বালোচিস্তানে কী হচ্ছে, পাকিস্তান কি ভেঙে যাচ্ছে?

‘মূল সমস্যাকে চিহ্নিত না করে সরকার বাইরের লোকজনকে দেখানোর জন্য একটি বয়ান সাজিয়েছে। বালোচিস্তানের একটি শান্ত, রাজনৈতিক ও বাস্তবসম্মত অ্যাপ্রোচ প্রয়োজন।’

আপডেট : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৭ পিএম

আবারও কি পাকিস্তান ভাঙছে? সম্প্রতি বালোচিস্তানে যেসব ঘটনা ঘটছে, তার ফলে এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে সর্বত্র।

গত ১৫ই জুলাই বালোচিস্তানের লেখক, মানবাধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক নেতা মির ইয়ার বালোচ সামাজিক মাধ্যমে একটি ঘোষণাপত্র প্রকাশ করেন।

‘দ্য ভিশন অফ সভারেন্টি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফর বালোচিস্তান’ (বালোচিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও উন্নয়নের স্বপ্ন) শীর্ষক ইংরেজি ঘোষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে, “রিপাব্লিক অফ বালোচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী বালোচিস্তানের ভূমির ৮৫ শতাংশ দখল করেছে।” 

আরও বলা হয়েছে, “বালোচিস্তান তার জাতীয় সংগীত ‘মা চুক্যান বালোচানি’, জাতীয় পতাকা এবং তার নিজস্ব মুদ্রা ‘বালোচি ফালুস’ গ্রহণ করেছে।”

সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ঘোষণাটিতে বালোচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। 

সেখানে লেখা হয়, “সময় এসে গেছে, বিশ্বের পক্ষ থেকে রিপাবলিক অফ বালোচিস্তানের স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিয়ে আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি পাকিস্তানের বৈরিতা, পারমাণবিক হুমকি ও উগ্রতার অবসান ঘটিয়ে অঞ্চলটিতে শান্তি আনার।” 

পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকে বালোচ ও পাশতো ব্যক্তিদের অবসর গ্রহণ করে বালোচিস্তানের বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে বলেও দাবি করা হয় ওই ঘোষণায়। 

তবে ঘোষণাপত্র ও তাতে থাকা দাবিগুলো নিয়ে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ কিংবা আন্তর্জাতিক মহল থেকে এখনো কোনো বার্তা পাওয়া যায়নি। 

তাহলে বালোচিস্তানের স্বঘোষিত প্রতিনিধি মির ইয়ার বালোচের এই স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটির তাৎপর্য কতটুকু এবং তার দাবিগুলোই বা কতটা সত্য? বালোচিস্তানে আসলে কী হচ্ছে?

বালোচিস্তানের সংঘাতের প্রেক্ষাপট

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, গত ৬ই জুলাই থেকে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মির (বিএলএ) দফায় দফায় হামলায় পাকিস্তানে কমপক্ষে ৪২ জন নিহত হয়েছেন। এই সংগঠনটি পাকিস্তানে নিষিদ্ধ। 

বালোচিস্তানের জিয়ারাত অঞ্চলের এক পুলিশ ছাউনিতে হামলা করে বিএলএ সদস্যরা ৯ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে। এছাড়া আরও ১৮ জন পুলিশ সদস্যকে জিম্মির পর গুলি করে হত্যা করে বলেও ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

হামলার পর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দেশটির সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ও বালোচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সারফ্রাজ বুগতির সাথে নিরাপত্তা বৈঠকে বসেন। 

সেখানে তিনি নির্দেশ দেন যে, “পাকিস্তানের শেষ সন্ত্রাসী হত্যা না করা পর্যন্ত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াই চলবে।”

ভারতকে লক্ষ্য করে শেহবাজ বলেন, পাকিস্তানের ‘পূর্বপাশের প্রতিবেশী’ সন্ত্রাসীদের অস্ত্র, অর্থ ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে। 

তবে নয়াদিল্লি থেকে শেহবাজের এই বক্তব্যের কোনো জবাব আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়নি। 

আয়তনের দিক দিয়ে পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ হলো বালোচিস্তান। তবে জনসংখ্যার দিক ক্ষুদ্রতম প্রদেশ।

খনিজ সম্পদে ভরপুর প্রদেশটিতে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত নতুন নয়। ২০০০ সালে বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) প্রতিষ্ঠা হওয়ার অনেক আগে থেকেই সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী সংঘাত শুরু হয়েছে।

১৯৫৮ সালে বালোচিস্তানের নওয়াব নওরোজ খানের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র বিদ্রোহ হয়। মূলত সে সময় পাকিস্তানের ‘ওয়ান ইউনিট স্কিম’-এর বিরুদ্ধে এই আন্দোলন হয়েছিলো, উদ্দেশ্য ছিলো সব প্রদেশকে একটি প্রশাসনের অধীনে নিয়ে আসা।

তবে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বিদ্রোহ দমন করতে সফল হয়। নওয়াব নওরোজ খানের সাথিদের হত্যা এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানে সামরিক শাসন আসার পর থেকে বালোচিস্তানে রাজনৈতিক অধিকারের জন্য আন্দোলন হয়েছে একাধিকবার।

তবে সবচেয়ে বড় সংঘাত হয় ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সালে। আবারও সশস্ত্র সংঘাতে লিপ্ত হয় পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী ও বালোচিস্তানের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। 

পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ফ্রাইডে টাইমসের এক প্রতিবেদন লেখা হয়েছে, ইরাক সরকারের কূটনৈতিক সম্মতি ছাড়াই ১৯৭৩ সালে ইসলামাবাদে ইরাকি দূতাবাসে রেইড দেয় পাকিস্তানের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেখান থেকে অস্ত্র, গোলাবারুদ ও অন্যান্য যন্ত্র উদ্ধার দেখায় পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ। 

সেই অস্ত্র ও গোলাবারুদের বাক্সের ওপর লেখা ছিলো “ফরেন মিনিস্ট্রি, বাগদাদ”। 

পাকিস্তানের তখনকার প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলি ভুট্টো যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনকে এক চিঠিতে বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের অস্ত্র দেওয়ার জন্য ইরাক, ভারত, আফগানিস্তান ও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন।

এই ঘটনার জের ধরেই বালোচিস্তানে সামরিক অপারেশন শুরু করে পাকিস্তানি সরকার।

১৯৭৭ সালে ভুট্টোর সরকারের পতনের পর জেনারেল জিয়াউল হক আত্মসমর্পণকারীদের সাধারণ ক্ষমার বিধান করলে তখনকার মতো সংঘাতের সমাপ্তি ঘটে। 

কিন্তু ২০০৫ সালে আবারও সংঘাতের আগুন জ্বলে। সেনাবাহিনীর এক ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে সরকারি গ্যাস কোম্পানির এক কর্মচারীকে ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হলে তা বলপ্রয়োগ করে পাকিস্তান সরকার দমন করে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়। 

এই ঘটনার জেরে স্থানীয় বুগতি গোষ্ঠীর সদস্যরা গ্যাস ফিল্ডের ওপর হামলা চালায়। 

দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, তখনকার প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বিদ্রোহ দমনে সাড়ে চার হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছিলেন।  

বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মির আদ্যোপান্ত

আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির ‘ম্যাপিং মিলিট্যান্টস প্রজেক্ট’-এর গবেষণা থেকে জানা যাচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে ২০০০ সালে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৭ সালের সশস্ত্র সংঘাতের পর রুশ গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবির সাহায্যে বিএলএ প্রতিষ্ঠিত হয়েও থাকতে পারে। 

২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে পাকিস্তানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও বেসামরিক প্রতিষ্ঠানে হামলা করে বিএলএ সদস্যরা। ২০০৯ সালে বালোচ রাজনৈতিক নেতা ব্রহমদাগ খান বুগতি বালোচিস্তানে থাকা ‘অ-বালোচ’ নাগরিকদের হত্যার ডাক দেন। 

এরপর পাঞ্জাবি, পাশতুন, সিন্ধি ও সারাইকি নাগরিকদের ওপর হামলায় পাঁচ শতাধিক মানুষ নিহত হন বলে স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিএলএ ওইসব হামলার দায় স্বীকার করে।

২০১১ থেকে ২০২০ সালে হামলা অব্যাহত রাখে বিএলএ। বিভিন্ন স্থাপনায় আত্মঘাতী বোমাহামলা ও অন্যান্য হামলায় বেশকিছু বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। 

এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হামলা হলো - ২০১৩ সালে বাস থেকে ১১ জন যাত্রীকে অপহরণ করে হত্যা, ২০১৪ সালে মুহাম্মদ আলি জিন্নাহর বাসস্থান ‘ক্যায়দ-এ-আজম রেসিডেন্সি’তে রকেট হামলা এবং পাকিস্তানের পতাকা সরিয়ে বিএলএ-র পতাকা বসানো, ২০১৭ সালে ২০ জন শ্রমিক হত্যা, ২০১৮ সালে করাচিতে চীনা দূতাবাসে হামলা করে ৪ জনকে হত্যা এবং ২০২০ সালে পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার কোরের আউটপোস্টে হামলা করে ৭ জন সেনাসদস্য হত্যার ঘটনা উল্লেখযোগ্য। 

পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর ওপর বিএলএ সবচেয়ে বেশি হামলা চালায় ২০২১ সালে। পাকিস্তানি ও আন্তর্জাতিক কয়েকটি গণমাধ্যম থেকে খবর থেকে জানা যাচ্ছে, এসব হামলায় নিহত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি সামরিক বাহিনীর সদস্য। 

২০২২ থেকে ২০২৫ সালেও বিভিন্ন জায়গায় হামলা চালায় বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি। ২০২৫ সালের ১২ই অগাস্ট বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি ও তাদের সশস্ত্র শাখা ‘মজিদ ব্রিগেড’কে বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্র। 

দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘোষণাটি আসে ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং ইসলামাবাদের সাথে ওয়াশিংটনের একটি বাণিজ্য চুক্তি সই হওয়ার কয়েকদিন পরেই। 

২০১৯ সালে বিএলএ ও মজিদ ব্রিগেডকে ‘স্পেশালি ডেজিগনেটেড গ্লোবাল টেরোরিস্ট (এসডিজিটি)’ ঘোষণা করেছিলো যুক্তরাষ্ট্র।

আক্রমণের প্যাটার্ন ও উদ্দেশ্য  

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট পয়েন্ট মিলিটারি অ্যাকাডেমির গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কমব্যাটিং টেরোরিজম সেন্টার’-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সাল থেকে বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মির আক্রমণে আগের তুলনায় ভিন্ন প্যাটার্ন দেখা যাচ্ছে। তারা পুরো প্রদেশজুড়ে সমন্বিত আক্রমণের সক্ষমতা, আত্মঘাতী আক্রমণের হার, সরকারি প্রতিষ্ঠান সাময়িক দখল করে ফেলা এবং রেলপথ ও মহাসড়কে আক্রমণ চালাচ্ছে। 

বিএলএ-এর বিভিন্ন শাখার মধ্যে আগের চেয়ে বেশি সমন্বয় ও সামরিক সক্ষমতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। 

এছাড়া চীনের সাথে পাকিস্তানের সম্মিলিত বিভিন্ন প্রকল্পও বিএলএ-এর আক্রোশের শিকার হচ্ছে বলে লন্ডনের দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর (সিপিইসি) প্রকল্পের ওপর বিভিন্ন সময়ে হামলা করেছে বিএলএ। এছাড়া চীনা প্রজেক্টের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সড়ক, বালোচিস্তানে খনিজ সম্পদের মাইনিং অপারেশন ও চীনা কোম্পানি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত গুয়াদার বন্দরে হামলা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বালোচিস্তানের গুয়াদার বন্দর থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস ও খণিজ সম্পদ উত্তোলন এবং পাকিস্তানের সাথে চীনের ৬২ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক চুক্তিকে বালোচিস্তানের মানুষ আন্তর্জাতিক শোষণ হিসেবে দেখে।

বিএলএ-র মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীরা তাদের যুদ্ধকে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ও জাতীয় মুক্তির পক্ষের লড়াই হিসেবে দেখে বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।

বালোচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘন 

বিএলএ ও বালোচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দমন করতে গিয়ে পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এসেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা থেকে। 

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন ও বিবৃতিতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র উঠে এসেছে।

বিভিন্ন সময়ে মোবাইল যোগাযোগ ও ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া, বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, সমাবেশ, মিছিল ও বিক্ষোভ দমনে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ ও বিক্ষোভকারীদের গণহারে গ্রেপ্তার ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে হত্যা, বালোচিস্তানের বেসামরিক নাগরিক, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও মানবাধিকারকর্মীদের গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নানা ধরনের অভিযোগ এসেছে এসব সংগঠনের প্রতিবেদন ও বিবৃতিতে।

পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের অভিযোগের জবাবে কর্তৃপক্ষ থেকে শোনা গেছে, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই স্বেচ্ছায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনে যোগ দিয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য সংস্থা এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে যে. পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জবাবদিহিতার অভাব আছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিখোঁজ হওয়া ব্যক্তিদের অনেকেরই পরে লাশ পাওয়া যায়, এবং লাশের গায়ে থাকে শারীরিক নির্যাতনের চিহ্ন।

এছাড়া, ২০০৫ সালে গ্যাস কোম্পানির কর্মচারীকে ধর্ষণের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের সহিংস দমনও বালোচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আলোচিত উদাহরণ।

এখন বালোচিস্তানে যা হচ্ছে  

২০২৬ সালের শুরুতেই ৩১এ জানুয়ারি বালোচিস্তান লিবারেশন আর্মি তাদের সবচেয়ে বড় অপারেশনগুলোর একটি চালায়। পাকিস্তানের একাধিক শহরে সমন্বিত হামলায় বেসামরিক নাগরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ প্রায় অর্ধশত মানুষকে নিহত হন বলে আল জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। 

এই হামলার পর পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পালটা হামলা চালায়। এতে দেড় শতাধিক বিচ্ছিন্নতাবাদীকে হত্যা করা হয় বলে দাবি করে পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী।

এই হামলার একদিন পর বালোচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সারফ্রাজ বুগতি বলেন, “বালোচিস্তানের সমস্যার সমাধান সামরিক বাহিনী, রাজনৈতিক সংলাপ নয়।”

বালোচিস্তানের সংঘর্ষ বিষয়ক গবেষক ইমতিয়াজ বালোচ আল জাজিরাকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, “মূল সমস্যাকে চিহ্নিত না করে সরকার বাইরের লোকজনকে দেখানোর জন্য একটি বয়ান সাজিয়েছে। বালোচিস্তানের একটি শান্ত, রাজনৈতিক ও বাস্তবসম্মত অ্যাপ্রোচ প্রয়োজন।”

বার্লিনভিত্তিক গবেষক সাহের বালোচ বলেন, “রাষ্ট্র যখন ভরসা তৈরি না করে ভয়ের মাধ্যমে শাসন করে, তখন মানুষ সহযোগিতা করে না। তথ্য প্রবাহিত হয় না। এই কারণে অনেক বেশি নিরাপত্তা আছে এমন জায়গাগুলোও আক্রমণের শিকার হয়।”

ফেব্রুয়ারি মাসজুড়ে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী প্রদেশজুড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশন চালায়। 

২০২৬এর জুলাইয়ের শুরুতে বিএলএ একটি পুলিশ ছাউনিতে হামলা চালিয়ে ৯ জন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে।

পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্যে, জুলাই মাসের শুরুর দিকে বিভিন্ন অপারেশনে ৮০ জনের বেশি বিচ্ছিন্নতাবাদীকে হত্যা করা হয়। 

অন্যদিকে তালিবান-অধ্যুষিত আফগানিস্তান সীমান্তে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে আছে পাকিস্তান। এর মধ্যেই ১৫ই জুলাই বালোচিস্তানের লেখক ও মানবাধিকারকর্মী মির ইয়ার বালোচ ঘোষণা করে বসেন বালোচিস্তানের স্বাধীনতা।

পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ কিংবা আন্তর্জাতিক মহল থেকে এই ঘোষণা নিয়ে কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য আসেনি।