ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রান, কোহলির মতো কাউকে কি আর দেখা যাবে

ওয়ানডেতে কোহলির ব্যাটিংয়ের পুরোনো ধরন ছিল ঝুঁকি কমিয়ে উইকেটে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় থাকা। ইনিংস বড় করার জন্য তিনি শুরুতে সময় নিতেন এবং পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী গতি বাড়াতেন।

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০১:০০ পিএম

৩৭ বছর বয়সে এসে বিরাট কোহলি নিজের ক্যারিয়ারে যেন নতুন এক সংস্করণ খুঁজে পেয়েছেন। দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে ভারতের এই ব্যাটার এবার ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন।

রোববার তিরুবনন্তপুরমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮৮ বলে অপরাজিত ১৩৯ রানের ইনিংস খেলার পথে এই মাইলফলক স্পর্শ করেন কোহলি। ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রান করা দ্বিতীয় ব্যাটার তিনি। তার আগে এই কীর্তি ছিলো শুধু শচীন টেন্ডুলকারের।

তবে মাইলফলকে পৌঁছানোর গতিতে কোহলি টেন্ডুলকারকেও পেছনে ফেলেছেন। ৩০৩ ইনিংসে ১৫ হাজার রান পূর্ণ করেছেন তিনি, যেখানে টেন্ডুলকারের লেগেছিলো ৩৭৭ ইনিংস। বলের হিসাবেও কোহলি দ্রুততম, ১৫ হাজারে পৌঁছাতে তার লেগেছে ১৫ হাজার ৯৫০ বল, টেন্ডুলকারের ১৭ হাজার ৫২৮।

তবে অভিষেকের পর সময়ের হিসাবে টেন্ডুলকারই দ্রুত ছিলোেন। তিনি কোহলির চেয়ে ২১২ দিন আগে ওয়ানডেতে ১৫ হাজার রানে পৌঁছেছিলেন।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেঞ্চুরিটি ছিলো কোহলির ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৫তম এবং লিস্ট এ ক্রিকেটে ৬০তম। লিস্ট এ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির রেকর্ডে তিনি এখন টেন্ডুলকারের সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে।

ভারতের মাটিতে ওয়ানডেতে ৭ হাজার রানও পূর্ণ করেছেন কোহলি। কোনো একটি দেশে ওয়ানডেতে ৭ হাজার রান করা প্রথম ব্যাটার তিনি। ভারতে টেন্ডুলকারের ৬ হাজার ৯৭৬ রানকে পেছনে ফেলেছেন কোহলি।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডেতে কোহলির সেঞ্চুরি এখন ১০টি। একটি দলের বিপক্ষে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির তালিকায় এটিও যৌথভাবে শীর্ষে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও তার ১০টি ওয়ানডে সেঞ্চুরি আছে।

১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার রানে পৌঁছানোর সময় কোহলির ব্যাটিংয়ে বড় পরিবর্তনের ছাপও স্পষ্ট। এই এক হাজার রানের পথে তার স্ট্রাইক রেট ১০৭ দশমিক ৯৩, যা ওয়ানডেতে তার যেকোনো এক হাজার রানের ধাপে সর্বোচ্চ।

এই এক হাজার রান করতে কোহলির লেগেছে ১৬ ইনিংস। এর মধ্যে ১১ বার তিনি পঞ্চাশ বা তার বেশি রান করেছেন, যার মধ্যে আছে পাঁচটি সেঞ্চুরি। কোনো এক হাজার রানের ধাপে এর আগে এতো বেশি পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস ও সেঞ্চুরি ছিলো না তার।

এই পরিবর্তনের পেছনে আছে নিজের ব্যাটিংয়ে নতুন কিছু যোগ করার চেষ্টা। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে তাকে নিজের খেলার ধরনে গতি বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। কোহলি নিজেই বলেছেন, নিজের নতুন একটি সংস্করণ খুঁজে বের করার এই প্রক্রিয়াটি তাকে রোমাঞ্চিত করেছে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ইনিংসের শুরু থেকেই সেই পরিবর্তনের ছাপ দেখা গেছে। প্রথম পাঁচ বলের মধ্যেই একটি ছক্কা মেরেছিলেন কোহলি। ইনিংস শেষে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৯টি ছক্কা, যা ওয়ানডেতে এক ইনিংসে তার ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ।

এর সঙ্গে ছিলো ১০টি চার। ওয়েস্ট ইন্ডিজের দেওয়া ২৯৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে ২৯তম ওভারে টানা তিনটি চার মেরে ১৫ হাজার ওয়ানডে রানের মাইলফলক স্পর্শ করেন তিনি।

কোহলি নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ইতিবাচকভাবে খেলতে পারবেন যখন, তখন সেভাবেই খেলবেন।

কোহলি জানিয়েছেন, মাইলফলক নিয়ে তার বিশেষ ভাবনা থাকে না। দলের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিস্থিতি বুঝে নিজের দায়িত্ব পালন করাই তার মূল লক্ষ্য। দীর্ঘদিন খেলতে পারা এবং এমন অর্জনের জায়গায় পৌঁছাতে পারায় তিনি কৃতজ্ঞ।

ওয়ানডেতে কোহলির ব্যাটিংয়ের পুরোনো ধরন ছিলো ঝুঁকি কমিয়ে উইকেটে যতটা সম্ভব দীর্ঘ সময় থাকা। ইনিংস বড় করার জন্য তিনি শুরুতে সময় নিতেন এবং পরে পরিস্থিতি অনুযায়ী গতি বাড়াতেন।

এখন সেই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ইতিবাচক ব্যাটিং। সেট হয়ে যাওয়ার পর প্রতিটি বল থেকে যত বেশি সম্ভব রান নেওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে ইতিবাচক ব্যাটিং আর বেপরোয়া ব্যাটিংয়ের মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে, সেটিও মাথায় রাখছেন অভিজ্ঞ এই ব্যাটার।

কোহলি বলেছেন, তিনি নিজেকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে ইতিবাচকভাবে খেলতে পারবেন যখন, তখন সেভাবেই খেলবেন। তবে সেটা করতে গিয়ে বেপরোয়া শট খেলবেন না। একজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার হিসেবে এই ভারসাম্য বজায় রেখে দলকে লক্ষ্যে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা তার থাকা উচিত বলেই মনে করেন তিনি।

এই নতুন পদ্ধতিতে শারীরিক সক্ষমতাকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কোহলি। তার মতে, মনকে মুক্ত রেখে খেলতে হলে শরীরকে ফিট রাখতে হয়। শারীরিকভাবে ফিট থাকলেই তিনি মাঠে নিজের মতো করে খেলার ছবি কল্পনা করতে পারেন এবং সেটিকে বাস্তবে প্রয়োগ করার সবচেয়ে ভালো সুযোগ পান।

২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে কোহলির রান ৫২৩। বছরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকদের তালিকায় তিনি আছেন তৃতীয় স্থানে। তার স্ট্রাইক রেট ১১৬ দশমিক ৭৪, যা চলতি বছরের শীর্ষ ৫০ রান সংগ্রাহকের মধ্যে মাত্র তিনজনের সমান বা বেশি।

১৫ হাজার রান পূর্ণ করার রাতেও তাই কোহলির কথায় মাইলফলকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে নিজের খেলার ধরন। ৩৭ বছর বয়সে এসে তিনি যে নতুনভাবে নিজেকে চ্যালেঞ্জ করছেন, তিরুবনন্তপুরমে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তার ১৩৯ রানের ইনিংস ছিলো তারই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।