পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা বদল ও ‘বুলডোজার’ রাজনীতির পদধ্বনি

মমতার দুর্ভেদ্য দুর্গ ধসিয়ে পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার জাস্টিস’ কি এখন পশ্চিমবঙ্গের নতুন ভবিষ্যৎ? কেন টার্গেট লেলিনের মূর্তি?

আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ০৫:৩৫ পিএম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্র সাক্ষী হয়েছে এক নাটকীয় পরিবর্তনের। রাজ্যটির বিধানসভার ২৯৪ আসনের ২০৭টিতে জিতে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি(বিজেপি)। ক্ষমতার এই পরিবর্তন রাজ্যটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক নতুন মেরুকরণের সূচনা করেছে। এবার পশ্চিমবঙ্গেও উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার জাস্টিস’ এবং বামপন্থী আদর্শের প্রতীকগুলোর ওপর হামলা, রাজ্যটিকে এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৪৫ দশমিক ৮৪ শতাংশ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে বিজেপি। তৃণমূল কংগ্রেস ৪০দশমিক ৮০ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছে ৮০টি আসনে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তৃণমূলের দুর্ভেদ্য দুর্গগুলোতে বিজেপির এই প্রবেশ কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং ‘আইডেন্টিটি পলিটিক্স’ বা পরিচয়বাদের রাজনীতির এক বড় জয়।

সহিংসতা ও রক্তপাত

নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় পশ্চিমবঙ্গে অন্তত চারজন নিহতের খবর পাওয়া গেছে গণমাধ্যমের খবরে। আসানসোল শিল্পাঞ্চলে তৃণমূলের কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার খবর জানিয়েছে আনন্দবাজার পত্রিকা। পাশাপাশি রূপনারায়ণপুর টোল প্লাজ়া, কুমারপুর, কুলটি, রানিগঞ্জ, জামুড়িয়া, বারাবনি এবং বার্ণপুরে তৃণমূলের একাধিক দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর এবং গেরুয়া রঙ করে দেওয়ার অভিযোগ করেছে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা।

তবে সহিংসতা ও ভাঙচুরে নিজেদের কর্মী জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে নবনির্বাচিত বিজেপি বিধায়কেরা। ‘দুষ্কৃতিকারীরা’ বিজেপির নাম ব্যবহার করে ‘অশান্তি পাকানোর চেষ্টা করছে’ বলে জানান তারা। 

উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ব্যক্তিগত সহকারীকে গুলি করে হত্যা করেছে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতকারীরা। 

পশ্চিমবঙ্গ বনাম উত্তরপ্রদেশ: ‘বুলডোজার’ যখন রাজনীতির প্রতীক

পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক সহিংসতায় সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বুলডোজারের ব্যবহার। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিজেপি কর্মীরা রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বুলডোজার নিয়ে বিজয় মিছিল করে বলে উঠে এসেছে বিবিসির এক প্রতিবেদনে। কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকায় একটি ইউনিয়ন অফিস বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বুলডজারকে ‘ল অ্যান্ড অর্ডারের’ একটি বিতর্কিত প্রতীকে পরিণত করেন মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। উত্তরপ্রদেশের ক্ষমতায় এসে ২০১৭ সালে ‘অপরাধী’ দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেন তিনি। এর অংশ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তিদের ঘরবাড়ি ও সম্পত্তি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়। একে বলা হয় ‘বুলডোজার জাস্টিস’।

যোগী আদিত্যনাথকে বিরোধীরা বিদ্রুপ করে ‘বুলডোজার বাবা’ ডাকলেও একে নিজের সাফল্যের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেন আদিত্যনাথ। বিজেপি সমর্থকরা মিছিলে খেলনা বুলডোজার নিয়ে সামিল হতে শুরু করে।

উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে ‘অপরাধীদের মনে ভয় ধরানো’র এবং দ্রুত ‘বিচার নিশ্চিত করা’র একটি কার্যকর উপায় হিসেবে দাবি করা হলেও এর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতো সংস্থাগুলো। তারা এটিকে ‘কালেক্টিভ পানিশমেন্ট’ বা ‘যৌথ শাস্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে। এই ধরনের ঘটনায় অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তির সাথে তার পরিবারের নিরপরাধ সদস্যরাও গৃহহীন হয়ে পড়ে। অ্যামনেস্টির ২০২৪ সালের একটি রিপোর্টে দাবি করা হয় যে, এই অভিযানগুলোর বড় অংশই সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে।

আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়,  ভারতে বুলডোজার ব্যবহার করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি ধ্বংস করাকে ‘আইন-শৃঙ্খলারক্ষা’ হিসেবে প্রচার করা হয়।

‘বুলডোজার জাস্টিস’কে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া এবং আগাম নোটিশ ছাড়া কোনো সম্পত্তি ভাঙা যাবে না বলে এক রায়ে জানায় তারা।

উত্তরপ্রদেশের সেই বুলডোজার ব্যবহার করে ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি এখন পশ্চিমবঙ্গেও দেখা যাচ্ছে। 

কেন টার্গেট লেনিনের মূর্তি

পশ্চিমবঙ্গে এবং ভারতের অন্যান্য প্রান্তে বিজেপির উত্থানের সময় ভ্লাদিমির লেনিনের মূর্তি ভাঙার ঘটনা অনেকবার দেখা গেছে। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার জিয়াগঞ্জ শহরের লেনিনের একটি মূর্তি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, একদল দুষ্কৃতকারী হ্যাকসো দিয়ে মূর্তির মাথাটি কেটে ফেলে। মূর্তিটি বেদি থেকে উপড়ে ফেলে। বিজেপির পতাকা নিয়ে আসা দুষ্কৃতকারীরা এই হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করে বামপন্থী রাজনৈতিক দল সিপিআইএম।

মুর্শিদাবাদের এই ঘটনাটি ছাড়াও বামপন্থী দলীয় কার্যালয়ে হামলা ও প্রতিকৃতি অবমাননার খবর উঠে এসেছে গণমাধ্যমে। 

মার্ক্সবাদ ও বামপন্থার বিশ্বজনীন প্রতীক লেনিন। বিজেপির ‘ডানপন্থী’ জাতীয়তাবাদী আদর্শের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ বামপন্থী ‘ইন্টারন্যাশনালিস্ট’ চিন্তা। তাই লেনিনের মূর্তি ভাঙা বামপন্থী দর্শনের পরাজয়কে ত্বরান্বিত করার একটি প্রতীকী রূপ।

এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের বাম শাসনের স্মৃতি এখনো অনেক মানুষের মনে টাটকা। বিজেপির কাছে লেলিনের মূর্তি ভাঙা হলো সেই পুরানো শাসনব্যবস্থার চূড়ান্ত বিলোপের ঘোষণা। একইসাথে বিজেপির কাছে এই মূর্তিগুলো ‘বিদেশি মতাদর্শের’ প্রতীক। তারা একে সরিয়ে ভারতীয় বা হিন্দুত্ববাদী আইকন স্থাপনের মাধ্যমে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চায় বলে মনে করেন অনেক বিশ্লেষক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এনডিটিভি এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ভারতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ২০১৭ সাল থেকে ক্রমাগত বেড়েছে। এই সহিংসতার একটি বড় অংশ সংঘটিত হয়েছে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সহিংসতা আশঙ্কা তৈরি করেছে সেই তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ করার।