ছিনতাই থেকে উধাও, এবার পিচ্চি রাজা: কতজন ধরা পড়লো

পঁচিশটি মামলার আসামী পিচ্চি রাজা পালালো প্রিজন ভ্যান থেকে। ছিনতাই আর উধাওয়ের আগের ঘটনাগুলোর পর আবারও প্রশ্নের মুখে পুলিশের সক্ষমতা। 

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪২ পিএম

প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার কথা বলেছিল ‘পিচ্চি রাজা’। তারপর উধাও!

রবিবার ২৭এ অগাস্ট, সন্ধ্যা নেমেছে তখন। মামলার হাজিরা দিতে রাজাকে আদালতে আনা হয়েছিলো। সেখান থেকে কাশিমপুর কারাগারে ফেরার পথে গাজীপুরের এক জায়গায় প্রিজন ভ্যান থামানো হয়। পুলিশ সদস্যরা তাকে বাথরুমে নিয়ে যায়। এরপর তাকে আর পাওয়া যায়নি।

কমপক্ষে ২৫টি মামলার আসামী এই রাজা, রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পের তালিকাভুক্ত মাদক কারবারি। সেখানে গড়ে তুলেছিলেন অপ্রতিরোধ্য এক গ্যাং।

গত মে মাসে গ্রেপ্তার হন, আর মাত্র চার মাসের মাথায় পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে গেলেন। চোখের পলকে কীভাবে পালালেন, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এখন সেই উত্তরই খুঁজছেন।

আসামী পালানো বা ছিনতাইয়ের ঘটনা এই প্রথম নয়। নিরাপত্তা বলয়ের তোয়াক্কা না করে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে, আর মানুষের উদ্বেগও বাড়ছে। এর আগে, এমন দুটি ঘটনা ছিলো বাইরে থেকে পরিকল্পিত হামলা। আর সাম্প্রতিক দুটিতে গলদ দেখা যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেতরেই। 

ছিনতাই থেকে উধাও: আগের ঘটনাগুলো 

২০১৪ সালের ২৩এ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে আসামী নিয়ে ময়মনসিংহ আদালতের দিকে যাচ্ছিল একটি প্রিজন ভ্যান। ত্রিশাল-ভালুকার মাঝামাঝি সাইনবোর্ড এলাকায় হঠাৎ চারপাশ থেকে গুলি আর বোমা ফাটিয়ে হামলা শুরু হয়, একেবারে ফিল্মি কায়দায়। এতে এক পুলিশ সদস্য নিহত হন। 

হামলাকারীরা ছিনিয়ে নেয় নিষিদ্ধ জঙ্গী সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর দণ্ডপ্রাপ্ত, প্রশিক্ষিত তিন নেতাকে। তারা হলেন মজলিসে সূরা সদস্য সালাহউদ্দিন ওরফে সালেহীন, জাহিদুল ইসলাম ওরফে বোমা মিজান এবং হাফেজ মাহমুদ ওরফে রাকিব হাসান।

ওই দিনই টাঙ্গাইল পুলিশ হাফেজ মাহমুদকে গ্রেপ্তার করে। রাতে বন্দুকযুদ্ধে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। বোমা মিজান ২০১৮ সালের অগাস্টে ভারতের বেঙ্গালুরুতে গ্রেপ্তার হন এবং এখনো সেখানকার কারাগারে আছেন। সালেহীনের কোনো তথ্য নেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে।

ত্রিশালে পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে আসামী ছিনতাইয়ের পর আবারও জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়া হয়, এবার পুরান ঢাকার আদালত পাড়া থেকে। ২০২২ সালের ২০এ নভেম্বর দুপুরে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া দুই জঙ্গি আবু সিদ্দিক সোহেল ওরফে সাকিব ও মাইনুল হাসান শামীমকে ছিনিয়ে নেয় তাদের সহযোগীরা। তখন পুলিশের চোখে পেপার স্প্রে মারা হয়। দুইজনকে এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি পুলিশ। এই ঘটনায়ও পুলিশের সক্ষমতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। 

তৃতীয় ঘটনাটি এই বছরের ২৭এ অগাস্টের। যাত্রাবাড়ী থানায় রিমান্ডে থাকা হত্যা মামলার আসামী মিতু আক্তারকে আদালতে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছিলো। এর মধ্যেই তিনি হঠাৎ উধাও হয়ে যান। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে, ২৯এ অগাস্ট, কেরাণীগঞ্জ থেকে তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনায় চার পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছিলো।

আর এবার ‘পিচ্চি রাজা’।

এখন পর্যন্ত যা জানা গেছে 

কাশিমপুরে কারাগারে বন্দি ছিলেন রাজা। পালানোর ঘটনা কীভাবে ঘটলো তা এখনো পরিস্কার না হলেও, তথ্য বলছে এর আগেও সাত-আটবার পালানোর পরিকল্পনা করেছিলেন রাজা।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মোহাম্মদ তাহেরুল হক চৌহান আলাপ-কে জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে দায়িত্ব অবহেলা ও গাফিলতির প্রমাণ মিলেছে। একজন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন স্তরের পাঁচ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও হয়েছে, তারা সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে বাকি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজার তথ্য দিয়ে সারাদেশে অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে, আর দেশের সব ইমিগ্রেশনে তার পালানোর পথ বন্ধ করা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন গাজীপুর মেট্রোপলিটান পুলিশ প্রধান।

কারা অধিদপ্তরের জেল সুপার (মিডিয়া) মাসুদ হাসান জুয়েল আলাপ-কে বলেছেন তারা “নিয়ম অনুযায়ী বুঝে পাননি”। আদালত বিষয়টি জানলে কারা কর্তৃপক্ষকে পরবর্তী নির্দেশনা দেবেন, আর সেই নির্দেশনাই তারা বাস্তবায়ন করবেন বলে তিনি জানান।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেছেন, “পিচ্চি রাজা খুবই ধুরন্ধর। তার অপরাধের নেটওয়ার্কও অনেক বড়। মাদক কারবার করে প্রচুর অর্থেরও মালিক হয়েছে ।”

কারও সহযোগিতা ছাড়া রাজার একার পক্ষে পালানো সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা। তার মতে, নিরপেক্ষ তদন্ত হলেই সব পরিষ্কার হবে।

কে এই ‘পিচ্চি রাজা’

মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) সদর দপ্তরের নামে ১৯৭২ সালে এই ক্যাম্পের নামকরণ হয়। আটকে পড়া পাকিস্তানি নাগরিকদের অস্থায়ীভাবে থাকার জন্যই এটি করা হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্যাম্প আলোচনায় আসে মাদক ব্যবসা, গ্যাং কালচারসহ নানা অপরাধের জন্য।

সেই মাদক অপরাধ চক্রের হোতাদের একজন পিচ্চি রাজা। জেনেভা ক্যাম্পেই তার বাড়বাড়ন্ত। শুধু মাদক বিক্রি করেই কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন রাজা। ক্যাম্পের আরও দুই শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ‘বুনিয়া সোহেল’ ও ‘চুয়া সেলিমের’ মতো তার নিজের বাহিনী রয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্টের পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ‘পিচ্চি রাজা’। মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র চলে যায় জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধীদের হাতে। সেসব অস্ত্র নিয়েই প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়ায় তারা। সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশ দফায় দফায় অভিযান চালালেও রাজা থেকে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। শেষ পর্যন্ত নেপাল থেকে ফেরার সময় গত ১৯এ মে সন্ধ্যায় স্ত্রী ও শ্যালকসহ গ্রেপ্তার হন রাজা।

‘শুধু বরখাস্ত করলে হবে না’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক আলাপ-কে বলেন, এই ঘটনা থেকে একটা বার্তা পরিষ্কার অপরাধী কারাগারে থাকুক বা বাইরে, তারা সবসময়ই শক্তিশালী। 

এক কারাগার থেকে আরেক কারাগারে স্থানান্তর, কিংবা আদালতে আনা-নেওয়ার সময় যে নিরাপত্তা থাকে, তার আধুনিকায়ন দ্রুত দরকার। না হলে ভবিষ্যতে কোনো শক্তিশালী অপরাধী নিজের ইচ্ছামতো হেফাজত থেকে পালিয়ে যেতে পারবে। এই ঘটনাকে তিনি অশনিসংকেত বলে মন্তব্য করেন।

তার মতে, ঘটনার পর শুধু অধস্তনদের সাময়িক বরখাস্ত বা ক্লোজ করে তদন্ত শেষ করে দিলে হবে না। গড়ে তুলতে হবে ‘স্মার্ট সুরক্ষা বলয়’। একই সঙ্গে এতো বড় একজন অপরাধীর পালানোর পেছনে যারা মদত দিয়েছে, তাদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করাও এখন সময়ের দাবি।