ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরা কেন বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেন না?

ব্রিটেনের রাজনীতিতে স্বল্প মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীত্বের ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালে মার্গারেট থ্যাচারের আগমনের পর থেকে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট পর্যন্ত ৩৭ বছরে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন পাঁচজন। আর ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরেই পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে ব্রিটেন।

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ২০২২ সালে প্রবেশ হয় লিজ ট্রাসের। তখন যুক্তরাজ্যের ট্যাব্লয়েড চ্যানেল “ডেইলি স্টার” একটি লাইভ স্ট্রিম শুরু করে, যেখানে লিজ ট্রাসের ছবির পাশে একটি পচনশীল লেটুস রেখে তারা বাজি ধরে, কে বেশি দিন টিকবে- প্রধানমন্ত্রী নাকি লেটুস।

লেটুস জিতে যায়। ৪৫ দিনের মাথায় ক্ষমতা ছেড়ে লিজ ট্রাস হয়ে যান যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময় কাজ করা প্রধানমন্ত্রী। নিজের পার্টির আস্থা হারিয়ে নেমে যেতে হয় তাকে, এবং তার পরে আসেন ঋষি সুনাক। 

ব্রিটেনের রাজনীতিতে সম্প্রতি সময়ে স্বল্প মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীত্বের ট্রেন্ড দেখা যাচ্ছে। ১৯৭৯ সালে মার্গারেট থ্যাচারের আগমনের পর থেকে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট গণভোট পর্যন্ত ৩৭ বছরে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হন পাঁচজন। আর এদিকে ২০১৬ সালে ডেভিড ক্যামেরনের পদত্যাগের পর ২০২৬ সাল পর্যন্ত ১০ বছরেই পাঁচজন প্রধানমন্ত্রী দেখেছে ব্রিটেন। 

গত ৫ বছরে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে দেখা গেছে ৪জনকে, যাদের মধ্যে তিনজন ক্ষমতায় আসেন দুই মাসের ব্যবধানে। যুক্তরাজ্যের গণতান্ত্রিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনের এই অস্থিতিশীলতার শুরু খুঁজতে গেলে যেতে হবে ২০১৬ সালে। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরন। যুক্তরাজ্যে ঐতিহাসিক গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত হয় ‘ব্রেক্সিট’-এর, সিদ্ধান্ত হয়, দেশটি আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে থাকবে না। 

তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছাড়ার বিপক্ষে, এবং গণরায় ব্রেক্সিটের পক্ষে যাওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেন। ক্যামেরনের পর আসেন কনজার্ভেটিভ পার্টিরই থেরেসা মে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের সুগম পথ তৈরি করবেন, তবে সংসদের সমর্থন হারান, এবং পদত্যাগ করেন ২০১৯ সালে। 

থেরেসা মে’র পর আসেন তুমুল আলোচিত বরিস জনসন। বরিস জনসম ক্ষমতায় এসেই কোভিড মহামারির মুখোমুখি হন। এই সময়ে তিনি নানা কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হন। 

লন্ডনের রয়াল হলোয়ে ইউনিভার্সিটির পলিটিকসের অধ্যাপক নিকোলাস অ্যালেন তুর্কিভিত্তিক ইংরেজি সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড-কে বলেন, “বরিস জনসনের প্রধানমন্ত্রীত্ব ইতিহাসের পাতায় লিখা থাকবে, তবে ভুল কারণে। এটি ছিলো ব্রিটিশ রাজনীতির ওপর দিয়ে একটি ঝড় বয়ে যাওয়ার মতো।” 

তার বিভিন্ন কেলেঙ্কারির মধ্যে সবচেয়ে নিন্দা কুড়ায় “পার্টিগেইট” কেলেঙ্কারি। কোভিড মহামারির সময় যুক্তরাজ্যে দেশজুড়ে লকডাউনের মাঝে বিভিন্ন গণমাধ্যমে আসতে থাকে, ডাউনিং স্ট্রিটে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পার্টি করছিলেন বরিস জনসন। প্রথমে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করলেও, সামাজিক মাধ্যমে নানা ছবি ছড়িয়ে পড়তে থাকলে এক পর্যায়ে তিনি পার্টির কথা স্বীকার করেন।

এছাড়া, তার বিরোধিতা করার কারণে কনজার্ভেটিভ পার্টির বিভিন্ন সদস্যকে বহিষ্কার করার অভিযোগও আছে জনসনের বিরুদ্ধে। নিকোলাস অ্যালেন বলেন, “পার্টির ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তার খুব সহিংস অ্যাপ্রোচ ছিলো। তিনি বড় সংখ্যক কনজার্ভেটিভকে পার্টি থেকে বহিষ্কার করেন, শুধুমাত্র তার বিরোধিতা করার কারণে।”

তবে তাকে পদত্যাগের দিকে ঠেলে দেয় অন্য এক কেলেঙ্কারি। বরিস জনসন তার পার্টির চিফ হুইপ হিসেবে যাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন, তার বিরুদ্ধে উঠে আসে যৌন হয়রানির অভিযোগ। সাথে এ অভিযোগও আসে, বরিস জনসন তাকে নিয়োগ দেওয়ার সময় এই অভিযোগের কথা জানতেন। এই কেলেঙ্কারির জের ধরে এক পর্যায়ে পদত্যাগ করেন বরিস জনসন।

টিআরটি ওয়ার্ল্ডের সাক্ষাৎকারে নিকোলাস অ্যালেন বলেন, “তার (বরিস জনসন) নিজের পার্টি তার বিরুদ্ধে চলে যায় তার নৈতিক সুস্থতার অভাবের কারণে।”

বরিস জনসনের পর ক্ষমতায় আসেন লিজ ট্রাস, যিনি ৪৫ দিনের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতা ছেড়েছিলেন এবং হেরে গিয়েছিলেন ডেইলি স্টারের সেই লেটুসের কাছে। লিজ ট্রাস মূলত একটি ‘মিনি-বাজেট’ ঘোষণা করেন যার ফলে ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য কমে যায়, এবং সাথে সাথেই তিনি নিজের পার্টির ভরসা হারান।

এরপর আসেন আরেকটি তুমুল পরিচিত নাম, ঋষি সুনাক। ঋষি সুনাক হন ২০২২ সালে ব্রিটেনের তৃতীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৬ সাল থেকে কনজার্ভেটিভ পার্টির চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী। ঋষি সুনাক ক্ষমতায় এসেই পান আগের আমলগুলো থেকে আসা অর্থনৈতিক সংকট এবং উঠতি জীবনযাত্রার ব্যয়।

ঋষি সুনাককে নিয়ে নিকোলাস অ্যালেন বলেন, “অর্থনৈতিক সংকট তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিলো। তবে তিনি অনেক কিছু করেছেন যেগুলোর কারণে মনে হতে পারে যে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অতটা ভালো না। এর সেরা উদাহরণ হলো আগে আগে সাধারণ নির্বাচনের ডাক দেওয়া। তিনি আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে পারতেন।”

২০২২ সালে ক্ষমতায় এসে অর্থনৈতিক সংকট কমানোর ওয়াদা করেন ঋষি সুনাক। পাশাপাশি রুয়ান্ডা থেকে আসা অবৈধ অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর ওয়াদাও করেন। টিআরটি ওয়ার্ল্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দু’টিতেই ব্যর্থ হন তিনি। 

২০২৪ সালেই নির্বাচন ঘোষণা করেন সুনাক। এরপর তার কিছু কাজকে “রাজনৈতিক অপরিপক্কতা” মনে করেছেন নিকোলাস অ্যালেন। এর মধ্যে তিনি উল্লেখ করেন ঋষি সুনাকের বেলফাস্টে ‘টাইটানিক কোয়ার্টারে’ পরিদর্শনের ঘটনা। তিনি বলেন, ‘ডুবে যাওয়া জাহাজে প্রতীক’ হিসেবে পরিচিত জায়গায় নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শন কোনো ভালো লক্ষণ নয়। 

নির্বাচনে হারেন ঋষি সুনাক, ক্ষমতায় আসেন কিয়ার স্টার্মার। লেবার পার্টির প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার ক্ষমতায় এসে কনজার্ভেটিভ পার্টির টানা শাসনের ধারা ভাঙেন। তবে নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই স্টার্মারকে ঘিরে ছিলো নানা বিতর্ক। গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে তার অবস্থান এবং সংসদে যুদ্ধবিরতির ডাক না দেওয়ায় তাকে নিয়ে বিতর্কের জন্ম হয়। 

তবে বিতর্ক ছাপিয়েই নির্বাচিত হয়েছিলেন স্টার্মার, এবং তার মেয়াদ প্রায় দুই বছরের মাথায়ই এখন খোলাখুলিভাবে তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিভিন্ন সংসদ সদস্যরা। তবে কেন প্রধানমন্ত্রীর এই আসন এতটা অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে?

যুক্তরাজ্যের গবেষক পিটার কাল মিডিয়াম নামক যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে লিখেন, “গণমাধ্যম, বাজার, পার্টির বিভাজন ও জনগণের হতাশা এমন গতিতে প্রধানমন্ত্রীদের গ্রাস করছে, যা ওয়েস্টমিন্সটারের ক্ষমতা পুনরায় উৎপাদন করার ক্ষমতার চেয়ে বেশি।”

তবে ক্ষমতায় থাকার গর মেয়াদ কমে যাওয়ার জন্য চারটি বিষয়কে দায়ী করেন পিটার কাল। প্রথমটি হলো সংবাদ প্রচারের দ্রুততা। পিটার কাল লিখেন, “একজন প্রধানমন্ত্রীর আগে এক সপ্তাহের মতো সময় থাকতো একটি খারাপ সাক্ষাৎকার থেকে উঠে আসার জন্যে। এখন হয়ত চল্লিশ মিনিটের মতো সময় পাবেন পুরো ব্যাপারটি মিম হয়ে বিভিন্ন হোয়াটস্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে যাওয়ার আগে।”

পিটার কালের মতে দ্বিতীয় কারণটি হলো ‘জরিপ শিল্প’। তার মতে, জরিপ এখন “পরিমাপের চেয়ে বেশি ‘পারফর্মেন্স রিভিউ হিসেবে কাজ করে।” কাল লিখেন, “ভোটারদের পছন্দ নিয়ে প্রতিটি জরিপকে ওয়েস্টমিনস্টার একটি রায় হিসেবে দেখে।”

তৃতীয় কারণ হিসেবে তিনি দায়ী করেন তথ্য ফাঁস করা বিভিন্ন মন্ত্রী বা সংসদ সদস্যদের। তার মতে, আগে সংসদ জাতির কাছে একটি ঐক্যের ছবি ধরে রাখতে চাইতো। তবে “এখন একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী কোনো এক সাংবাদিকের কাছে তার ভিন্নমতের কথা বলেই বেশি প্রভাব অর্জন করতে পারবেন,” লিখেন কাল।

চতুর্থ কারণ হিসেবে তিনি দায়ী করেন বাজারকে। তিনি লিজ ট্রাসের বাজেট ঘোষণার পর ব্রিটিশ পাউন্ডের মূল্য কমে যাওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে লিখেন, “এতে প্রকাশ পায় যে রাজনৈতিক শ্রেণির নিজেদের সিদ্ধান্তের পরিণতির ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার (ট্রাসের) পরের প্রতিটি প্রধানমন্ত্রীর মাথায় ঢোকে যে বন্ড মার্কেটের একটি নিজস্ব ‘ভেটো’ আছে। এবং এই ভেটোটি সংসদীয় ভোটে নয়, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রকাশ পায়।”

পিটার কালের মতে, এই চারটি বিষয়ের কারণে এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা দাঁড়িয়েছে যেখানে “ক্ষমতাকে সবসময়ই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, এবং প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় না পেতেই শেষ রায় ঘোষণা করে দেওয়া হয়।”

তবে পুরো ব্যাপারটির পেছনে রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে যুক্তরাজ্যের জনগণের হতাশার একটি বড় হাত আছে বলে মনে করেন ব্রিটিশ জরিপ বিশেষজ্ঞ ও মার্লিন স্ট্র্যাটিজি-র প্রতিষ্ঠাতা স্কার্লেট ম্যাগোয়ার। তিনি স্কাই নিউজকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “ভোটাররা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর তুমুলভাবে হতাশ এবং বড় পরিসরে ভরসা হারিয়েছেন।” 

মানুষের মনোভব বুঝতে রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতার কথাও বলেন তিনি, “ভোটারদের মুড সঠিকভাবে ধরতে ব্যর্থ হওয়াটা সমস্যার অংশ।”

তবে ক্ষমতার এই স্বল্প মেয়াদ বহাল থাকলে যুক্তরাজ্যের গণতন্ত্র সামগ্রিকভাবে সংকটে পড়বে বলে মনে করেন পিটার কাল। তিনি লিখেন, “এটি মানুষকে শেখাবে যে সরকার ব্যবস্থা আসলে কাজের চেয়ে বেশি নাটকীয়তা। এটি শেখাবে, একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে পরের প্রধানমন্ত্রীর নামমাত্র পার্থক্য আছে। এটি মানুষকে শেখাবে যে ভোট দেওয়া কেবল একটি আচার, যার বাস্তব জগতে কোনো প্রভাব নেই।”