কাঁটাতারের বেড়া: নিরাপত্তার প্রয়োজন নাকি রাজনীতির ‘কার্ড’

কাঁটাতারের বেড়ার ভূমিকা কী? বাংলাদেশ কেন বেড়া দেয় না, ভারত কেন দেয়? দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কাঠামো কেমন? এই লেখায় এসব প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা হয়েছে।

আপডেট : ১৩ মে ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

 

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে প্রথম ক্যাবিনেট মিটিংয়ে শুভেন্দু অধিকারী সিদ্ধান্ত নিলেন সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়ার জন্য জমি দেবেন বিএসএফকে।

ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির পালটা বলেছেন, “বাংলাদেশের মানুষ কাঁটাতার ভয় পায় না। বুঝছেন? বাংলাদেশের সরকারও কাঁটাতার ভয় পায় না, যেখানে আমাদের কথা বলা দরকার, আমরা কথা বলব।’’

প্রশ্ন হলো, কাঁটাতারের বেড়া ইস্যুতে ভয় পাওয়ার প্রসঙ্গ কেন এলো? কাঁটাতারের বেড়াতো নতুন নয়।

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বরাবরই বিজেপির অন্যতম কার্ড ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ’ আর ‘কাঁটাতারের বেড়া’।

নির্বাচনের আগে শুভেন্দু অধিকারী একাধিকবার বলেছেন বিএসএফকে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার জন্য জমি দেওয়া হবে। করেছেনও তাই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অবশ্য বলেছেন, ‘‘কোনো অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনের পর কোনো বিজয়ী দল বক্তব্য দিলে সেটার জবাব আমরা সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে দিই না। আমাদের জানাতে হবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে যে বাংলাদেশ বর্ডারে বা ইন্ডিয়ান বর্ডারে তারা কিছু করতে চায় কি না। সেটা ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলে হবে।”

এই বাস্তবতায় কাঁটাতারের বেড়া কতোটা নিরাপত্তা কাঠামেরা অংশ আর কতোটা রাজনীতি, সেটাই প্রশ্ন।

কাঁটাতারের বেড়ার ভূমিকা কী? বাংলাদেশ কেন বেড়া দেয় না, ভারত কেন দেয়? দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কাঠামো কেমন? এই লেখায় এসব প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা হয়েছে।

দেশভাগে যেভাবে সীমান্তের গোড়াপত্তন

লর্ড মাউন্টব্যাটেনকে যখন টেন ডাউনিং স্ট্রিটে ডেকে পাঠানো হয়, তখন তিনি ঠিকই জানতেন এবার তাকে ইংরেজ-শাসিত ভারতবর্ষের ভাইসরয় পদে মনোনীত করবেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলি।

তবে তার কাজটা হবে একটু ভিন্ন। হাতে রাজদণ্ড নয়, বরং ব্রিটিশ শাসন থেকে প্রজাদের মুক্তির বার্তা নিয়ে শেষ বড়লাট বাহাদুর হয়েই আসবেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী এটলিকে নিষ্কণ্টক শাসনের শর্ত দিয়েছেন মাউন্টব্যাটেন। বলেছিলেন, ব্রিটিশ সরকারকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা দিতে হবে যে তারা ভারত ছেড়ে যাবেন।

সাম্রাজ্যবাদী তকমা ঝেড়ে ফেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েই ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ক্লিমেন্ট এটলি। তাই রাজিও হয়েছিলেন মাউন্টব্যাটেনের শর্তে। সায় দিয়েছিলেন রাজা ষষ্ঠ জর্জও।

এরপর ভাইসরয় হয়ে ভারতের শাসনভার নেন মাউন্টব্যাটেন। স্বাধীনতা দিতে গিয়ে নানা জটিল সমীকরণের মীমাংসা হয় দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ।

একজন ব্রিটিশ আইনজীবীকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো ব্রিটিশ-শাসিত ভারতকে ভাগ করে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের সীমানা ঠিক করার জন্য।

কাগজে কলমে ব্রিটিশশাসিত ভারতকে ভাগ করতে মাত্র পাঁচ সপ্তাহ সময় দেয়া হয়েছিলো তাকে। কিন্তু যে সীমানা তিনি এঁকেছিলেন ভারত ও পাকিস্তানের, তা আজও উপমহাদেশে উত্তেজনার অন্যতম কারণ।

পাকিস্তান-ভারতের মধ্যে সেই উত্তেজনার প্রসঙ্গ আলাদা তোলা থাক। স্বাধীনতার পর সেই র‌্যাডক্লিফ লাইন আজও বাংলাদেশ ভারতের মধ্যেও অন্যতম ইস্যু।

চোরাচালান, অস্ত্র-মাদক পাচার, অনুপ্রবেশ, পুশব্যাক, পুশইন এইসবই ঘুরে ফিরে আসে দুই দেশের রাজনীতি আর কূটনীতিতে।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মোট সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এটি পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘ অংশীদারি স্থলসীমান্ত।

সীমান্ত ব্যবস্থাপনার কাঠামো

সীমান্ত রেখা নিয়ে ঢাকা, দিল্লি কিংবা কলকাতায় বসে যতটা রাজনীতি করা যায় বাস্তবের সীমান্ত ব্যবস্থাপনার সাথে তার যোজন দূরত্ব।

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে মোট সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার। এটি পৃথিবীর পঞ্চম দীর্ঘ স্থলসীমান্ত।

এর মধ্যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাথে ২ হাজার ২১৬ কিলোমিটার, আসামের সাথে ২৬৩, মেঘালয়ের সাথে ৪৪৩, ত্রিপুরার সাথে ৮৫৬ আর মিজোরামের সাথে ৩১৮ কিলোমিটার সীমান্ত। ২০২৫ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি ভারতের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত্যানন্দ রায় সংসদকে জানিয়েছিলেন, ভারত ৩ হাজার ২৩২ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতার দিয়েছে।

তবে অন্তবর্তী সরকারের তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম জানিয়েছিলেন ৪ হাজার ১৫৬ কিলোমিটার সীমান্তের মধ্যে ৩ হাজার ২৭১ কিলোমিটার অংশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত।

ওই সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে আলোচিত হয়ে উঠেছিলো কাঁটাতারের বেড়া। বেশ কিছু ঘটনার কারণে।

২০২৫ সালের ১৮ই জানুয়ারি চাঁপাইনবাবগঞ্জের চৌকা ও কিরণগঞ্জ সীমান্তে যা ঘটেছিলো তার নজির নিকট অতীতেও নেই। সীমান্তের দুই পাশ থেকেই হাজারের বেশি মানুষ জড়ো হয়েছিলেন আন্তর্জাতিক সীমানায়। বিতণ্ডায় জড়িয়েছেন নিজেদের মধ‍্যে।

ফেসবুক ছেয়ে গিয়েছিলো সংঘর্ষ-ধাওয়ার ফুটেজে। বিএসফকে ওইদিন টিয়ার শেল ছুঁড়তে দেখা গেছে। প্রকাশ‍্য দিবালোকে সীমান্তে এমন ঘটনার উদাহরণ স্মরণকালে নেই।

ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহানন্দা ব‍্যাটালিয়ানের তৎকালীন অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম কিবরিয়া বলেছিলেন, “বাংলাদেশি কিছু কৃষক ভারতের অভ‍্যন্তরে প্রবেশ করে ওদের কিছু গম খেত, অল্প পরিমাণ গম, ঘাস অথবা গম কাটে। এইটার প্রতিশোধ হিসাবে ভারতীয় কৃষকরা আমি বলবো, বিএসএফের প্রশ্রয়েই বলবো, তারা এসে বাংলাদেশে জিরো লাইনের পাশাপাশি কিছু আমগাছ ছিলো, আমগাছে কিছু ডাল কেটে ফেলে। তো এই ডাল কাটতে যেয়ে বাংলাদেশের গ্রামবাসীরা ভারতীয় নাগরিকদের ও বিএসফকে বাধা প্রদান করে।"

এরপর ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ঘটা অনাকাঙ্খিত ঘটনা বেশ ভালোভাবেই সামলেছেন বিজিবির কর্মকর্তারা।

এর আগে ২০২৫ সালের পহেলা জানুয়ারি লালমনিরহাটের পাটগ্রামের দহগ্রামের সরকারাপাড়া সীমান্তে জিরো লাইন ঘেঁষে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। খবর পেয়েই বিজিবি ঘটনাস্থলে গেলে কাজ বন্ধ হয়।

একই বছরের ৭ই জানুয়ারি লালমনিরহাটের ধবলসুতি সীমান্তে ল‍্যাম্পপোস্ট তৈরির চেষ্টাও বন্ধ করে বিজিবি। ৮ই জানুয়ারি বিএসএফ একইরকম উদ‍্যোগ নেয় নওগাঁর ধামইরহাট সীমান্তে। সেখানেও উত্তেজনা নিরসনে পতাকা বৈঠক হয়। ১০ই জানুয়ারি ফের দহগ্রামে কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার চেষ্টা করলে সেটিও বন্ধ হয় বিজিবির বাধায়।

২১এ জানুয়ারি জয়পুরহাটের পাঁচবিবির সোনাতলা সীমান্তে জিরো লাইনের ২০ গজ দূরেই কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার চেষ্টা করে বিএসএফ। পতাকা বৈঠকে তাৎক্ষণিকভাবেই প্রতিবাদ জানায় বিজিবি। বন্ধ হয় কাজ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনায় ২২এ জানুয়ারি পতাকা বৈঠক হয় সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে। যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় কৃষক ছাড়া কাউকেই সীমান্তের দেড়শ গজের মধ‍্যে ঢুকতে দেবে না দুই বাহিনী।

একের পর এক এমন সব ঘটনায় ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মনে করিয়ে দেয়া হয় জিরো লাইনের ১৫০ গজের ভেতর কোনো স্থাপনা তৈরি না করার আইনি বাধার কথা।

বিপরীতে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনারকে তলব করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারাও দাবি করেন আইন মেনেই যা করার করছেন।

মাঝে আর কাঁটাতার খুব একটা আলোচনায় ছিলো না। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে উদ্যোগের পরই তা আবার উঠে এলো দ্বিপাক্ষিক রাজনীতিতে।

২০১১ সালের ১৫ জানুয়ারি সরকারি অনুমোদনের কথা জানিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বেড়াগুলো তৈরির অনাপত্তি দেয় বিডিআর সদর দপ্তর

যেভাবে এলো কাঁটাতারের বেড়া

সীমান্ত ব‍্যবস্থাপনা নিয়ে বাংলাদেশ ভারতের প্রথম চুক্তি হয় ১৯৭৪ সালে। 'ল‍্যান্ড বাউন্ডারি এগ্রিমেন্ট' নামের চুক্তিটি ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি নামেও পরিচিত। এই চুক্তিতেই স্থান পায়, দক্ষিণ বেরুবাড়ীর বদলে আঙ্গরপোতা-দহগ্রামে যাতায়াতের জন‍্য তিন বিঘা করিডরের স্থায়ী বন্দোবস্ত, ছিটমহল বিনিময়, ফেনী-মুহুরী নদী, বেদখলে থাকা ভূমির মালিকানা নিশ্চিতকরণ, অচিহ্নিত সীমান্ত চিহ্নিতকরণসহ নানা বিষয়।

১৯৭৫ সালে দুই দেশ সই করে ‘জয়েন্ট ইন্ডিয়া বাংলাদেশ গাইডলাইন্স ফর বর্ডার অথরিটিজ’। এই গাইডলাইনের আট নাম্বার পয়েন্ট অনুসারে জিরো লাইনের দুদিকে দেড়শ গজ করে মোট তিনশ গজের মধ‍্যে কোনো দেশ স্থায়ী বা অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করতে পারবে না।

এই গাইডলাইনের বলেই ভারত কাঁটাতারের বেড়া জিরো লাইন থেকে দেড়শ গজ ভেতরে দেয়।

১৯৮৫ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আসাম আন্দোলনের নেতাদের সাথে ‘আসাম শান্তি চুক্তি’ সই করে। এই চুক্তির প্রভাবেই মূলত বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরির উদ‍্যোগ নেয় ভারত।

তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকার এতে উৎসাহ না দেখালেও, বিরোধিতাও করেনি। ১৯৭৫ সালের গাইডলাইন মেনে দেড়শ গজ ভেতরে বেড়া দিতে শুরু করে ভারত।

ছন্দপতন ঘটে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর। ২০১০ সালের মার্চে দিল্লিতে বিডিআর-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষে বিএসএফের মহাপরিচালক রমন শ্রীবাস্তব সাংবাদিকদের জানান, মানবিক ও ভৌগোলিক বাস্তবতার কারণে, প্রয়োজনীয় অংশে দেড়শ গজের মধ‍্যে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণে সম্মতি দিয়েছে ঢাকা।

সেখানে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন বিডিআরের মহাপরিচালক লেফটেন‍্যান্ট জেনারেল মইনুল ইসলাম। তিনিও সাংবাদিকদের এ তথ‍্য নিশ্চিত করেন।

২০১০ সালের ১২ই মার্চ দ‍্য ইকোনমিক টাইমসের শিরোনাম ছিলো, 'ঢাকা ওকে টু ফেন্সিং উইথ ১৫০ ইয়ার্ডস'। সেখানে বলা হয়, ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দুই দেশের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠকেই এই সিদ্ধান্ত নেয় দুই সরকার। যা প্রকাশ‍্যে আসে বিডিআর-বিএসএফ সম্মেলনে।

২০১০ সালের ১৮ই আগস্ট প্রথম বিএসএফের তরফে চিঠি লেখা হয় বিলুপ্ত বিডিআরকে। ছয়টি স্থানে কোনো গেট ছাড়া এক সারির বেড়া দেয়ার প্রয়োজনীয়তা জানিয়ে অনুমতি চেয়ে লেখা হয় সেই চিঠি।

ফিরতি চিঠিতে, ২০১১ সালের ১৫ই জানুয়ারি সরকারি অনুমোদনের কথা জানিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে বেড়াগুলো তৈরির অনাপত্তি দেয় বিডিআর সদর দপ্তর (২০১১ সালের ২৩ জানুয়ারি বিডিআর আনুষ্ঠানিকভাবে বিজিবি নাম ধারণ করে)।

এরও কয়েক মাস পর ২০১১ সালের জুলাইতে সমন্বিত সীমান্ত ব‍্যবস্থাপনা পরিকল্পনা প্রণয়ন করে বিজিবি ও বিএসএফ। ত্রিশে জুলাই এতে সই করেন তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আনোয়ার হুসাইন ও বিএসএফ মহাপরিচালক রামান শ্রীবাস্তব।

২০১০ সালের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ও ২০০৯ সালের স্বরাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকের বরাতে পরিকল্পনা সাজানো হয়। এতে অন‍্যান‍্য ইস‍্যুর পাশাপাশি জিরো লাইনের ১৫০ দেড়শ গজের ভেতর ‘ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কস’ নিয়ে ঐক‍মত্য হয়।

বলা হয়, দুই সীমান্তরক্ষী বাহিনী স্থানীয় পর্যায়ে ইস‍্যুগুলো মীমাংসা করবেন। তবে এখানেও ‘মিলিটারি’ বা সামরিক তথা প্রতিরক্ষা স্থাপনা তৈরি না করার বাধ‍্যবাধকতা রাখা হয়। কিন্তু ‘সিঙ্গেল রো ফেন্স’ বা এক সারির বেড়া প্রতিরক্ষা স্থাপনার মধ‍্যে পড়ে কিনা তা স্পষ্ট করা হয়নি।

এই অস্পষ্টতার সুযোগেই ‘কেইস টু কেইস বেসিসে’ দেড়শ গজের ভেতরে কাঁটাতার দেয়ার অনুমতি পেতে থাকে বিএসএফ। অন্তত ১৬০ টি জায়গায় কাঁটাতার দেয়া হয়েছে জিরো লাইনের দেড়শ গজের মধ‍্যে।

অন্তবর্তী সরকারের সময় আর নতুন করে এমন কোনো বেড়ার অনুমতি দেওয়া হয়নি। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকার যে কাঁটাতারের বেড়ার কথা বলছে তা মূলত দেড়শ গজ ভেতরের বেড়া।

অরক্ষিত সীমান্তগুলো বেড়া দেওয়ার জন্য ভারতের সীমান্তরক্ষীবাহিনী বিএসএফের যে জমি প্রয়োজন তা-ই আটকে রেখেছিলো সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়।

২০২৫ সালের অগাস্টে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় বিজিবি-বিএসএফ মহাপরিচালক পর্যায়ের ৫৬তম সীমান্ত সম্মেলন।

ফের আলোচনায় কাঁটাতারের বেড়া

পশ্চিমবঙ্গের সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের সাথে এই রাজ্যের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২,২১৭ কিলোমিটার।

এখন পর্যন্ত ১,৬৪৮ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করা হয়েছে। বাকি ৫৬৯ কিলোমিটারের মধ্যে ১১৩ কিলোমিটার নদী সীমান্তের অন্তর্গত।

বাকি ৪৫৬ কিলোমিটার অংশের মধ্যে ১৮১ কিলোমিটার বেড়া তৈরিতে প্রয়োজনীয় ১০৫ একর জমির জন্য টাকা ছাড় করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

গত ২৭এ জানুয়ারি কলকাতা হাইকোর্ট রাজ্যকে নির্দেশও দিয়েছিল, টাকা ছাড় করা হয়েছে এমন সীমান্তবর্তী জমি আগামী ৩১এ মার্চের মধ্যে বিএসএফকে হস্তান্তর করতে হবে।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতির এই দ্বৈরথই হয়ে উঠেছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আলোচিত বিষয়। কারণ সীমান্ত দুই দেশেরই।

বিজেপি বরাবরই বাংলাদেশিদের ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে সরব। রাজ্য থেকে কেন্দ্র ‘বাংলাদেশিদের’ ফেরত পাঠানোর হুমকিও দিয়েছেন একাধিক নেতা।

যদি অবৈধ কেউ থেকেও থাকে তাহলে ফেরত পাঠানোর সুনির্দিষ্ট নিয়ম আছে। কিন্তু টানা দুই মেয়াদে সদ্য শপথ নেওয়া আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমান্ত বিশ্ব শর্মা কিছুদিন আগে এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে ‘ফরমাল চ্যানেলের’ বদলে জোর করে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হচ্ছে সীমান্তের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং কোনো ধরনের ‘পুশইন’ যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা।

এ জন্য বিজিবিকে সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, “আমরা সতর্ক আছি। সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সমুন্নত রাখার দিকেই আমাদের নজর রয়েছে।”

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের উপমহাপরিচালক কর্নেল আবুল হাসনাত মোহাম্মদ মাহমুদ আজম আলাপ-কে বলেছেন, “বিএসএফ আইন ও গাইডলাইন মেনে কাজ করলে এটা নিয়ে ভাবনার কিছু নেই। তবে এখতিয়ারবহির্ভুত কোনো পদক্ষেপ নিলে তাতে বিজিবি ছাড় দেবে না। নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অনুসরণ করেই তা সমাধান করা হবে।”