ্ঠান, সিলেটে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের বাসভবনে এবং খুলনার এক আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা হয়। উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর অনুষ্ঠানে হামলার দায় স্বীকার করে হরকতুল জিহাদ। ওইসব ঘটনায় ২০ জন নিহত ও প্রায় ২০০ জন আহত হন।
এরপর ২০০১ সালের পহেলা বৈশাখে রমনা বটমূলে ছায়ানটের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা চালায় হরকতুল জিহাদ। সেই হামলায় একজন জঙ্গিসহ নিহত হন ১০জন।
একই বছরে মোট ছয়টি বড় আকারের বোমা হামলা হয় বাংলাদেশে। রমনা বটমূল ছাড়াও হামলা হয় রোমান ক্যাথলিক চার্চে, কমিউনিস্ট পার্টির একটি ও আওয়ামী লীগের চারটি রাজনৈতিক র্যালিতে।
এসব হামলায় সব মিলিয়ে ৬০ জন নিহত এবং শতাধিক মানুষ আহত হন। রোমান ক্যাথলিক চার্চে হামলা করে জেএমবি এবং বাকি প্রায় সবগুলোতে হরকতুল জিহাদ জড়িত ছিল।
ওই বছরই চট্টগ্রামে নাজিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ গোপাল কৃষ্ণ মুহুরীকে হত্যা করায় বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয় ইসলামী ছাত্রশিবিরের কয়েকজনের।
জেএমবির কার্যক্রম ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে ২০০২ সাল থেকে। ওই বছর ময়মনসিংহে চারটি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলা চালানো হয়। সেখানে ২৭ জন নিহত ও দুই শতাধিক মানুষ আহত হন।
একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ২০০৪ সালে লেখক ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদকে হত্যা চেষ্টায় জেএমবির নাম আসে। ২০০৫ সাল পর্যন্ত কমপক্ষে আটটি বড় পরিসরের বোমা হামলা করে জেএমবি। ৬৩ জেলায় একযোগে ৫০০ বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
নেত্রকোণায় উদীচী শিল্পগোষ্ঠীর কার্যালয়, গাজীপুর ও চট্টগ্রামে আদালত ভবনে হামলা এবং ২০০৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস হত্যা করা হয়।
পরের বছরগুলোতেও জেএমবি ও হরকতুল জিহাদ বিভিন্ন পরিসরে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যায় এবং আইএসআইএল (ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক অ্যান্ড দ্য লেভান্ট)-এর মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীর সাথে যোগসাজশও করে।
ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ২০০৪ সালের ২১এ অগাস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার অভিযুক্তদের মধ্যেও হরকতুল জিহাদের সদস্যদের নাম আসে।
এরপর ২০১৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামের জঙ্গিগোষ্ঠী।
লেখক ও ব্লগারদের হত্যাকাণ্ড এ সময় আলোচনায় আসে। অভিজিৎ রায়, আহমেদ রাজিব হায়দার, ওয়াশিকুর রহমান, অনন্ত বিজয় দাস ও একেএম শফিউল ইসলামদের হত্যার দায় স্বীকার করে।
বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকিতে
সাম্প্রতিক ঘটনায় পুলিশ ‘আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই’ বলে আশার বাণী শোনালেও মাদ্রাসায় বোমা বিস্ফোরণের চার মাস পর আবার জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
চব্বিশের পাঁচই অগাস্টের আগে ও পরে কয়েক ডজন চিহ্নিত ‘জঙ্গি’ কারাগারের বাইরে চলে আসে, যাদের মধ্যে ফাঁসির আসামিও রয়েছেন কয়েকজন। এছাড়া বিভিন্ন থানা ও কারাগার থেকে লুট হওয়া ১,৩৬২ অস্ত্রের এখনো উদ্ধার করতে না পারাটাও ‘ঝুঁকি’ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশ্ন উঠছে, জেল থেকে পালিয়ে যাওয়া জঙ্গি এবং লুট হওয়া অস্ত্রের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক কি আছে এর সাথে?
আর বিএনপি সরকার কি এবার জঙ্গিবাদ দমনে আগের মেয়াদের তুলনায় কার্যকর ভূমিকায় নামতে পারবে?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. সাইফুল আলম চৌধুরী বলেন, “শংকার কারণ হচ্ছে, ইন্টারিমের আগেই, মানে ৫ই অগাস্টের পরে জেলখানাগুলো থেকে প্রায় ৭৯জন জঙ্গি পালিয়েছে, যার মধ্যে নয় জন ফাঁসির আসামি। কাশিমপুর জেলখানায় মব করে জঙ্গিদের ছাড়িয়ে আনা হয়েছে।”
জুলাই আন্দোলনের সময় ১৭টা কারাগারে হামলা হয়েছিল। কারাগার থেকে যে অস্ত্রগুলো লুট হয়েছিল, সেখান থ্রি পয়েন্ট সিক্স টু বোরের রাইফেল আছে। যদি সামনে জঙ্গিরা সেগুলো ব্যবহার করে, তাহলে কী হবে?”
পুলিশ সদর থেকে দেওয়া সতর্কতামূলক নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কারাগারে বন্দী নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যের সাথে যোগসাজশ আছে সেনাবাহিনীর দু’জন সাবেক সদস্যের।
এটিকে “বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই” বলে মন্তব্য করেন একসময় জঙ্গিবাদ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করা সাংবাদিক সাইফুল আলম চৌধুরী।
“যেহেতু পুলিশ নিজেই বলছে যে, দুইজন স্কিলড ডিফেন্সের লোক আছে এবং তাদের কাছে এই লুট হওয়া অস্ত্র যদি কিছুটাও থাকে এবং তাদের সাথে যদি জঙ্গিগুলার সম্পর্ক থাকে, তাহলে দুই যোগ দুই করলে বিরাট কিছু হতেই পারে। এটা আশংকা তো করা যেতেই পারে।”
তবে চাকরিচ্যুত সেনা সদস্যদের সাথে যোগসাজশের মধ্যে কোনো ‘প্যাটার্ন নেই’ বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামান।
“এটা প্যাটার্ন না, তবে একদম বিচ্ছিন্নও না। এর আগেও এ ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এটা স্বাভাবিক না,” মন্তব্য করেন তিনি।
আর এর ফলে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলেও মনে করেন তিনি।
“যদি তথ্যটা সত্যি হয়, তাহলে ঝুঁকির মাত্রাটা আরও বাড়িয়ে দেয়। এবং এটা নতুন মাত্রা যোগ করে এই কারণে যে, যারা সশস্ত্র বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য, তারা প্রশিক্ষিত হয়।
“দ্বিতীয়ত হচ্ছে তাদের সাথে তাদের পুরোনো যারা কলিগ ছিলো, তাদের অনেকের যোগাযোগ থাকে। কাজেই সব মিলিয়ে এখানে যে ঝুঁকির মাত্রাটা, সেটা আরও বাড়িয়ে দেয় এক্ষেত্রে।”
এদিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদ্যেদের চাকরিচ্যুতি, প্রশিক্ষণের অভাব ও বদলির কারণে সন্ত্রাস দমনকারী বাহিনীর দুর্বল হয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ টানেন অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী।
“স্পেশাল ফোর্স হিসেবে এই ধরনের টেরোরিস্ট অ্যাটাকের জন্য সোয়াট, সিটিটিসি অথবা এটিইউ- এদের প্রত্যেককেই ৫ই আগস্টের পরে একেবারে ডিসফাংশনাল করে ফেলা হয়েছে। আমেরিকান অর্থায়নে তাদের ওয়েল-ট্রেইন করিয়েছিল। ম্যাক্সিমামের চাকরি গেছে। কেউ পুলিশে আর নাই। যারা আছে তাদের আদৌ এই ধরনের নেটওয়ার্ক সার্ভেইল্যান্স করার মতো সেই ট্রেইনিং এবং অভিজ্ঞতা আছে কিনা সেটা একটা বড় বিষয়।”
তিনি অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে জঙ্গিবাদের সাথে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকা ব্যক্তিদের সুপারিশেই সন্ত্রাস দমনকারী বাহিনীতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
“অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিটগুলোতে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল জঙ্গিবাদের, তাদের পছন্দমতোই ওখানকার পদায়ন করা হয়েছে।”
তাহলে জঙ্গি হামলার আশঙ্কা থাকলে বর্তমান সরকার কীভাবে তা মোকাবিলা করতে পারে?
এই প্রশ্নের জবাবে সাইফুল আলম বলেন, এবার সরকারকে ভিন্নভাবে পদক্ষেপ নিতে হবে।
“বিএনপির আগের টার্মে সত্যি কথা হচ্ছে, জঙ্গিবাদটা তারা পলিটিক্যালি দেখত। এটা অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই তাদের অতীত রেকর্ড দেখলে। সেখান থেকে এখন তারা বেরিয়ে আসবে কিনা বা নতুন করে ভাববে কিনা, তা দেখার বিষয়। এখান থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে।”
তবে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মনিরুজ্জামানের মনে করেন, বর্তমান সরকারের নীতি এ বিষয়ে পরিষ্কার।
“জঙ্গির ব্যাপারে তো সরকারের নীতি পরিষ্কার যে, এ ধরনের কিছু তারা এখানে হতে দেবে না। কাজেই যদি এখানে এ ধরনের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়, সরকার কঠোরভাবে নির্মূল করবে। এবং সেটাই হচ্ছে সঠিক পন্থা।”
তিনি আরো বলেন, “তাদের (জঙ্গি) বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে কার্যক্রম আছে, সেগুলো হয়তো বৃদ্ধি করবে এটাকে নির্মূল করার জন্যে। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখতে পেয়েছি যে, যেটুকু তথ্য তারা পেয়েছে, সেটার জন্য জনজীবন যাতে বিঘ্নিত না হয়, তার কারণে সতর্কতামূলক বার্তা ইতোমধ্যে দিয়েছে। এবং এটাই সঠিক পন্থা।”
সম্ভাব্য জঙ্গি হামলা দমনে সব ক্ষেত্রে নজরদারি বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়ে মনিরুজ্জামানের বলেন, “একটা হলো ফিজিক্যাল নজরদারি এবং আরেকটা হলো যে ইন্টারনেটে, মানে সাইবার জগতে নজরদারি। সেখানেও বাড়াতে হবে, দুই জায়গাতেই বাড়াতে হবে।
“সব ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নজরদারি বাড়াতে হবে। তাদের কর্মকাণ্ডের ওপরও নজরদারি বাড়াতে হবে।”
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের ইতিহাস নতুন নয়, এর আগেও উত্থান হয়েছে। তবে প্রতিবারই নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সমন্বিত উদ্যোগে দমন করাও সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বিচ্ছিন্ন নাকি বড় কোনো নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত, তা নির্ধারণে দ্রুত ও কার্যকর তদন্ত জরুরি বলেও মনে করছেন তারা।
পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা পুনর্গঠন, গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার সমন্বয় ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই ঝুঁকি মোকাবিলা সম্ভব নয় জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা।