“একজনকে চিনতে পারলেও নাম পরিচয় সঠিক জানা যায়নি। এর আগে ভবঘুরে হিসেবে পুলিশ তার একটি ভিডিও সংগ্রহ করে। যেখানে নাম সোনিয়া বললেও সেটা স্পষ্ট ছিল না। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনও ছিল মেয়েটা। বাকি একজনের ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।”
এমি জান্নাত
প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৫:২৩ পিএমআপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:৫৫ পিএম
সাভারে পৌর কমিউনিটি সেন্টার থেকে দুই নারীর মৃতদেহ উদ্ধার
এক ব্যক্তি হাঁটছেন রাস্তায়। কাঁধে এক নারীর নিথর দেহ। তার হাত-পা ঝুলছে। ঢিমেতালে হেঁটে ঢুকে গেলেন পরিত্যক্ত ভবনে।
ভবনটির ভেতর থেকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে দুইটি মরদেহ। দুটোই আগুনে পোড়া। এই দুই মরদেহের রহস্যের সুরাহা করতে গিয়েই সামনে এলো লোমহর্ষক ঘটনা।
কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটি মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানা যাচ্ছে। তাকে আটক করেছে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা এটি সিরিয়াল কিলিং। দগ্ধ দুজনের অবশ্য পরিচয় মেলেনি।
আটক ব্যক্তির নাম সম্রাট। তার সাথে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে আরো পাঁচ খুনের কথা। যা আতঙ্ক তৈরি করছে জনমনে। কোনো থ্রিলার মুভি নয়, নৃশংস খুনের ঘটনাগুলো বাস্তব একই ব্যক্তি ঘটিয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্য।
দিনের কোলাহল থেমে গেলে, এলাকার অলিগলিতে নেমে আসে এক অদ্ভূত নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যে গত ৫টি হত্যার ঘটনা বলে দেয় এক সিরিয়াল কিলারের নাম। তার নাম সম্রাট, জানিয়েছে পুলিশ।
রবিবার দুপুরে সাভার থানা রোডের পরিত্যক্ত ‘সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার’ থেকে আগুনে পোড়া দুজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পৌর ভবনের দোতলায় থাকা টয়লেটের ভিতর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। হত্যার পর লাশগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
চার মাসে পাঁচটি খুন
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেই কিছু অদ্ভুত মিল। হত্যাকাণ্ডের অবস্থান, সময় এবং আশপাশের নিস্তব্ধতা।
গত ২৯এ অগাস্ট ভবনের ভেতর থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ চার মাস পেরিয়ে গেলেও তার পরিচয় শনাক্ত কিংবা হত্যার রহস্য উদঘাটন করা যায়নি।
এরপর ১২ই অক্টোবর একই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে এক নারীর গলা কাটা অর্ধনগ্ন লাশ উদ্ধার হয়। গত ২০এ ডিসেম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে উদ্ধার হয় আগুনে পোড়া ও অর্ধগলিত এক যুবকের লাশ। সবশেষ রবিবার দুপুরে দুই নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
প্রথম লাশটি পাওয়া যায় সাভারের একটি পরিত্যক্ত গুদামের পাশে। পরিচয়হীন, কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই, নেই কোনো সুস্পষ্ট কারণ। পুলিশ শুরুতে এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখে। তবে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই ধরনের আরও দুটি লাশ উদ্ধার হয়। এটি কী কাকতালীয়?
পরে উত্তর খুঁজে পায় পুলিশ। সন্দেহভাজন নিজেই স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিচয় না মিললেও একজন ভবঘুরে ছিল বলে জানায় পুলিশ।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী আলাপকে বলেন, “গত চার মাসের ছয়টি খুনই সম্রাট নামের এই ব্যক্তি করেছে বলে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে।”
“একজনকে চিনতে পারলেও নাম পরিচয় সঠিক জানা যায়নি। এর আগে ভবঘুরে হিসেবে পুলিশ তার একটি ভিডিও সংগ্রহ করে। যেখানে নাম সোনিয়া বললেও সেটা স্পষ্ট ছিল না। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনও ছিল মেয়েটা। বাকি একজনের ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।”
কেন খুনগুলো করেছে? এ ব্যাপারে সম্রাট পুলিশকে জানিয়েছে, মেয়েগুলোর সাথে তার সম্পর্ক ছিল। ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর তার কোনো কারণে রাগ হয় এবং খুন করে। তবে রাগ ঠিক কী কারণে সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি।”
পাঁচজন ভিক্টিমের মধ্যে দুইজন পুরুষ ছিল। তাদের কেন হত্যা করা হয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ জানায় এ ব্যাপারে কোন স্বীকারোক্তি দেয়নি সে।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। অভিযুক্তকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জনমনে আতঙ্ক
ওই এলাকার বাসিন্দা আইরিন হক। তিনি বলেন, “ওই এলাকা এখন আতঙ্কের নাম। সন্ধ্যা হলে আমরা ঘর থেকে হওয়ার হওয়ার সাহস পাই না।”
“বিশেষ করে মেয়েরা জরুরি কাজ থাকলেও একদম বের হতে চায় না। এটা যেন ট্রমা হয়ে গেছে আমাদের। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক।”
সাভার থানার পাশেই থাকেন প্রান্ত। তিনি বলেন, গতকালের ঘটনার পর মনে হচ্ছে আমি, আমরা কেউই নিরাপদ না। আমরা একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সারাক্ষণ মনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে। কোথাও স্বস্তিতে বের হতে পারছি না।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল আলাপকে বলেন, “এই ধরনের ঘটনা সমাজে খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
“সিরিয়াল কিলিং সাধারণত ঠাণ্ডা মাথায় করা হয়। তবে এ ধরনের মানুষকে বিকৃত মস্তিষ্কের বলা যায়। এরা সামাজিক, সাধারণ এবং সুষ্ঠু জীবন থেকে দূরে থাকে।”
‘‘এদেরকে দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও মূলত অপরাধমূলক মোটিভ নিয়ে সবার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তাই এদেরকে ধরাও কঠিন হয়ে যায়। এ ধরনের অপরাধ দমনে প্রশাসন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবার নজরদারি বাড়াতে হবে”, যোগ করেন ড. তৌহিদুল।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মোস্তফাও একমত পোষণ করেন। আলাপকে তিনি বলেন, এই ধরনের মানুষকে মাসসিক রোগী বলা যায় না। এটা এক ধরনের ‘সাইকোলজিক্যাল পারভারসন’ বা সাইকোপ্যাথ।
তিনি বলেনম “এর কোন ডায়াগনসিস নেই আর রোগী হলে তো তাকে অপরাধী বলা যাবে না। ডায়াগনসিস না থাকায় এটা তাদের সুনির্দিষ্ট রোগ বলা যায় না। তারা সাধারণত অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটির হয়।’’
বাংলাদেশে সিরিয়াল কিলিং নতুন নয়
নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা দেশে নতুন নয়। রসু খাঁ কিংবা এরশাদ শিকদারের সিরিয়াল কিলিং এর দুর্ধর্ষ ঘটনাগুলো এখনো গায়ে কাঁটা দেয়।
১০১ টি খুন করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে অপরাধজগতে পা রাখেন বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ।
২০০৯ সালে সাধারণ একটি ফ্যান চুরির মামলায় তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ১১ খুনের বর্ণনা দেন রসু খাঁ।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একসময় সিরিয়াল কিলারে পরিণত হয় রসু খাঁ। টার্গেট ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ডের। রসু খাঁ যাদের হত্যা করেছে তারা সবাই ছিল গার্মেন্টস কর্মী। আটকের আড়াই মাস আগে পারভীন নামে একজনকে হত্যা করে।
প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে গিয়ে রসু খাঁ বিয়ে করে শ্যালিকা রীনাকে। রীনা ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী। কাজেই রীনার কর্মস্থলের সূত্রে বিভিন্ন গার্মেন্টসকর্মীদের সাথে রসু খাঁর পরিচয় হয়।
রীনার গার্মেন্টসেরই এক নারী কর্মীকে দেখে রসু খাঁ প্রেমে পড়ে। তাকে জানায় ভালবাসার কথা। রসু খাঁর সাথে প্রণয় জমতে না জমতেই মেয়েটি আরেকজনের প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। রসু খাঁ মেনে নিতে না পেরে প্রেমিকাকে বোঝায়। ঘটে আরেক বিপত্তি।
মেয়েটি তার নতুন প্রেমিককে জানিয়ে দেয় সব কিছু। সেই প্রেমিক দলবল নিয়ে এসে রসু খাঁকে বেধড়ক মার দেয়। ভালবাসার পরিণামে এই আঘাত মনোজগতে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। তার চিন্তাভাবনাই পালটে যায়। মেয়েদের উপর ঘৃণার জন্ম নেয়।
ঠিক তখনই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয় রসু খাঁ। ১০১টি নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী ১০১ টি পাপ পূর্ণ করে সে আশা করেছিল সুফি হয়ে যাবে। সুফি হয়ে সিলেটের মাজারে গিয়ে বাকি জীবন ধর্ম কর্মে মন দেবে।
কিন্তু সর্বশেষ পারভীন হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আবদুল মান্নান ২০১৮ সালের ৬ মার্চ রায়ে রসু খাঁকে মৃত্যুদন্ড দেন।
এরশাদ শিকদার
১৯৮২ সালে এইচএম এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন খুলনার এরশাদ শিকদার।
তার বিরুদ্ধে অন্তত ২৪ জনকে হত্যার অভিযোগ ছিল। অনেককেই তিনি হত্যা করে মৃতদেহ গুম করে ফেলতেন। ফলে মৃতদেহও পাওয়া যেতো না, কোন মামলাও হতো না। মতের অমিল বা একটু এদিক ওদিক হলেই নিয়ে নিতো প্রাণ।
তার অপরাধের কথা সবাই জানতো। কিন্তু কোথাও কোন প্রমাণ থাকতো না। কেউ তার বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস করতো না, কেউ সাক্ষী দিতে চাইতো না। এমনকি সে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলায় মৃতদেহও পাওয়া যেত না। কিন্তু যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনের হত্যাকাণ্ড তাকে টেনে নিয়ে যায় ফাঁসির কাষ্ঠে।
১৯৯৯ সালের ১১ই অগাস্ট চার নম্বর ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন, ব্যবসায়ী সৈয়দ মনিরসহ চারজন।
তাদের ওপর হামলা করে বেধড়ক পেটানো হয়। পরে খালিদ হোসেনকে হত্যার পর বস্তায় ভরে সংলগ্ন ভৈরব নদে ফেলে দেয়া হয়।
মৃতদেহের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারও ফেলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে খালিদ হোসেনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরশাদ শিকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু মামলায় কোন সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছিল না।
এরশাদ শিকদারের শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলো তারই বিশ্বস্ত দেহরক্ষী নূর আলম। রাজসাক্ষী হলো সে।
ক্ষমতার পাশাপাশি নারীর প্রতি আসক্তিও কম ছিলো না তার। এভাবেই এরশাদের চোখ পড়ে নূর আলমের স্ত্রীর ওপর। যেটা জানতে পেরে পুষে রাখা ক্ষোভই যেন ফুঁসে ওঠে নূর আলমের।
এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে ২৪টি হত্যাকাণ্ড করার সাক্ষ্য দিয়েছেন তার দেহরক্ষী। কিন্তু তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এরশাদ শিকদার ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তার ধারণা।
এসব মৃতদেহ বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয়া হতো অথবা ইটের ভাটায় পুড়িয়ে ফেলা হতো।
২০০০ সালের ৩০শে এপ্রিল এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে খুলনার আদালত।
আপিল এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার পর্ব পার হয়ে সেই ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৪ সালের ১০ই মে।
দেশে নতুন সিরিয়াল কিলারের সন্ধান
“একজনকে চিনতে পারলেও নাম পরিচয় সঠিক জানা যায়নি। এর আগে ভবঘুরে হিসেবে পুলিশ তার একটি ভিডিও সংগ্রহ করে। যেখানে নাম সোনিয়া বললেও সেটা স্পষ্ট ছিল না। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনও ছিল মেয়েটা। বাকি একজনের ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।”
এক ব্যক্তি হাঁটছেন রাস্তায়। কাঁধে এক নারীর নিথর দেহ। তার হাত-পা ঝুলছে। ঢিমেতালে হেঁটে ঢুকে গেলেন পরিত্যক্ত ভবনে।
ভবনটির ভেতর থেকে পরে উদ্ধার করা হয়েছে দুইটি মরদেহ। দুটোই আগুনে পোড়া। এই দুই মরদেহের রহস্যের সুরাহা করতে গিয়েই সামনে এলো লোমহর্ষক ঘটনা।
কাঁধে বয়ে নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিটি মানসিক ভারসাম্যহীন বলে জানা যাচ্ছে। তাকে আটক করেছে পুলিশ।
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে পুলিশের ধারণা এটি সিরিয়াল কিলিং। দগ্ধ দুজনের অবশ্য পরিচয় মেলেনি।
আটক ব্যক্তির নাম সম্রাট। তার সাথে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে আরো পাঁচ খুনের কথা। যা আতঙ্ক তৈরি করছে জনমনে। কোনো থ্রিলার মুভি নয়, নৃশংস খুনের ঘটনাগুলো বাস্তব একই ব্যক্তি ঘটিয়েছে বলে পুলিশের বক্তব্য।
দিনের কোলাহল থেমে গেলে, এলাকার অলিগলিতে নেমে আসে এক অদ্ভূত নীরবতা। সেই নীরবতার মধ্যে গত ৫টি হত্যার ঘটনা বলে দেয় এক সিরিয়াল কিলারের নাম। তার নাম সম্রাট, জানিয়েছে পুলিশ।
রবিবার দুপুরে সাভার থানা রোডের পরিত্যক্ত ‘সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টার’ থেকে আগুনে পোড়া দুজন নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
পৌর ভবনের দোতলায় থাকা টয়লেটের ভিতর থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। হত্যার পর লাশগুলো আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
চার মাসে পাঁচটি খুন
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডেই কিছু অদ্ভুত মিল। হত্যাকাণ্ডের অবস্থান, সময় এবং আশপাশের নিস্তব্ধতা।
গত ২৯এ অগাস্ট ভবনের ভেতর থেকে হাত পা বাঁধা অবস্থায় এক যুবকের অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করা হয়। দীর্ঘ চার মাস পেরিয়ে গেলেও তার পরিচয় শনাক্ত কিংবা হত্যার রহস্য উদঘাটন করা যায়নি।
এরপর ১২ই অক্টোবর একই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে এক নারীর গলা কাটা অর্ধনগ্ন লাশ উদ্ধার হয়। গত ২০এ ডিসেম্বর ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে উদ্ধার হয় আগুনে পোড়া ও অর্ধগলিত এক যুবকের লাশ। সবশেষ রবিবার দুপুরে দুই নারীর লাশ উদ্ধার করা হয়।
প্রথম লাশটি পাওয়া যায় সাভারের একটি পরিত্যক্ত গুদামের পাশে। পরিচয়হীন, কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী নেই, নেই কোনো সুস্পষ্ট কারণ। পুলিশ শুরুতে এটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবেই দেখে। তবে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে একই ধরনের আরও দুটি লাশ উদ্ধার হয়। এটি কী কাকতালীয়?
পরে উত্তর খুঁজে পায় পুলিশ। সন্দেহভাজন নিজেই স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরিচয় না মিললেও একজন ভবঘুরে ছিল বলে জানায় পুলিশ।
সাভার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরমান আলী আলাপকে বলেন, “গত চার মাসের ছয়টি খুনই সম্রাট নামের এই ব্যক্তি করেছে বলে আমাদের কাছে স্বীকার করেছে।”
“একজনকে চিনতে পারলেও নাম পরিচয় সঠিক জানা যায়নি। এর আগে ভবঘুরে হিসেবে পুলিশ তার একটি ভিডিও সংগ্রহ করে। যেখানে নাম সোনিয়া বললেও সেটা স্পষ্ট ছিল না। কিছুটা মানসিক ভারসাম্যহীনও ছিল মেয়েটা। বাকি একজনের ব্যাপারে কিছুই জানা যায়নি।”
কেন খুনগুলো করেছে? এ ব্যাপারে সম্রাট পুলিশকে জানিয়েছে, মেয়েগুলোর সাথে তার সম্পর্ক ছিল। ঘনিষ্ঠ হওয়ার পর তার কোনো কারণে রাগ হয় এবং খুন করে। তবে রাগ ঠিক কী কারণে সে ব্যাপারে স্পষ্ট কিছু বলেননি।”
পাঁচজন ভিক্টিমের মধ্যে দুইজন পুরুষ ছিল। তাদের কেন হত্যা করা হয়েছে জানতে চাইলে পুলিশ জানায় এ ব্যাপারে কোন স্বীকারোক্তি দেয়নি সে।
এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করেছে। অভিযুক্তকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
জনমনে আতঙ্ক
ওই এলাকার বাসিন্দা আইরিন হক। তিনি বলেন, “ওই এলাকা এখন আতঙ্কের নাম। সন্ধ্যা হলে আমরা ঘর থেকে হওয়ার হওয়ার সাহস পাই না।”
“বিশেষ করে মেয়েরা জরুরি কাজ থাকলেও একদম বের হতে চায় না। এটা যেন ট্রমা হয়ে গেছে আমাদের। সবার চোখেমুখে আতঙ্ক।”
সাভার থানার পাশেই থাকেন প্রান্ত। তিনি বলেন, গতকালের ঘটনার পর মনে হচ্ছে আমি, আমরা কেউই নিরাপদ না। আমরা একটু শান্তিতে বাঁচতে চাই। কিন্তু এই ধরনের ঘটনা সারাক্ষণ মনের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে রেখেছে। কোথাও স্বস্তিতে বের হতে পারছি না।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এবং অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল আলাপকে বলেন, “এই ধরনের ঘটনা সমাজে খুবই নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।”
“সিরিয়াল কিলিং সাধারণত ঠাণ্ডা মাথায় করা হয়। তবে এ ধরনের মানুষকে বিকৃত মস্তিষ্কের বলা যায়। এরা সামাজিক, সাধারণ এবং সুষ্ঠু জীবন থেকে দূরে থাকে।”
‘‘এদেরকে দেখতে স্বাভাবিক মনে হলেও মূলত অপরাধমূলক মোটিভ নিয়ে সবার মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। তাই এদেরকে ধরাও কঠিন হয়ে যায়। এ ধরনের অপরাধ দমনে প্রশাসন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবার নজরদারি বাড়াতে হবে”, যোগ করেন ড. তৌহিদুল।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যপক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গোলাম মোস্তফাও একমত পোষণ করেন। আলাপকে তিনি বলেন, এই ধরনের মানুষকে মাসসিক রোগী বলা যায় না। এটা এক ধরনের ‘সাইকোলজিক্যাল পারভারসন’ বা সাইকোপ্যাথ।
তিনি বলেনম “এর কোন ডায়াগনসিস নেই আর রোগী হলে তো তাকে অপরাধী বলা যাবে না। ডায়াগনসিস না থাকায় এটা তাদের সুনির্দিষ্ট রোগ বলা যায় না। তারা সাধারণত অ্যান্টিসোশ্যাল পারসোনালিটির হয়।’’
বাংলাদেশে সিরিয়াল কিলিং নতুন নয়
নতুন করে মাথা চাড়া দিয়ে উঠলেও সিরিয়াল কিলিংয়ের ঘটনা দেশে নতুন নয়। রসু খাঁ কিংবা এরশাদ শিকদারের সিরিয়াল কিলিং এর দুর্ধর্ষ ঘটনাগুলো এখনো গায়ে কাঁটা দেয়।
১০১ টি খুন করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে অপরাধজগতে পা রাখেন বাংলাদেশের প্রথম সিরিয়াল কিলার রসু খাঁ।
২০০৯ সালে সাধারণ একটি ফ্যান চুরির মামলায় তাকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ১১ খুনের বর্ণনা দেন রসু খাঁ।
প্রেমে ব্যর্থ হয়ে একসময় সিরিয়াল কিলারে পরিণত হয় রসু খাঁ। টার্গেট ছিল ১০১টি হত্যাকাণ্ডের। রসু খাঁ যাদের হত্যা করেছে তারা সবাই ছিল গার্মেন্টস কর্মী। আটকের আড়াই মাস আগে পারভীন নামে একজনকে হত্যা করে।
প্রথম স্ত্রীকে ছেড়ে গিয়ে রসু খাঁ বিয়ে করে শ্যালিকা রীনাকে। রীনা ছিলেন গার্মেন্টস কর্মী। কাজেই রীনার কর্মস্থলের সূত্রে বিভিন্ন গার্মেন্টসকর্মীদের সাথে রসু খাঁর পরিচয় হয়।
রীনার গার্মেন্টসেরই এক নারী কর্মীকে দেখে রসু খাঁ প্রেমে পড়ে। তাকে জানায় ভালবাসার কথা। রসু খাঁর সাথে প্রণয় জমতে না জমতেই মেয়েটি আরেকজনের প্রেমে জড়িয়ে পড়ে। রসু খাঁ মেনে নিতে না পেরে প্রেমিকাকে বোঝায়। ঘটে আরেক বিপত্তি।
মেয়েটি তার নতুন প্রেমিককে জানিয়ে দেয় সব কিছু। সেই প্রেমিক দলবল নিয়ে এসে রসু খাঁকে বেধড়ক মার দেয়। ভালবাসার পরিণামে এই আঘাত মনোজগতে ভয়ংকর প্রভাব ফেলে। তার চিন্তাভাবনাই পালটে যায়। মেয়েদের উপর ঘৃণার জন্ম নেয়।
ঠিক তখনই ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয় রসু খাঁ। ১০১টি নারীকে ধর্ষণ করে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। তার বক্তব্য অনুযায়ী ১০১ টি পাপ পূর্ণ করে সে আশা করেছিল সুফি হয়ে যাবে। সুফি হয়ে সিলেটের মাজারে গিয়ে বাকি জীবন ধর্ম কর্মে মন দেবে।
কিন্তু সর্বশেষ পারভীন হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় চাঁদপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. আবদুল মান্নান ২০১৮ সালের ৬ মার্চ রায়ে রসু খাঁকে মৃত্যুদন্ড দেন।
এরশাদ শিকদার
১৯৮২ সালে এইচএম এরশাদের সামরিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন খুলনার এরশাদ শিকদার।
তার বিরুদ্ধে অন্তত ২৪ জনকে হত্যার অভিযোগ ছিল। অনেককেই তিনি হত্যা করে মৃতদেহ গুম করে ফেলতেন। ফলে মৃতদেহও পাওয়া যেতো না, কোন মামলাও হতো না। মতের অমিল বা একটু এদিক ওদিক হলেই নিয়ে নিতো প্রাণ।
তার অপরাধের কথা সবাই জানতো। কিন্তু কোথাও কোন প্রমাণ থাকতো না। কেউ তার বিরুদ্ধে মামলা করার সাহস করতো না, কেউ সাক্ষী দিতে চাইতো না। এমনকি সে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলায় মৃতদেহও পাওয়া যেত না। কিন্তু যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেনের হত্যাকাণ্ড তাকে টেনে নিয়ে যায় ফাঁসির কাষ্ঠে।
১৯৯৯ সালের ১১ই অগাস্ট চার নম্বর ঘাট এলাকায় গিয়েছিলেন যুবলীগ নেতা খালিদ হোসেন, ব্যবসায়ী সৈয়দ মনিরসহ চারজন।
তাদের ওপর হামলা করে বেধড়ক পেটানো হয়। পরে খালিদ হোসেনকে হত্যার পর বস্তায় ভরে সংলগ্ন ভৈরব নদে ফেলে দেয়া হয়।
মৃতদেহের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেল এবং প্রাইভেট কারও ফেলে দেয়া হয়। পরবর্তীতে খালিদ হোসেনের মৃতদেহ পাওয়া যায়।
সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এরশাদ শিকারের বিরুদ্ধে মামলা হয়। কিন্তু মামলায় কোন সাক্ষী পাওয়া যাচ্ছিল না।
এরশাদ শিকদারের শিকদারের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলো তারই বিশ্বস্ত দেহরক্ষী নূর আলম। রাজসাক্ষী হলো সে।
ক্ষমতার পাশাপাশি নারীর প্রতি আসক্তিও কম ছিলো না তার। এভাবেই এরশাদের চোখ পড়ে নূর আলমের স্ত্রীর ওপর। যেটা জানতে পেরে পুষে রাখা ক্ষোভই যেন ফুঁসে ওঠে নূর আলমের।
এরশাদ শিকদারের বিরুদ্ধে ২৪টি হত্যাকাণ্ড করার সাক্ষ্য দিয়েছেন তার দেহরক্ষী। কিন্তু তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এরশাদ শিকদার ৬০টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে তার ধারণা।
এসব মৃতদেহ বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দেয়া হতো অথবা ইটের ভাটায় পুড়িয়ে ফেলা হতো।
২০০০ সালের ৩০শে এপ্রিল এরশাদ শিকদারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে খুলনার আদালত।
আপিল এবং রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার পর্ব পার হয়ে সেই ফাঁসি কার্যকর হয় ২০০৪ সালের ১০ই মে।