পাকিস্তান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যস্থতাকারী হলো
নাহিদ হোসেন
প্রকাশ : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩২ পিএমআপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ। ওয়াশিংটন থেকে তেহরান, দুইদিকেই কঠোর ভাষার ব্যবহার। হুমকি পালটা হুমকির জেরে জেরবার পৃথিবী।
ট্রাম্পে টাইমলাইনে ডেডলাইনের পর ডেডলাইন। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, “আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।” এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরান সমঝোতায় এলো?
যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেই কূটনৈতিকভাবে নানা বিপাকে ছিল, সেই পাকিস্তান হয়ে উঠলো সংকটের ত্রাতা।
পাকিস্তান কিভাবে যুদ্ধ থামালো তা যেমন প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কিভাবে একটি ভেঙে পড়া সম্পর্ক, পর্দার আড়ালের কূটনীতি আর ব্যক্তি সম্পর্কের সমীকরণে পাকিস্তান নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে ওয়াশিংটন আর তেহরানের মাঝে দাঁড়িয়ে কথা বলার বাস্তবতা খুব কম দেশেরই আছে।
ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন উত্থান পতন
পাকিস্তানের সাথে একটা সময় সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ২০১৮ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছিল ‘মিথ্যা ও প্রতারণার’ জন্য। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাও স্থগিত করা হয় ওই সময়।
এই পদক্ষেপ ছিল দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের ফল। আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান একদিকে তাদের মিত্র, অন্যদিকে তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতি ‘সহানুভূতিশীল।‘
ইমরান খানের শাসনামলে সম্পর্কে খানিকটা উষ্ণতা ফিরলেও, বাইডেন প্রশাসনের সময় ফের দূরত্ব তৈরি হয়।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইসলামাবাদের ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনে সন্দেহ আরও বাড়ে।
এসবের জের ধরেই ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্পর্কে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ছিল, কিন্তু আস্থা ছিল না।
গত বছরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা রাজনৈতিকভাবে কঠিন। অন্যদিকে পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। আইএমএফের সহযোগিতা, ডলার সংকট ইত্যাদির জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন তাদের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
আবার পাকিস্তান এমন একটি অবস্থানে ছিল যেখানে তারা সৌদি আরবের মিত্র হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেয়নি। এই ভারসাম্য তাদের গুরুত্ব বাড়ায়।
এই বছরের শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার রিয়াদ, তেহরান, আঙ্কারাসহ আঞ্চলিক যোগাযোগের গতি বাড়ান। কূটনীতিতে যাকে বলে ‘শাটল ডিপ্লোমেসি।’
মার্চের শেষ দিক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিল ইসলামাবাদ। ২৯এ মার্চ তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকও করে তারা।
যে কারণে পাকিস্তানে আস্থা
কোনো সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হতে হলে উভয় পক্ষের আস্থা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। প্যালেস্টাইন ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকাও তেহরানের আস্থার কারণ।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এও যুক্ত হয়েছে ইসলামাবাদ।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শাল’ বলেও উল্লেখ করেছেন। মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কাঠামোয় মুনিরের যোগাযোগ পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীতো বটেই, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এই মধ্যস্থতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
এ বছরের ১৫ই মার্চ ফিল্ড মার্শাল মুনির ওয়াশিংটন সফর করেন। সেখানে পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মূল আলোচ্য ছিল, ইরান সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য মধ্যস্থতা।
এরপর ২৯এ মার্চ ইসলামাবাদ সময় রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টায় ট্রাম্প ও মুনিরের মধ্যে প্রায় ২৫ মিনিটের ফোনালাপ হয়।
এই যোগাযোগই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নমনীয় করে এবং কূটনৈতিক পথের সুযোগ তৈরি করে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছিলো। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই বিকল্প পথ খুঁজতে থাকলে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তেহরানের জবাব ওয়াশিংটনে পাঠানোর দায়িত্বও পালন করে ইসলামাবাদ।
প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানেরও
শুধু ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য নয়, যুদ্ধবিরতি পাকিস্তানের প্রয়োজনও ছিল। দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং বিপুল সংখ্যক প্রবাসী সেখানেই কাজ করেন।
ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনায় জ্বালানির দাম বাড়ায় পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণভাবে দাম বাড়াতে হয়েছে, যা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে।
এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট, আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান টানাপোড়েনের মধ্যে আরেক প্রতিবেশী ইরানের অস্থিতিশীলতা ইসলামাবাদের জন্য সুখকর নয়।
পাকিস্তানের ভেতরেও অস্থিরতা দেখা দেয়। আয়াতুল্লাহ খামেইনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়, যাতে কয়েকজন নিহত হন।
তাই পাকিস্তানও চাইছিলো দুই দেশের সাথে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিয়ে যাওয়া।
আলাপের পূর্বাপর
দুই ধাপের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে পাকিস্তান। প্রথমে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, তারপর আলোচনা। ৫ই এপ্রিল পাকিস্তানের দেওয়া এই এই কাঠামো ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ নামে পরিচিতি পায়।
ট্রাম্প যখন ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়ে ফেলেছিল তখন পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ট্রাম্পকে দুই সপ্তাহ সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
টানা আলোচনায় যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
অতঃপর যুদ্ধবিরতিতের সম্মত হয় দুই দেশ। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি। সেখানে তিনি ‘আমার প্রিয় ভাই’ উল্লেখ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি ‘অবিরাম প্রচেষ্টার’ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
আরাঘচির ওই পোস্ট নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শেয়ার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এতে মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকায় ওয়াশিংটনের সম্মতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এর কিছুক্ষণ পর এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে শেহবাজ শরীফ বলেন, “সর্বোচ্চ বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে অবিলম্বে সর্বত্র, লেবাননসহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর।”
তিনি বলেন, “এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে আমি স্বাগত জানাই এবং দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সব বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানে আলোচনার জন্য ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
শরীফ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হবে এবং শিগগিরই আরও সুখবর দেওয়া যাবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ বলছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিল্ড মার্শাল মুনির রাতভর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন।
পাকিস্তান কীভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যস্থতাকারী হলো
মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে বারুদের গন্ধ। ওয়াশিংটন থেকে তেহরান, দুইদিকেই কঠোর ভাষার ব্যবহার। হুমকি পালটা হুমকির জেরে জেরবার পৃথিবী।
ট্রাম্পে টাইমলাইনে ডেডলাইনের পর ডেডলাইন। হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টা আগেও ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, “আজ রাতে একটি পুরো সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।” এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরান সমঝোতায় এলো?
যে দেশটি দীর্ঘদিন ধরে নিজেই কূটনৈতিকভাবে নানা বিপাকে ছিল, সেই পাকিস্তান হয়ে উঠলো সংকটের ত্রাতা।
পাকিস্তান কিভাবে যুদ্ধ থামালো তা যেমন প্রশ্ন। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কিভাবে একটি ভেঙে পড়া সম্পর্ক, পর্দার আড়ালের কূটনীতি আর ব্যক্তি সম্পর্কের সমীকরণে পাকিস্তান নিজেকে এমন জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে ওয়াশিংটন আর তেহরানের মাঝে দাঁড়িয়ে কথা বলার বাস্তবতা খুব কম দেশেরই আছে।
ইসলামাবাদ-ওয়াশিংটন উত্থান পতন
পাকিস্তানের সাথে একটা সময় সাপে-নেউলে সম্পর্ক ছিল যুক্তরাষ্ট্রের। ২০১৮ সালের শুরুতে ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে অভিযুক্ত করেছিল ‘মিথ্যা ও প্রতারণার’ জন্য। প্রায় দুই বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তাও স্থগিত করা হয় ওই সময়।
এই পদক্ষেপ ছিল দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসের ফল। আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ ছিল, পাকিস্তান একদিকে তাদের মিত্র, অন্যদিকে তালেবান ও হাক্কানি নেটওয়ার্কের প্রতি ‘সহানুভূতিশীল।‘
ইমরান খানের শাসনামলে সম্পর্কে খানিকটা উষ্ণতা ফিরলেও, বাইডেন প্রশাসনের সময় ফের দূরত্ব তৈরি হয়।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর ইসলামাবাদের ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনে সন্দেহ আরও বাড়ে।
এসবের জের ধরেই ২০২২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সম্পর্কে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ ছিল, কিন্তু আস্থা ছিল না।
গত বছরের শেষ নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়ছিল।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারে, ইরানের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা রাজনৈতিকভাবে কঠিন। অন্যদিকে পাকিস্তান নিজেই অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। আইএমএফের সহযোগিতা, ডলার সংকট ইত্যাদির জন্য ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন তাদের জন্য কৌশলগত প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়।
আবার পাকিস্তান এমন একটি অবস্থানে ছিল যেখানে তারা সৌদি আরবের মিত্র হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে দেয়নি। এই ভারসাম্য তাদের গুরুত্ব বাড়ায়।
এই বছরের শুরু থেকেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ সক্রিয় কূটনৈতিক উদ্যোগ নেয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার রিয়াদ, তেহরান, আঙ্কারাসহ আঞ্চলিক যোগাযোগের গতি বাড়ান। কূটনীতিতে যাকে বলে ‘শাটল ডিপ্লোমেসি।’
মার্চের শেষ দিক থেকেই উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্রিয় ছিল ইসলামাবাদ। ২৯এ মার্চ তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের নিয়ে বৈঠকও করে তারা।
যে কারণে পাকিস্তানে আস্থা
কোনো সংঘাতে মধ্যস্থতাকারী হতে হলে উভয় পক্ষের আস্থা জরুরি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে ইরান তার আরব প্রতিবেশীদের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার জবাবে উপসাগরীয় দেশগুলোতেও হামলা চালায় তেহরান।
পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের সীমান্ত ও দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক সম্পর্ক আছে। প্যালেস্টাইন ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকাও তেহরানের আস্থার কারণ।
গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হয়েছে। ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এও যুক্ত হয়েছে ইসলামাবাদ।
ট্রাম্প প্রকাশ্যে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনিরকে তার ‘পছন্দের ফিল্ড মার্শাল’ বলেও উল্লেখ করেছেন। মার্কিন ও ইরানি প্রতিরক্ষা কাঠামোয় মুনিরের যোগাযোগ পাকিস্তানকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীতো বটেই, সেনাপ্রধান আসিম মুনির এই মধ্যস্থতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
এ বছরের ১৫ই মার্চ ফিল্ড মার্শাল মুনির ওয়াশিংটন সফর করেন। সেখানে পেন্টাগন ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে মূল আলোচ্য ছিল, ইরান সংকট, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, এবং পাকিস্তানের সম্ভাব্য মধ্যস্থতা।
এরপর ২৯এ মার্চ ইসলামাবাদ সময় রাত আনুমানিক সাড়ে নয়টায় ট্রাম্প ও মুনিরের মধ্যে প্রায় ২৫ মিনিটের ফোনালাপ হয়।
এই যোগাযোগই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে নমনীয় করে এবং কূটনৈতিক পথের সুযোগ তৈরি করে।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হচ্ছিলো। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই বিকল্প পথ খুঁজতে থাকলে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফা প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তেহরানের জবাব ওয়াশিংটনে পাঠানোর দায়িত্বও পালন করে ইসলামাবাদ।
প্রয়োজন ছিল পাকিস্তানেরও
শুধু ভূরাজনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর জন্য নয়, যুদ্ধবিরতি পাকিস্তানের প্রয়োজনও ছিল। দেশটির অধিকাংশ জ্বালানি আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে এবং বিপুল সংখ্যক প্রবাসী সেখানেই কাজ করেন।
ইরানের হরমুজ প্রণালি অবরোধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনায় জ্বালানির দাম বাড়ায় পাকিস্তানকে অভ্যন্তরীণভাবে দাম বাড়াতে হয়েছে, যা সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে।
এছাড়া অর্থনৈতিক সংকট, আফগানিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা এবং ভারতের সঙ্গে বিদ্যমান টানাপোড়েনের মধ্যে আরেক প্রতিবেশী ইরানের অস্থিতিশীলতা ইসলামাবাদের জন্য সুখকর নয়।
পাকিস্তানের ভেতরেও অস্থিরতা দেখা দেয়। আয়াতুল্লাহ খামেইনি নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়, যাতে কয়েকজন নিহত হন।
তাই পাকিস্তানও চাইছিলো দুই দেশের সাথে সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নিজেকে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় নিয়ে যাওয়া।
আলাপের পূর্বাপর
দুই ধাপের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনে পাকিস্তান। প্রথমে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি, তারপর আলোচনা। ৫ই এপ্রিল পাকিস্তানের দেওয়া এই এই কাঠামো ‘ইসলামাবাদ অ্যাকর্ড’ নামে পরিচিতি পায়।
ট্রাম্প যখন ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করার হুমকি দিয়ে ফেলেছিল তখন পাক প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ট্রাম্পকে দুই সপ্তাহ সময় বাড়ানোর অনুরোধ জানান।
টানা আলোচনায় যুক্ত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাঘচি এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির।
অতঃপর যুদ্ধবিরতিতের সম্মত হয় দুই দেশ। দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকরের বিষয়টি নিশ্চিত করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি। সেখানে তিনি ‘আমার প্রিয় ভাই’ উল্লেখ করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রতি ‘অবিরাম প্রচেষ্টার’ জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
আরাঘচির ওই পোস্ট নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে শেয়ার করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এতে মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদের ভূমিকায় ওয়াশিংটনের সম্মতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এর কিছুক্ষণ পর এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া পোস্টে শেহবাজ শরীফ বলেন, “সর্বোচ্চ বিনয়ের সঙ্গে জানাচ্ছি, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে অবিলম্বে সর্বত্র, লেবাননসহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর।”
তিনি বলেন, “এই দূরদর্শী পদক্ষেপকে আমি স্বাগত জানাই এবং দুই দেশের নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। সব বিরোধের চূড়ান্ত সমাধানে আলোচনার জন্য ২০২৬ সালের ১০ই এপ্রিল শুক্রবার ইসলামাবাদে প্রতিনিধিদল পাঠানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”
শরীফ আশাবাদ ব্যক্ত করেন, ‘ইসলামাবাদ আলোচনা’ টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় সফল হবে এবং শিগগিরই আরও সুখবর দেওয়া যাবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএস নিউজ বলছে, দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত করার আগে ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং পাকিস্তানের ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ফিল্ড মার্শাল মুনির রাতভর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন।