এক আন্তর্জাতিক বিমান ছিনতাই যেভাবে ঢাকায় পড়ে রক্তাক্ত বিদ্রোহের ভেতর
যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ঢাকার বিমানবন্দরে নামলো বিদেশি একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যখন জিম্মি মুক্তি নিয়ে দরকষাকষি চলছে ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হলো এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থান। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সশস্ত্র যোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়লো রানওয়েসহ পুরো বিমানবন্দরে। সংঘর্ষ, ত্রিপাক্ষিক গোলাগুলি, রক্তাক্ত লাশের ছড়াছড়ি। এটি কোনো অ্যাকশন মুভির প্লট নয়। একটি সত্যি ঘটনা।
রাহী নায়াব
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫১ পিএমআপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:২২ পিএম
ছিনতাই করা বিমান নামার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই ঢাকার বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করে সরকার।
একদিকে জাপানের সশস্ত্র বিপ্লবী, 'জাপানিজ রেড আর্মি'। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিদ্রোহী সেনারা। দুই দলেরই উদ্দেশ্য ছিল, পুরনো ব্যবস্থার কবর রচনা করা।
কিন্তু ভাগ্য তাদের টেনে আনলো ঢাকার বিমানবন্দরে।
আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ঢাকায় অবতরণ করে জাপানিজ রেড আর্মি। তাদের হাতে জিম্মি বিভিন্ন দেশের দেড় শতাধিক নাগরিক। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের শ্বাসরুদ্ধ দর কষাকষি চলছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, শুরু হলো রক্তাক্ত এক অভ্যুত্থান। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সশস্ত্র যোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়লো রানওয়েসহ পুরো বিমানবন্দরে।
সংঘর্ষ, ত্রিপাক্ষিক গোলাগুলি, রক্তাক্ত লাশের ছড়াছড়ি। নাটকীয় সেই ঘটনার ইতি হয় বহু হত্যা ও মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে।
এই গল্প কোনো অ্যাকশন মুভির প্লট নয়। এটি জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট-৪৭২ ছিনতাই এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থানের বাস্তব কাহিনী।
আটচল্লিশ বছর আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনার শুরু
১৯৭৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর। প্যারিস থেকে টোকিওর উদ্দেশ্যে রওনা হয় জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট- ৪৭২। মুম্বাইয়ে ট্রানজিট। যাত্রাবিরতি শেষে দেড়শ’র বেশি যাত্রী নিয়ে আবার উড়াল দেয় ফ্লাইট। মাত্র বারো মিনিট পার হয়েছে। হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সিটবেল্ট বেঁধে বসার চিহ্ন। একজন কেবিন ক্রু মাইক্রোফোনে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে কথা বলা শুরু করেন।
হঠাৎ করেই আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান পাঁচজন জাপানি যুবক। তাদের হাতে অস্ত্র ও গ্রেনেড। চিৎকার করতে করতে তারা এগিয়ে যান ককপিটের দিকে। একজন ককপিটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পিস্তল উঁচিয়ে সোজা তাক করেন যাত্রীদের দিকে।
দলনেতার হাতে শুধুমাত্র পিস্তল। বাকি চারজনের এক হাতে গ্রেনেড ও অন্য হাতে পিস্তল। জোর করে ককপিটের দরজা খুলে ফেলেন তারা। বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন ফ্লাইটের কো-পাইলট ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পার্সার। মারধরের শিকার হন তারা।
পাইলট ক্যাপ্টেন তাকাহাশি ফ্লাইটটিকে আবার মুম্বাইয়ের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছিনতাইকারীদের অস্ত্রের মুখে ব্যর্থ হন। বিমানটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ছিনতাইকারীদের হাতে।
এরপর যাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রথমে ইংরেজিতে, তারপর জাপানি ভাষায় ঘোষণা দেন দলনেতা। “এই বিমানটি এখন জাপানিজ রেড আর্মির হিদাকা কমান্ডো ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে,” লিখেছেন হাজিমে ইশিই, যিনি সেসময় ছিলেন জাপানের পরিবহন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা সামাল দিতে জাপান থেকে একটি টাস্কফোর্স এসেছিল ঢাকায়। সেই দলের প্রধান ছিলেন হাজিমে ইশিই। পুরো ঘটনা নিয়ে তিনি লিখেছেন একটি বই ‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ যেখানে নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি, ভিকটিমদের সাক্ষাৎকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বয়ান তুলে ধরা হয়েছে।
ছিনতাইকারী পাঁচ যুবক ছিলেন এমন একটি সংগঠনের সদস্য, যেটি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বিমানবন্দরে হামলা, বিমান ছিনতাই, দূতাবাসে হামলাসহ বিভিন্ন দেশে গোলাগুলি, দাবি আদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জিম্মি এবং গ্রেনেড ও বোমা হামলা করে কুখ্যাতি অর্জন করে।
সংগঠনের নাম জাপানিজ রেড আর্মি। উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসের মাধ্যমে জাপানকেন্দ্রিক বৈশ্বিক বিপ্লব তৈরি করা।
গন্তব্য ঢাকা
বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরই নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের বসানো হয় দুই সারির মাঝের করিডোরের দিকের আসনে। আর পুরুষদের বিশেষ করে যুবকদের আসন দেয়া হয় জানালার পাশে।
গোলাপি হিজাব পড়া এক মিশরীয় নারীকে আদেশ দেয়া হয়, সবার পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস, টিকেট, ঘড়ি, ডায়েরি ও কলম সংগ্রহ করতে। নারীদের হাতের ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস করিডরে জমা দিতে বলা হয়।
যাত্রীদের কাছ সবকিছু নিয়ে সেগুলো জড়ো করা হয় বিমানের জরুরি বহির্গমনের দরজার সামনে যাতে সহজে দরজা না খোলা যায়।
নারীদের দিয়ে ভারি জিনিস বহন করানোর প্রতিবাদ করেন এক ট্যুর গাইড। এজন্য তাকে কুড়ি বারের বেশি আঘাত করা হয়। নির্দেশ অমান্য করায় আরেক নারী যাত্রী ও এক বিমানকর্মীকেও করা হয় মারধর।
রেড আর্মির বৈশ্বিক বিপ্লবের সেবারের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন চলছে সামরিক শাসন। বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে এমন আশা ছিল ছিনতাইকারীদের। তারা পাইলটদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে, মানচিত্রে লাল কালি দিয়ে দাগ কেটে ঢাকার পথ দেখিয়ে দেন।
পাইলটরা জানান, ঢাকার বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও রানওয়ের অবস্থান নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। তখন ছিনতাইকারীরাই পাইলটদের ঢাকা শহরের মানচিত্র দেখিয়ে রানওয়ের দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন।
এসব থেকে অনুমান করা যায় যে, এই অভিযানের পেছনে লম্বা সময়ের প্রস্তুতি ছিল রেড আর্মির সদস্যদের, বলা হয়েছে হাজিমে ইশিইয়ের ‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইয়ে।
ঢাকায় অবতরণ, অসহ্য যন্ত্রণা
আটাশে সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা। কন্ট্রোল টাওয়ারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে, তেজগাঁওয়ের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে জাপান এয়ারলাইন্সের ছিনতাই হওয়া ফ্লাইট ৪৭২। তবে কিছু সময়ের মধ্যেই ছিনতাইকারীরা বুঝে ফেলে, ভুল জায়গায় নেমেছে তারা। বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কোনো সহযোগিতা তারা পাবে না।
ছিনতাই করা বিমান নামার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তেজগাঁও বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রেড আর্মি সদস্যদের সাথে আলোচনা ও দর কষাকষির দায়িত্ব দেওয়া হয় বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদকে।
প্রথমেই তিনি খতিয়ে দেখেন, দ্রুত সশস্ত্র হামলা চালিয়ে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনার সম্ভাবনা আছে কিনা। ছিনতাইকারীদের সাথে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু যখন জানা যায় যে, প্রতিটা দরজার সামনে ব্যাগের স্তূপ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ভেতরে বিস্ফোরক রয়েছে, তখন সেই পরিকল্পনা বাদ দিতে বাধ্য হয় সরকার।
বিমানের ভেতরের যাত্রীদের ভাষ্য উল্লেখ করে হাজিমে ইশিই লিখেছেন, ছিনতাইকারীরা পরিচয় গোপন করার স্বার্থে মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। তারা একে অপরকে দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ ও পঞ্চাশ নম্বর বলে অভিহিত করছিলেন।
তবে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করলেও পরে জাপান সরকার ছিনতাইকারীদের পরিচয় বের করতে সক্ষম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের দলনেতার সাংকেতিক পরিচয় ছিল বিশ নম্বর এবং তিনি মুখ ঢাকেননি। বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদের সাথে কথাবার্তা চালিয়েছিলেন এই ব্যক্তি।
তার কথা বলার ভঙ্গি ছিল নরম, চিকন কণ্ঠস্বর। ধারণা করা হয়, তার নাম ওসামু মারুওকা। তিনি জাপানিজ রেড আর্মির সামরিক শাখার প্রধান। ১৯৭৩ সালে আরেকটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ছিলেন এই ব্যক্তি।
দলের উপনেতার নম্বর ছিল ত্রিশ। তিনি ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন না, তাই কথা পরিষ্কার বোঝা যায়নি। এজি মাহমুদ তার সাথে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। তার পরিচয় স্পষ্ট না। তবে ২৭ বছর বয়সী জুন নিশিকাওয়া কিংবা ২৯ বছরের হারুও ওয়াকো - রেড আর্মির এই দুজনের মধ্যে একজন হতে পারেন তিনি।
নিশিকাওয়া ১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসে ফরাসি দূতাবাসে হামলায় জড়িত ছিলেন। আর ওয়াকো ছিলেন রেড আর্মির সামরিক শাখার অন্যতম সদস্য। তিনি সিঙ্গাপুরে শেল কোম্পানির শোধনাগারে এবং কুয়ালালামপুরের যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনের দূতাবাসে হামলায় জড়িত ছিলেন।
বিমানের কাঠামো নিয়ে ভাল ধারণা ছিল দশ নম্বরের। দরজাগুলোতে বিস্ফোরক বসানোর কাজটি করেন এই ব্যক্তিই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কোচিংয়ের শিক্ষার্থী কাজুও তোহিরা বলে ধরে নেয়া হয়।
চল্লিশ নম্বরের মূল দায়িত্ব ছিল যাত্রীদের ওপর নজরদারি রাখা। জিম্মিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাচ্চাদের স্নেহ ও বয়স্কদের যত্ন নিলেও হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠত সে। আদেশ অমান্য করলে শারীরিক শাস্তি পেতে হতো। এই ব্যক্তিকে রেড আর্মির কেন্দ্রীয় কমিটির কুনিও বান্দো বলে মনে করা হয়, যিনি টোকিওতে এক গোলাগুলির ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন।
পঞ্চাশ নম্বর ছিলেন বেশ আলাপী ব্যক্তি। বিমানের পেছনের দিক থেকে জিম্মিদের পাহারা দিচ্ছিলেন। মনে করা হয় উগ্র বামপন্থী সংগঠন ‘হিগাশি আজিয়া হান্নিচি বুশো সেনসেন’-এর ‘নেকড়ে শাখা’-র নোরিও সাসাকি হলেন এই ব্যক্তি। তাকে ১৯৭৫ সালে কুয়ালালামপুরের ঘটনায় জিম্মিদের মুক্তির বদলে কারামুক্ত করতে বাধ্য হয় জাপান সরকার।
বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা ছাড়াই দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় রেড আর্মি। দুপুর ১২টায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে তারা হুঁশিয়ারি দেয় যে, বিমানের ২০০ গজের মধ্যে কেউ এলে গুলি করে হত্যা করা হবে। সেই সাথে বিমানটিকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হবে। তারা আরও দাবি জানায় যে, বিমানে এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং খাবার ও পানি পাঠাতে হবে।
এদিকে জিম্মিদের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতা ৭৫ শতাংশ। বিমানের ভেতর তাপ বাড়তে থাকে, অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কয়েকজন যাত্রীর হৃৎস্পন্দন বেড়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অজ্ঞান হয়ে করিডোরে পড়ে যান কয়েকজন।
জিম্মিদের শরীর থেকে স্রোতের মতো ঘাম ঝরতে থাকে। শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। অসহ্য যন্ত্রণায় অসহায় কয়েকজন যাত্রী মিনতি করে বলতে বাধ্য হন, “আমাদের গুলি করে মেরে ফেলুন।”
একজন ক্রু সদস্য বুদ্ধি করে জরুরি অক্সিজেন মাস্ক নামিয়ে দেন। তবে তাতে অক্সিজেন ছিল খুবই অল্প। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী গাড়ি পৌঁছালে কিছুটা স্বস্তি মেলে বলে ‘জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইতে বলা হয়েছে।
মুক্তিপণ দাবি ও জাপানের প্রতিক্রিয়া
উনত্রিশ তারিখ সকালে প্রথমবারের মতো খাবার দেয়া হয় বিমানে। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য একটি লাঞ্চ বক্স এবং কাগজের কাপে একটু পানি।
যাত্রীদের ভাষ্যমতে, তাদের খাবারে হাত দেয়নি রেড আর্মির সদস্যরা। বেশিরভাগ পানি যাত্রীদের দিয়ে দেয় তারা। নিজেরা শুধু গলা ভেজায় এবং ব্যাগ থেকে বিস্কুট খায়।
ছিনতাইকারীদের চোখে প্রধান শত্রু ছিল জাপান সরকার। তাদের সাথে কোনোরকম প্রত্যক্ষ আলাপে যেতে একেবারেই রাজি ছিলেন না তারা। সব সংলাপ চলছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এজি মাহমুদের মধ্যস্থতায়।
উনত্রিশ তারিখ রাত পৌনে নয়টায় জাপানের রাষ্ট্রদূত মি. ইশিয়ওকাকে ছিনতাইকারীদের সাথে কথা বলার অনুমতি মেলে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো লাভ হয় নাই।
সেই রাতেই ছিনতাইকারীরা জাপান সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানায় যে, কারাবন্দী রেড আর্মি নেতা জুনযো ওকুদাইরাসহ ৯ জনের মুক্তি এবং জিম্মিদের ছাড়াতে ছয় মিলিয়ন ডলারের মুক্তিপণ দিতে হবে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, জবাব দেয়ার জন্য জাপান সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ভোর তিনটা পর্যন্ত। সময় পার হলে যাত্রীদের মধ্যে প্রথম কাকে হত্যা করা হবে, তার নামও ঘোষণা করে তারা। সেই ব্যক্তি হলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গারফিল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মি. গ্যাব্রিয়েল, যিনি তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বন্ধু ছিলেন।
ছিনতাইকারীদের দাবি মানা হবে কিনা তা নিয়ে জাপান সরকারের অন্দরমহলে রীতিমতো কোন্দল লেগে যায়। বিমান ছিনতাই সামাল দিতে গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা বিভক্ত হয়ে পড়েন।
প্রশ্ন ওঠে যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার বদলে জাপান কি সন্ত্রাসীদের দাবির কাছে মাথা নত করবে? নাকি আইনের শাসন বহাল থাকবে?
ছিনতাইকারীরা যে নয়জনের মুক্তি চেয়েছিল তাদের মধ্যে সাতজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। বাকি দুইজন খুনের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত। এই দুইজনকে ছেড়ে দেওয়া নিয়েই মূলত আপত্তি তুলেছিল জাপানের আইন মন্ত্রণালয়।
এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদকে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় যে, ছিনতাইকারীরা খুনের আসামি দুইজনের নাম যেন তালিকা থেকে বাদ দেয়।
জবাবে এজি মাহমুদ বলেন, “জঙ্গিরা আপনাদের আবেদন মেনে নেবে বলে আমার মনে হয় না।” তিনি জাপান সরকারকে পালটা অনুরোধ করেন যে, মুক্তি চাওয়া নয় জনকেই যেন জাপান সরকার ঢাকাতে পাঠায়।
“তারপর আমি সন্ত্রাসীদের বোঝানোর চেষ্টা করব যাতে দুজন খুনিকে তালিকা থেকে বাদ দেয়। জঙ্গিরা এই প্রস্তাবে রাজি হলে তখন সেই দুইজনকে জাপানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে,” তখনকার বিমান বাহিনীর প্রধানকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন হাজিমে।
অবশেষে মুক্তিপণ দেওয়া এবং নয়জনকে ছেড়ে দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজি হয় জাপান সরকার। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সাথে সাথেই পদত্যাগ করেন আইনমন্ত্রী ও আইন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
জাপানের কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, নয়জনের মধ্যে তিনজন বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেব ছিনতাইকারীদের দেখানোর জন্য তাদের নিজের হাতে লেখা বক্তব্য এবং অডিও রেকর্ডিং প্রস্তুত করা হয়।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি হন যে ছয়জন
আটাশ বছর বয়সী জুনযো ওকুদাইরা জাপানিজ রেড আর্মির শীর্ষ নেতা, যার মুক্তিই ছিল বিমান ছিনতাইয়ের আসল উদ্দেশ্য। তার বড় ভাইও ছিলেন রেড আর্মির সদস্য যিনি ইসরায়েলের বিমানবন্দরে হামলা চালানোর সময় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। জুনযো ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে হামলায় অংশ নেন এবং ১৯৭৬ সালে সিরিয়া থেকে অবৈধভাবে জর্ডানে প্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পরেন।
উনত্রিশ বছর বয়সী সুতোমু শিরোসাকি রেড আর্মির কেন্দ্রীয় কমিটির ‘সংগ্রাম দল’-এর অধিনায়ক। ১৯৭১ সালে অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ডাকঘর ও ব্যাংকে আক্রমণে অংশ নেন। গ্রেপ্তারের পর ১০ বছরের কারাদণ্ড হয় তার।
একত্রিশ বছর বয়সী আকিয়া নিহিরা ১৯৭৫ সালে বাকবিতণ্ডার পর এক শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। রেড আর্মির সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে কারাগারে ওকুদাইরার সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়।
আটাশ বছর বয়সী আয়াকো দাইদোজি ‘হিগাশি আজিয়া হান্নিচি বুশো সেনসেন’-এর “নেকড়ে” শাখার সদস্য এবং সংগঠনটির নেতা শোজি দাইদোজির স্ত্রী। মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের সদরদপ্তর ও তেইজিন কোম্পানির গবেষণাগারে বোমা হামলার সন্দেহে গ্রেপ্তার হন।
ছাব্বিশ বছর বয়সী ইউকিকো একিদা ‘দাইচি নো কিবা’ (মাটির থাবা)-র নারী সদস্য। বিভিন্ন শোধনাগার, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ক্রমাগত বোমা হামলা চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।
চল্লিশ বছর বয়সী হিরোশি সেনসুই টোকিওর এক ঘরে প্রবেশ করে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করে টাকা চুরি করার অভিযোগে কারাবদ্ধ হয়। সেখানে কারাবন্দীদের নিয়ে একটি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন জেআরএ সদস্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন।
পয়লা অক্টোবর স্থানীয় সময় ভোরবেলা টোকিও থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয় জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট। সেই বিমানে ছিলেন মুক্তি পাওয়া ৬ জন, ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরিবহন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিই’র নেতৃত্বে জাপানের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা ২০ মিনিট। বিমানের জানালার পর্দা সরিয়ে জিম্মিদের বাইরে তাকাতে বলেন ছিনতাইকারীরা। তাকিয়েই তারা পুলকিত হয়ে ওঠেন। দেখতে পান, রানওয়েতে অবতরণ করছে জাপান থেকে আসা বিশেষ বিমান। জিম্মিদশা থেকে মুক্তির প্রহর এসে গেছে এটা ধরে নিয়ে বিমানের ভেতর আনন্দধ্বনি শোনা যায়, লিখেছেন হাজিমে ইশিই।
জাপান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিমান বাহিনী প্রধানের দ্বন্দ্ব
জাপানের বিশেষ বিমান অবতরণের পর পর্দা দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়। চারিদিকে বসানো হয় ট্যাঙ্ক ও কামান। মোতায়েন করা হয় শতাধিক সৈন্য।
মিনিট পনের পর বিমানের সামনে একটি গাড়ি এসে থামে। দলনেতা হাজিমে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলের সাতজনকে নিয়ে যাওয়া হয় কন্ট্রোল টাওয়ারে। বাকিরা অপেক্ষায় থাকেন বিশেষ বিমানে।
কন্ট্রোল টাওয়ারে আগে থেকেই ছিলেন এজি মাহমুদসহ বাংলাদেশের অন্য প্রতিনিধিরা। হাজিমের নেতৃত্বে জাপানের প্রতিনিধিরা সেখানে যাওয়ার নতুন ঝামেলার উদ্ভব হয়। সমস্যা সমাধানে জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের নীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ফুটে ওঠে।
টোকিও থেকে টাস্কফোর্স সদস্যদের আদেশ দেওয়া ছিল, ঢাকাতেই সব জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করে তারপরই দেশে ফিরতে হবে।
তবে ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। মুক্তিপণ নিয়ে ঢাকা থেকে উড়াল দেবে তারা। সঙ্গে নিয়ে যাবে কিছু জিম্মিকে, মানে শর্ত মানার পরও সবাই মুক্ত হবেন না।
রেড আর্মির সন্ত্রাসীদের এই পরিকল্পনার মূলে ছিল তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি। যাতে কোনো দেশ তাদের বহনকারী বিমানটি ভূপাতিত বা মাঝ আকাশে উড়িয়ে না দেয়। তাই নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরই সব জিম্মিকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল তারা।
তবে জাপান সরকারের কাছে এ ধরণের প্রস্তাব ছিল সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। কেননা, ঢাকা থেকে উড়াল দেয়ার পর বাকি জিম্মিদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এছাড়া, সব জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত না করেই মুক্তিপণের পুরোটা ও কয়েদিদের হস্তান্তর করলে, সন্ত্রাসীদের সাথে দর কষাকষির জন্য জাপানের প্রতিনিধিদের কাছে আর কোনো ‘অস্ত্র’ থাকবেও না।
কিন্তু এজি মাহমুদ বিমান ছিনতাইয়ের মতো উটকো ঝামেলার দ্রুত সমাধান করতে চাচ্ছিলেন। কারণ তার দিকে তখন ধেয়ে আসছিল বড় বিপদ।
এজি মাহমুদের উদ্দেশ্য ছিল, কোনোরকম রক্তপাত ছাড়াই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ছিনতাই করা বিমানটিকে ঢাকা থেকে বিদায় করা। তাই ঢাকায় ৫৯ জন জিম্মিকে মুক্ত করে, বাকীদের নিয়ে ছিনতাইকারীদের চলে যাওয়ার প্রস্তাবে ইতিবাচক সায় দেন তিনি।
কিন্তু তার এই সমঝোতায় সম্মত হননি জাপানের প্রতিনিধিরা। আর এ নিয়ে জাপান ও বাংলাদেশ দুই পক্ষের দরকষাকষি রূপ নেয় বাকবিতণ্ডায়।
জাপান সরকারের সদস্যরা আসার আগ পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন বিমান বাহিনীর প্রধান। তাই নতুন করে, নতুন শর্ত নিয়ে আর কোনো আলোচনা শুরু করতেই চাচ্ছিলেন না তিনি।
কিন্তু জিম্মি মুক্তির বিষয়ে জাপানি প্রতিনিধিরা ছিলেন নাছোড়বান্দা। এক পর্যায়ে এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদকে বিকল্প প্রস্তাব দেন হাজিমে ইশিই। তিনি বলেন, বিমানের সব যাত্রীকে ছেড়ে দিয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নিয়ে যেন ছিনতাইকারীরা ঢাকা ছাড়ে।
ঢাকায় গিয়ে জিম্মিদের মুক্ত করতে কী কী সমস্যার মুখে পড়তে হবে, তা আগেই কিছুটা অনুমান করেছিলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। কিছু প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তারা। প্রয়োজনে নিজেদের জিম্মি হতে হবে সেই মানসিক প্রস্তুতিও ছিল তাদের।
এদিকে জাপান থেকে বিশেষ বিমান আসার পরও মুক্তিপণ ও কয়েদিদের দিতে বিলম্ব হওয়া এবং এজি মাহমুদের কথার সুরের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন রেড আর্মি সদস্যরা। তাদের ধারণা হয়, জাপানের প্রতিনিধিরা এজি মাহমুদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছেন।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, রাগান্বিত স্বরে ছিনতাইকারীরা বার্তা দেন, “জাপান সরকারের কথায় তারা কান দেবেন না। জাপান সরকার কেবল নিজের স্বার্থের কথা ভাবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থের ভাবনা আদৌ তাদের মাথায় নেই।”
পয়লা অক্টোবর বেলা দুইটা। হাজিমে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নেয়ার জন্য ছিনতাইকারীদের প্রস্তাব দেন এজি মাহমুদ। কিন্তু এই প্রস্তাব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন রেড আর্মির সদস্যরা। তারা ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের আকাশে লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের ছিনতাই করা বিমান ভূপাতিত হওয়ার নজির দেখায়।
আরও মনে করিয়ে দেয় যে, সেই বিমানের যাত্রীদের সবাই ছিল আরব। তাই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ ও জাতির অনেক বেশি জিম্মি প্রয়োজন, যা তাদের আছে বলে জানায় রেড আর্মির সদস্যরা।
বিকেল পাঁচটা ১৫ মিনিট। ছিনতাইকারীরা ঘোষণা করে যে, পাঁচ মিনিট পর গ্যাব্রিয়েল তার শেষ উইল পড়ে শোনানোর সুযোগ পাবেন। কারণ, ২৫ মিনিট পর তার ‘মৃত্যুদণ্ড’ বাস্তবায়িত হবে। এই গ্যাব্রিয়েলই ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বন্ধু।
হুমকির পরও নিজের প্রস্তাবে অনড় থাকেন হাজিমে ইশিই। রেড আর্মির হম্বিতম্বি তাকে বিন্দুমাত্রও টলাতে পারেনি। অবশেষে সাড়ে পাঁচটায় ইশিইকে সরাসরি ছিনতাইকারীদের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
জঙ্গিদের তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সব সমালোচনা উপেক্ষা করেও তাদের দাবি মেনে নিতেই ঢাকায় এসেছে জাপান সরকারের প্রতিনিধিদল। তিনি অনুরোধ করেন, তাকেসহ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নিয়ে যাত্রীদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।
উত্তর আসে, “শাট আপ! চুপ করো!”
হাজিমে ইশিই তার বইয়ে লিখেছেন, “এরপর এজি মাহমুদ ছিনতাইকারীদের সাথে আবার কথা বলার চেষ্টা করেন। এবার তারা জানায়, জাপান থেকে বিশেষ বিমান আসার পর ছয় ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাই এখন তারা ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং সব জিম্মিকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
দুই বিমানে সংঘর্ষের চেষ্টা
হঠাৎ করেই নিশ্চুপ হয়ে যায় ছিনতাইকারীরা, তাদের আর কোনো কথাই শোনা যায়নি। হঠাৎ কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দেখা যায়, ছিনতাই করা বিমানটি ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে। যাচ্ছে জাপান থেকে আসা বিমানের দিকে। টাওয়ার থেকে ছিনতাইকারীদের কাছে আরও একটু সময় চাওয়া হয়।
কিন্তু কাজ হয় না। আসে না কোনো উত্তর। এগোতে থাকে বিমান। হয়ত তারা জাপানের দুটি বিমানের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটাতে চাচ্ছিলেন।
কন্ট্রোল রুম থেকে হঠাৎ কয়েকটি বাটনে চাপ দিলেন বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদ। মুহূর্তের মধ্যেই দমকলের গাড়ি, সামরিক ট্রাক, জিপ, মিনিবাস এবং সাঁজোয়া যান এসে জড়ো হয় ছিনতাই করা বিমানের সামনে। অবরোধ সৃষ্টি করা হয় পথে।
আর এতেই প্রচণ্ড ক্ষেপে ওঠেন ছিনতাইকারীরা। বিমান থামিয়ে ককপিটের জানালা দিয়ে চার রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে এক সন্ত্রাসী। আহত হন বাংলাদেশের দুই সৈনিক। তবে বিমানটিকে আটকানো সম্ভব হয়।
সন্ধ্যা ছয়টা ১২ মিনিট। সন্ত্রাসীরা ঘোষণা করে, সব দাবি মেটানোর প্রস্তুতির প্রমাণ দিতে হবে। না হলে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে বিমান।
হাজিমে ইশিইকে শেষবারের মতো সিদ্ধান্ত জানাতে অনুরোধ করেন এজি মাহমুদ। এই বার্তা দিয়েই আলোচনা থেকে উঠে যান এজি মাহমুদ। তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল রুম ত্যাগ করেন।
কিন্তু তখনও বাংলাদেশ সরকারের অন্য প্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ অব্যাহত রাখেন ইশিই। তিনি লিখেছেন, “জিয়াউর রহমান বাদে বাংলাদেশ সরকারের সব শীর্ষ নেতা কন্ট্রোল টাওয়ারে হাজির হন।”
অবশেষে সবার চাপে টোকিওর নির্দেশনার বাইরে গিয়ে ইশিই নিজে থেকেই প্রস্তাব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এজি মাহমুদকে আবারো অনুরোধ করেন, প্রথম ধাপে ৫৯ জন জিম্মির বদলে মুক্তিপণ ও ছয় কয়েদিকে হস্তান্তর করলেও, বাকি জিম্মিদেরও পরে যেন ছেড়ে দেয় এবং এর বদলে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জিম্মি নেওয়া হয়।
এদিকে বাইরে যখন দরকষাকষি চলছে, তখন বিমানের ভেতরে জিম্মিদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। হত্যার হুমকি পাওয়া গ্যাব্রিয়েল অসুস্থ হয়ে পড়েন। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
জিম্মি মুক্তির প্রথম ধাপ
অবশেষে জিম্মিদের বিনিময়ে মুক্তিপণ ও কয়েদিদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বিশেষ বিমানের সিঁড়ি পর্যন্ত জাপানের সার্বভৌমত্ব এবং সেখান থেকে ছিনতাই করা বিমান পর্যন্ত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব।
প্রথমেই কয়েদি হস্তান্তরের পালা। জাপান ও বাংলাদেশ থেকে একজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন এতে। বিমানের ভেতর বিশ নম্বর ককপিট থেকে এবং ত্রিশ নম্বর সামনের দরজার পাশে হাঁটু গেঁড়ে সশস্ত্র অবস্থান নেন। বাকি ছিনতাইকারীরা থাকেন বিমানের ভেতর, এক হাতে পিস্তল ও আরেক হাতে গ্রেনেড নিয়ে।
বিমান ছিনতাই হওয়ার ৮৫ ঘণ্টা পর পয়লা অক্টোবর রাত ১০টা সাত মিনিটে প্রথম দশজন জিম্মি মুক্তি পান।
জাপানিজ রেড আর্মির শীর্ষ নেতা জুনযো ওকুদাইরাকে হস্তান্তরের তালিকায় রাখা হয়েছিল সবার শেষে। হস্তান্তর চলার সময় হাজিমে ও এজি মাহমুদ তার সাথে আলাদা করে কথা বলেন। তারা অনুরোধ করেন, জুনযো যেন সহযোদ্ধাদের রাজি করায় যে, বাকি জিম্মিদের বদলে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলকে জিম্মি হিসেবে নিতে।
তবে রেড আর্মির নেতার কাছ থেকে কোনোরকম ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ৬১ জনকে ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। নয় জন ক্রুসহ বাকি যাত্রীরা তখনও জিম্মি।
বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থান
বিমান ছিনতাই হওয়ার তিনদিন আগে পঁচিশে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মিশর সফরে যান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে আরব লীগের সমর্থন আদায়ের চেষ্টার অংশ ছিল সেই সফর।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে লিখেছেন, তখনকার মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত জিয়াউর রহমানকে জানান, বাংলাদেশে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের আভাস পেয়েছে মিশরীয় গোয়েন্দারা। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেবেন অফিসার ও সিপাহীদের মধ্যে 'বৈষম্যে অতিষ্ঠ' বিমান বাহিনীর কিছু সৈন্য ও নন-কমিশনড অফিসার। তাদের উদ্দেশ্য, সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন মার্ক্সবাদী সরকার গঠন করা।
মাসকারেনহাস লিখেছেন, দোসরা অক্টোবর বিমান বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের আগাম খবর পেয়ে তিনি বিমানবাহিনী প্রধানকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
এদিকে রাতে প্রথম দফার জিম্মি হস্তান্তর শেষে একটু জিরোচ্ছিলেন সবাই। বিমানের ভেতর ছিনতাইকারী ও বাকি জিম্মিরা। বিশেষ বিমানে জাপানের প্রতিনিধি দলের একটি অংশ, বাকিরা কন্ট্রোল টাওয়ারে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, ভোর পাঁচটার দিকে হঠাৎ গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ এবং তা এতটাই তীব্র যে, মনে হচ্ছিল যেন পুরো বিমানবন্দর ফেটে পড়ছে।
বিমানবাহিনীর অভ্যুত্থান শুরু হয় ক্যান্টনমেন্টে। পরে তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। বিমানবন্দরে থাকা অফিসারদের হত্যা করতে অভ্যুত্থানকারীরা ঢুকে পড়ে টার্মিনাল ভবনে।
গোলাগুলির শব্দ আসার কিছুক্ষণ আগেও কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ও বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদ। কিন্তু অভ্যুত্থানকারীরা বিমানবন্দেরে ঢোকার আগেই কন্ট্রোল টাওয়ার ত্যাগ করেছিলেন তারা।
অবস্থা তখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে গোলাগুলির মাঝে গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরী জাপানের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এজি মাহমুদ চলে যাওয়ার আগে আনসার চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “সামান্য সমস্যা হয়েছে। আপনাদের বিমানে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে আপনাদের বিমানের ৩০০ মিটারের মধ্যে নিয়মিত-বাহিনী বহির্ভূত কোনো সৈন্য ঢুকে পড়লে, তাদের গুলি করে হত্যা করার অনুমতি দেয়া হলো। আপনারা আত্মরক্ষা করতে পারেন।”
ইশিইকেও অভয় দেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার। জানান, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
কিন্তু নিজের কী হবে তা যেন কল্পনাও করতে পারেননি এই অফিসার। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার সময় অভ্যুত্থানকারীদের গুলিতে প্রাণ হারান গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরী।
জাপানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ইশিইসহ সাতজন আলোচনার জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন। বাকিরা ছিলেন জাপান থেকে আসা বিশেষ বিমানে। অভ্যুত্থানে প্রাণহানির তীব্রতা দেখে বিশেষ বিমান থেকে বের হয়ে তারা আশ্রয় নেন টার্মিনাল ভবনে। সেখানেও ঢুকে পড়েন বিদ্রোহীরা। জাপানিজ ছাড়া কাউকে না দেখে পাশের ঘরে চলে যায়।
যেখান থেকে ক্রমাগত গুলির শব্দ ও মানুষের আর্তনাদের শব্দ শোনা যায় বলে হাজিমে ইশিই লিখেছেন।
কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দেখা যায়, রানওয়ের ওপর পড়ে রয়েছে কয়েকটি রক্তাক্ত মরদেহ। বিমানবাহিনীর অফিসাররা প্রাণ বাঁচাতে কাঁধ থেকে ব্যাজ খুলে ফেলে লুকাচ্ছিলেন।
ইশিই লিখেছেন, বিমানবাহিনীর এক অফিসার জাপান থেকে আসা একজন প্রতিনিধির জ্যাকেট পরে ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে কন্ট্রোল টাওয়ারের নিচের তলায় পাওয়া যায় সেই জ্যাকেটে মোড়ানো তার নিথর দেহ।
গোলাগুলির শব্দ কন্ট্রোল টাওয়ারের কাছে আসতে থাকে। অভ্যূত্থানকারীরা সেখানেও ঢুকে পড়লে ইশিই ও তার দলের বাকিরা হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিমায় দাঁড়ান। অন্য কাউকে সেখানে না দেখে অভ্যূত্থানকারীরা চলে যায়। পরে নিচে নামতে গিয়ে ইশিই দেখেন, দরজাগুলোর নিচ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে বের হচ্ছে রক্ত।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, "ভোর পাঁচটায় বেতার থেকে একটি বার্তা প্রচারিত হয়েছিল, অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। অভ্যুত্থানের অধিনায়ক কিছুক্ষণের মধ্যে জাতির উদ্দেশ্যে বার্তা দেবেন। এই বার্তা দিয়েছিলেন অভ্যুত্থানের অধিনায়ক বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট আফসার আলী খান।"
তিনি লিখেছেন, সার্জেন্ট আফসার আলী খানের সেদিনের বেতারের বার্তা ছিল 'বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে'। অভ্যুত্থান সফল হয়েছে, তিনি এমন দাবি প্রচার করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো অভ্যুত্থানকারীদের দমন করতে মেজর জেনারেল মীর শওকত আলির নেতৃত্বে নবম পদাতিক ডিভিশন ও পুলিশের সম্মিলিত বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল।
সার্জেন্ট আফসার আলী খান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা ছিলেন। ১৯৭২ সালে সেখান থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। তাকে সার্জেন্টদের মেস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখান থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহীদের দমন করে সেনা সদস্যরা সকাল ৮টা ১০ মিনিটে বিমানবন্দরে ঢুকে পালটা হামলা চালায়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।
বিমানবন্দরজুড়ে শুধু গুলির শব্দ। চাকাওয়ালা মেশিনগান ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দরে ঢুকে পড়ে নিয়মিত বাহিনী। তাদের আক্রমণের মুখে কোণঠাসা হতে থাকে অভ্যুত্থানকারীরা।
বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। আত্মসমর্পণকারী বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করে গ্রেফতার শুরু হয়। তবে সব আত্মসমর্পণকারীদের এই ভাগ্য হয়নি।
হাজিমে লিখেছেন, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মি. উয়েদা আশ্রয় নিয়েছিলেন টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে। সেখানকার জানালা দিয়ে তিনি দেখেন, ভবনটির দেয়ালে দলে দলে বিদ্রোহীদের দাঁড় করিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি করছিল নিয়মিত বাহিনীর সেনারা।
তিনি পরে বলেন, “আসা-যাওয়ার মধ্যে কয়েকটি মৃতদেহ দেখতে হয়েছিল। সবার মুখে সুন্দর গোঁফ, বাঙালিসুলভ সুদর্শন চেহারা। এই সামরিক অফিসারদের কেন এখানে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল তা নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার ছিল না।”
এদিকে নবম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সাথে বিদ্রোহীদের বন্দুকযুদ্ধে লক্ষ্যচ্যুত গুলি বারবার গিয়ে লাগছিল কন্ট্রোল টাওয়ারের দেয়ালে। আত্মরক্ষার্থে জাপানি প্রতিনিধিরা মাথা নিচু করে বসে ছিলেন টাওয়ারের বারান্দায়। ভেতর থেকে শুনতে পান, ছিনতাইকারীরা বারবার কথা বলার চেষ্টা করছে। হন্যে হয়ে খুঁজছে দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা এজি মাহমুদকে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, অভ্যুত্থানে নিহত হন দুই জন গ্রুপ ক্যাপ্টেন, একজন উইং কমান্ডারসহ ১১জন বিমান বাহিনীর অফিসার। সামরিক বাহিনীর পালটা অভিযানে নিহত হয় বেশিরভাগ বিদ্রোহী।
সকালের মধ্যেই বিদ্রোহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে করে ফেলে সরকার। সফলভাবে বিদ্রোহ দমনের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা আসে মিশর থেকে।
বিদ্রোহ দমন শেষে বিমানবন্দরের মূল ভবনে প্রবেশ করে সেনাবাহিনী। সেখানে ছাদের চার কোনায় চারটি মেশিনগান বসানো হয়, সাথে বসানো হয় ১৫ জনের টহল দল। কন্ট্রোল টাওয়ারের চারপাশে সেনা মোতায়েন করা হয়। ঢাকা শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোতায়েন করা হয় সৈন্যদের।
বিমানের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে রেড আর্মির ছিনতাইকারীরা দেখতে পায়, রানওয়েজুড়ে ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান। এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর হতেই বিমানের ভেতর গরম বাড়তে থাকে। অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে জিম্মিরা, কয়েকজন করিডোরে বমি করে দেয়।
একজন যাত্রী ছিনতাইকারীদের কাছে আর্জি করে, “আমরা তো আপনাদের কোনো ক্ষতি করিনি। আপনারা আমাদের সাথে এমন করছেন কেন?”
সুর নরম ছিনতাইকারীদের
‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইয়ে লেখা হয়েছে, কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ দেখে হয়তো তাদের মন একটু নরম হয়েছিল। এবার বিমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পরই নামে প্রশান্তির বৃষ্টি। তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসে।
ছিনতাইকারী ও বিমানের ক্রুরা মিলে বড় বড় পাত্রে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে থাকে। জিম্মিরা পালা করে কাগজের গ্লাস জানালা দিয়ে বের করে বৃষ্টির পানি খায়। দরজার বাইরে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতেও দেয়া হয় তাদের।
এদিকে দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যান এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদ। তিনি কোথায়, কেমন আছেন, কোনো খোঁজ মিলছে না। তার অনুপস্থিতিতে রেড আর্মির ছিনতাইকারীদের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ এক কর্মকর্তাকে।
বিমানবাহিনীর সদস্যদের বিদ্রোহ এবং তা কঠোরভাবে দমন, এই ঘটনা নিজেদের চোখে দেখে জাপানের সন্ত্রাসীদের সুর নরম হয়ে যায়, কণ্ঠে তখন বিনয়। মুক্তিপণ ও বন্দি হস্তান্তর প্রক্রিয়া গতি পায়।
জাপান সরকারের অনুরোধে বিমানের ক্রুদের ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। পরের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য নতুন ক্রু নিতে রাজি হইয় তারা। তাছাড়া আরও ৪২ জন জিম্মিকে ছেড়ে দিতেও সম্মত হয়।
হাজিমে লিখেছেন, মুক্তি পাওয়ার পরও দুইজন ক্রু যাত্রীদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তারা বলেন, “বিমানে যতক্ষণ যাত্রী আছে, তাদের সেবা করা ক্রুদের দায়িত্ব।” তবে ক্যাপ্টেন তাকাহাশির অনুরোধে তারা বিমান ছাড়েন।
বিদ্রোহের জেরে সেদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সরকারের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, যেকোনোভাবেই হোক না কেন, ছিনতাই করে আনা বিমানকে দ্রুত ঢাকা ছাড়তে হবে।
আর এই সিদ্ধান্ত সরাসরি কন্ট্রোল টাওয়ারে ফোন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে জানিয়ে দেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নিজে।
এই আদেশ আসার পরও হাজিমে ইশিই প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সব জিম্মিকে মুক্ত করার। বাংলাদেশ সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন তিনি। এক পর্যায়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সাথে বাকবিতণ্ডা জড়িয়ে পড়েন হাজিমে।
তিনি আবারও সন্ত্রাসীদের অনুরোধ করেন, বাকি জিম্মিদের বদলে তাকে জিম্মি হিসাবে নিতে। আগেরবার এই আবেদনে ছিনতাইকারীরা ক্ষিপ্ত হলেও, এবার কিন্তু ভদ্র ও নরম স্বরে উত্তর আসে জুনযো ওকুদাইরার কন্ঠে- “আমরা আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না। মেনে নিলে আমাদের নীতি ও নিয়ম ভঙ্গ করা হবে। আপনার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করব না।”
ক্লান্তি ও হতাশায় মাইক ছেড়ে দিয়ে বসে পড়েন ইশিই। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিনিধি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “স্যার, আর না। আর কিচ্ছু করতে হবে না। আপনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন।”
অবশেষে, ২৯ জন জিম্মি নিয়েই ঢাকা থেকে উড়াল দেয় জাপান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট নম্বর ৪৭২। জাপান সরকার গোপনে আলজেরিয়ার সরকারকে ছিনতাই করা বিমান গ্রহণ করার অনুরোধ করেছিল। অনানুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল আলজেরিয়া। আর এই তথ্য ছিনতাইকারীরা জানতেন যে, তাদের নিরাপদ গন্তব্য কোথায়। ঢাকা থেকে মুক্তিপণ, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া সঙ্গী এবং ২৯ জন জিম্মি নিয়ে আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় জাপানের রেড আর্মি।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলজেরিয়া গিয়ে বাকি জিম্মিদের ছেড়ে দিয়ে গায়েব হয়ে যায় রেড আর্মির সদস্যরা। ছিনতাইকারীদের দলনেতা, ‘২০ নম্বর’ ওসামু মারুওকা ও ‘৩০ নম্বর’ জুন নিশিকাওয়া বাদে তাদের কাউকেই আজ পর্যন্ত ধরা যায়নি এবং কোনো খোঁজও পাওয়া যায়নি।
বিদ্রোহী বিমানসেনাদের শাস্তি দিতে ও ভবিষ্যতে এ ধরণের অভ্যুত্থান নিরুৎসাহিত করতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় অনেক সৈনিক ও অফিসারকে। কেউ ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত হেঁটে যায় মাথা উঁচিয়ে, স্লোগান দিতে দিতে। কেউ যায় চিৎকার করতে করতে, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে প্রাণভিক্ষা চাইতে চাইতে।
এক আন্তর্জাতিক বিমান ছিনতাই যেভাবে ঢাকায় পড়ে রক্তাক্ত বিদ্রোহের ভেতর
যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ঢাকার বিমানবন্দরে নামলো বিদেশি একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। যখন জিম্মি মুক্তি নিয়ে দরকষাকষি চলছে ঠিক সেই মুহূর্তে শুরু হলো এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থান। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সশস্ত্র যোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়লো রানওয়েসহ পুরো বিমানবন্দরে। সংঘর্ষ, ত্রিপাক্ষিক গোলাগুলি, রক্তাক্ত লাশের ছড়াছড়ি। এটি কোনো অ্যাকশন মুভির প্লট নয়। একটি সত্যি ঘটনা।
একদিকে জাপানের সশস্ত্র বিপ্লবী, 'জাপানিজ রেড আর্মি'। অন্যদিকে, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিদ্রোহী সেনারা। দুই দলেরই উদ্দেশ্য ছিল, পুরনো ব্যবস্থার কবর রচনা করা।
কিন্তু ভাগ্য তাদের টেনে আনলো ঢাকার বিমানবন্দরে।
আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে ঢাকায় অবতরণ করে জাপানিজ রেড আর্মি। তাদের হাতে জিম্মি বিভিন্ন দেশের দেড় শতাধিক নাগরিক। বাংলাদেশ ও জাপান সরকারের শ্বাসরুদ্ধ দর কষাকষি চলছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে, শুরু হলো রক্তাক্ত এক অভ্যুত্থান। গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে সশস্ত্র যোদ্ধারা ছড়িয়ে পড়লো রানওয়েসহ পুরো বিমানবন্দরে।
সংঘর্ষ, ত্রিপাক্ষিক গোলাগুলি, রক্তাক্ত লাশের ছড়াছড়ি। নাটকীয় সেই ঘটনার ইতি হয় বহু হত্যা ও মৃত্যুদণ্ডের মাধ্যমে।
এই গল্প কোনো অ্যাকশন মুভির প্লট নয়। এটি জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট-৪৭২ ছিনতাই এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থানের বাস্তব কাহিনী।
আটচল্লিশ বছর আগে ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঠিক কী ঘটেছিল?
ঘটনার শুরু
১৯৭৭ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর। প্যারিস থেকে টোকিওর উদ্দেশ্যে রওনা হয় জাপান এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট- ৪৭২। মুম্বাইয়ে ট্রানজিট। যাত্রাবিরতি শেষে দেড়শ’র বেশি যাত্রী নিয়ে আবার উড়াল দেয় ফ্লাইট। মাত্র বারো মিনিট পার হয়েছে। হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সিটবেল্ট বেঁধে বসার চিহ্ন। একজন কেবিন ক্রু মাইক্রোফোনে যাত্রীদের উদ্দেশ্যে কথা বলা শুরু করেন।
হঠাৎ করেই আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান পাঁচজন জাপানি যুবক। তাদের হাতে অস্ত্র ও গ্রেনেড। চিৎকার করতে করতে তারা এগিয়ে যান ককপিটের দিকে। একজন ককপিটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পিস্তল উঁচিয়ে সোজা তাক করেন যাত্রীদের দিকে।
দলনেতার হাতে শুধুমাত্র পিস্তল। বাকি চারজনের এক হাতে গ্রেনেড ও অন্য হাতে পিস্তল। জোর করে ককপিটের দরজা খুলে ফেলেন তারা। বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন ফ্লাইটের কো-পাইলট ও অ্যাসিস্ট্যান্ট পার্সার। মারধরের শিকার হন তারা।
পাইলট ক্যাপ্টেন তাকাহাশি ফ্লাইটটিকে আবার মুম্বাইয়ের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু ছিনতাইকারীদের অস্ত্রের মুখে ব্যর্থ হন। বিমানটির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ছিনতাইকারীদের হাতে।
এরপর যাত্রীদের উদ্দেশ্যে প্রথমে ইংরেজিতে, তারপর জাপানি ভাষায় ঘোষণা দেন দলনেতা। “এই বিমানটি এখন জাপানিজ রেড আর্মির হিদাকা কমান্ডো ইউনিটের নিয়ন্ত্রণে,” লিখেছেন হাজিমে ইশিই, যিনি সেসময় ছিলেন জাপানের পরিবহন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনা সামাল দিতে জাপান থেকে একটি টাস্কফোর্স এসেছিল ঢাকায়। সেই দলের প্রধান ছিলেন হাজিমে ইশিই। পুরো ঘটনা নিয়ে তিনি লিখেছেন একটি বই ‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ যেখানে নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি, ভিকটিমদের সাক্ষাৎকার ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বয়ান তুলে ধরা হয়েছে।
ছিনতাইকারী পাঁচ যুবক ছিলেন এমন একটি সংগঠনের সদস্য, যেটি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের মধ্যে বিমানবন্দরে হামলা, বিমান ছিনতাই, দূতাবাসে হামলাসহ বিভিন্ন দেশে গোলাগুলি, দাবি আদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জিম্মি এবং গ্রেনেড ও বোমা হামলা করে কুখ্যাতি অর্জন করে।
সংগঠনের নাম জাপানিজ রেড আর্মি। উদ্দেশ্য, সন্ত্রাসের মাধ্যমে জাপানকেন্দ্রিক বৈশ্বিক বিপ্লব তৈরি করা।
গন্তব্য ঢাকা
বিমানের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পরই নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের বসানো হয় দুই সারির মাঝের করিডোরের দিকের আসনে। আর পুরুষদের বিশেষ করে যুবকদের আসন দেয়া হয় জানালার পাশে।
গোলাপি হিজাব পড়া এক মিশরীয় নারীকে আদেশ দেয়া হয়, সবার পাসপোর্ট, বোর্ডিং পাস, টিকেট, ঘড়ি, ডায়েরি ও কলম সংগ্রহ করতে। নারীদের হাতের ব্যাগ ও অন্যান্য জিনিস করিডরে জমা দিতে বলা হয়।
যাত্রীদের কাছ সবকিছু নিয়ে সেগুলো জড়ো করা হয় বিমানের জরুরি বহির্গমনের দরজার সামনে যাতে সহজে দরজা না খোলা যায়।
নারীদের দিয়ে ভারি জিনিস বহন করানোর প্রতিবাদ করেন এক ট্যুর গাইড। এজন্য তাকে কুড়ি বারের বেশি আঘাত করা হয়। নির্দেশ অমান্য করায় আরেক নারী যাত্রী ও এক বিমানকর্মীকেও করা হয় মারধর।
বিমানের একদম পিছন ও ককপিটের দরজায় দাঁড়িয়ে যাত্রীদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখেন দুজন।
রেড আর্মির বৈশ্বিক বিপ্লবের সেবারের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন চলছে সামরিক শাসন। বাংলাদেশ সরকার তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে এমন আশা ছিল ছিনতাইকারীদের। তারা পাইলটদের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে, মানচিত্রে লাল কালি দিয়ে দাগ কেটে ঢাকার পথ দেখিয়ে দেন।
পাইলটরা জানান, ঢাকার বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ কাঠামো ও রানওয়ের অবস্থান নিয়ে তাদের কোনো ধারণা নেই। তখন ছিনতাইকারীরাই পাইলটদের ঢাকা শহরের মানচিত্র দেখিয়ে রানওয়ের দিকনির্দেশনা দিতে থাকেন।
এসব থেকে অনুমান করা যায় যে, এই অভিযানের পেছনে লম্বা সময়ের প্রস্তুতি ছিল রেড আর্মির সদস্যদের, বলা হয়েছে হাজিমে ইশিইয়ের ‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইয়ে।
ঢাকায় অবতরণ, অসহ্য যন্ত্রণা
আটাশে সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টা। কন্ট্রোল টাওয়ারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে, তেজগাঁওয়ের ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে জাপান এয়ারলাইন্সের ছিনতাই হওয়া ফ্লাইট ৪৭২। তবে কিছু সময়ের মধ্যেই ছিনতাইকারীরা বুঝে ফেলে, ভুল জায়গায় নেমেছে তারা। বাংলাদেশ থেকে বিশেষ কোনো সহযোগিতা তারা পাবে না।
ছিনতাই করা বিমান নামার খবর পাওয়ার সাথে সাথেই তেজগাঁও বিমানবন্দর বন্ধ ঘোষণা করে সরকার। সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। রেড আর্মি সদস্যদের সাথে আলোচনা ও দর কষাকষির দায়িত্ব দেওয়া হয় বিমান বাহিনীর প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদকে।
প্রথমেই তিনি খতিয়ে দেখেন, দ্রুত সশস্ত্র হামলা চালিয়ে জিম্মিদের ছাড়িয়ে আনার সম্ভাবনা আছে কিনা। ছিনতাইকারীদের সাথে কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু যখন জানা যায় যে, প্রতিটা দরজার সামনে ব্যাগের স্তূপ দিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে এবং ভেতরে বিস্ফোরক রয়েছে, তখন সেই পরিকল্পনা বাদ দিতে বাধ্য হয় সরকার।
বিমানের ভেতরের যাত্রীদের ভাষ্য উল্লেখ করে হাজিমে ইশিই লিখেছেন, ছিনতাইকারীরা পরিচয় গোপন করার স্বার্থে মুখ কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। তারা একে অপরকে দশ, বিশ, ত্রিশ, চল্লিশ ও পঞ্চাশ নম্বর বলে অভিহিত করছিলেন।
তবে সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করলেও পরে জাপান সরকার ছিনতাইকারীদের পরিচয় বের করতে সক্ষম হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের দলনেতার সাংকেতিক পরিচয় ছিল বিশ নম্বর এবং তিনি মুখ ঢাকেননি। বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদের সাথে কথাবার্তা চালিয়েছিলেন এই ব্যক্তি।
তার কথা বলার ভঙ্গি ছিল নরম, চিকন কণ্ঠস্বর। ধারণা করা হয়, তার নাম ওসামু মারুওকা। তিনি জাপানিজ রেড আর্মির সামরিক শাখার প্রধান। ১৯৭৩ সালে আরেকটি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনায় জড়িত ছিলেন এই ব্যক্তি।
দলের উপনেতার নম্বর ছিল ত্রিশ। তিনি ইংরেজিতে সাবলীল ছিলেন না, তাই কথা পরিষ্কার বোঝা যায়নি। এজি মাহমুদ তার সাথে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেন। তার পরিচয় স্পষ্ট না। তবে ২৭ বছর বয়সী জুন নিশিকাওয়া কিংবা ২৯ বছরের হারুও ওয়াকো - রেড আর্মির এই দুজনের মধ্যে একজন হতে পারেন তিনি।
নিশিকাওয়া ১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসে ফরাসি দূতাবাসে হামলায় জড়িত ছিলেন। আর ওয়াকো ছিলেন রেড আর্মির সামরিক শাখার অন্যতম সদস্য। তিনি সিঙ্গাপুরে শেল কোম্পানির শোধনাগারে এবং কুয়ালালামপুরের যুক্তরাষ্ট্র ও সুইডেনের দূতাবাসে হামলায় জড়িত ছিলেন।
বিমানের কাঠামো নিয়ে ভাল ধারণা ছিল দশ নম্বরের। দরজাগুলোতে বিস্ফোরক বসানোর কাজটি করেন এই ব্যক্তিই। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কোচিংয়ের শিক্ষার্থী কাজুও তোহিরা বলে ধরে নেয়া হয়।
চল্লিশ নম্বরের মূল দায়িত্ব ছিল যাত্রীদের ওপর নজরদারি রাখা। জিম্মিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বাচ্চাদের স্নেহ ও বয়স্কদের যত্ন নিলেও হঠাৎ হিংস্র হয়ে উঠত সে। আদেশ অমান্য করলে শারীরিক শাস্তি পেতে হতো। এই ব্যক্তিকে রেড আর্মির কেন্দ্রীয় কমিটির কুনিও বান্দো বলে মনে করা হয়, যিনি টোকিওতে এক গোলাগুলির ঘটনার নেতৃত্বে ছিলেন।
পঞ্চাশ নম্বর ছিলেন বেশ আলাপী ব্যক্তি। বিমানের পেছনের দিক থেকে জিম্মিদের পাহারা দিচ্ছিলেন। মনে করা হয় উগ্র বামপন্থী সংগঠন ‘হিগাশি আজিয়া হান্নিচি বুশো সেনসেন’-এর ‘নেকড়ে শাখা’-র নোরিও সাসাকি হলেন এই ব্যক্তি। তাকে ১৯৭৫ সালে কুয়ালালামপুরের ঘটনায় জিম্মিদের মুক্তির বদলে কারামুক্ত করতে বাধ্য হয় জাপান সরকার।
বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতা ছাড়াই দাবি আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয় রেড আর্মি। দুপুর ১২টায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে তারা হুঁশিয়ারি দেয় যে, বিমানের ২০০ গজের মধ্যে কেউ এলে গুলি করে হত্যা করা হবে। সেই সাথে বিমানটিকে বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হবে। তারা আরও দাবি জানায় যে, বিমানে এয়ার কন্ডিশনিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং খাবার ও পানি পাঠাতে হবে।
এদিকে জিম্মিদের অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। ঢাকায় তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আর্দ্রতা ৭৫ শতাংশ। বিমানের ভেতর তাপ বাড়তে থাকে, অক্সিজেনের অভাব দেখা দেয়। কয়েকজন যাত্রীর হৃৎস্পন্দন বেড়ে শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অজ্ঞান হয়ে করিডোরে পড়ে যান কয়েকজন।
জিম্মিদের শরীর থেকে স্রোতের মতো ঘাম ঝরতে থাকে। শিশুরা চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। অসহ্য যন্ত্রণায় অসহায় কয়েকজন যাত্রী মিনতি করে বলতে বাধ্য হন, “আমাদের গুলি করে মেরে ফেলুন।”
একজন ক্রু সদস্য বুদ্ধি করে জরুরি অক্সিজেন মাস্ক নামিয়ে দেন। তবে তাতে অক্সিজেন ছিল খুবই অল্প। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী গাড়ি পৌঁছালে কিছুটা স্বস্তি মেলে বলে ‘জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইতে বলা হয়েছে।
মুক্তিপণ দাবি ও জাপানের প্রতিক্রিয়া
উনত্রিশ তারিখ সকালে প্রথমবারের মতো খাবার দেয়া হয় বিমানে। প্রত্যেক যাত্রীর জন্য একটি লাঞ্চ বক্স এবং কাগজের কাপে একটু পানি।
যাত্রীদের ভাষ্যমতে, তাদের খাবারে হাত দেয়নি রেড আর্মির সদস্যরা। বেশিরভাগ পানি যাত্রীদের দিয়ে দেয় তারা। নিজেরা শুধু গলা ভেজায় এবং ব্যাগ থেকে বিস্কুট খায়।
ছিনতাইকারীদের চোখে প্রধান শত্রু ছিল জাপান সরকার। তাদের সাথে কোনোরকম প্রত্যক্ষ আলাপে যেতে একেবারেই রাজি ছিলেন না তারা। সব সংলাপ চলছিল বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এজি মাহমুদের মধ্যস্থতায়।
উনত্রিশ তারিখ রাত পৌনে নয়টায় জাপানের রাষ্ট্রদূত মি. ইশিয়ওকাকে ছিনতাইকারীদের সাথে কথা বলার অনুমতি মেলে, কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো লাভ হয় নাই।
সেই রাতেই ছিনতাইকারীরা জাপান সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দাবি জানায় যে, কারাবন্দী রেড আর্মি নেতা জুনযো ওকুদাইরাসহ ৯ জনের মুক্তি এবং জিম্মিদের ছাড়াতে ছয় মিলিয়ন ডলারের মুক্তিপণ দিতে হবে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, জবাব দেয়ার জন্য জাপান সরকারকে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয় ভোর তিনটা পর্যন্ত। সময় পার হলে যাত্রীদের মধ্যে প্রথম কাকে হত্যা করা হবে, তার নামও ঘোষণা করে তারা। সেই ব্যক্তি হলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গারফিল্ড ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট মি. গ্যাব্রিয়েল, যিনি তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের বন্ধু ছিলেন।
ছিনতাইকারীদের দাবি মানা হবে কিনা তা নিয়ে জাপান সরকারের অন্দরমহলে রীতিমতো কোন্দল লেগে যায়। বিমান ছিনতাই সামাল দিতে গঠিত টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা বিভক্ত হয়ে পড়েন।
প্রশ্ন ওঠে যাত্রীদের জীবনের নিরাপত্তার বদলে জাপান কি সন্ত্রাসীদের দাবির কাছে মাথা নত করবে? নাকি আইনের শাসন বহাল থাকবে?
ছিনতাইকারীরা যে নয়জনের মুক্তি চেয়েছিল তাদের মধ্যে সাতজন সন্ত্রাসী সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। বাকি দুইজন খুনের দায়ে দণ্ডপ্রাপ্ত। এই দুইজনকে ছেড়ে দেওয়া নিয়েই মূলত আপত্তি তুলেছিল জাপানের আইন মন্ত্রণালয়।
এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদকে জাপান সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয় যে, ছিনতাইকারীরা খুনের আসামি দুইজনের নাম যেন তালিকা থেকে বাদ দেয়।
জবাবে এজি মাহমুদ বলেন, “জঙ্গিরা আপনাদের আবেদন মেনে নেবে বলে আমার মনে হয় না।” তিনি জাপান সরকারকে পালটা অনুরোধ করেন যে, মুক্তি চাওয়া নয় জনকেই যেন জাপান সরকার ঢাকাতে পাঠায়।
“তারপর আমি সন্ত্রাসীদের বোঝানোর চেষ্টা করব যাতে দুজন খুনিকে তালিকা থেকে বাদ দেয়। জঙ্গিরা এই প্রস্তাবে রাজি হলে তখন সেই দুইজনকে জাপানে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে,” তখনকার বিমান বাহিনীর প্রধানকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন হাজিমে।
অবশেষে মুক্তিপণ দেওয়া এবং নয়জনকে ছেড়ে দিতে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজি হয় জাপান সরকার। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে সাথে সাথেই পদত্যাগ করেন আইনমন্ত্রী ও আইন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী।
জাপানের কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, নয়জনের মধ্যে তিনজন বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে। এর স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেব ছিনতাইকারীদের দেখানোর জন্য তাদের নিজের হাতে লেখা বক্তব্য এবং অডিও রেকর্ডিং প্রস্তুত করা হয়।
জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশে আসতে রাজি হন যে ছয়জন
আটাশ বছর বয়সী জুনযো ওকুদাইরা জাপানিজ রেড আর্মির শীর্ষ নেতা, যার মুক্তিই ছিল বিমান ছিনতাইয়ের আসল উদ্দেশ্য। তার বড় ভাইও ছিলেন রেড আর্মির সদস্য যিনি ইসরায়েলের বিমানবন্দরে হামলা চালানোর সময় বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। জুনযো ১৯৭৫ সালে মালয়েশিয়ায় মার্কিন দূতাবাসে হামলায় অংশ নেন এবং ১৯৭৬ সালে সিরিয়া থেকে অবৈধভাবে জর্ডানে প্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পরেন।
উনত্রিশ বছর বয়সী সুতোমু শিরোসাকি রেড আর্মির কেন্দ্রীয় কমিটির ‘সংগ্রাম দল’-এর অধিনায়ক। ১৯৭১ সালে অর্থ সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ডাকঘর ও ব্যাংকে আক্রমণে অংশ নেন। গ্রেপ্তারের পর ১০ বছরের কারাদণ্ড হয় তার।
একত্রিশ বছর বয়সী আকিয়া নিহিরা ১৯৭৫ সালে বাকবিতণ্ডার পর এক শ্রমিককে কুপিয়ে হত্যা করার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। রেড আর্মির সাথে সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে কারাগারে ওকুদাইরার সাথে ঘনিষ্ঠতা হয়।
আটাশ বছর বয়সী আয়াকো দাইদোজি ‘হিগাশি আজিয়া হান্নিচি বুশো সেনসেন’-এর “নেকড়ে” শাখার সদস্য এবং সংগঠনটির নেতা শোজি দাইদোজির স্ত্রী। মিতসুবিশি হেভি ইন্ডাস্ট্রিজের সদরদপ্তর ও তেইজিন কোম্পানির গবেষণাগারে বোমা হামলার সন্দেহে গ্রেপ্তার হন।
ছাব্বিশ বছর বয়সী ইউকিকো একিদা ‘দাইচি নো কিবা’ (মাটির থাবা)-র নারী সদস্য। বিভিন্ন শোধনাগার, শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ক্রমাগত বোমা হামলা চালানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার হন।
চল্লিশ বছর বয়সী হিরোশি সেনসুই টোকিওর এক ঘরে প্রবেশ করে এক গৃহবধূকে কুপিয়ে হত্যা করে টাকা চুরি করার অভিযোগে কারাবদ্ধ হয়। সেখানে কারাবন্দীদের নিয়ে একটি ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করেন এবং বিভিন্ন জেআরএ সদস্যের সাথে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন।
পয়লা অক্টোবর স্থানীয় সময় ভোরবেলা টোকিও থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে উড়াল দেয় জাপান এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ ফ্লাইট। সেই বিমানে ছিলেন মুক্তি পাওয়া ৬ জন, ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরিবহন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হাজিমে ইশিই’র নেতৃত্বে জাপানের একটি প্রতিনিধি দলের সদস্যরা।
বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা ২০ মিনিট। বিমানের জানালার পর্দা সরিয়ে জিম্মিদের বাইরে তাকাতে বলেন ছিনতাইকারীরা। তাকিয়েই তারা পুলকিত হয়ে ওঠেন। দেখতে পান, রানওয়েতে অবতরণ করছে জাপান থেকে আসা বিশেষ বিমান। জিম্মিদশা থেকে মুক্তির প্রহর এসে গেছে এটা ধরে নিয়ে বিমানের ভেতর আনন্দধ্বনি শোনা যায়, লিখেছেন হাজিমে ইশিই।
জাপান প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বিমান বাহিনী প্রধানের দ্বন্দ্ব
জাপানের বিশেষ বিমান অবতরণের পর পর্দা দিয়ে ঢেকে ফেলা হয়। চারিদিকে বসানো হয় ট্যাঙ্ক ও কামান। মোতায়েন করা হয় শতাধিক সৈন্য।
মিনিট পনের পর বিমানের সামনে একটি গাড়ি এসে থামে। দলনেতা হাজিমে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলের সাতজনকে নিয়ে যাওয়া হয় কন্ট্রোল টাওয়ারে। বাকিরা অপেক্ষায় থাকেন বিশেষ বিমানে।
কন্ট্রোল টাওয়ারে আগে থেকেই ছিলেন এজি মাহমুদসহ বাংলাদেশের অন্য প্রতিনিধিরা। হাজিমের নেতৃত্বে জাপানের প্রতিনিধিরা সেখানে যাওয়ার নতুন ঝামেলার উদ্ভব হয়। সমস্যা সমাধানে জাপান ও বাংলাদেশ সরকারের নীতির মধ্যে মৌলিক পার্থক্য ফুটে ওঠে।
টোকিও থেকে টাস্কফোর্স সদস্যদের আদেশ দেওয়া ছিল, ঢাকাতেই সব জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত করে তারপরই দেশে ফিরতে হবে।
তবে ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্য ছিল ভিন্ন। মুক্তিপণ নিয়ে ঢাকা থেকে উড়াল দেবে তারা। সঙ্গে নিয়ে যাবে কিছু জিম্মিকে, মানে শর্ত মানার পরও সবাই মুক্ত হবেন না।
রেড আর্মির সন্ত্রাসীদের এই পরিকল্পনার মূলে ছিল তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি। যাতে কোনো দেশ তাদের বহনকারী বিমানটি ভূপাতিত বা মাঝ আকাশে উড়িয়ে না দেয়। তাই নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছানোর পরই সব জিম্মিকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করেছিল তারা।
তবে জাপান সরকারের কাছে এ ধরণের প্রস্তাব ছিল সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। কেননা, ঢাকা থেকে উড়াল দেয়ার পর বাকি জিম্মিদের ভাগ্যে কী ঘটবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এছাড়া, সব জিম্মির মুক্তি নিশ্চিত না করেই মুক্তিপণের পুরোটা ও কয়েদিদের হস্তান্তর করলে, সন্ত্রাসীদের সাথে দর কষাকষির জন্য জাপানের প্রতিনিধিদের কাছে আর কোনো ‘অস্ত্র’ থাকবেও না।
কিন্তু এজি মাহমুদ বিমান ছিনতাইয়ের মতো উটকো ঝামেলার দ্রুত সমাধান করতে চাচ্ছিলেন। কারণ তার দিকে তখন ধেয়ে আসছিল বড় বিপদ।
এজি মাহমুদের উদ্দেশ্য ছিল, কোনোরকম রক্তপাত ছাড়াই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, ছিনতাই করা বিমানটিকে ঢাকা থেকে বিদায় করা। তাই ঢাকায় ৫৯ জন জিম্মিকে মুক্ত করে, বাকীদের নিয়ে ছিনতাইকারীদের চলে যাওয়ার প্রস্তাবে ইতিবাচক সায় দেন তিনি।
কিন্তু তার এই সমঝোতায় সম্মত হননি জাপানের প্রতিনিধিরা। আর এ নিয়ে জাপান ও বাংলাদেশ দুই পক্ষের দরকষাকষি রূপ নেয় বাকবিতণ্ডায়।
জাপান সরকারের সদস্যরা আসার আগ পর্যন্ত ছিনতাইকারীদের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন বিমান বাহিনীর প্রধান। তাই নতুন করে, নতুন শর্ত নিয়ে আর কোনো আলোচনা শুরু করতেই চাচ্ছিলেন না তিনি।
কিন্তু জিম্মি মুক্তির বিষয়ে জাপানি প্রতিনিধিরা ছিলেন নাছোড়বান্দা। এক পর্যায়ে এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদকে বিকল্প প্রস্তাব দেন হাজিমে ইশিই। তিনি বলেন, বিমানের সব যাত্রীকে ছেড়ে দিয়ে প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নিয়ে যেন ছিনতাইকারীরা ঢাকা ছাড়ে।
ঢাকায় গিয়ে জিম্মিদের মুক্ত করতে কী কী সমস্যার মুখে পড়তে হবে, তা আগেই কিছুটা অনুমান করেছিলেন প্রতিনিধি দলের সদস্যরা। কিছু প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন তারা। প্রয়োজনে নিজেদের জিম্মি হতে হবে সেই মানসিক প্রস্তুতিও ছিল তাদের।
এদিকে জাপান থেকে বিশেষ বিমান আসার পরও মুক্তিপণ ও কয়েদিদের দিতে বিলম্ব হওয়া এবং এজি মাহমুদের কথার সুরের পরিবর্তন লক্ষ্য করেন রেড আর্মি সদস্যরা। তাদের ধারণা হয়, জাপানের প্রতিনিধিরা এজি মাহমুদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছেন।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, রাগান্বিত স্বরে ছিনতাইকারীরা বার্তা দেন, “জাপান সরকারের কথায় তারা কান দেবেন না। জাপান সরকার কেবল নিজের স্বার্থের কথা ভাবে এবং বাংলাদেশের স্বার্থের ভাবনা আদৌ তাদের মাথায় নেই।”
পয়লা অক্টোবর বেলা দুইটা। হাজিমে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নেয়ার জন্য ছিনতাইকারীদের প্রস্তাব দেন এজি মাহমুদ। কিন্তু এই প্রস্তাব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেন রেড আর্মির সদস্যরা। তারা ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের আকাশে লিবিয়ান আরব এয়ারলাইন্সের ছিনতাই করা বিমান ভূপাতিত হওয়ার নজির দেখায়।
আরও মনে করিয়ে দেয় যে, সেই বিমানের যাত্রীদের সবাই ছিল আরব। তাই প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশ ও জাতির অনেক বেশি জিম্মি প্রয়োজন, যা তাদের আছে বলে জানায় রেড আর্মির সদস্যরা।
বিকেল পাঁচটা ১৫ মিনিট। ছিনতাইকারীরা ঘোষণা করে যে, পাঁচ মিনিট পর গ্যাব্রিয়েল তার শেষ উইল পড়ে শোনানোর সুযোগ পাবেন। কারণ, ২৫ মিনিট পর তার ‘মৃত্যুদণ্ড’ বাস্তবায়িত হবে। এই গ্যাব্রিয়েলই ছিলেন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বন্ধু।
হুমকির পরও নিজের প্রস্তাবে অনড় থাকেন হাজিমে ইশিই। রেড আর্মির হম্বিতম্বি তাকে বিন্দুমাত্রও টলাতে পারেনি। অবশেষে সাড়ে পাঁচটায় ইশিইকে সরাসরি ছিনতাইকারীদের সাথে কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হয়।
জঙ্গিদের তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সব সমালোচনা উপেক্ষা করেও তাদের দাবি মেনে নিতেই ঢাকায় এসেছে জাপান সরকারের প্রতিনিধিদল। তিনি অনুরোধ করেন, তাকেসহ প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জিম্মি হিসেবে নিয়ে যাত্রীদের যেন ছেড়ে দেওয়া হয়।
উত্তর আসে, “শাট আপ! চুপ করো!”
হাজিমে ইশিই তার বইয়ে লিখেছেন, “এরপর এজি মাহমুদ ছিনতাইকারীদের সাথে আবার কথা বলার চেষ্টা করেন। এবার তারা জানায়, জাপান থেকে বিশেষ বিমান আসার পর ছয় ঘণ্টা অতিবাহিত হয়ে গেছে। তাই এখন তারা ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং সব জিম্মিকে মেরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।”
দুই বিমানে সংঘর্ষের চেষ্টা
হঠাৎ করেই নিশ্চুপ হয়ে যায় ছিনতাইকারীরা, তাদের আর কোনো কথাই শোনা যায়নি। হঠাৎ কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দেখা যায়, ছিনতাই করা বিমানটি ধীরে ধীরে এগোতে শুরু করেছে। যাচ্ছে জাপান থেকে আসা বিমানের দিকে। টাওয়ার থেকে ছিনতাইকারীদের কাছে আরও একটু সময় চাওয়া হয়।
কিন্তু কাজ হয় না। আসে না কোনো উত্তর। এগোতে থাকে বিমান। হয়ত তারা জাপানের দুটি বিমানের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটাতে চাচ্ছিলেন।
কন্ট্রোল রুম থেকে হঠাৎ কয়েকটি বাটনে চাপ দিলেন বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদ। মুহূর্তের মধ্যেই দমকলের গাড়ি, সামরিক ট্রাক, জিপ, মিনিবাস এবং সাঁজোয়া যান এসে জড়ো হয় ছিনতাই করা বিমানের সামনে। অবরোধ সৃষ্টি করা হয় পথে।
আর এতেই প্রচণ্ড ক্ষেপে ওঠেন ছিনতাইকারীরা। বিমান থামিয়ে ককপিটের জানালা দিয়ে চার রাউন্ড গুলি ছোঁড়ে এক সন্ত্রাসী। আহত হন বাংলাদেশের দুই সৈনিক। তবে বিমানটিকে আটকানো সম্ভব হয়।
সন্ধ্যা ছয়টা ১২ মিনিট। সন্ত্রাসীরা ঘোষণা করে, সব দাবি মেটানোর প্রস্তুতির প্রমাণ দিতে হবে। না হলে বোমা মেরে উড়িয়ে দেওয়া হবে বিমান।
হাজিমে ইশিইকে শেষবারের মতো সিদ্ধান্ত জানাতে অনুরোধ করেন এজি মাহমুদ। এই বার্তা দিয়েই আলোচনা থেকে উঠে যান এজি মাহমুদ। তাৎক্ষণিকভাবে কন্ট্রোল রুম ত্যাগ করেন।
কিন্তু তখনও বাংলাদেশ সরকারের অন্য প্রতিনিধিদের কাছে অনুরোধ অব্যাহত রাখেন ইশিই। তিনি লিখেছেন, “জিয়াউর রহমান বাদে বাংলাদেশ সরকারের সব শীর্ষ নেতা কন্ট্রোল টাওয়ারে হাজির হন।”
অবশেষে সবার চাপে টোকিওর নির্দেশনার বাইরে গিয়ে ইশিই নিজে থেকেই প্রস্তাব মেনে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এজি মাহমুদকে আবারো অনুরোধ করেন, প্রথম ধাপে ৫৯ জন জিম্মির বদলে মুক্তিপণ ও ছয় কয়েদিকে হস্তান্তর করলেও, বাকি জিম্মিদেরও পরে যেন ছেড়ে দেয় এবং এর বদলে প্রতিনিধিদলের সদস্যদের জিম্মি নেওয়া হয়।
এদিকে বাইরে যখন দরকষাকষি চলছে, তখন বিমানের ভেতরে জিম্মিদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হতে থাকে। হত্যার হুমকি পাওয়া গ্যাব্রিয়েল অসুস্থ হয়ে পড়েন। অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
জিম্মি মুক্তির প্রথম ধাপ
অবশেষে জিম্মিদের বিনিময়ে মুক্তিপণ ও কয়েদিদের হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, বিশেষ বিমানের সিঁড়ি পর্যন্ত জাপানের সার্বভৌমত্ব এবং সেখান থেকে ছিনতাই করা বিমান পর্যন্ত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব।
প্রথমেই কয়েদি হস্তান্তরের পালা। জাপান ও বাংলাদেশ থেকে একজন করে প্রতিনিধি অংশ নেন এতে। বিমানের ভেতর বিশ নম্বর ককপিট থেকে এবং ত্রিশ নম্বর সামনের দরজার পাশে হাঁটু গেঁড়ে সশস্ত্র অবস্থান নেন। বাকি ছিনতাইকারীরা থাকেন বিমানের ভেতর, এক হাতে পিস্তল ও আরেক হাতে গ্রেনেড নিয়ে।
বিমান ছিনতাই হওয়ার ৮৫ ঘণ্টা পর পয়লা অক্টোবর রাত ১০টা সাত মিনিটে প্রথম দশজন জিম্মি মুক্তি পান।
জাপানিজ রেড আর্মির শীর্ষ নেতা জুনযো ওকুদাইরাকে হস্তান্তরের তালিকায় রাখা হয়েছিল সবার শেষে। হস্তান্তর চলার সময় হাজিমে ও এজি মাহমুদ তার সাথে আলাদা করে কথা বলেন। তারা অনুরোধ করেন, জুনযো যেন সহযোদ্ধাদের রাজি করায় যে, বাকি জিম্মিদের বদলে ইশিইসহ প্রতিনিধি দলকে জিম্মি হিসেবে নিতে।
তবে রেড আর্মির নেতার কাছ থেকে কোনোরকম ইতিবাচক উত্তর পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত ৬১ জনকে ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। নয় জন ক্রুসহ বাকি যাত্রীরা তখনও জিম্মি।
বিমান বাহিনীর অভ্যুত্থান
বিমান ছিনতাই হওয়ার তিনদিন আগে পঁচিশে সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান মিশর সফরে যান। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির পক্ষে আরব লীগের সমর্থন আদায়ের চেষ্টার অংশ ছিল সেই সফর।
সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে লিখেছেন, তখনকার মিশরীয় রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাত জিয়াউর রহমানকে জানান, বাংলাদেশে একটি সামরিক অভ্যুত্থানের আভাস পেয়েছে মিশরীয় গোয়েন্দারা। এই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেবেন অফিসার ও সিপাহীদের মধ্যে 'বৈষম্যে অতিষ্ঠ' বিমান বাহিনীর কিছু সৈন্য ও নন-কমিশনড অফিসার। তাদের উদ্দেশ্য, সামরিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন মার্ক্সবাদী সরকার গঠন করা।
মাসকারেনহাস লিখেছেন, দোসরা অক্টোবর বিমান বাহিনী দিবসের অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে। কিন্তু অভ্যুত্থানের আগাম খবর পেয়ে তিনি বিমানবাহিনী প্রধানকে লিখিতভাবে জানিয়ে দেন যে, তিনি উপস্থিত থাকতে পারবেন না।
এদিকে রাতে প্রথম দফার জিম্মি হস্তান্তর শেষে একটু জিরোচ্ছিলেন সবাই। বিমানের ভেতর ছিনতাইকারী ও বাকি জিম্মিরা। বিশেষ বিমানে জাপানের প্রতিনিধি দলের একটি অংশ, বাকিরা কন্ট্রোল টাওয়ারে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, ভোর পাঁচটার দিকে হঠাৎ গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের বিকট শব্দ এবং তা এতটাই তীব্র যে, মনে হচ্ছিল যেন পুরো বিমানবন্দর ফেটে পড়ছে।
বিমানবাহিনীর অভ্যুত্থান শুরু হয় ক্যান্টনমেন্টে। পরে তা বাইরে ছড়িয়ে পড়ে। বিমানবন্দরে থাকা অফিসারদের হত্যা করতে অভ্যুত্থানকারীরা ঢুকে পড়ে টার্মিনাল ভবনে।
গোলাগুলির শব্দ আসার কিছুক্ষণ আগেও কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার ও বিমানবাহিনী প্রধান এজি মাহমুদ। কিন্তু অভ্যুত্থানকারীরা বিমানবন্দেরে ঢোকার আগেই কন্ট্রোল টাওয়ার ত্যাগ করেছিলেন তারা।
অবস্থা তখন প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে গোলাগুলির মাঝে গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরী জাপানের সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। এজি মাহমুদ চলে যাওয়ার আগে আনসার চৌধুরীকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন।
ছিনতাইকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “সামান্য সমস্যা হয়েছে। আপনাদের বিমানে তার কোনো প্রভাব পড়বে না। তবে আপনাদের বিমানের ৩০০ মিটারের মধ্যে নিয়মিত-বাহিনী বহির্ভূত কোনো সৈন্য ঢুকে পড়লে, তাদের গুলি করে হত্যা করার অনুমতি দেয়া হলো। আপনারা আত্মরক্ষা করতে পারেন।”
ইশিইকেও অভয় দেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার। জানান, তাদের কোনো ক্ষতি হবে না।
কিন্তু নিজের কী হবে তা যেন কল্পনাও করতে পারেননি এই অফিসার। কিছুক্ষণের মধ্যে বিমানবন্দর থেকে বাইরে যাওয়ার সময় অভ্যুত্থানকারীদের গুলিতে প্রাণ হারান গ্রুপ ক্যাপ্টেন আনসার চৌধুরী।
জাপানের প্রতিনিধিদের মধ্যে ইশিইসহ সাতজন আলোচনার জন্য কন্ট্রোল টাওয়ারে ছিলেন। বাকিরা ছিলেন জাপান থেকে আসা বিশেষ বিমানে। অভ্যুত্থানে প্রাণহানির তীব্রতা দেখে বিশেষ বিমান থেকে বের হয়ে তারা আশ্রয় নেন টার্মিনাল ভবনে। সেখানেও ঢুকে পড়েন বিদ্রোহীরা। জাপানিজ ছাড়া কাউকে না দেখে পাশের ঘরে চলে যায়।
যেখান থেকে ক্রমাগত গুলির শব্দ ও মানুষের আর্তনাদের শব্দ শোনা যায় বলে হাজিমে ইশিই লিখেছেন।
কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে দেখা যায়, রানওয়ের ওপর পড়ে রয়েছে কয়েকটি রক্তাক্ত মরদেহ। বিমানবাহিনীর অফিসাররা প্রাণ বাঁচাতে কাঁধ থেকে ব্যাজ খুলে ফেলে লুকাচ্ছিলেন।
ইশিই লিখেছেন, বিমানবাহিনীর এক অফিসার জাপান থেকে আসা একজন প্রতিনিধির জ্যাকেট পরে ছদ্মবেশে পালানোর চেষ্টা করেন। পরে কন্ট্রোল টাওয়ারের নিচের তলায় পাওয়া যায় সেই জ্যাকেটে মোড়ানো তার নিথর দেহ।
গোলাগুলির শব্দ কন্ট্রোল টাওয়ারের কাছে আসতে থাকে। অভ্যূত্থানকারীরা সেখানেও ঢুকে পড়লে ইশিই ও তার দলের বাকিরা হাত উঁচিয়ে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিমায় দাঁড়ান। অন্য কাউকে সেখানে না দেখে অভ্যূত্থানকারীরা চলে যায়। পরে নিচে নামতে গিয়ে ইশিই দেখেন, দরজাগুলোর নিচ থেকে গড়িয়ে গড়িয়ে বের হচ্ছে রক্ত।
অ্যান্থনি মাসকারেনহাস লিখেছেন, "ভোর পাঁচটায় বেতার থেকে একটি বার্তা প্রচারিত হয়েছিল, অভ্যুত্থান সফল হয়েছে। অভ্যুত্থানের অধিনায়ক কিছুক্ষণের মধ্যে জাতির উদ্দেশ্যে বার্তা দেবেন। এই বার্তা দিয়েছিলেন অভ্যুত্থানের অধিনায়ক বিমানবাহিনীর সার্জেন্ট আফসার আলী খান।"
তিনি লিখেছেন, সার্জেন্ট আফসার আলী খানের সেদিনের বেতারের বার্তা ছিল 'বাস্তবতা থেকে যোজন যোজন দূরে'। অভ্যুত্থান সফল হয়েছে, তিনি এমন দাবি প্রচার করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো অভ্যুত্থানকারীদের দমন করতে মেজর জেনারেল মীর শওকত আলির নেতৃত্বে নবম পদাতিক ডিভিশন ও পুলিশের সম্মিলিত বাহিনী অগ্রসর হচ্ছিল।
সার্জেন্ট আফসার আলী খান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে আটকা ছিলেন। ১৯৭২ সালে সেখান থেকে পালিয়ে আফগানিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে ফিরে বিমান বাহিনীতে যোগ দেন। তাকে সার্জেন্টদের মেস পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়। সেখান থেকেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।
এদিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বিদ্রোহীদের দমন করে সেনা সদস্যরা সকাল ৮টা ১০ মিনিটে বিমানবন্দরে ঢুকে পালটা হামলা চালায়। এতে দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ।
বিমানবন্দরজুড়ে শুধু গুলির শব্দ। চাকাওয়ালা মেশিনগান ও অন্যান্য ভারী অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দরে ঢুকে পড়ে নিয়মিত বাহিনী। তাদের আক্রমণের মুখে কোণঠাসা হতে থাকে অভ্যুত্থানকারীরা।
বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বারে অবস্থান নেয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। আত্মসমর্পণকারী বিদ্রোহীদের নিরস্ত্র করে গ্রেফতার শুরু হয়। তবে সব আত্মসমর্পণকারীদের এই ভাগ্য হয়নি।
হাজিমে লিখেছেন, জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মি. উয়েদা আশ্রয় নিয়েছিলেন টার্মিনাল বিল্ডিংয়ে। সেখানকার জানালা দিয়ে তিনি দেখেন, ভবনটির দেয়ালে দলে দলে বিদ্রোহীদের দাঁড় করিয়ে তাদের লক্ষ্য করে গুলি করছিল নিয়মিত বাহিনীর সেনারা।
তিনি পরে বলেন, “আসা-যাওয়ার মধ্যে কয়েকটি মৃতদেহ দেখতে হয়েছিল। সবার মুখে সুন্দর গোঁফ, বাঙালিসুলভ সুদর্শন চেহারা। এই সামরিক অফিসারদের কেন এখানে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল তা নিয়ে ভাবার মতো মানসিক অবস্থা তখন আমার ছিল না।”
এদিকে নবম ইনফ্যান্ট্রি ডিভিশনের সাথে বিদ্রোহীদের বন্দুকযুদ্ধে লক্ষ্যচ্যুত গুলি বারবার গিয়ে লাগছিল কন্ট্রোল টাওয়ারের দেয়ালে। আত্মরক্ষার্থে জাপানি প্রতিনিধিরা মাথা নিচু করে বসে ছিলেন টাওয়ারের বারান্দায়। ভেতর থেকে শুনতে পান, ছিনতাইকারীরা বারবার কথা বলার চেষ্টা করছে। হন্যে হয়ে খুঁজছে দরকষাকষির দায়িত্বে থাকা এজি মাহমুদকে।
হাজিমে ইশিই লিখেছেন, অভ্যুত্থানে নিহত হন দুই জন গ্রুপ ক্যাপ্টেন, একজন উইং কমান্ডারসহ ১১জন বিমান বাহিনীর অফিসার। সামরিক বাহিনীর পালটা অভিযানে নিহত হয় বেশিরভাগ বিদ্রোহী।
সকালের মধ্যেই বিদ্রোহ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে করে ফেলে সরকার। সফলভাবে বিদ্রোহ দমনের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বার্তা আসে মিশর থেকে।
বিদ্রোহ দমন শেষে বিমানবন্দরের মূল ভবনে প্রবেশ করে সেনাবাহিনী। সেখানে ছাদের চার কোনায় চারটি মেশিনগান বসানো হয়, সাথে বসানো হয় ১৫ জনের টহল দল। কন্ট্রোল টাওয়ারের চারপাশে সেনা মোতায়েন করা হয়। ঢাকা শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে মোতায়েন করা হয় সৈন্যদের।
বিমানের জানালা দিয়ে উঁকি মেরে রেড আর্মির ছিনতাইকারীরা দেখতে পায়, রানওয়েজুড়ে ট্যাংক, কামান ও সাঁজোয়া যান। এদিকে সকাল গড়িয়ে দুপুর হতেই বিমানের ভেতর গরম বাড়তে থাকে। অসুস্থ হয়ে পড়তে থাকে জিম্মিরা, কয়েকজন করিডোরে বমি করে দেয়।
একজন যাত্রী ছিনতাইকারীদের কাছে আর্জি করে, “আমরা তো আপনাদের কোনো ক্ষতি করিনি। আপনারা আমাদের সাথে এমন করছেন কেন?”
সুর নরম ছিনতাইকারীদের
‘ঢাকায় জাপানি বিমান ছিনতাই ১৯৭৭: জাপানি মন্ত্রীর স্মৃতিকথা’ বইয়ে লেখা হয়েছে, কিছুক্ষণ আগে ঘটে যাওয়া যুদ্ধ দেখে হয়তো তাদের মন একটু নরম হয়েছিল। এবার বিমানের দরজা খুলে দেওয়া হয়। কিছুক্ষণ পরই নামে প্রশান্তির বৃষ্টি। তাপমাত্রা কিছুটা কমে আসে।
ছিনতাইকারী ও বিমানের ক্রুরা মিলে বড় বড় পাত্রে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করতে থাকে। জিম্মিরা পালা করে কাগজের গ্লাস জানালা দিয়ে বের করে বৃষ্টির পানি খায়। দরজার বাইরে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতেও দেয়া হয় তাদের।
এদিকে দৃশ্যপট থেকে পুরোপুরি উধাও হয়ে যান এয়ার ভাইস মার্শাল এজি মাহমুদ। তিনি কোথায়, কেমন আছেন, কোনো খোঁজ মিলছে না। তার অনুপস্থিতিতে রেড আর্মির ছিনতাইকারীদের সাথে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ এক কর্মকর্তাকে।
বিমানবাহিনীর সদস্যদের বিদ্রোহ এবং তা কঠোরভাবে দমন, এই ঘটনা নিজেদের চোখে দেখে জাপানের সন্ত্রাসীদের সুর নরম হয়ে যায়, কণ্ঠে তখন বিনয়। মুক্তিপণ ও বন্দি হস্তান্তর প্রক্রিয়া গতি পায়।
জাপান সরকারের অনুরোধে বিমানের ক্রুদের ছেড়ে দেয় ছিনতাইকারীরা। পরের গন্তব্যে যাওয়ার জন্য নতুন ক্রু নিতে রাজি হইয় তারা। তাছাড়া আরও ৪২ জন জিম্মিকে ছেড়ে দিতেও সম্মত হয়।
হাজিমে লিখেছেন, মুক্তি পাওয়ার পরও দুইজন ক্রু যাত্রীদের ছেড়ে যেতে রাজি হননি। তারা বলেন, “বিমানে যতক্ষণ যাত্রী আছে, তাদের সেবা করা ক্রুদের দায়িত্ব।” তবে ক্যাপ্টেন তাকাহাশির অনুরোধে তারা বিমান ছাড়েন।
বিদ্রোহের জেরে সেদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সান্ধ্য আইন জারি করেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। সরকারের জরুরি বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, যেকোনোভাবেই হোক না কেন, ছিনতাই করে আনা বিমানকে দ্রুত ঢাকা ছাড়তে হবে।
আর এই সিদ্ধান্ত সরাসরি কন্ট্রোল টাওয়ারে ফোন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাকে জানিয়ে দেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি নিজে।
এই আদেশ আসার পরও হাজিমে ইশিই প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন সব জিম্মিকে মুক্ত করার। বাংলাদেশ সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা অব্যাহত রাখেন তিনি। এক পর্যায়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার সাথে বাকবিতণ্ডা জড়িয়ে পড়েন হাজিমে।
তিনি আবারও সন্ত্রাসীদের অনুরোধ করেন, বাকি জিম্মিদের বদলে তাকে জিম্মি হিসাবে নিতে। আগেরবার এই আবেদনে ছিনতাইকারীরা ক্ষিপ্ত হলেও, এবার কিন্তু ভদ্র ও নরম স্বরে উত্তর আসে জুনযো ওকুদাইরার কন্ঠে- “আমরা আপনার অনুরোধ রাখতে পারছি না। মেনে নিলে আমাদের নীতি ও নিয়ম ভঙ্গ করা হবে। আপনার প্রস্তাব আমরা গ্রহণ করব না।”
ক্লান্তি ও হতাশায় মাইক ছেড়ে দিয়ে বসে পড়েন ইশিই। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিনিধি তাকে জড়িয়ে ধরে বলেন, “স্যার, আর না। আর কিচ্ছু করতে হবে না। আপনি যথেষ্ট চেষ্টা করেছেন।”
অবশেষে, ২৯ জন জিম্মি নিয়েই ঢাকা থেকে উড়াল দেয় জাপান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট নম্বর ৪৭২। জাপান সরকার গোপনে আলজেরিয়ার সরকারকে ছিনতাই করা বিমান গ্রহণ করার অনুরোধ করেছিল। অনানুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছিল আলজেরিয়া। আর এই তথ্য ছিনতাইকারীরা জানতেন যে, তাদের নিরাপদ গন্তব্য কোথায়। ঢাকা থেকে মুক্তিপণ, জেল থেকে ছাড়া পাওয়া সঙ্গী এবং ২৯ জন জিম্মি নিয়ে আলজেরিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয় জাপানের রেড আর্মি।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলজেরিয়া গিয়ে বাকি জিম্মিদের ছেড়ে দিয়ে গায়েব হয়ে যায় রেড আর্মির সদস্যরা। ছিনতাইকারীদের দলনেতা, ‘২০ নম্বর’ ওসামু মারুওকা ও ‘৩০ নম্বর’ জুন নিশিকাওয়া বাদে তাদের কাউকেই আজ পর্যন্ত ধরা যায়নি এবং কোনো খোঁজও পাওয়া যায়নি।
বিদ্রোহী বিমানসেনাদের শাস্তি দিতে ও ভবিষ্যতে এ ধরণের অভ্যুত্থান নিরুৎসাহিত করতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয় অনেক সৈনিক ও অফিসারকে। কেউ ফাঁসির মঞ্চ পর্যন্ত হেঁটে যায় মাথা উঁচিয়ে, স্লোগান দিতে দিতে। কেউ যায় চিৎকার করতে করতে, নিজেকে নির্দোষ দাবি করে প্রাণভিক্ষা চাইতে চাইতে।
বিষয়: