প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের প্রতি সমর্থন জানানোয় যুক্তরাজ্যে নিজের বইয়ের বিক্রি বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন আইরিশ ঔপন্যাসিক স্যালি রুনি।
‘নরমাল পিপল’ ও ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’-এর মতো জনপ্রিয় বইয়ের লেখক রুনি দ্য গার্ডিয়ান বলেছেন, সংগঠনটির প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানানোয় যুক্তরাজ্যে তার বই বিক্রি থেকে রয়্যালটি বা প্রাপ্য অর্থ গ্রহণ করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছে না।
গত বছর প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে নিষিদ্ধ করার পর রুনি জানিয়েছিলেন, তিনি তার বই বিক্রির আয় থেকে সংগঠনটিকে অর্থসহায়তা দেবেন। যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদ আইনে নিষিদ্ধ সংগঠনকে সমর্থন করা অপরাধ। এ কারণে গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি পুরস্কার গ্রহণের জন্য যুক্তরাজ্য সফরও বাতিল করেন তিনি।
দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে রুনি বলেন, “২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরের মাসে আমি একটি মতামতধর্মী নিবন্ধ লিখে সংগঠনটিকে সমর্থন অব্যাহত রাখার ইচ্ছা প্রকাশ করি। তবে আয়ারল্যান্ডে সংগঠনটি নিষিদ্ধ বা অন্য কোনোভাবে নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত নয়।”
তিনি আরও বলেন, “এর ফলে যুক্তরাজ্যে আমার লেখা প্রকাশের চুক্তি বাস্তবায়ন করাও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ ও পর্যালোচনার পর আমার পূর্ণ সম্মতিতে প্রকাশনা সংস্থা ফ্যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা আর যুক্তরাজ্যে আমার বই সরবরাহ করতে পারবে না। নিজের বিশ্বাস ও অবস্থান সম্পর্কে জনগণের কাছে সৎ থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। এর পরিণতি মেনে নিতেও আমি সম্পূর্ণ প্রস্তুত।”
নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জের সমর্থনে হাইকোর্টে দেওয়া এক বিবৃতিতেও রুনি সতর্ক করেছিলেন, এ নিষেধাজ্ঞা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তার বই যুক্তরাজ্যের দোকানগুলো থেকে হারিয়ে যেতে পারে। দেশটিতে তার নতুন বই প্রকাশও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সমালোচকদের প্রশংসা পাওয়া রুনি বাণিজ্যিকভাবেও যুক্তরাজ্যে সফল একজন লেখক। তাকে একসময় একটি প্রজন্মের কণ্ঠস্বর হিসেবে বলা হতো। ‘নরমাল পিপল’ বইটি ১০ লাখের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’ এবং ‘বিউটিফুল ওয়ার্ল্ড, হোয়্যার আর ইউ’—প্রতিটি বইয়ের বিক্রি পাঁচ লাখ ছাড়িয়েছে।
বিবিসি তার ‘নরমাল পিপল’ ও ‘কনভারসেশনস উইথ ফ্রেন্ডস’ অবলম্বনে টেলিভিশন সিরিজ নির্মাণ করে। এর মধ্যে ‘নরমাল পিপল’ ৬ কোটি ২৭ লাখবার দেখা হয়। ২০২০ সালে এটি বিবিসির সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজগুলোর একটি।
রুনি গত বছর জানিয়েছিলেন, টেলিভিশন সিরিজ দুটির প্রযোজক তাকে সতর্ক করেছিলেন, রয়্যালটির অর্থ প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে দেওয়া হলে সন্ত্রাসবাদ আইন লঙ্ঘন হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের সন্ত্রাসবাদ আইনের ১৫ নাম্বার ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যদি জেনেশুনে বা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের কারণ থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হতে পারে—এমন অর্থ বা সম্পদ সরবরাহ করেন, তবে তা অপরাধ। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে রুনির প্রকাশক ফ্যাবার এক বিবৃতিতে বলেছে, “যুক্তরাজ্যের বর্তমান আইন এমন পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যেখানে ফ্যাবার স্যালি রুনির বই থেকে অর্জিত যুক্তরাজ্যের আয় তাকে দিতে পারছে না। একজন লেখকের বই বিক্রি করে সেই আয় তাকে দিতে না পারা প্রকাশকের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, “তাই স্যালির পূর্ণ সম্মতিতে আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, যুক্তরাজ্যে আর কোনো মাধ্যমে তার বই সরবরাহ করবো না। তবে অন্যান্য দেশে তার সাহিত্যকর্ম প্রকাশ ও বিক্রি অব্যাহত রাখবো।”
গত বছরের জুলাইয়ে প্যালেস্টাইন অ্যাকশন নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে যুক্তরাজ্যে সংগঠনটির প্রতি সমর্থনের অভিযোগে ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের অধিকাংশই ‘আমি গণহত্যার বিরোধিতা করি, প্যালেস্টাইন অ্যাকশনকে সমর্থন করি’ লেখা প্ল্যাকার্ড বহন করেছিলেন।
প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার বৈধতা নিয়ে আইনি চ্যালেঞ্জ চলমান থাকায় এখনো কারও বিচার হয়নি। নভেম্বরে যুক্তরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টে এ চ্যালেঞ্জের শুনানি হওয়ার কথা। গ্রেপ্তার ও অভিযোগ গঠনের অধিকাংশ ঘটনা সন্ত্রাসবাদ আইনের ১৩ নাম্বার ধারার আওতায়। এ ধারায় সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আইনি চ্যালেঞ্জ করা প্যালেস্টাইন অ্যাকশনের সহপ্রতিষ্ঠাতা হুদা আম্মোরি বলেন, “স্যালি রুনির যুক্তরাজ্যে নিজের লেখা প্রকাশ করতে না পারা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত।”
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইউকের প্রধান নির্বাহী কেরি মস্কোজিউরি বলেন, “প্যালেস্টাইন অ্যাকশন সম্পর্কে কার কী মত, তা যা-ই হোক না কেন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার উদ্দেশ্যে তৈরি আইন যখন শিল্পের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ স্তব্ধ করে দেয়, তখন সবারই উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে লেখকদের বই স্টোর থেকে হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়। নিজের বিবেকের কথা প্রকাশ করা এবং জীবিকা নির্বাহের মধ্যে কাউকে বেছে নিতেও বাধ্য করা উচিত নয়।”



