মুসাব্বির হত্যা: কী রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে

কে ছিলেন মুসাব্বির, আর কেনই বা তিনি হয়ে উঠলেন লক্ষ্যবস্তু? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, সর্বত্র একই আলোচনা চলছে এটি কি নিছকই একটি খুন, নাকি বড় কোনো বার্তার ইঙ্গিত?

 

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:১৫ পিএম

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে আরেকটি নাম যুক্ত হলো, আজিজুর রহমান মুসাব্বির। কারওয়ান বাজারের ব্যস্ত সড়কে, নিজের পরিচিত পথেই গুলিবিদ্ধ হয়ে খুন হয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তরের স্বেচ্ছাসেবক দলের এই নেতা।

ঘটনার পরপরই শুরু হয়েছে আলোচনা। কে ছিলেন মুসাব্বির, আর কেনইবা তিনি হয়ে উঠলেন আততায়ীর লক্ষ্য?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে রাজনৈতিক অঙ্গন, সর্বত্র একই আলোচনা চলছে এটি কি নিছকই একটি খুন, নাকি বড় কোনো বার্তার ইঙ্গিত?

স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতারা জানিয়েছেন, বিগত সরকারের আমলে ১৭ বছর আন্দোলনের পরিচিত মুখ ছিলেন মুসাব্বির। একাধিকবার জেলেও যেতে হয়েছে তাকে।

২০২৪ এর ৫ আগস্টের পর থেকে রাজপথ ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আরও পরিচিত মুখ হয়ে উঠছিলেন তিনি।

বুধবার রাতে বাড়ি ফেরার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মুসাব্বির। সেদিন রাত সোয়া ৮টার দিকে কারওয়ান বাজারের স্টার কাবাবের পেছনে পশ্চিম তেজতুরি বাজারের গলিতে বাড়ি ফেরার পথে অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়।

ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে সেদিনের পুরো দৃশ্য। একাধিক ফুটেজে দেখা যায়, স্টার কাবাবের পেছনের গলিতে বস্তা নিয়ে বসে ছিল দুই ব্যক্তি। মুসাব্বিরকে দেখামাত্র পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে তারা।

মাটিতে লুটিয়ে পড়েন মুসাব্বির। উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে আবারও তাকে লাথি মারা হয়।

ফের উঠে দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। এ সময় মুসাব্বিরের ফোন পড়ে যায়। শুটাররা সেই ফোন নিয়েই পালিয়ে যায়।

প্রথমে হামলাকারী দুজন দু’দিকে পালিয়ে যান। পরে আবার একজন পথ পাল্টে একই পথ অনুসরণ করেন।

পুলিশ জানিয়েছে, গুলির সময় মুসাব্বিরের সঙ্গে ছিলেন তেজগাঁও থানার ভ্যানশ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সুফিয়ান মাসুদসহ কয়েকজন। অন্ধকার গলিতে লুকিয়ে থাকা দুর্বৃত্তরা মুসাব্বিরকে দেখেই বস্তা থেকে পিস্তল বের করে পেছন থেকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হন মাসুদও।

গুলিবিদ্ধ অবস্থায় দুজনকে পান্থপথের বিআরবি হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মুসাব্বিরকে মৃত ঘোষণা করেন। আহত আবু সুফিয়ান মাসুদকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।  

এ ঘটনার পর হাসপাতালের সামনে জড়ো হতে থাকেন অনেক মানুষ। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন দলের নেতাকর্মীরা। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে কারওয়ান বাজা‌রেও।

বুধবার রাত ১০টার পরও কারওয়ান বাজার মোড়ে শত শত মানুষ অবস্থান নেয়। এ সময় তারা টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করেন। রাস্তায় তীব্র যানজট তৈরি হয়।

অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কারওয়ান বাজার এলাকায় বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।

বৃহস্পতিবার সকালে এই ঘটনায় তেজগাঁও থানায় মামলা করেন মুসাব্বিরের স্ত্রী। তেঁজগাও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ক্যশৈন্যু মারমা বলেছেন, মুসাব্বিরের স্ত্রী অজ্ঞাতনামা পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

তবে মামলায় কোনও পারিবারিক বা রাজনৈতিক শত্রুতার কথা উল্লেখ করা হয়নি। অজ্ঞাত পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানান ওসি।

এরপর বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের কার্যালয়ের সামনে আজিজুর রহমান মুসাব্বিরের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজার নামাজের আগে মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত গ্রেফতারের দাবিতে আগামী শনিবার ঢাকাসহ সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল।

কে এই মুসাব্বির

মামলার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন মুসাব্বিরের স্ত্রী সুরাইয়া বেগম। হত্যার বিচার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “সিসিটিভির ফুটেজ রয়েছে। এসব দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জরুরি পদক্ষেপ নেবে।”

সুরাইয়া বেগম বলেন, “এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলছে। আগেও ঘটেছে, এখনও ঘটছে, ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। এসব ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে আমার মতো অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে যাবে।”

এমন ঘটনার কারণ জানেন না জানিয়ে তিনি বলেন, “২০ বছর ধরে পানির ব্যবসা করে আসছিলেন মুসাব্বির। প্রথমে সরাসরি জড়িত থাকলেও রাজনীতিতে প্রবেশ করার পর লোক দিয়ে এই ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ব্যবসা নিয়ে কোনো ঝামেলা থাকার কথা না।”

মোসাব্বিরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আশিক আহমেদ বলেন, “তিনি আমার পরিবারের মতো ছিলেন। তার দুই মেয়ে ও এক ছেলে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। তারপরও কখনও ভয় পাননি।”

“মুসাব্বির সবসময় অন্যায়ের বিপক্ষে সোচ্চার ছিলেন, সেজন্যই তাকে প্রাণ দিতে হলো”, বলেন আশিক।

স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহদপ্তর সম্পাদক ওসমান গনি বলেন, “আমাদের দলের নেতা হিসেবে বলতে পারি তিনি (মুসাব্বির) অত্যন্ত ত্যাগী নেতা ছিলেন। বিগত সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলে তিনি কয়েকবার জেল খেটেছেন।”

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করেছেন, মুসাব্বিরকে গুলি করে হত্যার ঘটনাকে ‘পতিত স্বৈরাচারী’ শক্তির ষড়যন্ত্র।
বৃহস্পতিবার গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ কঠিন করতে এ ধরনের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটানো হচ্ছে।

“আমরা দেখছি, সম্প্রতি কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটছে। গতকালের ঘটনাটিও তারই একটি অংশ। হতে পারে, পতিত স্বৈরাচারী শক্তি এখনো নির্বাচনকে বাধাগ্রস্ত করতে এবং গণতন্ত্রে উত্তরণের পথ কঠিন করতে কিছু ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে।”

২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পরদিন গুলি করা হয় ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদীকে। 

প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে তারা চিকিৎসা চলে। এক পর্যায়ে বিদেশেও নেওয়া হয়। কিন্তু তাকে বাঁচানো যায়নি। ১৮ ডিসেম্বর মারা যান ওসমান হাদি।

ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোসাব্বির। হাদির পক্ষে দেওয়া স্লোগানের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। 

নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন

তফসিল ঘোষণার পরদিনের প্রার্থীকে হত্যা ও এবার মুসাব্বিরকে হত্যার ঘটনা নির্বাচনি সহিংসতা হতে পারে বলে মত বিশ্লেষকদের। এতে করে নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে শঙ্কা দেখা দিবে বলে মনে করেন তারা।

রাজনীতি বিশ্লেষক শুভ কিবরিয়া বলেন, “হাদীর মৃত্যুর পরে আমরা আশা করেছিলাম, যে আমরা পরিস্কার ধারণা পাবো যে কারা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। একেক সময় একেক রকম তথ্য এসেছে।”

“মনে হচ্ছে একটা উদ্দেশ্য থাকতে পারে। বেছে বেছে রাজনীতিবিদদের খুন করা হচ্ছে। আর কোনও আলামতও পাওয়া যাচ্ছে না এবং ধরাও হচ্ছে না”, বলেন শুভ কিবরিয়া।

তিনি বলেন, “এগুলো মানুষের ভেতরে অনিরাপত্তাবোধ তৈরি করবে যা নির্বাচনের জন্য সহায়ক কোনো ঘটনা না।”