সালমান শাহ’র বন্ধু কে এই ডন? 

২৪টি সিনেমায় নায়ক-ভিলেনের মুখোমুখি হওয়া সেই আশরাফুল হক ডনই এবার গ্রেপ্তার সালমান শাহ হত্যা মামলায়। তিন দশক ধরে জনপ্রিয় অভিনেতার মৃত্যু ঘিরে রহস্য, অভিযোগ আর পালটা দাবির শেষ নেই। সেই ঘটনায় বারবার কেন এসেছে ডনের নাম? কী ছিল সালমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক? আর ৩০ বছর পর কেন আবার তদন্তের কেন্দ্রে এই অভিনেতা?

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম

এক সময়ের গভীর বন্ধুত্ব, আবার রুপালি পর্দায় ২৪টি চলচ্চিত্রে একে অপরের মুখোমুখি হয়ে নায়ক ও ভিলেন হিসেবে তীব্র শত্রুতা- সিনেমার গল্পের চেয়েও যেন নাটকীয় তাদের রসায়ন।

কিন্তু পর্দার সেই শত্রুতাই পেঁচিয়ে গেছে বাস্তব জীবনের এক অমীমাংসিত ট্র্যাজেডির সাথে। 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র সালমান শাহ হত্যা মামলায় তিন দশক পর গ্রেপ্তার হলেন তারই এক সময়ের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, অভিনেতা আশরাফুল হক ডন।

সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর পর থেকেই ঘুরেফিরে এসেছে তার নাম। কিন্তু দীর্ঘ তিন দশক গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনার ভেতরে থাকার পর এবার বাস্তবতার মুখোমুখি ডন। 

রবিবার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল হাসান তালুকদার আলাপ-কে বলেন, ইমিগ্রেশন পুলিশের হাতে ডন আটক হওয়ার পরপরই পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।

ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জসিম উদ্দিন খান। 

“সালমান শাহ হত্যা মামলায় ডনকে ইমিগ্রেশন পুলিশের সহায়তায় বিমানবন্দর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে।”

ডনের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিলো বলেও জানান তিনি। বলেন, “দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে সৌদি আরবে ওমরাহ করতে যাচ্ছিলেন ডন। তবে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার সময় ধরা পড়েন তিনি।” 

এই গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তিন দশক পর কীভাবে আবার নতুন মোড় নিলো এই আলোচিত মৃত্যুর তদন্ত? 

কীভাবে গড়ে উঠেছিলো তরুণ ক্রেইজ সালমান শাহ ও ডনের সেই বন্ধুত্ব? আর কেনোইবা পর্দার বাইরে বন্ধুর অকালমৃত্যুর নেপথ্যে বারবার অভিযুক্ত হিসেবে নাম এলো ডনের?

এসব উত্তরের সন্ধান করতে ফিরে তাকাতে হবে তিন দশক আগের এক সকালে, যেদিন ইস্কাটনের বাসভবনে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতার মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছিল জটিল ও তিন দশকের অমীমাংসিত গোলকধাঁধা।

সালমান শাহ’র মৃত্যু, যে রহস্যের শেষ নেই

১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর। ঢাকার ইস্কাটনের একটি ফ্ল্যাটে স্ক্রী সামিরা হককে নিয়ে থাকতেন সালমান শাহ। 

বেলা ১১টার দিকে সালমানের মা নীলা চৌধুরী একটি ফোন পেয়ে দ্রুত ছুটে যান ছেলের ফ্ল্যাটে। সেখানে গিয়ে অবিশ্বাস্য এক ঘটনার মুখোমুখি হন নীলা চৌধুরী।  

বিছানায় পড়ে আছেন সালমান শাহ। সামিরার আত্মীয়ের পার্লারের কিছু মেয়ে সালমানের হাত-পায়ে তেল মালিশ করছে। নীলা চৌধুরী দেখলেন ছেলের হাতপায়ের নখ নীল হয়ে গেছে।​

সালমান শাহকে দ্রুত প্রথমে হলি ফ্যামিলি এবং পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তখন জানানো হয়, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করেছেন সালমান শাহ।​

জনপ্রিয় চিত্রনায়কের মৃত্যুর সময় থেকেই তার পরিবারের সদস্যরা দাবি করে আসছেন যে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেননি। 

তাকে ‘পরিকল্পিতভাবে হত্যা’ করা হয়েছে বলে দাবি ওঠে পরিবারের পক্ষ থেকে। 

সালমানের বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। 

তবে মা নীলা চৌধুরী বারবার বলেছেন, সালমানের শরীরে কোনো ক্ষত ছিলো না, যা দেখে আত্মহত্যা ধরা যায়। 

তাকে ইনজেকশন পুশ করে গলায় চাপ দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন নীলা চৌধুরী। 

মামলা তদন্ত করে ১৯৯৭ সালে সিআইডি প্রতিবেদন দেয়, যেখানে ‘আত্মহত্যা’র ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়। 

কিন্তু সালমানের পরিবার ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে। 

২০০৩ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়, ২০১৪ সালে সেই প্রতিবেদনেও ঘটনাটিকে অপমৃত্যু বলা হয়। 

এরপর ২০১৬ সালে তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই। ২০২০ সালে পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় এবং সেখানেও উল্লেখ করা হয় যে, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন।​

পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে সালমান শাহের আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। এরমধ্যে রয়েছে:

শাবনূরের সঙ্গে অতিরিক্ত অন্তরঙ্গতা, স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ, বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ার কারণে একাধিকবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মায়ের প্রতি অসীম ভালোবাসা যা জটিল সম্পর্কের বেড়াজাল তৈরি করে এবং সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতা।​

কিন্তু সালমানের মা নীলা চৌধুরী এবং মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বলেন, এটি “মনগড়া প্রতিবেদন” এবং “সঠিক তদন্ত” করা হয়নি।​ 

ডনের নাম এলো যেভাবে

সালমানের মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে তদন্ত সংস্থার কার্যক্রম নিয়ে বারবারই অসন্তুষ্ট থেকেছে তার পরিবারের সদস্যরা। 

ছেলের মৃত্যুর জন্য নীলা চৌধুরী মূলত পুত্রবধূ সামিরা, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি ও তাদের সহযোগী ডন, আজিজ মোহাম্মদ ভাইদের ‘ষড়যন্ত্র ও হত্যা পরিকল্পনাকে’ দায়ী করেন।

যদিও সালমানের সাবেক স্ত্রী সামিরা বারবার সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি নির্দোষ। 

এরমধ্যেই রেজভী ফরহাদের জবানবন্দি ও রুবি সুলতানার ভিডিওকেও তিনি প্রমাণ হিসেবে বারবার সামনে আনেন।

সালমান শাহ মৃত্যুর মামলায় সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হল ১১ নম্বর আসামি রেজভী আহমেদ ফরহাদের ১৯৯৭ সালের জবানবন্দি। 

১৬৪ ধারার ওই জবানবন্দিতে রেজভী স্বীকার করেন, “সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে সাজানো হয়েছে।” 

রেজভী আরও বলেন, সালমান শাহর মৃত্যু ছিল ১২ লাখ টাকার এক হত্যার চুক্তি, যে চুক্তি করেছিলেন সালমানের শাশুড়ি লতিফা হক লুসি। এই হত্যা চুক্তিতে আরও ছিলেন বাংলা সিনেমার খলনায়ক ডন, ডেভিড, ফারুক ও জাভেদ।​ 

তিনি আরও বলেন, ১৯৯৬ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় গুলিস্তানের একটি বারে ডন, ডেভিড, ফারুক, জাভেদ, ছাত্তার, সাজু এবং রেজভী দেখা করেন। 

সালমানের স্ত্রী সামিরার সঙ্গে ডনের এবং সামিরার মায়ের সঙ্গে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের গোপন সম্পর্ক ছিলো বলেও জবানবন্দিতে জানান রেজভী।

ডনকে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

কে এই ডন

ডনের জন্ম ১৯৭১ সালে বগুড়াতে। শিক্ষা জীবন কেটেছে সেখানেই। ১০ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট ডন নব্বই দশকের শুরুতেই স্থায়ী হন ঢাকাতে। 

পরিচালক সোহানুর রহমান সোহানের হাত ধরে ঢাকাই চলচ্চিত্রে সুযোগ পান ডন। সোহান পরিচালিত ‘লাভ ’ ছবিতে খলনায়ক হিসাবে অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছিলেন। 

ওই সিনেমায় নায়ক ছিলেন নাঈম, নায়িকা শাবনাজ। 

তবে ‘লাভ’ সিনেমার আগেই মুক্তি পায় ভারতীয় চলচ্চিত্র থেকে রূপান্তর করা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। এই ছবিরও পরিচালক ছিলেন সোহান।

১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়ার পরই ব্যাপক হইচই পড়ে যায়। ঢালিউডের ব্লকবাস্টার এই সিনেমার নায়ক ছিলেন সালমান শাহ, নায়িকা মৌসুমী। আর খলনায়কের ভূমিকায় ডন।

সালমান শাহ চার বছরের অভিনয় জীবনে ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। এরমধ্যে ২৪টিতেই খলনায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ডন। 

প্রথম সিনেমা ছাড়াও ‘এ জীবন তোমার আমার’, ‘বিক্ষোভ’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত’, ‘তোমাকে চাই’, ‘ফুলের মতো বউ’, ‘বিয়ের ফুল’, ‘জীবন সংসার’, ‘ভালোবাসা কারে কয়’ ও ‘মহামিলন’সহ বেশ কয়েকটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্র রয়েছে। 

অভিনয়জীবনে প্রায় সাড়ে ৬০০ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন ডন। বড় পর্দার পাশাপাশি টেলিভিশন নাটক ও টেলিফিল্মেও কাজ করেছেন তিনি। 

অভিনয়ের পাশাপাশি প্রযোজনায়ও যুক্ত হয়েছিলেন ডন। ‘এক জনমের ভালোবাসা’ নামে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেছেন। 

ব্যান্ড দল ‘আর্কাইভ’-এর সাথেও যুক্ত ছিলেন। এক সময় বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন।

দুই ডজন জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এবং কাছাকাছি বয়সের হওয়ার কারণে সালমান শাহর সঙ্গে গভীর বন্ধুত্বও গড়ে ওঠে ডনের। 

সালমান শাহর মৃত্যু প্রসঙ্গে গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডন বলেছিলেন, “সালমান আমার কেমন বন্ধু ছিলো, তা ইন্ডাস্ট্রির সবার জানা।” 

“ওর সঙ্গে আমার শেষ দেখা হয়েছিলো ১লা সেপ্টেম্বর। পরদিন আমি বগুড়ায় চলে যাই। আমার ভাই দেশের বাইরে থাকতো। সে দেশে এসেছিলো। ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্যই আমি বগুড়া চলে যাই।”

মামলা, তদন্ত ও নতুন মামলা

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় ১৯৯৬ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তার বাবা কমর উদ্দিন চৌধুরী রমনা থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেন। ১৯৯৭ সালের ৩রা নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘আত্মহত্যা’ বলে উল্লেখ করা হয়।

পরে এই মামলার দায়িত্ব পায় পিবিআই। দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ২৫এ ফেব্রুয়ারি সালমান শাহর অপমৃত্যুর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক সিরাজুল ইসলাম ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিমের আদালতে ৬০০ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন। 

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সালমান শাহকে খুন করা হয়নি। তিনি আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণও উল্লেখ করা হয়।

নীলা চৌধুরী পিবিআইয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে নারাজি দিয়ে দাবি করেন, তার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে।

এরপর গত বছরের ২০এ অক্টোবর আদালত সালমান শাহর মায়ের রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। একইসঙ্গে চাঞ্চল্যকর ওই মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন। 

এরই প্রেক্ষিতে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর গত বছরের ২১এ অক্টোবর রাজধানীর রমনা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় ১১ জনকে আসামি করা হয়।

আসামিরা হলেন-সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, ব্যবসায়ী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, খলনায়ক ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভী আহমেদ ফরহাদ।

এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকেও আসামি করা হয়েছে। সেই মামলার তদন্তের অগ্রগতিতেই ডনকে গ্রেপ্তার করা হলো পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।